করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন ডি

  ডা. শাহজাদা সেলিম ৩০ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয় যা শরীরের ক্যালসিয়াম, ফসফেট ইত্যাদির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ভিটামিন ডি হাড়ের কাঠামো তৈরি এবং ঘনত্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। নাম শুনে ভিটামিন মনে হলেও ভিটামিন ডি হলো একটি স্টেরয়েড হরমোন। অন্য ভিটামিন যেখানে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বা কো-এনজাইম হিসেবে কাজ করে, ভিটামিন ডি (স্টেরয়েড হরমোন) জিন এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকে। প্রাণিজ ও উদ্ভিদজাত স্টেরল ও ফাইটোস্টেরল থেকে সূর্যালোকের অতি বেগুনি রশ্মি দ্বারা রূপান্তরিত হয়ে দেহে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ভিটামিন ডি-২ ও ভিটামিন ডি-৩ মানব দেহে থাকে।

বড়দের যেমন ভিটামিন খুবই দরকার, শিশু-কিশোরদের শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি তাদের শরীর গঠন, রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয়। বাড়ন্তকালে শিশুদের দৈহিক কাঠামো তৈরি করার অন্যতম কাঁচামাল ক্যালসিয়াম- যা শরীরের ভিটামিন ডি দ্বারা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি, দৈহিক স্থূলতা সবকিছু ভিটামিন ডি-র সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই কম বয়সী শিশু-কিশোরদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস ক্রমশ : বেশি মাত্রায় দেখা দেয়ার পেছনে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি একটি বড় কারণ হয়ে থাকতে পারে। ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে কিছু কিছু ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। এটা এখন নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে, ভিটামিন ডি-র অভাব থাকলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর ঘাটতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমতে থাকে।

সারা বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ (সারস-করোনাভাইরাস-২ দ্বারা সংঘটিত রোগ) মহামারীতে জর্জরিত।

মৃত্যু হারে সবার উপরে যুক্তরাষ্ট্র, তারপর ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য রয়েছে (সূত্র : সিএসএসই, জন হপকিংস বিশ্ব বিদ্যালয়)। বাংলাদেশের পরিস্থিতিও ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।

একটি জিনিস মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছে, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত কম, তাদের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততবেশি; শুধু তাই নয়, রোগ প্রতিরোধ কম হয় কেউ এতে আক্রান্ত হলে মৃত্যু ঝুঁকিও বেশি তার। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দৈহিক স্থূলতা, হাঁপানি ইত্যাদি রোগ থাকলেও রোগীর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

করোনা রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন ডি-র ভূমিকা

যুক্তরাজ্যভিত্তিক অন্য আরেকটি গবেষণায় করোনাভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পেতে প্রতিদিন সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করার কথা বলেছেন এবং ভিটামিন সি, ভিটামিন ডিসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, এমন খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলেছেন। এর সূত্র ধরে, ডায়াবেটিস রোগী তো বটেই, অন্যদেরও এ কোভিড-১৯ মহামারীকালে অন্য উপকারী খাদ্য উপাদান গ্রহণে উদ্যোগী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশে প্রচুর সূর্যালোক থাকার পরও অধিকাংশ মানুষ ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে ভুগছেন এবং তাদের ভিটামিন ক্যাপসুল সেবনের পরামর্শ দিতে হচ্ছে।

ভিটামিন ডি-র উৎস

* সূর্যরশ্মি

শরীরের ভিটামিন ডি-র চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি ত্বকে সূর্যরশ্মি পতিত হওয়ার কারণে তৈরি হয়।

* স্যালমন ফিশ

* সার্ডিন (কৌটাজাত)

* টুনা (কৌটাজাত)

* ম্যাকারেল (কৌটাজাত)

* মাশরুম

* ডিম (সিদ্ধ)

* টক দই

* গরুর কলিজা (রান্না করা)

* ৪০ ওট ভিটামিন ডি-র কার্যকারিতা ১ মাইক্রোগ্রাম সমতুল্য।

সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি পেতে হলে মার্চ-অক্টোবর মাসের (অন্যান্য মাসগুলোতে আরও বেশি সময় ধরে) প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট রোদ পোহাতে হবে যখন শরীরের ১৮ শতাংশের বেশি অংশে রোদ লাগবে।

১-৭০ বছর বয়সী মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৬০০ ওট এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৮০০ ওট ভিটামিন ডি গ্রহণ করা দরকার।

ভিটামিন ডি ওষুধ হিসেবে খেতে হবে কাদের

* নবজাতক যারা শুধুই মায়ের দুগ্ধ পান করছে ও যারা ১০০০ মিলিলিটারের কম শিশু খাদ্য গ্রহণ করে।

* শিশু-কিশোর যারা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা নগরে বা অস্বাস্থ্যকর শহরে (ঢাকা অন্যতম) বসবাস করছে।

* দৈহিক স্থূল শিশু-কিশোর যাদের ত্বকের বিভিন্ন অংশে কমলের মতো কালো অংশ দেখা দিচ্ছে।

* ধর্মীয় বা অন্য কারণে পোশাকে প্রায় সারাদেহ আবৃত শিশু-কিশোর।

* খাদ্যনালির সমস্যার কারণে হজম ও বিপাকীয় কার্যক্রম হ্রাস পেলে।

* প্রাতিষ্ঠানিক জীবনযাপন (হোস্টেল, হাসপাতাল বা অফিস) যাতে রোদে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়।

* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়েছে, এমন হলে।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতি খুব বেশি হলে ৪০ হাজার ওট সপ্তাহে এবং পরবর্তীতে মাসে একটি করে ভিটামিন ডি ক্যাপসুল খেয়ে যেতে হবে। ঘাটতি কম হলে ২০ হাজার ওট ক্যাপসুল যথেষ্ট হতে পারে।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে তো বটেই, অন্য ক্ষেত্রেও, সবাইকে সূর্যালোকে যেতে হবে নিয়মিত। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে প্রচলিত খাদ্যগুলো ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি খুবই কম, তারপরও যেসব খাদ্যে ভিটামিন ডি-র কিছু পরিমাণে উপস্থিতি আছে (ওপরের তালিকাভুক্ত) তা যতটা সম্ভব নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত