হার্ট অ্যাটাকে করণীয়
jugantor
হার্ট অ্যাটাকে করণীয়

  ডা. রফিক আহমেদ  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর বড় ১০টি কারণের অন্যতম হার্ট অ্যাটাক। বলা হয়ে থাকে বিশ্বে এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ।

বাংলাদেশেও হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ আজকাল খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ব্যায়াম করুন আর নাই করুন, যে কোনো সময়ে আপনার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

খাদ্য নির্দেশিকা অনুসরণ করুন এবং এতে কলোস্টেরলের পরিমাণ ২০০-এর নিচে রাখতে সচেষ্ট হোন। তুলনামূলক স্বল্পমাত্রার ভালো কলোস্টেরল, এইচএলডি অথবা অতিরিক্ত পরিমাণ ট্রাইগ্লিসারাইড এ সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং এটি পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই সমান ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও হার্ট অ্যাটাক হলেই মৃত্যু হবে এমন নয়। শক্তিশালী ক্লট বাস্টিং (রক্ত জমাট বাধা প্রতিরোধকারী) ওষুধ বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ কারতে পারে।

এ ওষুধ দ্রুত সরবরাহের মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ- ধমনিতে জমাট বাঁধা রক্ত তরলীকরণের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার লোকের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. ডাব্লিউ ডগলাস ওয়েভার বলেন, একজন চিকিৎসক কোনো রোগীর ক্লট বাস্টিং চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কি-না তা তাকে অধিকসংখ্যক প্রশ্ন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি এ সত্য প্রমাণে সক্ষম হবেন যে, রোগীর চিকিৎসা না করার ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে এ ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি নেয়া অনেকাংশেই উত্তম।

কলোরেডো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও পরিচালক রবার্ট গিন্সবার্গ স্বীকার করেন, ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা যত ব্যাপকভাবে হওয়া উচিত তা হচ্ছে না।

সবচেয়ে ভালো হবে হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়ার প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করা। এক মুখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, উপসর্গ দেখা দেয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই যদি রোগীকে ক্লট বাস্টার দেয়া হয় তবে মৃত্যুঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কমে যায়। আবার ৩ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে এ ঝুঁকি কমে যায় ১৭ শতাংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- আপনি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লট বাস্টিং ওষুধগুলোর মধ্যে কোনটি আপনি দ্রুত নাগালের মধ্যে পেলেন।

সর্বোত্তম হাসপাতালটি বেছে নিন

হার্ট অ্যাটকের রোগীকে হাসপাতালে আনা এবং ক্লট বাস্টিং ওষুধ প্রয়োগের মধ্যবর্তী সময়সীমা ৩০ মিনিট (যা রোগীর জন্য ভালো) থেকে ২৫৫ মিনিট (যা রোগীর জীবননাশে যথেষ্ট) পর্যন্ত বিস্তৃত। হাসপাতালের এ জরুরি বিভাগগুলো খুব ভালো যেখানে রোগী পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিহত করার ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। যদি আপনার এলাকায় চিকিৎসার জন্য একাধিক হাসপাতাল থাকে, সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন, হার্ট অ্যাটাক চিকিৎসার জন্য কোনটি উত্তম।

প্রাথমিক উপসর্গ

* বুক ব্যথা, চাপ চাপ ব্যথা, বুকের বাম পাশে বা পুরো বুকজুড়ে তীব্র ব্যথা।

* শরীরের অন্য অংশে ব্যথা- মনে হতে পারে, ব্যথা শরীরে এক অংশ থেকে অন্য অংশে চলে যাচ্ছে যেমন- বুক থেকে হাতে ব্যথা অনুভব করা। সাধারণত বাম হাতে ব্যথা হয় কিন্তু দু’হাতেই ব্যথা হতে পারে।

* মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করা।

* শরীরে ঘাম হওয়া।

* বমি বমি ভাব হওয়া।

* বুক ধড়ফড় করা বা বিনা কারণে অস্থির লাগা।

* সর্দি বা কাশি হওয়া।

বেশির ভাগ সময় বুকে ব্যথা খুবই তীব্র হয় ফলে শরীরের অন্য অংশে ব্যথা অনেকেই টের পান না।

ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা বলছে, হৃদরোগের প্রথমিক উপসর্গ খেয়াল না করলে তার ফলে কেবল মৃত্যু নয়- বেঁচে থাকলেও অনেক জটিলতা নিয়ে বাঁচতে হয়।

সব সময় মেডিকেল তথ্যসংবলিত প্রয়োজনীয় তালিকা সঙ্গে রাখুন

এটি সঙ্গে থাকলে যে কোনো জরুরি বিভাগে খুব ভালো কাজ দেবে। আমেরিকার বার্মিংহামের অ্যালবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের পরিচালক ডা. জেরাল্ড পস্ট আপনার চিকিৎসককে জানানোর জন্য আপনার চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করে আপনার মানিব্যাগে সব সময় রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে চিন্তা করার সময় কিন্তু এখনই। স্মরণ রাখবেন, আপনার হার্ট অ্যাটকের পরে প্রতিটি সেকেন্ড আপনার বাঁচার সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করতে থাকে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

হার্ট অ্যাটাকে করণীয়

 ডা. রফিক আহমেদ 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর বড় ১০টি কারণের অন্যতম হার্ট অ্যাটাক। বলা হয়ে থাকে বিশ্বে এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ।

বাংলাদেশেও হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ আজকাল খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ব্যায়াম করুন আর নাই করুন, যে কোনো সময়ে আপনার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

খাদ্য নির্দেশিকা অনুসরণ করুন এবং এতে কলোস্টেরলের পরিমাণ ২০০-এর নিচে রাখতে সচেষ্ট হোন। তুলনামূলক স্বল্পমাত্রার ভালো কলোস্টেরল, এইচএলডি অথবা অতিরিক্ত পরিমাণ ট্রাইগ্লিসারাইড এ সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং এটি পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই সমান ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও হার্ট অ্যাটাক হলেই মৃত্যু হবে এমন নয়। শক্তিশালী ক্লট বাস্টিং (রক্ত জমাট বাধা প্রতিরোধকারী) ওষুধ বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ কারতে পারে।

এ ওষুধ দ্রুত সরবরাহের মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ- ধমনিতে জমাট বাঁধা রক্ত তরলীকরণের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার লোকের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. ডাব্লিউ ডগলাস ওয়েভার বলেন, একজন চিকিৎসক কোনো রোগীর ক্লট বাস্টিং চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কি-না তা তাকে অধিকসংখ্যক প্রশ্ন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি এ সত্য প্রমাণে সক্ষম হবেন যে, রোগীর চিকিৎসা না করার ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে এ ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি নেয়া অনেকাংশেই উত্তম।

কলোরেডো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও পরিচালক রবার্ট গিন্সবার্গ স্বীকার করেন, ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা যত ব্যাপকভাবে হওয়া উচিত তা হচ্ছে না।

সবচেয়ে ভালো হবে হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়ার প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করা। এক মুখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, উপসর্গ দেখা দেয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই যদি রোগীকে ক্লট বাস্টার দেয়া হয় তবে মৃত্যুঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কমে যায়। আবার ৩ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে এ ঝুঁকি কমে যায় ১৭ শতাংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- আপনি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লট বাস্টিং ওষুধগুলোর মধ্যে কোনটি আপনি দ্রুত নাগালের মধ্যে পেলেন।

সর্বোত্তম হাসপাতালটি বেছে নিন

হার্ট অ্যাটকের রোগীকে হাসপাতালে আনা এবং ক্লট বাস্টিং ওষুধ প্রয়োগের মধ্যবর্তী সময়সীমা ৩০ মিনিট (যা রোগীর জন্য ভালো) থেকে ২৫৫ মিনিট (যা রোগীর জীবননাশে যথেষ্ট) পর্যন্ত বিস্তৃত। হাসপাতালের এ জরুরি বিভাগগুলো খুব ভালো যেখানে রোগী পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিহত করার ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। যদি আপনার এলাকায় চিকিৎসার জন্য একাধিক হাসপাতাল থাকে, সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন, হার্ট অ্যাটাক চিকিৎসার জন্য কোনটি উত্তম।

প্রাথমিক উপসর্গ

* বুক ব্যথা, চাপ চাপ ব্যথা, বুকের বাম পাশে বা পুরো বুকজুড়ে তীব্র ব্যথা।

* শরীরের অন্য অংশে ব্যথা- মনে হতে পারে, ব্যথা শরীরে এক অংশ থেকে অন্য অংশে চলে যাচ্ছে যেমন- বুক থেকে হাতে ব্যথা অনুভব করা। সাধারণত বাম হাতে ব্যথা হয় কিন্তু দু’হাতেই ব্যথা হতে পারে।

* মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করা।

* শরীরে ঘাম হওয়া।

* বমি বমি ভাব হওয়া।

* বুক ধড়ফড় করা বা বিনা কারণে অস্থির লাগা।

* সর্দি বা কাশি হওয়া।

বেশির ভাগ সময় বুকে ব্যথা খুবই তীব্র হয় ফলে শরীরের অন্য অংশে ব্যথা অনেকেই টের পান না।

ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা বলছে, হৃদরোগের প্রথমিক উপসর্গ খেয়াল না করলে তার ফলে কেবল মৃত্যু নয়- বেঁচে থাকলেও অনেক জটিলতা নিয়ে বাঁচতে হয়।

সব সময় মেডিকেল তথ্যসংবলিত প্রয়োজনীয় তালিকা সঙ্গে রাখুন

এটি সঙ্গে থাকলে যে কোনো জরুরি বিভাগে খুব ভালো কাজ দেবে। আমেরিকার বার্মিংহামের অ্যালবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের পরিচালক ডা. জেরাল্ড পস্ট আপনার চিকিৎসককে জানানোর জন্য আপনার চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করে আপনার মানিব্যাগে সব সময় রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে চিন্তা করার সময় কিন্তু এখনই। স্মরণ রাখবেন, আপনার হার্ট অ্যাটকের পরে প্রতিটি সেকেন্ড আপনার বাঁচার সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করতে থাকে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল