টনসিল ও এডেনয়েডে ইনফেকশন
jugantor
টনসিল ও এডেনয়েডে ইনফেকশন

  অধ্যাপক ডা. জাহির আল-আমিন  

১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টনসিলে ইনফেকশনের কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। শিশুদের এটি সাধারণ সমস্যা। এ রোগে শিশু ঘনঘন গলাব্যথা ও জ্বরে ভোগে, ঢোক গিলতে বা খাবার খেতে কষ্ট হয় এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সামান্য থেকে অতিমাত্রায় হতে পারে।

রোগী আক্রান্ত হতে থাকলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মধ্যে দিন কাটানোর ফলে বাচ্চার স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও হাসি-খুশি ভাব কমে যেতে থাকে।

টনসিল এবং এডেনয়েডের কাজ

টনসিল এক জাতীয় লিম্ফয়েড টিস্যু। গলার ভেতরে জিহ্বার পেছনে দু’পাশে দুটি টনসিল থাকে। নাকের পেছনের দিকে থাকে এডেনয়েড। টনসিল, এডেনয়েড এবং গলার পেছনের টিস্যু মিলে তৈরি হয় ওয়ালডেয়ার’স রিং। এগুলোকে পেটের ভেতরের এপেনডিক্সের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গঠনগত দিক থেকে টনসিল, এডেনয়েড ও এপেনডিক্সের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। লিম্ফয়েড টিস্যুর ধর্মানুযায়ী এগুলো ছোটবেলায় বড় থাকে। বাচ্চা যখন ঘনঘন সর্দি-কাশিতে ভোগে তখন এগুলো আকারে আরও বড় হতে থাকে।

বাচ্চা অসুখ-বিসুখে না ভুগলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়ার কথা এবং ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে টনসিল ও এডেনয়েডের আর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করার কথা নয়। উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা করা না হলে এ সমস্যাগুলো বয়সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে।

টনসিল ও এডেনয়েড আমাদের জন্মের আগে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির সঙ্গে জড়িত। জন্মের পরপর এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে থাকে। দু’বছর বয়সের পর অল্প মাত্রায় স্থানীয় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত থাকা ভিন্ন এর কোনো কাজই নেই।

মনে রাখতে হবে, বারবার ইনফেকশনের ফলে যদি অঙ্গ ক্রনিকালি ইনফেকটেড হয়ে যায় তখন রোগপ্রতিরোধ গড়ার পরিবর্তে এগুলো রোগজীবাণুর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, টনসিল বা এডেনয়েডের অপারেশন হলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যেতে পারে- এ কথাটি সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন। দু’বছর বয়সের পর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় এগুলোর গুরুত্ব নেই বললেই চলে।

টনসিল ইনফেকশনের উপসর্গ

ঘনঘন গলাব্যথা ও সঙ্গে জ্বর। সাধারণত গলাব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকে, যা অনেক সময় ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। গলাব্যথার কারণে বাচ্চা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় বাচ্চার দেহে পানিশূন্যতা ও ক্যালোরির অভাব দেখা দিতে পারে।

ঘনঘন টনসিলে ইনফেকশন হলে এটি আকারে বড় হয়ে যায় এবং শ্বাসের রাস্তা ও খাদ্য গ্রহণের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে বাচ্চা খেতে অস্বস্তিবোধ করে। রাতে ঘুমের মধ্যে বাচ্চা হা করে শব্দ করে ঘুমায় এবং অনেক সময় দম বন্ধ হয়ে যায় বা দম নেয়ার জন্য বাচ্চা ছটফট করে। একে আমরা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ এপনিয়া সিনড্রোম বলে থাকি। এটি সাধারণত এডেনয়েডের কারণে হয়। টনসিল অনেক বড় হলেও এ সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় এডেনেয়ড ও টনসিল একসঙ্গে বড় থাকতে পারে।

এ সমস্যা হলে বাচ্চা ঘুমানোর সঙ্গে সঙ্গে নাক ডাকতে শুরু করে। নাক ডাকা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, শ্বাসের রাস্তা ক্রমাগত ছোট হতে হতে যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় তখন বাচ্চা শ্বাস নেয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখে। এ পর্যায়ে শরীরের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এক্ষেত্রে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শরীর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হবে। এ সময়ে শরীরের ভেতরের জীবন বাঁচানোর প্রক্রিয়াগুলো (রিরিক্স মেকানিজম) সক্রিয় হয়ে ওঠে। শরীর বুঝতে পারে এভাবে অক্সিজেন কমতে থাকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হবে। ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এ প্রক্রিয়াগুলো সবল হয়ে পড়ে এবং বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়। বাচ্চা ধড়ফড় করে উঠে বসে এবং আবার শ্বাস নিতে শুরু করে।

যেহেতু শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কম থাকে সেহেতু মস্তিষ্কের কার্যকারিতা দুর্বল অবস্থায় থাকে। বাচ্চা কয়েকবার শ্বাস নেয়ার পরই আবার শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এ অবস্থা সারা রাত ধরে চলতে থাকে। এভাবে অক্সিজেনের স্বল্পতার জন্য বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্রমান্বয়ে বাধাগ্রস্ত হয়। বাচ্চা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়, পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়, অবাধ্য হয় ও মেধা কমে যেতে থাকে। স্কুলের কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে।

অনেকের ধারণা, টনসিল বা এডেনয়েডের সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। এ কথা সত্য। লিম্ফয়েড টিস্যুর ধর্মানুযায়ী বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ছোট হতে থাকে এবং কর্মক্ষমতা হারায় কিন্তু এখানে জানা প্রয়োজন, শারীরিক বৃদ্ধি জীবনের প্রথম দিকেই বেশি থাকে। জন্মের পরপরই বাচ্চার যে ওজন থাকে তা পাঁচ মাসের মাথায় দ্বিগুণ এবং এক বছরের মাথায় তিনগুণ হয়ে যায়। ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষের ওজন ৫ মাসে ১৪০ কেজি এবং এক বছরে ২১০ কেজি হওয়ার সমতুল্য।

এ থেকেই বোঝা যায়, বাচ্চা কী রকম দ্রুতগতিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। যতদিন যেতে থাকে বাচ্চার বৃদ্ধির মাত্রা ততই কমতে থাকে। ১২ থেকে ১৪ বছরের মাথায় বাচ্চার বৃদ্ধি প্রায় পূর্ণতা লাভ করে। আরও ৩ থেকে ৪ বছর অল্পমাত্রায় আমাদের শরীরের বৃদ্ধি পায়। এরপর ১৭ থেকে ১৮ বছরের শরীরে আর কোনো প্রয়োজনীয় বৃদ্ধিপ্রাপ্তি হয় না বললেই চলে। ১৭ থেকে ১৮ বছরের পর যে ওজন বাড়ে তা মূলত চর্বি বা ফ্যাট, যা শরীরের কোনো উন্নতি তো করেই না বরং ক্ষতি বা শরীরের কিছু অংশের বৃদ্ধি সাধন এই ১৭ থেকে ১৮ বছরের অনেক আগেই পূর্ণতা লাভ করে।

আমাদের মস্তিষ্কের এবং স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধি চার বছরের মাথায় সম্পূর্ণ হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর একবিন্দুও কার্যকারিতা বৃদ্ধি হয় না। কোনো বাচ্চা যদি জীবনের প্রাথমিক অবস্থায় ঘনঘন অসুস্থ হতে থাকে তাহলে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি এবং বিকাশ অবশ্যই বাধাগ্রস্ত হবে।

আধুনিক এ যুগে বাচ্চা ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে নিজ থেকে ভালো হয়ে যাবে এবং শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হবে না। এ যুক্তি মেনে নেয়া যায় না। বাচ্চার কিছু অসুখ-বিসুখ হবেই। যে সমস্যা প্রতিরোধ করা যায় বা যেগুলোর মাত্রা কমিয়ে দেয়া যায় সেগুলোর অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত। এ অবস্থায় বাচ্চার কোনো অবস্থাতেই দৈহিক ও মানসিক বিকাশের পূর্ণতা লাভ করবে না।

এডেনয়েড গ্রন্থি বড় হলে বাচ্চা ঘনঘন সর্দি-কাশি ও ঠাণ্ডায় ভোগে এবং ঠাণ্ডা সহজে সারতে চায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাচ্চা শ্বাসকষ্ট এবং রাতের বেলায় কাশিতে ভোগে।

গলা বা নাকের প্রদাহ কানের ভেতর চলে যায়। ফলে কানের মধ্যে ঘনঘন ব্যথা হয় এবং কানে কম শোনে। অনেক সময় ব্যথা ছাড়াও কানের মধ্যে পুঁজ বা পানি জমতে পারে এবং বাচ্চা কানে কম শুনতে পারে।

কানের ভেতর ঘনঘন ইনফেকশন বা কানের ভেতর লম্বা সময় পুঁজ পানি জমা থাকার ফলে কানের পর্দাগুলো ক্ষতিসাধিত হয় এবং একসময় পর্দা সম্পূর্ণরূপে ছিদ্র হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কান পাকা রোগ এবং শ্রবণের সমস্যা এভাবে শুরু হয়ে থাকে। খুব কম ক্ষেত্রে টনসিলে ঘনঘন ইনফেকশন থেকে বাতজ্বর (রিউম্যাটিক ফিভার) হতে পরে। এ রোগের ফলে হার্টের এবং কিডনির মারাত্মক ক্ষতিসাধিত হতে পারে। অল্প বয়সে হার্টের ভাল্ব নষ্ট হয়ে যাওয়া বা কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার (কিডনি ফেইলিওরের) অন্যতম প্রধান কারণ বাতজ্বর, যা টনসিলে ইনফেকশন থেকেই হয়ে থাকে।

টনসিল ও এডেনয়েড অপারেশন

বারবার ইনফেকশনের কারণে টনসিল বা এডেনয়েডের অপারেশন করা দরকার। গলার পেছন দিকে থাকে টনসিল আর নাকের পেছন দিকে এডেনয়েড। এগুলো ফেলে দিলে শরীরের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং এডেনয়েড ফেলে দিলে কানের ইনফেকশন কম হয়।

অপারেশনে সম্ভাব্য জটিলতা

রক্তক্ষরণ : শতকরা একজনের অপারেশনের পর রক্তক্ষরণ হতে পরে। এটি সাধারণত হাসপাতালে থাকা অবস্থায় হয় এবং এজন্য রোগীকে আবার অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার দরকার হতে পারে। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশন করার ১০ দিনের মধ্যে রক্তক্ষরণ হতে পারে, যা কখনও মারাত্মক রূপ নেয় এবং রোগীর শিরায় এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিতে হতে পারে।

ব্যথা : গলাব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। এটি ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অতিরিক্ত গলাব্যথা হওয়া বিরল।

কানে ব্যথা : এটি স্বাভাবিক। সাধারণত এটি রেফার্ড পেইন অর্থাৎ গলায় অপারেশনের জন্যই কানে ব্যথা অনুভূত হয়। সাধারণত এ ব্যথা কানের কোনো ইনফেকশনের জন্য হয় না।

ঢোক গিলতে অসুবিধা : এটি স্বাভাবিক এবং কয়েক দিন থাকে। খাবার কিছুক্ষণ আগে ব্যথার ওষুধ নিয়ে ব্যথা কমে যাওয়ার পর স্বাভাবিক খাবার খেলে সমস্যাটি দ্রুত সারে।

ইনফেকশন : অপারেশন পর কাঁচা ঘা থাকে ১০ থেকে ১৪ দিন। প্রথম কয়েক দিনে তাই এ কাঁচা ঘা-এ কোনো ইনফেকশন হতে পারে। ঘনঘন গড়গড়া করলে গলা পরিষ্কার থাকবে। নিয়মিত স্বাভাবিক খাবার খেলেও গলার ভেতর ময়লা জমতে পারে না। প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার গড়গড়া করবেন। শুধু মাত্র তরল খাবার না খেয়ে ঠাণ্ডা ও নরম সব ধরনের খাবারই খাবেন।

দাঁতের ক্ষতি : অপারেশনের সময় মুখ হা করিয়ে রাখার জন্য এক ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়, যা সামনের দাঁতগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে থাকে। কারও যদি কৃত্রিম বা আলগা দাঁত থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারকে অবহিত করুন এবং অপারেশনের আগে অজ্ঞানকারী ডাক্তারকেও জানাবেন। কখনও বা নড়বড়ে দাঁত নিরাপত্তার জন্যই অপসারণ করতে হতে পারে।

অপারেশনের পর

* অধিকাংশ রোগী অপারেশনের পরদিনই বাড়ি যেতে পারে।

* নির্দেশমতো ওষুধ গ্রহণ করুন, ব্যথা উপশমের জন্য কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ দিন নিয়মিত ব্যথার ওষুধ গ্রহণ করুন। ব্যথা বাড়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। কারণ ওষুধ নেয়ার পরও ব্যথা কমতে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা সময় লাগে।

* ধূমপান করবেন না, উত্তেজক পানীয় পরিহার করুন।

* স্বাভাবিক খাবার খাবেন। কেবল নরম খাবার নয়- তবে ঝালজাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।

* যদি রক্তক্ষরণ হয়, বরফ পানি দিয়ে গড়গড়া করুন এবং কুলি করুন। রক্তপাত বন্ধ না হলে হাসপাতালে চলে আসুন। অথবা ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

* অপারেশনের সাত দিন পর অবশ্যই বিশেষজ্ঞকে দেখানো উচিত।

লেখক : নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, সিনিয়র কনসালটেন্ট, ইমপালস হসপিটাল, ঢাকা

টনসিল ও এডেনয়েডে ইনফেকশন

 অধ্যাপক ডা. জাহির আল-আমিন 
১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টনসিলে ইনফেকশনের কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। শিশুদের এটি সাধারণ সমস্যা। এ রোগে শিশু ঘনঘন গলাব্যথা ও জ্বরে ভোগে, ঢোক গিলতে বা খাবার খেতে কষ্ট হয় এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সামান্য থেকে অতিমাত্রায় হতে পারে।

রোগী আক্রান্ত হতে থাকলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মধ্যে দিন কাটানোর ফলে বাচ্চার স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও হাসি-খুশি ভাব কমে যেতে থাকে।

টনসিল এবং এডেনয়েডের কাজ

টনসিল এক জাতীয় লিম্ফয়েড টিস্যু। গলার ভেতরে জিহ্বার পেছনে দু’পাশে দুটি টনসিল থাকে। নাকের পেছনের দিকে থাকে এডেনয়েড। টনসিল, এডেনয়েড এবং গলার পেছনের টিস্যু মিলে তৈরি হয় ওয়ালডেয়ার’স রিং। এগুলোকে পেটের ভেতরের এপেনডিক্সের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গঠনগত দিক থেকে টনসিল, এডেনয়েড ও এপেনডিক্সের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। লিম্ফয়েড টিস্যুর ধর্মানুযায়ী এগুলো ছোটবেলায় বড় থাকে। বাচ্চা যখন ঘনঘন সর্দি-কাশিতে ভোগে তখন এগুলো আকারে আরও বড় হতে থাকে।

বাচ্চা অসুখ-বিসুখে না ভুগলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়ার কথা এবং ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে টনসিল ও এডেনয়েডের আর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করার কথা নয়। উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা করা না হলে এ সমস্যাগুলো বয়সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে।

টনসিল ও এডেনয়েড আমাদের জন্মের আগে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির সঙ্গে জড়িত। জন্মের পরপর এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে থাকে। দু’বছর বয়সের পর অল্প মাত্রায় স্থানীয় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত থাকা ভিন্ন এর কোনো কাজই নেই।

মনে রাখতে হবে, বারবার ইনফেকশনের ফলে যদি অঙ্গ ক্রনিকালি ইনফেকটেড হয়ে যায় তখন রোগপ্রতিরোধ গড়ার পরিবর্তে এগুলো রোগজীবাণুর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, টনসিল বা এডেনয়েডের অপারেশন হলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যেতে পারে- এ কথাটি সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন। দু’বছর বয়সের পর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় এগুলোর গুরুত্ব নেই বললেই চলে।

টনসিল ইনফেকশনের উপসর্গ

ঘনঘন গলাব্যথা ও সঙ্গে জ্বর। সাধারণত গলাব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকে, যা অনেক সময় ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। গলাব্যথার কারণে বাচ্চা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় বাচ্চার দেহে পানিশূন্যতা ও ক্যালোরির অভাব দেখা দিতে পারে।

ঘনঘন টনসিলে ইনফেকশন হলে এটি আকারে বড় হয়ে যায় এবং শ্বাসের রাস্তা ও খাদ্য গ্রহণের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে বাচ্চা খেতে অস্বস্তিবোধ করে। রাতে ঘুমের মধ্যে বাচ্চা হা করে শব্দ করে ঘুমায় এবং অনেক সময় দম বন্ধ হয়ে যায় বা দম নেয়ার জন্য বাচ্চা ছটফট করে। একে আমরা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ এপনিয়া সিনড্রোম বলে থাকি। এটি সাধারণত এডেনয়েডের কারণে হয়। টনসিল অনেক বড় হলেও এ সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় এডেনেয়ড ও টনসিল একসঙ্গে বড় থাকতে পারে।

এ সমস্যা হলে বাচ্চা ঘুমানোর সঙ্গে সঙ্গে নাক ডাকতে শুরু করে। নাক ডাকা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, শ্বাসের রাস্তা ক্রমাগত ছোট হতে হতে যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় তখন বাচ্চা শ্বাস নেয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখে। এ পর্যায়ে শরীরের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এক্ষেত্রে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শরীর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হবে। এ সময়ে শরীরের ভেতরের জীবন বাঁচানোর প্রক্রিয়াগুলো (রিরিক্স মেকানিজম) সক্রিয় হয়ে ওঠে। শরীর বুঝতে পারে এভাবে অক্সিজেন কমতে থাকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হবে। ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এ প্রক্রিয়াগুলো সবল হয়ে পড়ে এবং বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়। বাচ্চা ধড়ফড় করে উঠে বসে এবং আবার শ্বাস নিতে শুরু করে।

যেহেতু শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কম থাকে সেহেতু মস্তিষ্কের কার্যকারিতা দুর্বল অবস্থায় থাকে। বাচ্চা কয়েকবার শ্বাস নেয়ার পরই আবার শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এ অবস্থা সারা রাত ধরে চলতে থাকে। এভাবে অক্সিজেনের স্বল্পতার জন্য বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্রমান্বয়ে বাধাগ্রস্ত হয়। বাচ্চা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়, পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়, অবাধ্য হয় ও মেধা কমে যেতে থাকে। স্কুলের কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে।

অনেকের ধারণা, টনসিল বা এডেনয়েডের সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। এ কথা সত্য। লিম্ফয়েড টিস্যুর ধর্মানুযায়ী বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ছোট হতে থাকে এবং কর্মক্ষমতা হারায় কিন্তু এখানে জানা প্রয়োজন, শারীরিক বৃদ্ধি জীবনের প্রথম দিকেই বেশি থাকে। জন্মের পরপরই বাচ্চার যে ওজন থাকে তা পাঁচ মাসের মাথায় দ্বিগুণ এবং এক বছরের মাথায় তিনগুণ হয়ে যায়। ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষের ওজন ৫ মাসে ১৪০ কেজি এবং এক বছরে ২১০ কেজি হওয়ার সমতুল্য।

এ থেকেই বোঝা যায়, বাচ্চা কী রকম দ্রুতগতিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। যতদিন যেতে থাকে বাচ্চার বৃদ্ধির মাত্রা ততই কমতে থাকে। ১২ থেকে ১৪ বছরের মাথায় বাচ্চার বৃদ্ধি প্রায় পূর্ণতা লাভ করে। আরও ৩ থেকে ৪ বছর অল্পমাত্রায় আমাদের শরীরের বৃদ্ধি পায়। এরপর ১৭ থেকে ১৮ বছরের শরীরে আর কোনো প্রয়োজনীয় বৃদ্ধিপ্রাপ্তি হয় না বললেই চলে। ১৭ থেকে ১৮ বছরের পর যে ওজন বাড়ে তা মূলত চর্বি বা ফ্যাট, যা শরীরের কোনো উন্নতি তো করেই না বরং ক্ষতি বা শরীরের কিছু অংশের বৃদ্ধি সাধন এই ১৭ থেকে ১৮ বছরের অনেক আগেই পূর্ণতা লাভ করে।

আমাদের মস্তিষ্কের এবং স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধি চার বছরের মাথায় সম্পূর্ণ হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর একবিন্দুও কার্যকারিতা বৃদ্ধি হয় না। কোনো বাচ্চা যদি জীবনের প্রাথমিক অবস্থায় ঘনঘন অসুস্থ হতে থাকে তাহলে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি এবং বিকাশ অবশ্যই বাধাগ্রস্ত হবে।

আধুনিক এ যুগে বাচ্চা ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে নিজ থেকে ভালো হয়ে যাবে এবং শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হবে না। এ যুক্তি মেনে নেয়া যায় না। বাচ্চার কিছু অসুখ-বিসুখ হবেই। যে সমস্যা প্রতিরোধ করা যায় বা যেগুলোর মাত্রা কমিয়ে দেয়া যায় সেগুলোর অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত। এ অবস্থায় বাচ্চার কোনো অবস্থাতেই দৈহিক ও মানসিক বিকাশের পূর্ণতা লাভ করবে না।

এডেনয়েড গ্রন্থি বড় হলে বাচ্চা ঘনঘন সর্দি-কাশি ও ঠাণ্ডায় ভোগে এবং ঠাণ্ডা সহজে সারতে চায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাচ্চা শ্বাসকষ্ট এবং রাতের বেলায় কাশিতে ভোগে।

গলা বা নাকের প্রদাহ কানের ভেতর চলে যায়। ফলে কানের মধ্যে ঘনঘন ব্যথা হয় এবং কানে কম শোনে। অনেক সময় ব্যথা ছাড়াও কানের মধ্যে পুঁজ বা পানি জমতে পারে এবং বাচ্চা কানে কম শুনতে পারে।

কানের ভেতর ঘনঘন ইনফেকশন বা কানের ভেতর লম্বা সময় পুঁজ পানি জমা থাকার ফলে কানের পর্দাগুলো ক্ষতিসাধিত হয় এবং একসময় পর্দা সম্পূর্ণরূপে ছিদ্র হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কান পাকা রোগ এবং শ্রবণের সমস্যা এভাবে শুরু হয়ে থাকে। খুব কম ক্ষেত্রে টনসিলে ঘনঘন ইনফেকশন থেকে বাতজ্বর (রিউম্যাটিক ফিভার) হতে পরে। এ রোগের ফলে হার্টের এবং কিডনির মারাত্মক ক্ষতিসাধিত হতে পারে। অল্প বয়সে হার্টের ভাল্ব নষ্ট হয়ে যাওয়া বা কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার (কিডনি ফেইলিওরের) অন্যতম প্রধান কারণ বাতজ্বর, যা টনসিলে ইনফেকশন থেকেই হয়ে থাকে।

টনসিল ও এডেনয়েড অপারেশন

বারবার ইনফেকশনের কারণে টনসিল বা এডেনয়েডের অপারেশন করা দরকার। গলার পেছন দিকে থাকে টনসিল আর নাকের পেছন দিকে এডেনয়েড। এগুলো ফেলে দিলে শরীরের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং এডেনয়েড ফেলে দিলে কানের ইনফেকশন কম হয়।

অপারেশনে সম্ভাব্য জটিলতা

রক্তক্ষরণ : শতকরা একজনের অপারেশনের পর রক্তক্ষরণ হতে পরে। এটি সাধারণত হাসপাতালে থাকা অবস্থায় হয় এবং এজন্য রোগীকে আবার অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার দরকার হতে পারে। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশন করার ১০ দিনের মধ্যে রক্তক্ষরণ হতে পারে, যা কখনও মারাত্মক রূপ নেয় এবং রোগীর শিরায় এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিতে হতে পারে।

ব্যথা : গলাব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। এটি ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অতিরিক্ত গলাব্যথা হওয়া বিরল।

কানে ব্যথা : এটি স্বাভাবিক। সাধারণত এটি রেফার্ড পেইন অর্থাৎ গলায় অপারেশনের জন্যই কানে ব্যথা অনুভূত হয়। সাধারণত এ ব্যথা কানের কোনো ইনফেকশনের জন্য হয় না।

ঢোক গিলতে অসুবিধা : এটি স্বাভাবিক এবং কয়েক দিন থাকে। খাবার কিছুক্ষণ আগে ব্যথার ওষুধ নিয়ে ব্যথা কমে যাওয়ার পর স্বাভাবিক খাবার খেলে সমস্যাটি দ্রুত সারে।

ইনফেকশন : অপারেশন পর কাঁচা ঘা থাকে ১০ থেকে ১৪ দিন। প্রথম কয়েক দিনে তাই এ কাঁচা ঘা-এ কোনো ইনফেকশন হতে পারে। ঘনঘন গড়গড়া করলে গলা পরিষ্কার থাকবে। নিয়মিত স্বাভাবিক খাবার খেলেও গলার ভেতর ময়লা জমতে পারে না। প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার গড়গড়া করবেন। শুধু মাত্র তরল খাবার না খেয়ে ঠাণ্ডা ও নরম সব ধরনের খাবারই খাবেন।

দাঁতের ক্ষতি : অপারেশনের সময় মুখ হা করিয়ে রাখার জন্য এক ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়, যা সামনের দাঁতগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে থাকে। কারও যদি কৃত্রিম বা আলগা দাঁত থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারকে অবহিত করুন এবং অপারেশনের আগে অজ্ঞানকারী ডাক্তারকেও জানাবেন। কখনও বা নড়বড়ে দাঁত নিরাপত্তার জন্যই অপসারণ করতে হতে পারে।

অপারেশনের পর

* অধিকাংশ রোগী অপারেশনের পরদিনই বাড়ি যেতে পারে।

* নির্দেশমতো ওষুধ গ্রহণ করুন, ব্যথা উপশমের জন্য কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ দিন নিয়মিত ব্যথার ওষুধ গ্রহণ করুন। ব্যথা বাড়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। কারণ ওষুধ নেয়ার পরও ব্যথা কমতে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা সময় লাগে।

* ধূমপান করবেন না, উত্তেজক পানীয় পরিহার করুন।

* স্বাভাবিক খাবার খাবেন। কেবল নরম খাবার নয়- তবে ঝালজাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।

* যদি রক্তক্ষরণ হয়, বরফ পানি দিয়ে গড়গড়া করুন এবং কুলি করুন। রক্তপাত বন্ধ না হলে হাসপাতালে চলে আসুন। অথবা ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

* অপারেশনের সাত দিন পর অবশ্যই বিশেষজ্ঞকে দেখানো উচিত।

লেখক : নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, সিনিয়র কনসালটেন্ট, ইমপালস হসপিটাল, ঢাকা