কর্মস্থলে দুশ্চিন্তা কী করে কমাবেন
jugantor
কর্মস্থলে দুশ্চিন্তা কী করে কমাবেন

  অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী  

০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা ফুলটাইম কাজ করেন, বা দিনে দু-তিনটা কাজ করেন এদের অনেকেই জীবনের পুরো সময়ই কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ, নিখুঁত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা, এসবের জন্য কর্মীরা কর্মস্থলে দুশ্চিন্তায় পড়বেন, এটি বিচিত্র কী? কিন্তু এরকম কাজ যারা করেন তারা একা নন, অন্তত এক তৃতীয়াংশ লোক জীবনে কোনো কোনো সময় দুশ্চিন্তা বৈকল্যে ভোগেন। আর অনেক লোকই কর্মস্থলে নার্ভাস হওয়া, উদ্বেগ, অস্বস্তি অনুভব করেন সত্যি। তবে এও ঠিক দুশ্চিন্তা উদ্বেগগুলো স্বাভাবিক ইমোশন্যাল জীবনের অংশও বটে। তবে দুশ্চিন্তা যখন পিছু টানে বেশি, অনেক দুর্ভোগের সৃষ্টি করে তখন একে মোকাবেলার কিছু কৌশল জানা ভালো।

ঘুমাবেন বেশি, দুশ্চিন্তা করবেন কম

অনেকেরই ঘুম হয় না ভালো, যথেষ্ট হয় না। জানেন তো, স্মৃতিশক্তি ও বোধ আর অবধারণের জন্য নিদ্রা বড় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার আগে ভালো করে ঘুমাতে উপদেশ দিই। আমরা জানি নিদ্রালু ড্রাইভার প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। তাই চালকশক্তির পারফরমেন্স আর বিচারবুদ্ধির জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেকে ভুলে যাই উজ্জীবক ঘুম ইমোশনাল পারফরমেন্স আর সহ্য শক্তির উৎকর্ষের জন্য দরকার। এ জন্য এ রকম একটি প্রবচন আছে Some one work up on the worng side of the bed। বেশিরভাগ লোকের রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হয়।

* শয্যায় যাওয়ার প্রতিদিনের রুটিন যেন একই সময়ে হয়।

* ব্যবহার করুন স্লিপ মাসক, ইয়ার প্লান, হোয়াইট নয়েজ মেশিন ঘুমের ব্যাঘাত যাতে না হয়।

* ফোন বন্ধ করুন, বন্ধ করুন সব শব্দ আর আলোকিত ডায়েল, স্কিনের নীল আলো যেন না পড়ে চোখে।

মনকে চাপমুক্ত করতে কফি

মন বদলানোর জন্য ক্যাফেইনের জুড়ি নেই, তাই কফির এত কদর দেশে-বিদেশে। কফি পান করুন তবে পরিমিত। বিকালে অবশ্য নয়। পান করুন সকালে। বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ কিন্তু কর্মস্থলে দুশ্চিন্তা বাড়ায়। অনেকে শেষ বেলাতেও কফি পান করে কাজে উদ্দীপনা পান। এটি ঠিক নয়। এতে ঘুম হবে কম দুশ্চিন্তাও কমবে না। তাই দিনের প্রথমভাগে দুকাপের বেশি কফি নয়।

দীর্ঘসূত্রতা থেকে সাবধান

অনেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ শুরু করবেন কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন, আটকে গেলেন। এভাবে বেশ কয়েকটি শক্ত কাজ জমে গেলে কর্মস্থলে হয় দুশ্চিন্তা। চুপসে গেলেন, নিশ্চল হলেন, এভাবে কাজগুলো আরও জমতে থাকবে। পিছিয়ে যেতে থাকবেন, দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। এ রকম ঘটে তাহলে কাজের ধারা বদলান, ধরুন এমন কোনো কাজ যা সহজ, প্রথমে। এভাবে দীর্ঘসূত্রতা মনে হলেও সেই সহজ কাজটি সম্পন্ন করতে পারলে মনে কর্মসম্পাদনের সন্তুষ্টি আসবে। আর মনে সাহস ও শক্তি বাড়বে, মনে হবে গতিশীল আরও কঠিন কাজ সম্পাদনের জন্য। তাই সহজ কাজ সম্পন্ন করলেও মনে আসবে শান্তি, মগজ হবে চনমনে আর দুশ্চিন্তা হবে দূর।

মন লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া রোধ করতে ব্যবহার করুন শব্দরোধক হেডফোন। আজকাল কর্মস্থল খোলা ফ্লোরে লেআউটে, এ রকম ডিজাইন হওয়াতে পরস্পর সংযোগ বাড়ে। আর তাই মনোযোগ নষ্ট করতে বেশ উপযোগী। হয়তো কোনো ডেডলাইনের লক্ষ্যে কাজটি শেষ করতে হবে, বারবার মনোযোগে বাধা পড়ল, এতে কর্ম সম্পাদনের দক্ষতা কমল, দুশ্চিন্তাও বাড়ল। এসব ক্ষেত্রে শব্দবোধক হেডফোন ব্যবহার করা ভালো। আর হেডফোন পরলে অন্যরাও বুঝবেন আপনি ব্যস্ত তাই কাজে বাধা পড়া কমবে।

নিজের মনে ফিরে আসতে নিন বিরতি

হয়তো আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছেন, বা দুশ্চিন্তায় হয়েছেন আচ্ছন্ন। সে সময় বিরতি নেয়া ভালো, যাতে আবার ফিরে পেতে পাবেন সঠিক বিষয়বস্তু, লক্ষ্য ও অবস্থান। একটু হেঁটে আসুন, পান করুন এক গ্লাস জল। এতেও কাজ না হলে অডিও গাইডের সাহায্য নিতে পারেন। তিন রকমের অডিও গাইড আছে। ‘গাইডেড ইমেজারি, মনোসংযোগ, আর ক্রমান্বয়ে বেশি শিথিয়ান।’ প্রশান্ত মানবকণ্ঠ আপনার লক্ষ্য মনস্থির করবে, প্রশান্ত করবে। কমে যাবে মনের চাপ আর উদ্বেগ। শিথিলায়নে স্মৃতিশক্তিও উজ্জীবিত হয়।

কথা বলুন যে কারও সঙ্গে

মনের দুঃখ কষ্ট উদ্বেগ পরিচিতি প্রিয়জন শুধু নয়, কারও সঙ্গেই বললে শেয়ার করলে উদ্বেগ কমে। একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে এমন নয়। মানুষের সংস্পর্শেও মানুষের সঙ্গে আলাপনের জন্য যে কোনো কারও সঙ্গে কথা বললে হয়। নিজের চিন্তাভাবনা অনুভূতি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করলে এদের সাপোর্টও পেতে পারেন। দুশ্চিন্তার মোকাবেলার নতুন দিক ও উপায় বাতলাতে পারেন এরা।

কখন কথা বলবেন পেশাদার ডাক্তারের সঙ্গে

উদ্বেগ দুশ্চিন্তা হল কর্মজীবন ও ব্যক্তি জীবন দুটিরই অংশ। আর একে সামলাতে কিছু উপায় বলা হল। তবে দুশ্চিন্তা যদি খুব বেশি হয়, অটল হয়ে থাকে, শারীরিক কুশলাদি হয় বিঘ্নিত যেন বুকে ধুকপুকানি, ঘাম হওয়া, পেটে প্রজাপতি ওড়া, শরীর ও মন যদি হয় অবসন্ন।

কর্মস্থলে দুশ্চিন্তা কী করে কমাবেন

 অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী 
০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা ফুলটাইম কাজ করেন, বা দিনে দু-তিনটা কাজ করেন এদের অনেকেই জীবনের পুরো সময়ই কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ, নিখুঁত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা, এসবের জন্য কর্মীরা কর্মস্থলে দুশ্চিন্তায় পড়বেন, এটি বিচিত্র কী? কিন্তু এরকম কাজ যারা করেন তারা একা নন, অন্তত এক তৃতীয়াংশ লোক জীবনে কোনো কোনো সময় দুশ্চিন্তা বৈকল্যে ভোগেন। আর অনেক লোকই কর্মস্থলে নার্ভাস হওয়া, উদ্বেগ, অস্বস্তি অনুভব করেন সত্যি। তবে এও ঠিক দুশ্চিন্তা উদ্বেগগুলো স্বাভাবিক ইমোশন্যাল জীবনের অংশও বটে। তবে দুশ্চিন্তা যখন পিছু টানে বেশি, অনেক দুর্ভোগের সৃষ্টি করে তখন একে মোকাবেলার কিছু কৌশল জানা ভালো।

ঘুমাবেন বেশি, দুশ্চিন্তা করবেন কম

অনেকেরই ঘুম হয় না ভালো, যথেষ্ট হয় না। জানেন তো, স্মৃতিশক্তি ও বোধ আর অবধারণের জন্য নিদ্রা বড় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার আগে ভালো করে ঘুমাতে উপদেশ দিই। আমরা জানি নিদ্রালু ড্রাইভার প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। তাই চালকশক্তির পারফরমেন্স আর বিচারবুদ্ধির জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেকে ভুলে যাই উজ্জীবক ঘুম ইমোশনাল পারফরমেন্স আর সহ্য শক্তির উৎকর্ষের জন্য দরকার। এ জন্য এ রকম একটি প্রবচন আছে Some one work up on the worng side of the bed। বেশিরভাগ লোকের রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হয়।

* শয্যায় যাওয়ার প্রতিদিনের রুটিন যেন একই সময়ে হয়।

* ব্যবহার করুন স্লিপ মাসক, ইয়ার প্লান, হোয়াইট নয়েজ মেশিন ঘুমের ব্যাঘাত যাতে না হয়।

* ফোন বন্ধ করুন, বন্ধ করুন সব শব্দ আর আলোকিত ডায়েল, স্কিনের নীল আলো যেন না পড়ে চোখে।

মনকে চাপমুক্ত করতে কফি

মন বদলানোর জন্য ক্যাফেইনের জুড়ি নেই, তাই কফির এত কদর দেশে-বিদেশে। কফি পান করুন তবে পরিমিত। বিকালে অবশ্য নয়। পান করুন সকালে। বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ কিন্তু কর্মস্থলে দুশ্চিন্তা বাড়ায়। অনেকে শেষ বেলাতেও কফি পান করে কাজে উদ্দীপনা পান। এটি ঠিক নয়। এতে ঘুম হবে কম দুশ্চিন্তাও কমবে না। তাই দিনের প্রথমভাগে দুকাপের বেশি কফি নয়।

দীর্ঘসূত্রতা থেকে সাবধান

অনেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ শুরু করবেন কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন, আটকে গেলেন। এভাবে বেশ কয়েকটি শক্ত কাজ জমে গেলে কর্মস্থলে হয় দুশ্চিন্তা। চুপসে গেলেন, নিশ্চল হলেন, এভাবে কাজগুলো আরও জমতে থাকবে। পিছিয়ে যেতে থাকবেন, দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। এ রকম ঘটে তাহলে কাজের ধারা বদলান, ধরুন এমন কোনো কাজ যা সহজ, প্রথমে। এভাবে দীর্ঘসূত্রতা মনে হলেও সেই সহজ কাজটি সম্পন্ন করতে পারলে মনে কর্মসম্পাদনের সন্তুষ্টি আসবে। আর মনে সাহস ও শক্তি বাড়বে, মনে হবে গতিশীল আরও কঠিন কাজ সম্পাদনের জন্য। তাই সহজ কাজ সম্পন্ন করলেও মনে আসবে শান্তি, মগজ হবে চনমনে আর দুশ্চিন্তা হবে দূর।

মন লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া রোধ করতে ব্যবহার করুন শব্দরোধক হেডফোন। আজকাল কর্মস্থল খোলা ফ্লোরে লেআউটে, এ রকম ডিজাইন হওয়াতে পরস্পর সংযোগ বাড়ে। আর তাই মনোযোগ নষ্ট করতে বেশ উপযোগী। হয়তো কোনো ডেডলাইনের লক্ষ্যে কাজটি শেষ করতে হবে, বারবার মনোযোগে বাধা পড়ল, এতে কর্ম সম্পাদনের দক্ষতা কমল, দুশ্চিন্তাও বাড়ল। এসব ক্ষেত্রে শব্দবোধক হেডফোন ব্যবহার করা ভালো। আর হেডফোন পরলে অন্যরাও বুঝবেন আপনি ব্যস্ত তাই কাজে বাধা পড়া কমবে।

নিজের মনে ফিরে আসতে নিন বিরতি

হয়তো আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছেন, বা দুশ্চিন্তায় হয়েছেন আচ্ছন্ন। সে সময় বিরতি নেয়া ভালো, যাতে আবার ফিরে পেতে পাবেন সঠিক বিষয়বস্তু, লক্ষ্য ও অবস্থান। একটু হেঁটে আসুন, পান করুন এক গ্লাস জল। এতেও কাজ না হলে অডিও গাইডের সাহায্য নিতে পারেন। তিন রকমের অডিও গাইড আছে। ‘গাইডেড ইমেজারি, মনোসংযোগ, আর ক্রমান্বয়ে বেশি শিথিয়ান।’ প্রশান্ত মানবকণ্ঠ আপনার লক্ষ্য মনস্থির করবে, প্রশান্ত করবে। কমে যাবে মনের চাপ আর উদ্বেগ। শিথিলায়নে স্মৃতিশক্তিও উজ্জীবিত হয়।

কথা বলুন যে কারও সঙ্গে

মনের দুঃখ কষ্ট উদ্বেগ পরিচিতি প্রিয়জন শুধু নয়, কারও সঙ্গেই বললে শেয়ার করলে উদ্বেগ কমে। একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে এমন নয়। মানুষের সংস্পর্শেও মানুষের সঙ্গে আলাপনের জন্য যে কোনো কারও সঙ্গে কথা বললে হয়। নিজের চিন্তাভাবনা অনুভূতি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করলে এদের সাপোর্টও পেতে পারেন। দুশ্চিন্তার মোকাবেলার নতুন দিক ও উপায় বাতলাতে পারেন এরা।

কখন কথা বলবেন পেশাদার ডাক্তারের সঙ্গে

উদ্বেগ দুশ্চিন্তা হল কর্মজীবন ও ব্যক্তি জীবন দুটিরই অংশ। আর একে সামলাতে কিছু উপায় বলা হল। তবে দুশ্চিন্তা যদি খুব বেশি হয়, অটল হয়ে থাকে, শারীরিক কুশলাদি হয় বিঘ্নিত যেন বুকে ধুকপুকানি, ঘাম হওয়া, পেটে প্রজাপতি ওড়া, শরীর ও মন যদি হয় অবসন্ন।