ভিটামিন আবিষ্কারের কাহিনী
jugantor
ভিটামিন আবিষ্কারের কাহিনী

  ডা. অপূর্ব চৌধুরী  

০৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইংরেজিতে লিখে Vitamin। কিন্তু একশ’ বছর আগে শব্দটি লেখা হতো Vitamine। কী করে Vitamin হল? কেন একটি অতিরিক্ত E বাদ দেয়া হল?

নিশ্চয়ই কোনো গল্প আছে!

কারণটি ছিল মজার।

১৯১২ সালে পোল্যান্ডের এক বায়োকেমিস্ট Casimir Funk প্রথম ভিটামিন আবিষ্কার করেন। পোলিশ আসল নাম Kazimierz Funk। ১৯১০-এর দিকে লন্ডন চলে আসেন। আবার পরবর্তী সময়ে ১৯৪০-এর দিকে আমেরিকায় চলে যান, পরিচিতি পান Casimir Funk নামে।

লন্ডনের বিখ্যাত Lister Institute-এ গবেষণা করে তিনি প্রথম ভিটামিন আবিষ্কার করেন।

এ প্রসঙ্গে বলে নেই- সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা বেশিরভাগ চিকিৎসক কিংবা বিজ্ঞানীদেরও ধারণা নেই, আজকের পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যত ভালো ভালো আবিষ্কার ও সুফল মানুষ ভোগ করছে তার সিংহভাগ এসেছে পৃথিবীর ৩টি রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে। লন্ডনের লিস্টার ইন্সটিটিউট, প্যারিসের পাস্তুর ইন্সটিটিউট ও আমেরিকার রকফেলার ইন্সটিটিউট।

যাই হোক, Casimir Funk ভিটামিন আবিষ্কার করে নাম দেন Vitamine। ভাঙলে হয় Vital Amine। ভিটামিনের রাসায়নিক গঠনে তখন তিনি ভেবেছিলেন, এর মধ্যে Amine নামের গ্রুপের রাসায়নিক উপাদান আছে। Amine হল একধরনের গ্রুপ যেখানে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের বন্ধনে কেমিক্যালটি তৈরি হয়। যেমন- অ্যামিনো এসিড।

তিনি ভেবেছিলেন, ভিটামিনের মধ্যে Amine আছে এবং এটি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাম দেন- Vital Amine বা Life Amine। ল্যাটিন Vita মানে Life।

পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, যেসব ভিটামিনের মধ্যে Amine গ্রুপের কিছু থাকে না; শেষে E বাদ দিয়ে সংশোধন করে বলা হতে লাগল- Vitamin!

উনিশ শতকে চিকিৎসকরা ভাবত, শরীরের ৪টি মূল উপাদান দরকার। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও মিনারেলস। তখনও ভিটামিনের কথা জানত না।

Casimir Funk বিশ শতকের শুরুর দিকে ডাচ বিজ্ঞানী Christiaan Eijkman-এর একটি আর্টিক্যাল পড়েন। সেখানে Beriberi রোগের কারণ সম্পর্কে Christiaan Eijkman আলোচনা করেন। ১৮৯৭ সালে Eijkman প্রথম বেরিবেরির কারণ হিসেবে খাদ্যকে দায়ী করেন। তিনি দেখতে পান, যারা সাদা চালের পরিবর্তে বাদামি চাল খায় তাদের এ রোগ হয় না। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা জানে, এ বেরিবেরির কারণ ভিটামিন B1 বা Thiamine।

রসায়নবিদ Casimir Funk বাদামি চালের ওপর কাজ করে তার রাসায়নিক উপাদানটি পৃথক করে তার নাম দেন- Anti-Beriberi!

তার মানে ভিটামিন শব্দটি লেখার আগে ১৯১১ সালে তাকে প্রথম বলা হতো Anti-Beriberi। তিনি তখন আসলে ভুল করে অন্য একটি ভিটামিন B3, যা Niacin নামে বর্তমানে পরিচিত সেটি আবিষ্কার করেন। বাদামি চালের ভেতর ভুল করে B3-কে ভাবেন, বেরিবেরির উপাদান। আসলে সেটি ছিল B1 Thiamine। এমন করে পরবর্তী সময়ে ৪টি মূল ভিটামিন তিনি আবিষ্কার করেন। ভিটামিন B1, B3, C ও D।

কিন্তু নামগুলো এমন অ্যালফাবেট ছিল না।

তখন তাদের নাম ছিল বেশ মজার। যেমন-

বেরিবেরির কারণ Anti-beriberi Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন-ই-এর সাব গ্রুপ B1 বা Thiamine।

স্কার্ভির কারণ Anti-scorbut Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন C।

Pellagrar’র কারণ Anti-pellagric Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন B3 বা Niacin।

রিকেটস-এর কারণ Anti-rachitic Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন D।

এ নিয়ে ১৯১২ সালে তিনি একটি পপুলার বই লিখেন : The Vitamines।

১৯১২ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে সব ধরনের ভিটামিন আবিষ্কার হয় একে একে।

ভুল করে প্রথম ভিটামিন হিসেবে ভিটামিন B আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তী সময়ে ১৯১২ সালেই John Hopkins ভিটামিন A আবিষ্কার করেন, যা পরে ১৯২০ সালে নামকরণ করে A হিসেবে।

শুরুর দিকে প্রতিটি আবিষ্কারের একটি নাম থাকলেও পরবর্তী সময়ে আবিষ্কারের ক্রম অনুযায়ী ভিটামিনগুলোর নাম- A, B, C, D, E

ও K করা হয়। B মূলত বেরিবেরি থেকে নেয়া, ভিটামিন K রক্ত জমাট বাঁধায় দরকারি বলে জার্মান koagulation বা ইংরেজি Coagulation থেকে K নেয়া হয়েছে।

মানুষের শরীরে দরকার ধরা হয় ১৩টি ভিটামিন। কেউ কেউ Choline নামের একটি উপাদানকেও ভিটামিন গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত করে ১৪টি বলে।

ভিটামিন D ছাড়া আর কোনো ভিটামিন শরীর নিজেকে জোগাতে পারে না। তাই বিভিন্ন খাবার খেয়ে ভিটামিনের প্রয়োজনটি পূরণ করতে হয়।

ভিটামিনের মূল কাজ শরীরে কোষের ভেতর বিভিন্ন মেটাবলিক কাজে সাহায্য করা।

লেখক : চিকিৎসক ও লেখক, ইংল্যান্ড

 

ভিটামিন আবিষ্কারের কাহিনী

 ডা. অপূর্ব চৌধুরী 
০৮ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইংরেজিতে লিখে Vitamin। কিন্তু একশ’ বছর আগে শব্দটি লেখা হতো Vitamine। কী করে Vitamin হল? কেন একটি অতিরিক্ত E বাদ দেয়া হল?

নিশ্চয়ই কোনো গল্প আছে!

কারণটি ছিল মজার।

১৯১২ সালে পোল্যান্ডের এক বায়োকেমিস্ট Casimir Funk প্রথম ভিটামিন আবিষ্কার করেন। পোলিশ আসল নাম Kazimierz Funk। ১৯১০-এর দিকে লন্ডন চলে আসেন। আবার পরবর্তী সময়ে ১৯৪০-এর দিকে আমেরিকায় চলে যান, পরিচিতি পান Casimir Funk নামে।

লন্ডনের বিখ্যাত Lister Institute-এ গবেষণা করে তিনি প্রথম ভিটামিন আবিষ্কার করেন।

এ প্রসঙ্গে বলে নেই- সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা বেশিরভাগ চিকিৎসক কিংবা বিজ্ঞানীদেরও ধারণা নেই, আজকের পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যত ভালো ভালো আবিষ্কার ও সুফল মানুষ ভোগ করছে তার সিংহভাগ এসেছে পৃথিবীর ৩টি রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে। লন্ডনের লিস্টার ইন্সটিটিউট, প্যারিসের পাস্তুর ইন্সটিটিউট ও আমেরিকার রকফেলার ইন্সটিটিউট।

যাই হোক, Casimir Funk ভিটামিন আবিষ্কার করে নাম দেন Vitamine। ভাঙলে হয় Vital Amine। ভিটামিনের রাসায়নিক গঠনে তখন তিনি ভেবেছিলেন, এর মধ্যে Amine নামের গ্রুপের রাসায়নিক উপাদান আছে। Amine হল একধরনের গ্রুপ যেখানে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের বন্ধনে কেমিক্যালটি তৈরি হয়। যেমন- অ্যামিনো এসিড।

তিনি ভেবেছিলেন, ভিটামিনের মধ্যে Amine আছে এবং এটি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাম দেন- Vital Amine বা Life Amine। ল্যাটিন Vita মানে Life।

পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, যেসব ভিটামিনের মধ্যে Amine গ্রুপের কিছু থাকে না; শেষে E বাদ দিয়ে সংশোধন করে বলা হতে লাগল- Vitamin!

উনিশ শতকে চিকিৎসকরা ভাবত, শরীরের ৪টি মূল উপাদান দরকার। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও মিনারেলস। তখনও ভিটামিনের কথা জানত না।

Casimir Funk বিশ শতকের শুরুর দিকে ডাচ বিজ্ঞানী Christiaan Eijkman-এর একটি আর্টিক্যাল পড়েন। সেখানে Beriberi রোগের কারণ সম্পর্কে Christiaan Eijkman আলোচনা করেন। ১৮৯৭ সালে Eijkman প্রথম বেরিবেরির কারণ হিসেবে খাদ্যকে দায়ী করেন। তিনি দেখতে পান, যারা সাদা চালের পরিবর্তে বাদামি চাল খায় তাদের এ রোগ হয় না। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা জানে, এ বেরিবেরির কারণ ভিটামিন B1 বা Thiamine।

রসায়নবিদ Casimir Funk বাদামি চালের ওপর কাজ করে তার রাসায়নিক উপাদানটি পৃথক করে তার নাম দেন- Anti-Beriberi!

তার মানে ভিটামিন শব্দটি লেখার আগে ১৯১১ সালে তাকে প্রথম বলা হতো Anti-Beriberi। তিনি তখন আসলে ভুল করে অন্য একটি ভিটামিন B3, যা Niacin নামে বর্তমানে পরিচিত সেটি আবিষ্কার করেন। বাদামি চালের ভেতর ভুল করে B3-কে ভাবেন, বেরিবেরির উপাদান। আসলে সেটি ছিল B1 Thiamine। এমন করে পরবর্তী সময়ে ৪টি মূল ভিটামিন তিনি আবিষ্কার করেন। ভিটামিন B1, B3, C ও D।

কিন্তু নামগুলো এমন অ্যালফাবেট ছিল না।

তখন তাদের নাম ছিল বেশ মজার। যেমন-

বেরিবেরির কারণ Anti-beriberi Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন-ই-এর সাব গ্রুপ B1 বা Thiamine।

স্কার্ভির কারণ Anti-scorbut Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন C।

Pellagrar’র কারণ Anti-pellagric Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন B3 বা Niacin।

রিকেটস-এর কারণ Anti-rachitic Vitamin-এর অভাব, যা পরে নাম দেয়া হল ভিটামিন D।

এ নিয়ে ১৯১২ সালে তিনি একটি পপুলার বই লিখেন : The Vitamines।

১৯১২ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে সব ধরনের ভিটামিন আবিষ্কার হয় একে একে।

ভুল করে প্রথম ভিটামিন হিসেবে ভিটামিন B আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তী সময়ে ১৯১২ সালেই John Hopkins ভিটামিন A আবিষ্কার করেন, যা পরে ১৯২০ সালে নামকরণ করে A হিসেবে।

শুরুর দিকে প্রতিটি আবিষ্কারের একটি নাম থাকলেও পরবর্তী সময়ে আবিষ্কারের ক্রম অনুযায়ী ভিটামিনগুলোর নাম- A, B, C, D, E

ও K করা হয়। B মূলত বেরিবেরি থেকে নেয়া, ভিটামিন K রক্ত জমাট বাঁধায় দরকারি বলে জার্মান koagulation বা ইংরেজি Coagulation থেকে K নেয়া হয়েছে।

মানুষের শরীরে দরকার ধরা হয় ১৩টি ভিটামিন। কেউ কেউ Choline নামের একটি উপাদানকেও ভিটামিন গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত করে ১৪টি বলে।

ভিটামিন D ছাড়া আর কোনো ভিটামিন শরীর নিজেকে জোগাতে পারে না। তাই বিভিন্ন খাবার খেয়ে ভিটামিনের প্রয়োজনটি পূরণ করতে হয়।

ভিটামিনের মূল কাজ শরীরে কোষের ভেতর বিভিন্ন মেটাবলিক কাজে সাহায্য করা।

লেখক : চিকিৎসক ও লেখক, ইংল্যান্ড