করোনাকালীন রমজানে মুখ ও দাঁতের যত্ন
jugantor
করোনাকালীন রমজানে মুখ ও দাঁতের যত্ন

  ডা. শারমীন জামান  

১৬ মে ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বে মহামারীতে রূপ নেয়া করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে ঘরেই আছেন প্রায় সবাই। এর মধ্যদিয়েই এদেশে পালিত হচ্ছে রমজান। রোজায় আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। তাই মুখ ও দাঁতের জন্য প্রয়োজন পড়ে আলাদা যত্নের। অপরদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতে খাবারের তালিকায় যেমন নতুন কিছু খাবার যুক্ত করা প্রয়োজন তেমনি শরীরকে সতেজ রাখতে শরীর চর্চার প্রয়োজন। কোন বদ অভ্যাস (যেমন- ধূমপান) থাকলে এ সময়ে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এগুলো ইতোমধ্যেই আপনারা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে জেনেছেন। রোজায় অনেকেরই মুখ ও দাঁতের রোগ বেড়ে যায়। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিছুটা দুষ্কর। তাই কিছু বিষয় মেনে চললেই সহজে এসব সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

রমজানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা উপবাস থাকতে হয়। পানি পান করা যায় না। এতে লালা নিঃসরণ কম হয়। মুখে লালা স্বল্পতার কারণে মুখে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমন- মাড়ির রোগ, দাঁতের ক্যাভিটি, মুখের ভেতর ক্ষত। তাই ইফতার থেকে শুরু করে সাহরির আগ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। লেবুর শরবতসহ ফলের জুস খাওয়া যেতে পারে।

রোজায় আরেকটি বড় সমস্যা হল মুখের দুর্গন্ধ। সাহরির পর থেকে ইফতার পর্যন্ত কিছু খাই না আমরা। ফলে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। সেজন্য সাহরির পরে দাঁত ব্রাশ করেই ঘুমানো উচিত। আবার ইফতারের পরও একবার দাঁত ব্রাশ করে নিতে হবে। ইফতার এবং সাহরির সময় জিলাপি, রসগোল্লা বা রসমালাইয়ের মতো কোনো মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া হয়। মিষ্টি খাওয়ার পরে কিন্তু দাঁত ব্রাশ করতেই হবে, কেননা মিষ্টিতে যে শর্করা জাতীয় উপাদান থাকে তা দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করে। সাহরির পরে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে ও জিহ্বা টাং স্ক্রাপার (tongue scrapper) দিয়ে জিহ্বায় লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে হবে। অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে বা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া করা যেতে পারে।

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, দাঁত ক্ষয় এমন সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে খাদ্য তালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার থাকতে হবে। ইফতারিতে প্রচুর ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবুর শরবত, জাম্বুরা, কমলা, আমড়া, মাল্টা, আনারস সেই সঙ্গে সালাদ যেমন গাজর, শসা, টমেটো, লেটুসপাতা ইত্যাদির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া ভালো। শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। ধূমপান ও জর্দা থেকে বিরত থাকুন। এ সময় যদি কারও ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশন করোনা সংক্রমণ রোধে ডেন্টাল চেম্বার বা হাসপাতালে যেতে কিছু স্বাস্থ্যবিধির কথা উল্লেখ করেছে।

চেম্বারে যেতে মাকস ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। অভ্যর্থনা কক্ষের কর্মীসহ অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে কথা বলতে তিন ফিট দূরত্ব রাখতে হবে। চিকিৎসককে সম্পূর্ণ হিস্ট্রি (করোনার উপসর্গ থাকলেও) শুরুতেই জানাতে হবে।

কি ধরনের চিকিৎসা রোগীরা এ সময়ে নেবেন তারও একটি নিদের্শনা দিয়েছে আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশন। এর মধ্যে ছ’মাস পর পর ডেন্টিস্টের কাছে যে রুটিন চেকআপের কথা আমরা বলি সেটা আপাতত বিরত থাকতে বলা হয়েছে। স্কেলিং, পলিশিং, এসথেটিক ফিলিংয়ের মতো চিকিৎসা নিতে এ সময় রোগীকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মাড়ির সমস্যা, কোন দুর্ঘটনায় আঘাত পেলে, ফ্রাকচার হলে বা সেলুলাইটিসের মতো জীবনের ঝুঁকি আছে এমন রোগ বা যেগুলো জরুরি প্রয়োজন সেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আশা করি এ ধরনের নির্দেশনা আপনারাও মেনে চলবেন।

লেখক : ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন, ফরাজী ডেন্টাল হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা

করোনাকালীন রমজানে মুখ ও দাঁতের যত্ন

 ডা. শারমীন জামান 
১৬ মে ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বে মহামারীতে রূপ নেয়া করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে ঘরেই আছেন প্রায় সবাই। এর মধ্যদিয়েই এদেশে পালিত হচ্ছে রমজান। রোজায় আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। তাই মুখ ও দাঁতের জন্য প্রয়োজন পড়ে আলাদা যত্নের। অপরদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতে খাবারের তালিকায় যেমন নতুন কিছু খাবার যুক্ত করা প্রয়োজন তেমনি শরীরকে সতেজ রাখতে শরীর চর্চার প্রয়োজন। কোন বদ অভ্যাস (যেমন- ধূমপান) থাকলে এ সময়ে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এগুলো ইতোমধ্যেই আপনারা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে জেনেছেন। রোজায় অনেকেরই মুখ ও দাঁতের রোগ বেড়ে যায়। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিছুটা দুষ্কর। তাই কিছু বিষয় মেনে চললেই সহজে এসব সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

রমজানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা উপবাস থাকতে হয়। পানি পান করা যায় না। এতে লালা নিঃসরণ কম হয়। মুখে লালা স্বল্পতার কারণে মুখে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমন- মাড়ির রোগ, দাঁতের ক্যাভিটি, মুখের ভেতর ক্ষত। তাই ইফতার থেকে শুরু করে সাহরির আগ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। লেবুর শরবতসহ ফলের জুস খাওয়া যেতে পারে।

রোজায় আরেকটি বড় সমস্যা হল মুখের দুর্গন্ধ। সাহরির পর থেকে ইফতার পর্যন্ত কিছু খাই না আমরা। ফলে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। সেজন্য সাহরির পরে দাঁত ব্রাশ করেই ঘুমানো উচিত। আবার ইফতারের পরও একবার দাঁত ব্রাশ করে নিতে হবে। ইফতার এবং সাহরির সময় জিলাপি, রসগোল্লা বা রসমালাইয়ের মতো কোনো মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া হয়। মিষ্টি খাওয়ার পরে কিন্তু দাঁত ব্রাশ করতেই হবে, কেননা মিষ্টিতে যে শর্করা জাতীয় উপাদান থাকে তা দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করে। সাহরির পরে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে ও জিহ্বা টাং স্ক্রাপার (tongue scrapper) দিয়ে জিহ্বায় লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে হবে। অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে বা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া করা যেতে পারে।

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, দাঁত ক্ষয় এমন সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে খাদ্য তালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার থাকতে হবে। ইফতারিতে প্রচুর ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবুর শরবত, জাম্বুরা, কমলা, আমড়া, মাল্টা, আনারস সেই সঙ্গে সালাদ যেমন গাজর, শসা, টমেটো, লেটুসপাতা ইত্যাদির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া ভালো। শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। ধূমপান ও জর্দা থেকে বিরত থাকুন। এ সময় যদি কারও ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশন করোনা সংক্রমণ রোধে ডেন্টাল চেম্বার বা হাসপাতালে যেতে কিছু স্বাস্থ্যবিধির কথা উল্লেখ করেছে।

চেম্বারে যেতে মাকস ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। অভ্যর্থনা কক্ষের কর্মীসহ অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে কথা বলতে তিন ফিট দূরত্ব রাখতে হবে। চিকিৎসককে সম্পূর্ণ হিস্ট্রি (করোনার উপসর্গ থাকলেও) শুরুতেই জানাতে হবে।

কি ধরনের চিকিৎসা রোগীরা এ সময়ে নেবেন তারও একটি নিদের্শনা দিয়েছে আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশন। এর মধ্যে ছ’মাস পর পর ডেন্টিস্টের কাছে যে রুটিন চেকআপের কথা আমরা বলি সেটা আপাতত বিরত থাকতে বলা হয়েছে। স্কেলিং, পলিশিং, এসথেটিক ফিলিংয়ের মতো চিকিৎসা নিতে এ সময় রোগীকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মাড়ির সমস্যা, কোন দুর্ঘটনায় আঘাত পেলে, ফ্রাকচার হলে বা সেলুলাইটিসের মতো জীবনের ঝুঁকি আছে এমন রোগ বা যেগুলো জরুরি প্রয়োজন সেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আশা করি এ ধরনের নির্দেশনা আপনারাও মেনে চলবেন।

লেখক : ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন, ফরাজী ডেন্টাল হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা