ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাস
jugantor
ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাস

  ডা. মো. ফারুক হোসেন  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়াবহ মহামারী সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। কারণ এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস, যা এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়- এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর যারা সুস্থ হয়েছেন, তারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

করোনাভাইরাস ছাড়াও এমন কিছু ভাইরাস আছে, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে। এসব ভাইরাস স্বাভাবিক কোষকে ক্যান্সার কোষে পরিবর্তন করতে সক্ষম। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮ ওরোফ্যারিনজিয়াল (গলা) ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬-কে মুখের ক্যান্সারের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুখের ক্যান্সার প্রধানত টনসিল, জিহ্বা ও ওরোফ্যারিংসে হয়ে থাকে।

মুখের স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস (HPV) একটি বড় ঝুঁকি। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাসের কারণে শুধু মুখের ক্যান্সার নয় বরং সারভাইক্যাল ক্যান্সারও হতে পারে। সারভাইক্যাল ক্যান্সার আরম্ভ হয় মহিলাদের সার্ভিক্স-এর কোষের মধ্যে অর্থাৎ ইউটেরাসের নিচের অংশ, যা সংযুক্ত হয় স্ত্রী যৌনাঙ্গের সঙ্গে। প্রাথমিক অবস্থায় সারভাইক্যাল ক্যান্সার ধরা পড়লে ক্যান্সার ভালো করা সম্ভব। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮ শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে সারভাইক্যাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী। এছাড়া হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস দ্বারা পায়ুপথ, পুরুষ ও স্ত্রী যৌনাঙ্গ এবং ওরোফ্যারিংসের ক্যান্সার হতে পারে। আশার কথা হল, হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাসের বিরুদ্ধে গার্ডাসিল এবং সার্ভারিক্সনামক টিকা প্রদান করা যায়। সার্ভারিক্স টিকা দেয়া হয় হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮-এর সংক্রমণের বিরুদ্ধে, যা শতকরা ৭০ ভাগ সারভাইক্যাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী। টিকা নিতে হবে যে কোনো মানুষের যৌনজীবন শুরু করার আগে। প্রায় ৪০ ধরনের হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস যৌনমিলনের সময় সংক্রমিত হতে পারে। যৌনমিলনের সময় সংক্রমিত ভাইরাস মুখে জেনিটাল ওয়ার্টস বা গোটা সৃষ্টি করে থাকে। তাই হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে হলে বিকৃত যৌনাচার থেকে দূরে থাকুন। পশ্চিমা সংস্কৃতির ওরাল সেক্স পরিহার করুন। মুখে কোনো গোটা বা অস্বাভাবিক পিণ্ড দেখা গেলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে লিভার ক্যান্সার হতে পারে। এপস্টেনবার ভাইরাসের কারণে বারকিট্স লিম্ফোমা হতে পারে। বারকিট্স লিম্ফোমা এক ধরনের নন হজকিন্স লিম্ফোমা, যেখানে ক্যান্সার শুরু হয় ইমিউন-বি সেল থেকে। বারকিট্স লিম্ফোমা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অকার্যকর করে ফেলে। এপস্টেনবার ভাইরাসের কারণে এপিথেলিয়াল ম্যালিগন্যান্সি অর্থাৎ ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। আপনার শরীরে এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমিত হলে আপনার ক্যাপোসিস সারকোমানামক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এইচআইভি ভাইরাস শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলে। যেহেতু রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল থাকে তাই হিউম্যান হারপিস ভাইরাস-৮ দ্রুত বংশ বিস্তার করে। এ হিউম্যান হারপিস ভাইরাস-৮ ক্যাপোসিস সারকোমানামক ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে।

এ ক্যান্সারের মাধ্যমে এইডস রোগী শনাক্ত করা যায়। ভাইরাস কখনই খালি চোখে দেখা যায় না। আমরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কিছু নিয়মকানুন পালন করলে অবশ্যই কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে আমরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখি। শুধু করোনাভাইরাস নয় বরং সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলে হেপাটাইটিস ভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক : মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]

ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাস

 ডা. মো. ফারুক হোসেন 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়াবহ মহামারী সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। কারণ এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস, যা এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়- এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর যারা সুস্থ হয়েছেন, তারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

করোনাভাইরাস ছাড়াও এমন কিছু ভাইরাস আছে, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে। এসব ভাইরাস স্বাভাবিক কোষকে ক্যান্সার কোষে পরিবর্তন করতে সক্ষম। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮ ওরোফ্যারিনজিয়াল (গলা) ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬-কে মুখের ক্যান্সারের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুখের ক্যান্সার প্রধানত টনসিল, জিহ্বা ও ওরোফ্যারিংসে হয়ে থাকে।

মুখের স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস (HPV) একটি বড় ঝুঁকি। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাসের কারণে শুধু মুখের ক্যান্সার নয় বরং সারভাইক্যাল ক্যান্সারও হতে পারে। সারভাইক্যাল ক্যান্সার আরম্ভ হয় মহিলাদের সার্ভিক্স-এর কোষের মধ্যে অর্থাৎ ইউটেরাসের নিচের অংশ, যা সংযুক্ত হয় স্ত্রী যৌনাঙ্গের সঙ্গে। প্রাথমিক অবস্থায় সারভাইক্যাল ক্যান্সার ধরা পড়লে ক্যান্সার ভালো করা সম্ভব। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮ শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে সারভাইক্যাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী। এছাড়া হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস দ্বারা পায়ুপথ, পুরুষ ও স্ত্রী যৌনাঙ্গ এবং ওরোফ্যারিংসের ক্যান্সার হতে পারে। আশার কথা হল, হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাসের বিরুদ্ধে গার্ডাসিল এবং সার্ভারিক্সনামক টিকা প্রদান করা যায়। সার্ভারিক্স টিকা দেয়া হয় হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮-এর সংক্রমণের বিরুদ্ধে, যা শতকরা ৭০ ভাগ সারভাইক্যাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী। টিকা নিতে হবে যে কোনো মানুষের যৌনজীবন শুরু করার আগে। প্রায় ৪০ ধরনের হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস যৌনমিলনের সময় সংক্রমিত হতে পারে। যৌনমিলনের সময় সংক্রমিত ভাইরাস মুখে জেনিটাল ওয়ার্টস বা গোটা সৃষ্টি করে থাকে। তাই হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে হলে বিকৃত যৌনাচার থেকে দূরে থাকুন। পশ্চিমা সংস্কৃতির ওরাল সেক্স পরিহার করুন। মুখে কোনো গোটা বা অস্বাভাবিক পিণ্ড দেখা গেলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে লিভার ক্যান্সার হতে পারে। এপস্টেনবার ভাইরাসের কারণে বারকিট্স লিম্ফোমা হতে পারে। বারকিট্স লিম্ফোমা এক ধরনের নন হজকিন্স লিম্ফোমা, যেখানে ক্যান্সার শুরু হয় ইমিউন-বি সেল থেকে। বারকিট্স লিম্ফোমা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অকার্যকর করে ফেলে। এপস্টেনবার ভাইরাসের কারণে এপিথেলিয়াল ম্যালিগন্যান্সি অর্থাৎ ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। আপনার শরীরে এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমিত হলে আপনার ক্যাপোসিস সারকোমানামক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এইচআইভি ভাইরাস শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলে। যেহেতু রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল থাকে তাই হিউম্যান হারপিস ভাইরাস-৮ দ্রুত বংশ বিস্তার করে। এ হিউম্যান হারপিস ভাইরাস-৮ ক্যাপোসিস সারকোমানামক ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে।

এ ক্যান্সারের মাধ্যমে এইডস রোগী শনাক্ত করা যায়। ভাইরাস কখনই খালি চোখে দেখা যায় না। আমরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কিছু নিয়মকানুন পালন করলে অবশ্যই কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে আমরা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখি। শুধু করোনাভাইরাস নয় বরং সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলে হেপাটাইটিস ভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক : মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]