চিন্তায়, মননে COVID-19 এর প্রভাব ও তার প্রতিকার

  ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ ১১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো Situation বা Object বা Person আপনি তাতে কতটুকু আতঙ্কিত হবেন তার সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে আপনি তাকে কীভাবে দেখছেন এবং তাকে কীভাবে গ্রহণ বা বর্জন করছেন তার ওপর অর্থাৎ আপনার Cognition এর ওপর।

আপনার Cognition মানে হচ্ছে আপনার Thinking Process অর্থাৎ, আপনি যে প্রতিক্রিয়ায় চিন্তা করেন বা সোজা কথায় আপনার চিন্তার প্রক্রিয়াই হচ্ছে আপনার Cognition। এখন এই Cognition যখন সঠিক রাস্তায় চলে তখন আমাদের চিন্তা, মন, আবেগ, জীবন সবই সঠিক রাস্তায় চলে।

আর আমাদের Cognition যখন Biased হয় বা Distorted হয় অর্থাৎ, বক্র রাস্তায় চলে বা বিকৃতভাবে কাজ করে তখন আমাদের চিন্তা, মনন, আবেগ, জীবন সবই বেঠিক রাস্তায় চলে বা বিকৃতভাবে চলে। তখন আমাদের জীবন তার স্বাভাবিক গতি হারায়, জীবনের নানা ক্ষেত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় তথা আমাদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জীবনের নানা ক্ষেত্র বলতে আমরা কী বুঝি?

যে জীবন আমরা যাপন করি প্রকৃত পক্ষে তা অনেকগুলো জীবনের সমষ্টি। যেমন- ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন, শিক্ষা জীবন, সামাজিক জীবন, ধর্মীয় জীবন ইত্যাদি আরও বহুবিধ জীবন। যখন কোনো ঘটনা বা অন্য যা কিছু আমাদের Cognition কে এমনভাবে অস্বাভাবিক আন্দোলনে আন্দোলিত করে যে আমাদের জীবনের এ ক্ষেত্রগুলো গুরুতরভাবে affected হয় তখন আমাদের Cognition বা চিন্তার প্রক্রিয়া তার ত্রুটিগুলোকে Identify করে সেগুলোকে Correction তথা আমাদের Cognition কে সঠিক রাস্তায় চালানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। কিসের ওপর আমাদের Cognition কাজ করবে বা কোনো বিশেষ Point এর ওপর Cognition তার কাজ শুরু করবে?

আমাদের Cognition বা চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু হয় কোনো Event বা ঘটনা, কোনো Object বা বস্তু কিংবা কোনো Situation বা অবস্থাকে কেন্দ্র করে। পরিবেশ, পরিবেশের পরিবর্তন, জীবনের গতি ধারার পরিবর্তন, যে কোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ ঘটনা বা অবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই আমাদের Cognitive প্রক্রিয়াকে Stimulate করে। এ Cognition আবার In a Large Scale আমাদের Emotion বা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, আমাদের আবেগ আবার আমাদের behavior বা ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই behavior আবার আমাদের Cognition কে প্রভাবিত করে, অর্থাৎ একটা visious Circle এর মতো তৈরি হয়।

ফলে একবার কোনো Negative বা নেতিবাচক চক্রের মধ্যে ঢুকে গেলে আমাদের Cognition ক্রমান্বয়ে Negative Thinking বা নেতিবাচক চিন্তার দিকে ধাবিত হতে থাকে। সব Negative, Passimistic Thinking আমাদের চিন্তার জগৎ, মনন, জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অযথা আতঙ্কিত হই, বিষণ্ন হই, হতাশাগ্রস্ত হই। ফলশ্রুতিতে আমাদের জীবন হয়ে ওঠে বিস্বাদময়, জীবনের ক্ষেত্রগুলো গুরুতরভাবে আহত হয়, দগ্ধ হয় এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। আমরা তখন আন্তর্জাতিক এবং বহির্জগতে সর্বক্ষেত্রেই জীবনের স্বাভাবিক গতিধারা হারিয়ে ফেলি।

প্রসঙ্গ হচ্ছে Corona বা COVID-19 এবং এর মানসিক প্রভাব। COVID-19 এর সঙ্গে অনেকগুলো Event বা ঘটনা, পরিবেশ, অবস্থা জড়িত। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে আমরা যদি দৃষ্টি দেই COVID-19 পৃথিবীজুড়ে একটা Pandemic অবস্থায় আছে। এখন এ Corona virus এর বিস্তার বা Infection এর Impact বা Perspective বা পরিপ্রেক্ষিত কী কী হতে পারে? এবং কোথায় কোথায় হতে পারে?

* শরীরে বা Physical Impact এ ভাইরাস আপনাকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করবে, আপনি রোগাক্রান্ত হবেন, কারও কারও ক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে। যদিও আক্রান্ত হওয়া এবং সুস্থ হওয়ার তুলনায় তার হার অনেক কম।

* মানসিক প্রভাব বা Psychological Impact.

* Social Impact বা সামাজিক প্রভাব।

* অর্থনৈতিক প্রভাব।

* Religions Impact বা প্রভাব।

প্রত্যেকের আলাদাভাবে Psychological বা মানসিক প্রভাব আছে। প্রতিটি ক্ষেত্র যা COVID-19 দ্বারা Affected হচ্ছে এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ সময় মানসিকভাবে সুস্থ থাকা, মনকে Stable রাখা অনেক জরুরি। আপনার চিন্তার জগতে যদি ফাটল ধরে যায় আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন, মানসিকভাবে আপনি কিছুতেই আর যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারবেন না।

কী রকম মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি বা Corona আমাদের মনে কী প্রভাব ফেলছে? COVID-19 এর কারণে আমরা অনেকেই মানসিক রোগী না হয়েও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। মূলত যেসব মানসিক বিপর্যস্ততা আমাদের অনেককেই কাবু করছে তার মধ্যে কতগুলো হল-

* উদ্বেগ বা Anxiety

* মানসিক চাপ বা Stress

* ভয় বা Phobia

* অতিরিক্ত আতঙ্ক বা Panic Attack

* Psychosomatic Symptoms বা মানসিক অস্থিরতায় শারীরিক প্রভাব যেমন- অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার বা উদ্বেগের কারণে বুকের মধ্যে চাপ চাপ লাগা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, মনে হচ্ছে এখনই অজ্ঞান হয়ে যাব ইত্যাদি।

* অনিদ্রা

* হিস্টেরিয়া বা Conversion disorder

* পরবর্তীতে কারও কারও মধ্যে Post Traumatic stress disorder বা PTSD দেখা দিতে পারে।

প্রতিটি মানসিক অবস্থা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক অবস্থায় একেক রকম। যেমন, একজন ব্যক্তি যিনি মাত্রাতিরিক্তি Anxiety তে ভোগেন বা Anxiety Prone Personality কিন্তু COVID-19 এ আক্রান্ত হননি তার অবস্থা এবং যিনি আক্রান্ত হয়েছেন তার অবস্থা এবং উদ্বেগের মাত্রা ভিন্ন রকম হবে এবং চিকিৎসাও হবে ভিন্ন রকম।

এসব পরিস্থিতিতে যারা পূর্ব থেকেই কোনো Minor Psychiatric Disorder বা লঘু মানসিক ব্যধি যেমন, Anxiety disorder, Phobic disorder বা অহেতুক ভীতি, Obsessive compulsive Disorder বা শুচিবায়ু, Depression disorder বা বিষণ্নতাজনিত মানসিক ব্যধি ইত্যাদিতে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে বর্তমান Anxiety এর সঙ্গে সঙ্গে তার রোগের উপসর্গগুলো বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে এ পরিস্থিতিতে যে কোনো মানুষেরই Anxiety বা Stress অনুভব করা স্বাভাবিক এবং আমরা সবাই আতঙ্কিত হব, চাপ অনুভব করব, বিষণ্ন হব এটাই Natural কিন্তু এটা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় বা আমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে তখন অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

দীর্ঘদিন কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন বা লকডাউন ও নানা রকম মানসিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। সে ক্ষেত্রেও আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে এ সময়টাতে আমরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারি এ সাময়িক পরিস্থিতিতে যে ধরনের মানসিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল বিষণ্নতা, বিরক্তি (Irritability), মেজাজ বা রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা, হতাশা এমনকি শুরু হতে পারে দাম্পত্য কলহ।

* যারা মাত্রাতিরিক্ত Anxietyতে ভোগেন তারা ঘনঘন করোনার Update জানতে যাবেন না, সেটা Google Search দিয়েই হোক, টিভিতেই হোক বা ফেসবুক যেখান থেকেই হোক না কেন।

* আপনি আপনার এই অবসর, অলস সময়টাকে কোনো Productive বা ইতিবাচক কাজে, চিন্তায় ব্যয় করুন। সেটা যে যার লেভেল বা যোগ্যতার ভিত্তিতেই করবেন।

* এ সাময়িক অবসর, অলস সময় আপনাকে আপনার নিজের দিকে তাকানোর একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। একবার চিন্তা করুন তো এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে আমরা সারাক্ষণ শুধু ছুটে চলেছি। আরও অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক অবস্থানের উন্নতি, প্রতিষ্ঠা সারাক্ষণ শুধু এর পেছনেই ছুটছি। আমাদের ভেতরের মানুষ, আমাদের অন্তর্গত যে সত্তা তার দিকে তাকানোর সময়ই আমরা পাই না। এ সময় সেই অন্তর্নিহিত ‘আমি’কে Develop করার একটা উদ্যোগ আমরা নিতে পারি।

* আপনার যদি কোনো হবি বা শখ থাকে সেগুলোকে চর্চা করুন, গভীরতা উপলব্ধি করুন।

* পরিবারের সঙ্গে বাচ্চাদের সঙ্গে কোয়ালিটিপূর্ণ সময় কাটান।

* প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছাড়ার আগে এ চিন্তা করে বিছানা ছাড়ুন যে আজকে সারা দিন আমাদের অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, আমি আমার মতো করে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব। হয়তো বা অনেক ক্ষেত্রেই সফল হব না, তাতে কিছু যায় আসে না, আমি আমার মতো করে যুদ্ধটা চালিয়ে যাব এবং আমি আমার মতো করেই সফল হব।

* নিয়মিত সাধ্যমতো এবং পরিমাণমতো শরীরচর্চা করুন।

* পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো একটি ইতিবাচক পদ্ধতি বা Positive Coping Style নিজের জন্য তৈরি করুন। অবশ্যই এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, একদিনেই তৈরি হবে না। আপনি চেষ্টাটা শুরু করুন এবং চালিয়ে যান হতাশা হবেন না।

* সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন, মোকাবেলা করবেন তা নিয়ে আপনার মতো একটা পরিকল্পনা তৈরি করুন। পরিকল্পনা শতভাগ সফল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, আপনি আপনার মতো চেষ্টা করুন।

* Relaxation, Meditation ইত্যাদি বিষয়গুলো এ সময় বেশ কার্যকরী।

* যারা আগে থেকেই লঘু মানসিক ব্যধি যেমন- Anxiety Disorder, OCD, Depression, Psychosomatic

Disorder, Phobia ইত্যাদিতে ভুগছেন এ সময় তাদের রোগের লক্ষণগুলোর তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। তারা তাদের ওষুধের মাত্রা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (সাইক্রিয়াট্রি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত