করোনার টিকা কীভাবে পাওয়া যাবে
jugantor
করোনার টিকা কীভাবে পাওয়া যাবে

  অধ্যাপক ডা. সাইফুদ্দিন একরাম  

২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও ভারত, চীন এবং রাশিয়ার টিকা কতটা এবং কত দিনের জন্য কার্যকরী? করোনাভাইরাসের মিউটেশন ঘটলে কি এসব টিকা কার্যকরী থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই সরাসরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না-

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে দ্রুত টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু গরিব দেশগুলোর অবস্থা ঠিক কি হবে, বোঝা যাচ্ছে না। মধ্যম আয়ের দেশগুলোও টিকা দেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু কত দিনে তা সবার কাছে পৌঁছাবে বলা যাচ্ছে না।

ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম যে দুটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে, তা হলো ফাইজার/ বায়োন্টেক এবং মডার্নার। এ দুটির কোনোটিই নিম্নআয়ের দেশের জন্য উপযুক্ত নয়। ফাইজার/ বায়োন্টেকের টিকা -৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে এবং এর জন্য অবকাঠামো এবং পরিবহণের বাড়তি খরচ রয়েছে। ফলে গড়পড়তা এক ডোজ টিকা দিতে কমপক্ষে ২০ ডলার বা সাড়ে ১৪ পাউন্ড খরচ হবে। মডার্নার টিকা সাধারণ ফ্রিজে একমাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু এর খরচ আরও বেশি। নিম্নএবং মধ্যম আয়ের দেশগুলো এজন্য এদুটি টিকা কেনার খুব একটা চেষ্টা করেছে না।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কবে নাগাদ টিকার সরবরাহ পাওয়া যাবে? এ পর্যন্ত বেশিরভাগ টিকাই উন্নত দেশগুলো কিনে নিয়েছে। ফাইজার/ বায়োন্টেক আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের জন্য মাত্র পাঁচ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। সেটিও দেওয়া হবে ২০২১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। মডার্না এ বছর আফ্রিকার জন্য কোনো টিকা দিতে পারবে না। এজন্য অনেকেই আশংকা করছেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই কোভিড-১৯ টিকা পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

কোভ্যাকস (COVAX) কি পারবে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর গরিব দেশগুলোকে কোভিড-১৯ টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের নাম কোভ্যাকস (COVAX)। এর জন্য ২০২০ সালে আড়াই বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। কোভ্যাকস-এর সাহায্যে নিম্নএবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি ব্যবহারের জন্য ফাইজার/ বায়োন্টেকের টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এটি কোভ্যাকস উদ্যোগের মাধ্যমে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকা কম দামে একটি টিকা তৈরি করেছে। এটি সহজে সংরক্ষণ করা যাবে এবং ব্যাপক সংখ্যায় উৎপাদনও করা যাবে। এই টিকাও কোভ্যাকস উদ্যোগের মাধ্যমে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে। এটি এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, জানুয়ারির শেষ নাগাদ টিকা সরবরাহ শুরু করবে। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ সারা বিশ্বে ২০০ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা যদি সময়মতো পূরণ হয়ও, তার পরেও বিশ্বের চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কোভ্যাকস যে পরিমাণ টিকা সরবরাহ করতে পারবে তা দিয়ে হয়তো শুধু ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে; কিন্তু ক্রমবর্ধমান মহামারিতে আক্রান্ত আফ্রিকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য তা যথেষ্ট হবে না।’ এখন পর্যন্ত আফ্রিকার জন্য কোভ্যাকস যে পরিমাণ টিকা সরবরাহ করার অঙ্গীকার করেছে তা বড়জোর ৩০ কোটি মানুষকে বা মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগকে দেওয়া যাবে।

ভারত, চীন এবং রাশিয়া কি পারবে

উন্নত দেশগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য অপেক্ষা করতে চায়নি। তারা সরাসরি টিকা উৎপাদকদের সঙ্গে ডিল করে অধিকাংশ ভ্যাকসিন কিনে নেওয়ার চুক্তি করেছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশ; যেমন- আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ইত্যাদি। তারা মূলত ভারত, চীন কিংবা রাশিয়া থেকে ভ্যাকসিন কেনার ব্যবস্থা করছে। এ মুহূর্তে সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা প্রস্তুত করার লাইসেন্স পেয়েছে। অন্যদিকে ভারত বায়োটেক নিজেই একটি টিকা তৈরি করছে। এ বছর ভারত সরকার জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে দুটি টিকারই জরুরি অনুমোদন দিয়েছে এবং জানুয়ারির ১৬ তারিখ থেকে ভারতে টিকাদান শুরু হয়েছে।

ভারত অন্য কয়েকটি দেশের জন্যও টিকা তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার তিন কোটি ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা জানুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ ১০ লাখ এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ লাখ টিকা সংগ্রহ করবে। আফ্রিকাকে তিনটি প্রতিষ্ঠান টিকা সরবরাহ করবে। এদের মধ্যেও সেরাম ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেখানে তারা ২৭ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এরমধ্যে ২০২১ সালের জুন মাস নাগাদ ৫ কোটি ডোজ দেওয়া হতে পারে।

কোভ্যাকস উদ্যোগের জন্যও সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা দেবে। কিন্তু অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে মাস্ক নিয়ে যে ব্যাপক কূটনীতি এবং অব্যবস্থাপনা হয়েছিল, সেটিকে অতিক্রম করার জন্য চীন নিজে আগ বাড়িয়ে কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বলেছিলেন, ‘চীনের ভ্যাকসিন হবে সারা পৃথিবীর সম্পদ’। তিনি ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোকে টিকা সংগ্রহ করার সুবিধার্থে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন।

কিন্তু তার প্রস্তাব সবক্ষেত্রে সফল হয়নি। ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সাল পর্যন্ত চীনের রাষ্ট্রীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সাইনোফার্ম (Sinopharm) শুধু চীনের জনগণের জন্যই টিকা তৈরি করেছে। তবে ২০২১ সালে তাদের ১০০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করার পরিকল্পনা রয়েছে। চীন থেকে আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কো টিকা সংগ্রহ করছে।

মিশর ১ কোটি ডোজ এবং পাকিস্তান ১২ লাখ ডোজ টিকা নেবে। তুরস্ক এবং ইন্দোনেশিয়া আরেকটি চীনা ভ্যাকসিন দিয়ে টিকাদান শুরু করেছে। সেটির নাম করোনাভ্যাক। থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনও একই ভ্যাকসিন ব্যবহার করছে। এছাড়া ব্রাজিল সাড়ে চার কোটি ডোজ করোনাভ্যাক ভ্যাকসিন নিচ্ছে।

পৃথিবীতে প্রথম করোনার টিকা তৈরি করেছে রাশিয়া। তারাও ভ্যাকসিন কূটনীতিতে সক্রিয়। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিন সরকারি অনুমোদন পেয়েছে। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকে আর্জেন্টিনা স্পুটনিক-৫ নেওয়া শুরু করেছে। আফ্রিকার সাব-সাহারার দেশ গিনিতে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।

এটি তৈরি করার জন্য হেটেরো ড্রাগস এবং অন্য একটি ভারতীয় সংস্থা কাজ করছে। এছাড়া তুরস্কেও এটি উৎপাদন করা হবে। ব্রাজিলের একটি রাজ্য ‘বাহিয়া’ স্পুটনিক-৫ এর ট্রায়াল করছে; বিনিময়ে তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫ কোটি ডোজ টিকা পাবে।

কবে নাগাদ পৃথিবীর সবাই টিকা পাবে

ধীরে ধীরে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে করোনার টিকা প্রোগ্রাম বিস্তৃত হচ্ছে; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্রয় নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। এর ফলে অনেকে হয়তো আশ্বস্ত বোধ করছেন; কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছাড়া টিকার ব্যাপারে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে।

সবার মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- করোনার মহামারি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও ভারত, চীন এবং রাশিয়ার টিকা কতটা এবং কতদিনের জন্য কার্যকরী? তাছাড়া করোনাভাইরাসের মিউটেশন ঘটলে কি এসব টিকা কার্যকরী থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই সরাসরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শুধু মধ্যম আয়ের দেশ নয়, নিম্নআয়ের দেশগুলোতেও ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুতরাং এটি খুবই পরিষ্কার যে, দুনিয়ার সামনে সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা এখন একটি বিশাল সমস্যা। উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষমতা থাকার ফলে ভারত ২০২১ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে ৩০ কোটি জনগণকে টিকা দিতে পারবে বলে আশা করছে।

অর্থাৎ ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ টিকা পাবে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য অথবা অন্তত ৯০ ভাগ মানুষের জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে কমপক্ষে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। ততদিনে করোনাভাইরাসের গতিপ্রকৃতি কি হবে, তা ভবিতব্যই বলতে পারে।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (প্রাক্তন), সূত্র : রোরি হর্নার

করোনার টিকা কীভাবে পাওয়া যাবে

 অধ্যাপক ডা. সাইফুদ্দিন একরাম 
২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও ভারত, চীন এবং রাশিয়ার টিকা কতটা এবং কত দিনের জন্য  কার্যকরী? করোনাভাইরাসের মিউটেশন ঘটলে কি এসব টিকা কার্যকরী থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই সরাসরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না-

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে দ্রুত টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু গরিব দেশগুলোর অবস্থা ঠিক কি হবে, বোঝা যাচ্ছে না। মধ্যম আয়ের দেশগুলোও টিকা দেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু কত দিনে তা সবার কাছে পৌঁছাবে বলা যাচ্ছে না।

ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম যে দুটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে, তা হলো ফাইজার/ বায়োন্টেক এবং মডার্নার। এ দুটির কোনোটিই নিম্নআয়ের দেশের জন্য উপযুক্ত নয়। ফাইজার/ বায়োন্টেকের টিকা -৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে এবং এর জন্য অবকাঠামো এবং পরিবহণের বাড়তি খরচ রয়েছে। ফলে গড়পড়তা এক ডোজ টিকা দিতে কমপক্ষে ২০ ডলার বা সাড়ে ১৪ পাউন্ড খরচ হবে। মডার্নার টিকা সাধারণ ফ্রিজে একমাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু এর খরচ আরও বেশি। নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলো এজন্য এদুটি টিকা কেনার খুব একটা চেষ্টা করেছে না।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কবে নাগাদ টিকার সরবরাহ পাওয়া যাবে? এ পর্যন্ত বেশিরভাগ টিকাই উন্নত দেশগুলো কিনে নিয়েছে। ফাইজার/ বায়োন্টেক আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের জন্য মাত্র পাঁচ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। সেটিও দেওয়া হবে ২০২১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। মডার্না এ বছর আফ্রিকার জন্য কোনো টিকা দিতে পারবে না। এজন্য অনেকেই আশংকা করছেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই কোভিড-১৯ টিকা পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

কোভ্যাকস (COVAX) কি পারবে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর গরিব দেশগুলোকে কোভিড-১৯ টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের নাম কোভ্যাকস (COVAX)। এর জন্য ২০২০ সালে আড়াই বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। কোভ্যাকস-এর সাহায্যে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি ব্যবহারের জন্য ফাইজার/ বায়োন্টেকের টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এটি কোভ্যাকস উদ্যোগের মাধ্যমে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকা কম দামে একটি টিকা তৈরি করেছে। এটি সহজে সংরক্ষণ করা যাবে এবং ব্যাপক সংখ্যায় উৎপাদনও করা যাবে। এই টিকাও কোভ্যাকস উদ্যোগের মাধ্যমে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে। এটি এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, জানুয়ারির শেষ নাগাদ টিকা সরবরাহ শুরু করবে। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ সারা বিশ্বে ২০০ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা যদি সময়মতো পূরণ হয়ও, তার পরেও বিশ্বের চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কোভ্যাকস যে পরিমাণ টিকা সরবরাহ করতে পারবে তা দিয়ে হয়তো শুধু ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে; কিন্তু ক্রমবর্ধমান মহামারিতে আক্রান্ত আফ্রিকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য তা যথেষ্ট হবে না।’ এখন পর্যন্ত আফ্রিকার জন্য কোভ্যাকস যে পরিমাণ টিকা সরবরাহ করার অঙ্গীকার করেছে তা বড়জোর ৩০ কোটি মানুষকে বা মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগকে দেওয়া যাবে।

ভারত, চীন এবং রাশিয়া কি পারবে

উন্নত দেশগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য অপেক্ষা করতে চায়নি। তারা সরাসরি টিকা উৎপাদকদের সঙ্গে ডিল করে অধিকাংশ ভ্যাকসিন কিনে নেওয়ার চুক্তি করেছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশ; যেমন- আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ইত্যাদি। তারা মূলত ভারত, চীন কিংবা রাশিয়া থেকে ভ্যাকসিন কেনার ব্যবস্থা করছে। এ মুহূর্তে সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা প্রস্তুত করার লাইসেন্স পেয়েছে। অন্যদিকে ভারত বায়োটেক নিজেই একটি টিকা তৈরি করছে। এ বছর ভারত সরকার জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে দুটি টিকারই জরুরি অনুমোদন দিয়েছে এবং জানুয়ারির ১৬ তারিখ থেকে ভারতে টিকাদান শুরু হয়েছে।

ভারত অন্য কয়েকটি দেশের জন্যও টিকা তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার তিন কোটি ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা জানুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ ১০ লাখ এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ লাখ টিকা সংগ্রহ করবে। আফ্রিকাকে তিনটি প্রতিষ্ঠান টিকা সরবরাহ করবে। এদের মধ্যেও সেরাম ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেখানে তারা ২৭ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এরমধ্যে ২০২১ সালের জুন মাস নাগাদ ৫ কোটি ডোজ দেওয়া হতে পারে।

কোভ্যাকস উদ্যোগের জন্যও সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা দেবে। কিন্তু অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে মাস্ক নিয়ে যে ব্যাপক কূটনীতি এবং অব্যবস্থাপনা হয়েছিল, সেটিকে অতিক্রম করার জন্য চীন নিজে আগ বাড়িয়ে কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বলেছিলেন, ‘চীনের ভ্যাকসিন হবে সারা পৃথিবীর সম্পদ’। তিনি ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোকে টিকা সংগ্রহ করার সুবিধার্থে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন।

কিন্তু তার প্রস্তাব সবক্ষেত্রে সফল হয়নি। ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সাল পর্যন্ত চীনের রাষ্ট্রীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সাইনোফার্ম (Sinopharm) শুধু চীনের জনগণের জন্যই টিকা তৈরি করেছে। তবে ২০২১ সালে তাদের ১০০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করার পরিকল্পনা রয়েছে। চীন থেকে আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কো টিকা সংগ্রহ করছে।

মিশর ১ কোটি ডোজ এবং পাকিস্তান ১২ লাখ ডোজ টিকা নেবে। তুরস্ক এবং ইন্দোনেশিয়া আরেকটি চীনা ভ্যাকসিন দিয়ে টিকাদান শুরু করেছে। সেটির নাম করোনাভ্যাক। থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনও একই ভ্যাকসিন ব্যবহার করছে। এছাড়া ব্রাজিল সাড়ে চার কোটি ডোজ করোনাভ্যাক ভ্যাকসিন নিচ্ছে।

পৃথিবীতে প্রথম করোনার টিকা তৈরি করেছে রাশিয়া। তারাও ভ্যাকসিন কূটনীতিতে সক্রিয়। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিন সরকারি অনুমোদন পেয়েছে। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকে আর্জেন্টিনা স্পুটনিক-৫ নেওয়া শুরু করেছে। আফ্রিকার সাব-সাহারার দেশ গিনিতে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।

এটি তৈরি করার জন্য হেটেরো ড্রাগস এবং অন্য একটি ভারতীয় সংস্থা কাজ করছে। এছাড়া তুরস্কেও এটি উৎপাদন করা হবে। ব্রাজিলের একটি রাজ্য ‘বাহিয়া’ স্পুটনিক-৫ এর ট্রায়াল করছে; বিনিময়ে তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫ কোটি ডোজ টিকা পাবে।

কবে নাগাদ পৃথিবীর সবাই টিকা পাবে

ধীরে ধীরে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে করোনার টিকা প্রোগ্রাম বিস্তৃত হচ্ছে; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্রয় নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। এর ফলে অনেকে হয়তো আশ্বস্ত বোধ করছেন; কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছাড়া টিকার ব্যাপারে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে।

সবার মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- করোনার মহামারি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও ভারত, চীন এবং রাশিয়ার টিকা কতটা এবং কতদিনের জন্য কার্যকরী? তাছাড়া করোনাভাইরাসের মিউটেশন ঘটলে কি এসব টিকা কার্যকরী থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই সরাসরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শুধু মধ্যম আয়ের দেশ নয়, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুতরাং এটি খুবই পরিষ্কার যে, দুনিয়ার সামনে সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা এখন একটি বিশাল সমস্যা। উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষমতা থাকার ফলে ভারত ২০২১ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে ৩০ কোটি জনগণকে টিকা দিতে পারবে বলে আশা করছে।

অর্থাৎ ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ টিকা পাবে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য অথবা অন্তত ৯০ ভাগ মানুষের জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে কমপক্ষে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। ততদিনে করোনাভাইরাসের গতিপ্রকৃতি কি হবে, তা ভবিতব্যই বলতে পারে।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (প্রাক্তন), সূত্র : রোরি হর্নার