করোনাকালে করণীয়

  ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব এখন করোনার কাছে জিম্মি। পুরো বিশ্ব যেন অসহায়, সামান্য অসতর্কতেই যেন রক্ষা নেই। মাত্র চার মাসে জন্ম নেয়া এ ভাইরাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের চরিত্রের পরিবর্তন করছে, ফলে গবেষকদের অনেকটা গোলকধাঁধার মধ্যে ফেলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে প্রলয় ধ্বংসলীলা। ইতালির এক চিকিৎসকের অসহায়ত্ব স্বীকার উক্তি, ‘কোনো কিছুই যেন যথেষ্ট নয়’।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বা কোভিড-১৯ এর ওষুধ তৈরির বিষয়ে ইঙ্গিত দিলেও কবে নাগাত তা ব্যবহারে আসবে তা স্পষ্ট নয়। নির্দিষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা না দিলেও তিনটি বিষয়ে এখন বিশেষ নজর দিতে হবে।

ঘরে থাকুন

ইতিমধ্যে প্রায় সব প্রচার মিডিয়ার সক্রিয় প্রচারে নিশ্চিত যে করোনাভাইরাস সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়াচ্ছে, সংস্পর্শ মানে সরাসরি ছোঁয়ার বাইরেও তার ব্যবহৃত কিছু ছোঁয়া, তার স্পর্শের কিছু ধরা সেটা হতে পারে সিঁড়ির রেলিং, লিফটের সুইচ, রিকশা, গণপরিবহন, প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগ বা যে কোনো কিছু, তার হাঁচি বা কাশির ছয় ফুটের মধ্যে থাকা বা হাঁচি ও কাশির পরক্ষণেই ওই স্থানে প্রবেশ করা, তার কাশি, লালা বা সর্দি কোনো ভাবে লাগা, সেটি সরাসরি হোক বা যে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপরে জমে থেকে অন্যের শরীরে লাগা বা হাঁচি ও কাশি পড়ে থাকলে সেটি পায়ে লেগে বা জুতায় লাগলে পরে শরীরের কোথাও লাগা ও সেখান থেকে মুখ, নাক বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা।

বিতর্ক থাকলেও কিছু গবেষণা বলছে, হাঁচি থেকে ভাইরাসটি নিচে পড়ার আগে কিছু সময় বাতাসে থাকতে পারে, ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন পদার্থের ওপর তাপমাত্রা ও আদ্রতার ওপর নির্ভর করে কিছু সময় বিশেষ করে প্লাস্টিকের পৃষ্ঠে প্রায় ৭২ ঘণ্টাও থাকতে পারে।

এত কিছুর মধ্যেও স্বস্তির বিষয়, সাধারণত এ ভাইরাস চামড়া ভেদ করে ঢুকতে পারে না, সরাসরি কাশি, হাঁচি, সর্দি বা লালার মাধ্যমে অথবা হাত কিংবা যে কোনো মাধ্যম থেকে ভাইরাসটি মুখ, নাক বা চোখের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। কানের মধ্য দিয়েও ঢোকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কেউ জানে না কোন ব্যক্তির মধ্যে ঢুকে আছে এ ভাইরাস, অনেক সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত থাকলে উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাস করতে পারে কোভিড-১৯। সুতরাং এখন সবাইকে কোভিড-১৯ এর মতো মনে করতে হবে, এ এক নির্মম নিষ্ঠুরতা।

বারবার বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, নিজ ঘরের সীমানা পার হওয়াই এখন বিপজ্জনক, কারণ কোনো অবস্থাতে আক্রান্ত ব্যক্তির সীমানার মধ্যে পড়া যাবে না। অদৃশ্য শত্রুকে মোকাবেলা সহজ নয়।

এতকিছু জানার পরও আমরা দেখছি অতি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ মিথ্যার আশ্রয়ে বা কোনো অজুহাতে বাইরে বের হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, যেটা অনেকটাই আত্মহননের শামিল।

শহরে এখন অনেকেই বহুতল ভবনে থাকছে, নিজেদের মধ্যে ফোনে আলাপ করে প্রতি পরিবারের একজন সপ্তাহে একদিন নির্ধারণ করে সবচেয়ে কাছের বিক্রয় কেন্দ্র থেকে নিজেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত করে অতি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করুন, শহরের বাইরেও এলাকাভিত্তিক এভাবে ভাগ করে নিতে হবে।

অভাবী মানুষদের খাদ্যের তাগিতে যেন ঘর থেকে বের হতে না হয় সেই লক্ষ্যে বিত্তবানদের চিন্তা করতে হবে, সাহায্য পাঠাতে সরাসরি ভিড় না করে পরিচিতদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ও অপরিচিতদের জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর সাহায্য নেয়া যেতে পারে, কারণ আমাদের নিরাপত্তার জন্য তারা এখন সক্রিয়ভাবে মাঠে আছে। মনে রাখতে হবে ধনী-গরিব যেই হোক, একজন করোনায় আক্রান্ত হলেই আপনার ঝুঁকি বাড়ল, তাই নিরুপায় অসহায় মানুষদেরও খাদ্যের নিশ্চয়তা দেয়া জরুরি।

অতি জরুরি প্রয়োজনে যাদেরকে বাইরে যেতে হচ্ছে সেটি পেশাগত কারণে হোক বা অন্য কোনো কারণে, নিজেকে সঠিক জ্ঞানে প্রস্তুত করে বের হতে হবে। সরকারি পরামর্শ আপোষহীনভাবে মানতে হবে যেমন সামাজিক দূরত্ব, হাত জীবাণুমুক্ত রাখা, কোনো সন্দেহ থাকলে হাত দিয়ে মুখমণ্ডলের কোথাও না ছোঁয়া, মুখ, নাক ও চোখ সুরক্ষিত রাখা, হাঁচি, কাশি ও থুতু ফেলার শিষ্টাচার মেনে চলা।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত রাখুন

আতঙ্কের কিছু নেই, গুজবে কান দিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল বা হতাশাগ্রস্ত হওয়া চলবে না, মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা হতাশা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। তাই নিজেকে প্রফুল্ল রাখতে হবে। সঠিক শিক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত রাখলে ভয়ে কারণটি কম হবে।

যারা ধূমপান বা মদপান করেন তারা কিন্তু যুক্তিসঙ্গত কারণেই মহা বিপজ্জনক অবস্থায় আছেন।

জানা রোগ যেমন ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার, Asthma, কিডনি রোগ ইত্যাদিকে যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর সবারই ভিটামিন-সি যুক্ত খাবারসহ স্বাস্থ্যকর খাবারে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ তরল পান করতে হবে। বেশি ভাজাপোড়া বা রিচ ফুড পরিত্যাগ করা ভালো। বাড়তি হিসাবে প্রতিদিন লেবু, গাজর, বিট, কমলা, পেয়ারা, বাদাম, আমলকী, টমেটো, আনারস, রসুন, আদা, কালিজিরা, গ্রিন টি, ডিম, টকদই, দুধ, শাকসবজি খাওয়া যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর বিষয়টি মাথায় রেখে বাসার বারান্দা বা ছাদে সামাজিক দূরত্বের কথা মাথায় রেখে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কিছু সময় রোদে থাকতে পারেন। ডায়াবেটিসের ঝামেলা না থাকলে চিনির পরিবর্তে পরিমাণ বুঝে মধু খাওয়া যায়।

দিনে নিয়ম মেনে ঘরের মধ্যেই প্রয়োজন বুঝে ৩০ থেকে ৬০ মি. ব্যায়াম করা বা হাঁটা জরুরি। ঢাকার বাসাগুলো ছোট হলেও এক জায়গাতে বেশিক্ষণ বসে বা শুয়ে থাকা যাবে না। দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপে না থাকা ভালো। পরিবারের অন্য সদস্যরাও যেন সঠিক কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মানে সেদিকেও নজরদারী প্রয়োজন। কমপক্ষে ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে ভাইরাসটি তেমন সুবিধা করতে পারে না, আর তাই আক্রান্ত হলেও তার সিংহভাগ আবার সুস্থ হয়ে উঠছে।

অসুস্থতায় চিকিৎসকের টেলিপরামর্শ নিন

আবহাওয়া পরিবর্তনের এ সময়ে ঠাণ্ডা জ্বর বা কাশি হতেই পারে। আতঙ্গিত না হয়ে পরিচিত কোন চিকিৎসকের টেলিপরামর্শ নিতে পারেন, এ মুহূর্তে টেলিমেডিসিনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, রাষ্টীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন চিকিৎসা সেবাদানকারী সংগঠন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দৈনিক সংবাদপত্রে টেলিপরামর্শের নম্বর দিচ্ছে, যেমন ডেন্টাল সমস্যা সমাধানে বিএফডিএস। একান্ত না পারলে বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিচার করে জ্বরে প্যারাসিটামলের সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকলে ওমেপ্রাজল খেতে পারেন, কাশি বা গলায় ব্যথা হলে গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করার সঙ্গে এন্টি হিস্টামিন খাওয়া যেতে পারে, আর নিজেকে পরিবারের বাকি সদস্যদের থেকে যথাসম্ভব আলাদা রাখার চেষ্টা করতে হবে।

নিয়ন্ত্রণ না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, এখন একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে কোভিড-১৯ সেবা চালু হয়েছে, কাছের কেন্দ্রটির নম্বর সংরক্ষণ করে রাখুন। আল্লাহ না করুন কোনো কারণে হাসপাতালে যেতেই হয় তো অন্য কোনো কারণে কোনো ওষুধ খেলে সেগুলোসহ মোবাইল ফোন চার্জারসহ নিতে হবে।

আল্লাহ আমাদের এই কঠিন সময়কে সহজ করে দিন।

লেখক : সদস্য সচিব, বিএফডিএস, রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত