করোনার দ্বিতীয় ঢেউ : আমাদের করণীয়
jugantor
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ : আমাদের করণীয়

  ডা. শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন, মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান, ডা. সাবাহ হক  

০৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে করোনার ‘প্রথম ঢেউ’ শেষ না হলেও এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। আসন্ন শীতে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামনের দিনগুলোতে করোনা মোকাবেলায় জোরালো প্রস্তুতি নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইউরোপে নতুন করে তিন লক্ষাধিক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়- এ সংখ্যাটি মার্চে সংক্রমণের সংখ্যা থেকেও বেশি।

বিগত সপ্তাহগুলোতে ইউরোপের অনেক দেশে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ড এবং পোল্যান্ডে সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে।

ইউরোপের কিছু দেশ যেমন- আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিক, মন্টিনিগ্রো, নর্থ ম্যাসেডোনিয়ায় প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে বিগত দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। কানাডার কিছু প্রদেশেও মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। দেশটির কুইবেক প্রদেশের পরিস্থিতি খুবই জটিল- প্রদেশটির কিছু এলাকাকে রেড এলার্টে উন্নীত করা হয়েছে। অপরপক্ষে সংক্রমণের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে এখনও প্রথম ঢেউ চলমান।

যথাযথভাবে সাবধানতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহার কারণেই বিভিন্ন দেশে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনের জন্য করোনায় মৃত্যুহার অনেক কমে এসেছে সত্যি, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অতীতের ভয়াবহতার দিকে চলে যেতে পারে।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রোধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আক্রান্ত দেশগুলো। স্পেনের মাদ্রিদে আবারও লকডাউন দেয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে অধিক আক্রান্ত তিন শহরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ নিষেধ করা হয়েছে। কানাডার কুইবেক প্রদেশে ২৮ দিনের জন্য রেস্তোরাঁ, সিনেমা, থিয়েটার, জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উত্তর-পূর্ব যুক্তরাজ্যসহ আরও কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের এ কঠিন সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ- তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে সংক্রমণ স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসতে পারে।

করোনাভাইরাসের ‘প্রথম ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণে সফল দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ কোরিয়াতে জুলাই-আগস্ট মাসে নতুন করে সংক্রমণ দেখা যায়, তবে দেশ দুটি আবার কিছু বিধি-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত

প্রয়োজনের তুলনায় টেস্টের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে করোনার প্রথম ঢেউ মিলিয়ে যায়নি। প্রথম ঢেউটি তখনই সমাপ্ত হয়েছে বলা যাবে যখন ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাংলাদেশে টানা দুই সপ্তাহ দৈনিক নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে ধরে নেয়া যেত যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অথচ বাংলাদেশের শনাক্তের হার এখনও ১১-১২ শতাংশ। কাজেই ধরে নেয়া যায়, বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রথম ঢেউটিই এখনও ওঠা-নামা করছে।

আসন্ন শীতে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় করোনাভাইরাস বাতাসে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারে, তাই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাপমাত্রার সঙ্গে সরাসরি করোনা সংক্রমণের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত না হলেও, বিশ্বে শীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রবণতা বেড়েছিল।

শীতের সময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। বদ্ধ পরিবেশে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। বাংলাদেশে শীতের সময় দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এ কারণে শীতের সময় অ্যাজমা ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য করোনা অনেক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ১৫তম। অথচ প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার কত শতাংশকে টেস্ট করা হচ্ছে সেই সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ১৫৮তম। প্রতিবেশী দেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় আমরা এদিক থেকে অনেক পিছিয়ে।

মহামারীর গতি ও প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বেশি সংখ্যক টেস্ট এবং ট্রেসিং করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে টেস্ট হচ্ছে মাত্র ১১৭১৬ জনের (সেপ্টেম্বর ২৯)- যা একেবারেই নগণ্য। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দৈনিক করা টেস্টের ১১-১২ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া গেছে। এ উচ্চ সংক্রমণ হার প্রমাণ করে, আমরা পর্যাপ্ত পরিণাম টেস্ট করছি না, ফলে অনেক আক্রান্ত রোগীই টেস্টের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। টেস্টের আওতার বাইরে থাকা এসব আক্রান্ত ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরার কারণে আশপাশের আরও বহু মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে।

যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পজিটিভিটি রেট ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে সরকারি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, কিন্তু সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আপাতদৃষ্টিতে ক্রমহ্রাসমান সংক্রমণ আশা জাগালেও এর পেছনের কারণগুলো পর্যালোচনা করলে একটি আশঙ্কার ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা উদ্বিগ্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শুরু থেকেই ঢাকার বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোতে টেস্টিং ফ্যাসিলিটি নগণ্য। সঙ্গে রয়েছে টেস্টের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার লাইন- সেখানে সুস্থ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন প্রবল তার সঙ্গে রয়েছে টেস্টের ফলাফল দেয়ার ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত বিলম্ব। এটি জনগণকে টেস্টের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সংক্রমণের প্রাথমিক দিনগুলোর চেয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে টেস্ট করার ক্ষেত্রে আরও অনেক অন্তরায় তৈরি হয়েছে। টেস্টের ক্ষেত্রে ফি নেয়া এর মধ্যে একটি বড় অন্তরায়। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি ঋণাত্মক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ নাগরিককে টেস্ট করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের করণীয়

মহামারীর শুরুর দিনগুলো থেকেই আমাদের সমন্বয়ের অভাব ছিল, পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় মিলের চেয়ে অমিলই বেশি দেখা গেছে। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- কোথায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে আগামীদিনগুলোর জন্য বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।

অযথা কালক্ষেপণ না করে আমাদের উচিত অতি দ্রুত রেপিড এন্টিজেন টেস্টিং শুরু করা এবং করোনা টেস্টের সব অন্তরায় দূর করা। এন্টিজেন টেস্টিং যেমন টেস্টের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা কমাবে, পাশাপাশি অধিক সংখ্যক মানুষকে টেস্টিংয়ের আওতায় নিয়ে আসবে। ফলশ্রুতিতে সংক্রমিত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পৃথকীকরণ সহজতর হবে। করোনার লাগাম টানতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমিতদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে।

করোনা মহামারীর বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। করোনার নিয়ন্ত্রণে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র জানা অত্যন্ত জরুরি। সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য এন্টিবডি টেস্ট করতে হবে। পাশাপাশি সংক্রমণের প্রকৃতি বুঝতে আরও তিনটি সূচক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে- ১. নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার (টেস্ট পসিটিভিটি রেট), ২. হাসপাতালে ভর্তির হার (হসপিটালাইজেশন রেট) এবং ৩. দৈনিক মৃত্যু হার। তবে কেবল জাতীয় পর্যায়ে নয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও এ সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বিভিন্ন জেলায় করোনা সংক্রমণের মাত্রা ভিন্ন হওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে করোনা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা (ট্রেসিং) এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো কাজ করতে হলে অনেক স্বেচ্ছাসেবী দরকার। এক্ষেত্রে হেলথ ইন্সপেক্টর এবং ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কর্মীদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে। কিন্তু বিভিন্ন অফিস-আদালত, গণপরিবহন এবং তৃণমূল পর্যায়ে এ স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানা হচ্ছে তা নির্ধারণে কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি এবং গাইডলাইনের যথার্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কেট ও শপিংমলসহ জনবহুল জায়গশুগুলোতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।

সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখতে হবে। শীতকালে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেলে তা মোকাবিলা করার জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা এবং আইসিইউ-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা উচিত যাতে তারা কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই রোগীদের চাপ সামলাতে পারেন। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর জন্য জনগণকে টেলিহেলথ সেবার প্রতি উৎসাহিত করতে হবে।

দেশে কোভিড শনাক্তের সংখ্যা কমার কারণে অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা দেখা দিয়েছে। আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। কাজেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই, বরং আশঙ্কায় বিচলিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আজকের সতর্কতা এবং পূর্বপরিকল্পনাই আগামীতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কী

বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সংক্রমণ আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পারে- এ বিষয়টিকেই বলা হয় মহামারীর ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা ‘দ্বিতীয় ঢেউ’।

সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউয়ের কোনো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই। জনস্বাস্থ্যবিদরা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি সহজভাবে বোঝানোর জন্য সংক্রমণকে সামুদ্রিক ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে- এ ওঠানামা বা বাড়া-কমার প্রত্যেকটি ধাপকে বলা হয় ঢেউ বা ওয়েভ। ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের পর সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে কমে এলে প্রথম ঢেউয়ের সমাপ্তি ঘটে। এর পর হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সূচনা ঘটে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারী ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুয়ের দ্বিতীয় ঢেউ ছিল প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। মাত্র তিন মাস স্থায়ী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃত্যুবরণ করে অসংখ্য মানুষ। কেবল ভারতবর্ষেই মৃত্যুবরণ করে ১২-২০ মিলিয়ন মানুষ।

প্রসঙ্গ ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল- একটি নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও কথা সত্য, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে তা ধনী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন কূটনীতি আরও জোরদার করতে হবে। কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য সব উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ ও ভ্যাকসিন সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি, ভ্যাকসিন প্রাপ্তির আগেই বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কৌশল (ভ্যাকসিন ডিপ্লয়মেন্ট প্ল্যান) চূড়ান্ত করতে হবে। প্রথম দিকে খুব সীমিত আকারে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে; এ কারণে কাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সে বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। পাশাপাশি, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ (‘কোল্ড চেইন’ কাঠামো) ও পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত কঠোর সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। করোনার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে আমাদের সামাজিক আচরণের ওপর নির্ভর করে- এ কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রাষ্ট্রের যেমন উচিত স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের যথার্থ প্রয়োগ ও অনুশীলন নিশ্চিত করা, পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াও অপরিহার্য। আমাদের দেশের মফস্বলগুলোতে এখনও করোনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি হয়নি বরং অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই মহামারীর মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকার জন্য এটিকে অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছেন। এতে করে কেবল আমাদের দেশে সংক্রমণ বাড়ছে শুধু তাই নয় বরং সংক্রমণের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসক, ধর্মীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

লেখক : ডা. শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র পলিসি বিশ্লেষক, আলবার্টা মিনিস্ট্রি অফ হেলথ, কানাডা

মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান : পিএইচডি গবেষক (যন্ত্রকৌশল বিভাগ), ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা, কানাডা

ডা. সাবাহ হক : পিএইচডি গবেষক (চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ), ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি, অন্টারিও, কানাডা

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ : আমাদের করণীয়

 ডা. শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন, মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান, ডা. সাবাহ হক 
০৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে করোনার ‘প্রথম ঢেউ’ শেষ না হলেও এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। আসন্ন শীতে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামনের দিনগুলোতে করোনা মোকাবেলায় জোরালো প্রস্তুতি নেয়া অত্যন্ত জরুরি। 

বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইউরোপে নতুন করে তিন লক্ষাধিক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়- এ সংখ্যাটি মার্চে সংক্রমণের সংখ্যা থেকেও বেশি।

বিগত সপ্তাহগুলোতে ইউরোপের অনেক দেশে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ড এবং পোল্যান্ডে সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে।

ইউরোপের কিছু দেশ যেমন- আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিক, মন্টিনিগ্রো, নর্থ ম্যাসেডোনিয়ায় প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে বিগত দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। কানাডার কিছু প্রদেশেও মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। দেশটির কুইবেক প্রদেশের পরিস্থিতি খুবই জটিল- প্রদেশটির কিছু এলাকাকে রেড এলার্টে উন্নীত করা হয়েছে। অপরপক্ষে সংক্রমণের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে এখনও প্রথম ঢেউ চলমান।

যথাযথভাবে সাবধানতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহার কারণেই বিভিন্ন দেশে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনের জন্য করোনায় মৃত্যুহার অনেক কমে এসেছে সত্যি, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অতীতের ভয়াবহতার দিকে চলে যেতে পারে।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রোধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আক্রান্ত দেশগুলো। স্পেনের মাদ্রিদে আবারও লকডাউন দেয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে অধিক আক্রান্ত তিন শহরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ নিষেধ করা হয়েছে। কানাডার কুইবেক প্রদেশে ২৮ দিনের জন্য রেস্তোরাঁ, সিনেমা, থিয়েটার, জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উত্তর-পূর্ব যুক্তরাজ্যসহ আরও কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের এ কঠিন সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ- তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে সংক্রমণ স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসতে পারে।

করোনাভাইরাসের ‘প্রথম ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণে সফল দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ কোরিয়াতে জুলাই-আগস্ট মাসে নতুন করে সংক্রমণ দেখা যায়, তবে দেশ দুটি আবার কিছু বিধি-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত

প্রয়োজনের তুলনায় টেস্টের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে করোনার প্রথম ঢেউ মিলিয়ে যায়নি। প্রথম ঢেউটি তখনই সমাপ্ত হয়েছে বলা যাবে যখন ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাংলাদেশে টানা দুই সপ্তাহ দৈনিক নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে ধরে নেয়া যেত যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অথচ বাংলাদেশের শনাক্তের হার এখনও ১১-১২ শতাংশ। কাজেই ধরে নেয়া যায়, বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রথম ঢেউটিই এখনও ওঠা-নামা করছে।

আসন্ন শীতে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় করোনাভাইরাস বাতাসে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারে, তাই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাপমাত্রার সঙ্গে সরাসরি করোনা সংক্রমণের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত না হলেও, বিশ্বে শীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রবণতা বেড়েছিল।

শীতের সময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। বদ্ধ পরিবেশে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। বাংলাদেশে শীতের সময় দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এ কারণে শীতের সময় অ্যাজমা ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য করোনা অনেক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ১৫তম। অথচ প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার কত শতাংশকে টেস্ট করা হচ্ছে সেই সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ১৫৮তম। প্রতিবেশী দেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় আমরা এদিক থেকে অনেক পিছিয়ে।

মহামারীর গতি ও প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বেশি সংখ্যক টেস্ট এবং ট্রেসিং করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে টেস্ট হচ্ছে মাত্র ১১৭১৬ জনের (সেপ্টেম্বর ২৯)- যা একেবারেই নগণ্য। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দৈনিক করা টেস্টের ১১-১২ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া গেছে। এ উচ্চ সংক্রমণ হার প্রমাণ করে, আমরা পর্যাপ্ত পরিণাম টেস্ট করছি না, ফলে অনেক আক্রান্ত রোগীই টেস্টের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। টেস্টের আওতার বাইরে থাকা এসব আক্রান্ত ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরার কারণে আশপাশের আরও বহু মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে।

যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পজিটিভিটি রেট ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে সরকারি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, কিন্তু সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আপাতদৃষ্টিতে ক্রমহ্রাসমান সংক্রমণ আশা জাগালেও এর পেছনের কারণগুলো পর্যালোচনা করলে একটি আশঙ্কার ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা উদ্বিগ্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শুরু থেকেই ঢাকার বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোতে টেস্টিং ফ্যাসিলিটি নগণ্য। সঙ্গে রয়েছে টেস্টের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার লাইন- সেখানে সুস্থ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন প্রবল তার সঙ্গে রয়েছে টেস্টের ফলাফল দেয়ার ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত বিলম্ব। এটি জনগণকে টেস্টের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সংক্রমণের প্রাথমিক দিনগুলোর চেয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে টেস্ট করার ক্ষেত্রে আরও অনেক অন্তরায় তৈরি হয়েছে। টেস্টের ক্ষেত্রে ফি নেয়া এর মধ্যে একটি বড় অন্তরায়। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি ঋণাত্মক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ নাগরিককে টেস্ট করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের করণীয়

মহামারীর শুরুর দিনগুলো থেকেই আমাদের সমন্বয়ের অভাব ছিল, পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় মিলের চেয়ে অমিলই বেশি দেখা গেছে। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- কোথায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে আগামীদিনগুলোর জন্য বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।

অযথা কালক্ষেপণ না করে আমাদের উচিত অতি দ্রুত রেপিড এন্টিজেন টেস্টিং শুরু করা এবং করোনা টেস্টের সব অন্তরায় দূর করা। এন্টিজেন টেস্টিং যেমন টেস্টের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা কমাবে, পাশাপাশি অধিক সংখ্যক মানুষকে টেস্টিংয়ের আওতায় নিয়ে আসবে। ফলশ্রুতিতে সংক্রমিত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পৃথকীকরণ সহজতর হবে। করোনার লাগাম টানতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমিতদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে।

করোনা মহামারীর বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। করোনার নিয়ন্ত্রণে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র জানা অত্যন্ত জরুরি। সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য এন্টিবডি টেস্ট করতে হবে। পাশাপাশি সংক্রমণের প্রকৃতি বুঝতে আরও তিনটি সূচক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে- ১. নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার (টেস্ট পসিটিভিটি রেট), ২. হাসপাতালে ভর্তির হার (হসপিটালাইজেশন রেট) এবং ৩. দৈনিক মৃত্যু হার। তবে কেবল জাতীয় পর্যায়ে নয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও এ সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বিভিন্ন জেলায় করোনা সংক্রমণের মাত্রা ভিন্ন হওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে করোনা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা (ট্রেসিং) এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো কাজ করতে হলে অনেক স্বেচ্ছাসেবী দরকার। এক্ষেত্রে হেলথ ইন্সপেক্টর এবং ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কর্মীদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে। কিন্তু বিভিন্ন অফিস-আদালত, গণপরিবহন এবং তৃণমূল পর্যায়ে এ স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানা হচ্ছে তা নির্ধারণে কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি এবং গাইডলাইনের যথার্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কেট ও শপিংমলসহ জনবহুল জায়গশুগুলোতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।

সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখতে হবে। শীতকালে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেলে তা মোকাবিলা করার জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা এবং আইসিইউ-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা উচিত যাতে তারা কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই রোগীদের চাপ সামলাতে পারেন। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর জন্য জনগণকে টেলিহেলথ সেবার প্রতি উৎসাহিত করতে হবে।

দেশে কোভিড শনাক্তের সংখ্যা কমার কারণে অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা দেখা দিয়েছে। আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। কাজেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই, বরং আশঙ্কায় বিচলিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আজকের সতর্কতা এবং পূর্বপরিকল্পনাই আগামীতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কী

বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সংক্রমণ আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পারে- এ বিষয়টিকেই বলা হয় মহামারীর ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা ‘দ্বিতীয় ঢেউ’।

সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউয়ের কোনো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই। জনস্বাস্থ্যবিদরা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি সহজভাবে বোঝানোর জন্য সংক্রমণকে সামুদ্রিক ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে- এ ওঠানামা বা বাড়া-কমার প্রত্যেকটি ধাপকে বলা হয় ঢেউ বা ওয়েভ। ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের পর সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে কমে এলে প্রথম ঢেউয়ের সমাপ্তি ঘটে। এর পর হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সূচনা ঘটে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারী ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুয়ের দ্বিতীয় ঢেউ ছিল প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। মাত্র তিন মাস স্থায়ী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃত্যুবরণ করে অসংখ্য মানুষ। কেবল ভারতবর্ষেই মৃত্যুবরণ করে ১২-২০ মিলিয়ন মানুষ।

প্রসঙ্গ ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল- একটি নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও কথা সত্য, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে তা ধনী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন কূটনীতি আরও জোরদার করতে হবে। কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য সব উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ ও ভ্যাকসিন সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি, ভ্যাকসিন প্রাপ্তির আগেই বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কৌশল (ভ্যাকসিন ডিপ্লয়মেন্ট প্ল্যান) চূড়ান্ত করতে হবে। প্রথম দিকে খুব সীমিত আকারে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে; এ কারণে কাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সে বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। পাশাপাশি, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ (‘কোল্ড চেইন’ কাঠামো) ও পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত কঠোর সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। করোনার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে আমাদের সামাজিক আচরণের ওপর নির্ভর করে- এ কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রাষ্ট্রের যেমন উচিত স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের যথার্থ প্রয়োগ ও অনুশীলন নিশ্চিত করা, পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াও অপরিহার্য। আমাদের দেশের মফস্বলগুলোতে এখনও করোনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি হয়নি বরং অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই মহামারীর মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকার জন্য এটিকে অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছেন। এতে করে কেবল আমাদের দেশে সংক্রমণ বাড়ছে শুধু তাই নয় বরং সংক্রমণের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসক, ধর্মীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

লেখক : ডা. শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র পলিসি বিশ্লেষক, আলবার্টা মিনিস্ট্রি অফ হেলথ, কানাডা

মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান : পিএইচডি গবেষক (যন্ত্রকৌশল বিভাগ), ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা, কানাডা

ডা. সাবাহ হক : পিএইচডি গবেষক (চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ), ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি, অন্টারিও, কানাডা