অক্টোবর স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস

জনস্বাস্থ্য সমস্যা ব্রেস্ট ক্যান্সার

  ডা. কাজী ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১০ লাখেরও অধিক নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীই মারা যায়। বিশ্বে স্তন ক্যান্সার একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্বে প্রতি ৮ জন নারীর মধ্যে একজনের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পরিসংখ্যান

সঠিক কোনো পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা না থাকলেও ডঐঙ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে বিশ্লেষণ করে যা উপস্থাপন করেছে তা হল বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১,৫০,৭৪১ জন নতুন ক্যান্সার রোগী আক্রান্ত হচ্ছে। যার মধ্যে ১,০৮,১৩৭ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এসব রোগীর শতকরা ৮.৫ শতাংশ অর্থাৎ ১২,৭৬৪ জনই স্তন ক্যান্সারের রোগী। শুধু মহিলা রোগীদের ক্ষেত্রে হিসাব করা হলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১৯ শতাংশ।

ঝুঁকিপূর্ণ কারা

* বয়স : বেশিরভাগ স্তন ক্যান্সারই ৫০ বছরের পরে হয়ে থাকে।

* পারিবারিক ইতিহাস : যদি কারও মা, খালা, মেয়ে বা বোনের স্তন ক্যান্সার থাকে তবে তারও স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

* দেরিতে প্রথম সন্তান : যেসব নারী ৩৫ বছরের পর প্রথম গর্ভ ধারণ করে তাদের সাধারণত স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।

* দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেন হরমোনের সংস্পর্শ : অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া, বেশি বয়সে মাসিক বন্ধ হওয়া বা মাসিক বন্ধ হওয়ার পর হরমোন থেরাপি নেয়া স্তন ক্যান্সারের একটি সম্ভাব্য কারণ।

* স্থূলতা বা চর্বি জাতীয় খাদ্যাভ্যাস : অধিক ওজন এবং চর্বি জাতীয় খাবার, অ্যালকোহল ইত্যাদি এবং কায়িক পরিশ্রম না করা স্তন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

উপসর্গ কীভাবে নির্ণয় করবেন

* স্তনে বা বগল তলায় শক্ত চাকা হওয়া যা সাধারণত ব্যথাবিহীন হয়।

* স্তনের আকার অথবা আকৃতির পরিবর্তন হওয়া।

* চামড়ার পরিবর্তন যেমন : চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া, চামড়ায় গর্ত হওয়া, চামড়া লাল হওয়া বা গরম হওয়া। অথবা চামড়া কমলার খোসার প্রকৃতি ধারণ করা।

* স্তনের বোঁটায় কোনো পরিবর্তন যেমন : বোঁটা ভিতর দিকে চলে যাওয়া, বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রক্ত বা পুঁজ জাতীয় পদার্থ বের হওয়া।

চিকিৎসা

অপারেশন : ছোট অবস্থায় ধরা পড়লে সাধারণত শুরুতেই অপারেশন করে পুরো স্তন ফেলে দিতে হয়। তবে আংশিক স্তন ফেলেও চিকিৎসা সম্ভব, যদি ক্যান্সারের অন্যান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা দেয়া সহজতর হয়।

চাকা যদি বড় হয়ে যায় অথবা বগল তলায়ও চাকার অস্তিত্ব ধরা পরে, তখন শুরুতেই অপারেশন করা হয় না। সেই ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির মাধ্যমে চাকাকে ছোট করে সফল অপারেশনের জন্য যোগ্য করে তোলা হয়।

কেমোথেরাপি : রোগের শুরুতেই স্তন ক্যান্সার শুধু স্তনেই সীমাবদ্ধ থাকে না বলে ধারণা করা হয়। সেজন্য প্রায় প্রতিটি স্তন ক্যান্সারের রোগীর কেমোথেরাপি বা ওষুধের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

অতিমাত্রায় হরমোন সংবেদনশীল টিউমার, অধিক বয়সে সব ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির পরিবর্তে হরমোনথেরাপি দেয়া যেতে পারে।

যাদের রোগ স্তন বা বগল তলা ছাড়াও দেহের অন্যান্য অঙ্গ যেমন- ফুসফুস, লিভার ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের চিকিৎসা কেবলমাত্র কেমোথেরাপি বা অন্যান্য ওষুধের চিকিৎসা।

রেডিওথেরাপী

উচ্চ মাত্রায় এক্স-রে দ্বারা ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করাকে রেডিওথেরাপি বলে। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীরই রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। যাদের রোগ কোথাও ছড়ায়নি তাদেরকে আরোগ্য করার জন্য রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। আর যাদের রোগ ব্রেইন বা হাড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাদেরকে উপশম করার জন্য রেডিওথেরাপি দেয়া হয়।

অন্যান্য চিকিৎসা

হরমোনথেরাপি : হরমোন সংবেদনশীল টিউমারকে চিকিৎসার জন্য শরীরে সংশ্লিষ্ট হরমোনের নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়া হয়।

ইমিউনোথেরাপি : কোন কোন স্তন ক্যান্সার রোগীর টিউমারে কোন কোন প্রোটিনের উপস্থিতি অতিমাত্রায় দেখা যায় যেমন- (HER-2)। সে ক্ষেত্রে ওই প্রোটিনের বিপরীতে ওষুধ প্রদান করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে কি পূর্ণ চিকিৎসা সম্ভব

রোগ নির্ণয়, অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি অথবা হরমোনালথেরাপি এর সবগুলো চিকিৎসাই বাংলাদেশে সম্ভব। দেশে প্রতি বছর প্রশিক্ষিত সার্জন এবং ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় দেশে রেডিওথেরাপি মেশিনের স্বল্পতা রয়েছে। কিছু দেশীয় ওষুধ কোম্পানি এখন দেশেই স্বল্প মূল্যে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি করছে।

দ্রুত রোগ নির্ণয়ের কোনো ব্যবস্থা আছে কি

অনেকেই জানেন, দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত জরায়ুর ‘ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম’ চালু আছে। সরকার এর সঙ্গে স্তন পরীক্ষাও যুক্ত করেছে। এছাড়াও সতর্ক হলে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব।

বিশ্বে বর্তমানে স্তন ক্যান্সার একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণাও চলছে। দিনে দিনে এ রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এখনই সবাইকে সতর্ক হতে হবে এ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অথবা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেয়ার জন্য।

লেখক : আবাসিক চিকিৎসক, রেডিওথেরাপি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×