করোনায় প্লাজমা থেরাপি

  ডা. সুরজিৎ সরকার তিতাস ৩০ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। কেউ বলছেন ধন্বন্তরী, কেউ বলছেন অর্বাচীনতা, আসলে ব্যাপারটা কি?

কোনো ব্যক্তি যখন ভাইরাস আক্রান্ত হন তখন তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসটিকে মেরে ফেলার জন্য এক ধরনের প্রোটিন জাতীয় পদার্থ তৈরি করে, যাকে বলে অ্যান্টিবডি। এ অ্যান্টিবডি তৈরি হতে ব্যক্তিভেদে ৮ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। একবার এটি তৈরি হয়ে গেলে শরীরে ভাইরাস আর থাকতে পারে না, মরে যায়। কিন্তু অ্যান্টিবডি শরীরে থেকে যায়। কোনো রোগীর রোগ লক্ষণ চলে যাওয়ার অন্তত ১৪ দিন পরে যদি পরীক্ষার মাধ্যমে ওই ব্যক্তির শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া যায় তবে তার শরীর থেকে বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে প্রায় কোনো রকম ঝুঁকি ছাড়া রক্তের কোষবিহীন তরল অংশ, যাকে প্লাজমা বলে, বের করে আনা হয়। মানুষের গড়ন আর শারীরিক অবস্থাভেদে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলি পর্যন্ত প্লাজমা একজন ডোনারের কাছ থেকে একবারে নেয়া যায়। কোন করোনা আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত যেভাবে দেয়া হয় ঠিক সেভাবেই দেয়া হয়। একেক গবেষণায় একেকটি পরিমাণ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে একবারে ২০০ মিলি একজন রোগীর জন্য যথেষ্ট বলেই অনেকে মনে করেন। তবে অ্যান্টিবডির মাত্রা অনুযায়ী ৩-৫ মিলি/কেজি প্রয়োগ হয়ে থাকে। কাজেই একজন ডোনার থেকে ২-৩ জন রোগীকে প্লাজমা দেয়া সম্ভব। যেহেতু মনে করা হয় অ্যান্টিবডি তৈরির জন্যই ডোনারের শরীর থেকে ভাইরাস চলে গেছে। কাজেই সেই একই পদ্ধতিতে অন্য রোগীর শরীর থেকেও ভাইরাস তাড়াতে সাহায্য করবে। এটাই প্রচলিত বিজ্ঞান এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণিত সত্যও বটে।

প্রশ্ন হল বর্তমান করোনায় এটা কাজ করবে কী না। তাত্ত্বিকভাবে করাটাই স্বাভাবিক এবং করলে মানব জাতির জন্যই সুখবর। কারণ যে টিকার জন্য জগৎবাসী উন্মুখ হয়ে আছে সেটার সঙ্গে কিন্তু এটার অনেকটা মিল আছে। টিকা দেয়ার উদ্দেশ্যও কিন্তু মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করা, যেটা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। প্লাজমা থেরাপিতে অন্যের শরীরে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি রোগীর শরীরে সরাসরি দিয়ে দেয়া হয়, যেটা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। তবে একজনের শরীরে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি অন্যের শরীরে কতটা সফলতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু তাই নয় এর কিছু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যদিও বলা হয় সেটা প্রতি পাঁচ হাজার জনে একজনের হয়।

এখনও পর্যন্ত প্রায় শ’খানেক জায়গায় এ চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। ছোট পরিসরের কিছু কিছু রিপোর্টও বেরিয়েছে। সেগুলোর ফলাফলে তারতম্য আছে। তবে বেশির ভাগ রিপোর্ট আশাব্যঞ্জক। শুরুতে কেবলমাত্র ক্রিটিক্যাল অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও এখন অনেক জায়গাতেই খারাপ হতে পারে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। একটা রিপোর্টে এমনও দেখানো হয়েছে ক্রিটিকাল স্টেজের রোগী যাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দরকার হয়েছে সেখানে মৃত্যুর হার ৯০ শতাংশ অথচ প্লাজমা থেরাপির ফলে সেটা ১৫ শতাংশ, উহানে প্রায় ৫৭ শতাংশ যদিও এ সময়ে যে কোনো রিপোর্টই সতর্কতার সঙ্গে ইন্টারপ্রেট করা উচিত। কারণ আজকে যা সত্য মনে হচ্ছে কালকে তা নাও হতে পারে।

যেহেতু কোভিড-১৯ এর কোনো নির্ধারিত চিকিৎসা নেই। তাই প্রচলিত অন্য চিকিৎসাগুলোর চেয়ে প্লাজমা চিকিৎসার সফলতা অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও বেশি। সেটা প্রমাণ করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ প্লাজমা থেরাপি যদি সত্যিই ব্যর্থ হয় তবে টিকার সফলতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে।

বিজ্ঞানে শেষ বলে কিছু নেই। একটু খোলা মনে সব অপশনগুলোকে মাথায় রেখেই এগোনো দরকার। অতি উৎসাহী হওয়া যেমন ঠিক নয় তেমনি রক্ষণশীলতারও প্রয়োজন নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার সব অপশনগুলো থেকে সবচেয়ে ভালো অপশনটা বেরিয়ে আসুক।

লেখক : শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত