স্ট্রোক চিকিৎসায় যখন সার্জারি প্রয়োজন
jugantor
স্ট্রোক চিকিৎসায় যখন সার্জারি প্রয়োজন
পর্ব-৭

  ডা. আব্দুল্লাহ আল নোমান  

৩০ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেস ১ : সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এক মধ্যবয়সি মহিলা হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছলে তার সিটিস্ক্যানে দেখা যায় সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ।

মস্তিষ্কের ওপর যে তিন স্তরের পর্দা থাকে তার দ্বিতীয়টির নিচে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এটি একটি জটিল স্ট্রোক। পর দিন ক্যাথল্যাবে সিটি এনজিওগ্রাম করে রক্তনালিতে একটি এনিউরিজম বা ফোস্কা দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে রোগীদের দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়- এন্ডোভাস্কুলার কয়েলিং অথবা ক্লিপিং। রোগীর অভিভাবকরা ক্লিপিং সার্জারি বেছে নেন এবং বৃহস্পতিবার প্রায় সাত ঘণ্টার সফল অপারেশন শেষে রোগীর জ্ঞান ফেরে। মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালক সার্কল অব উইলিসের একেবারে সামনের দিকে একটি রক্তানালিতে ফোস্কাটি ছিল।

ক্রেনিয়েক্টমি (মাথার খুলি কেটে) করে মস্তিষ্কের কোনো ইনজুরি না করে এ জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার করেন ডা. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে নিবেদিত স্ট্রোক সার্জন টিম। এ ক্ষেত্রে কয়েলিং সার্জারিতে ঊরুর অংশে রক্তনালিতে ছিদ্র করে নলের সাহায্যে ফোস্কাটি পূর্ণ করে দেওয়া হয় যেন পরে এখান থেকে আর রক্তক্ষরণ না হয়। এটি অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল পদ্ধতি।

কেস-২ : একজন মধ্যবয়সি মহিলা সপ্তাহ খানেক আগে বিকালে হঠাৎ লক্ষ করেন তার ডান দিক আর নাড়াতে পারছেন না। সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথাও অনুভব করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হন সিটিস্ক্যানে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ধরা পড়ায়। সোমবার তার মস্তিষ্কের এমআরআই করলে ধরা পড়ে বাম পাশে একগুচ্ছ রক্তনালির একটি টিউমার যা আর্টারিও-ভেনাস ম্যালফর্মেশন বা এভিএম নামে পরিচিত। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এ টিউমার থাকতে পারে।

কিন্তু মস্কিষ্কের চাপ সব সময় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। এ ধরনের টিউমার বা রক্তক্ষরণের কারণে খুলির অভ্যন্তরীণ আয়তন মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে মাথাব্যথা হয়, প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে কোনো এক দিকে। এ ধরনের জটিল রক্তনালির টিউমারজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসায় এখন হাইব্রিড নিউরোসার্জারি চিকিৎসা বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি কমপ্রিহেনসিভ এপ্রোচ হিসেবেও পরিচিত।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে নিউরো ক্যাথল্যাবে কেমিক্যাল এম্বোলাইজেশন করে রক্তনালিকে বন্ধ করলে ব্লিডিং কমে আসে এবং টিউমার সংকুচিত হয়। এন্ডোভাস্কুলার এ পদ্ধতি নিরাপদ। পরপরই ক্রেনিয়েক্টমি করে খুলি সরিয়ে মস্তিষ্কের সুস্থ অংশ থেকে এ রক্তনালির টিউমারকে আলাদা করা হয়।

সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া এ অত্যাধুনিক সার্জারিতে আটজনের একটি দল ১১ ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচার শেষে রোগীর জ্ঞান ফেরায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্ট্রোকের জন্য বেশ কয়েকটি সার্জারি পদ্ধতি পৃথিবীজুড়ে স্বীকৃত- যার সবক’টি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভগে চালু রয়েছে। সরকারিভাবে নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট অ্যান্ড স্ট্রোক ইন্টারভেনশনের জন্য আলাদা ইউনিট রয়েছে। বেসরকারিভাবে ঢাকায় মুষ্টিমেয় কিছু সেন্টার থাকলেও দেশজুড়ে স্ট্রোক সেবা প্রদানের জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতি জেলায় আলাদা স্ট্রোক সেন্টার করা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : এমবিবিএস পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি, নিউরোসার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

স্ট্রোক চিকিৎসায় যখন সার্জারি প্রয়োজন

পর্ব-৭
 ডা. আব্দুল্লাহ আল নোমান 
৩০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেস ১ : সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এক মধ্যবয়সি মহিলা হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছলে তার সিটিস্ক্যানে দেখা যায় সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ।

মস্তিষ্কের ওপর যে তিন স্তরের পর্দা থাকে তার দ্বিতীয়টির নিচে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এটি একটি জটিল স্ট্রোক। পর দিন ক্যাথল্যাবে সিটি এনজিওগ্রাম করে রক্তনালিতে একটি এনিউরিজম বা ফোস্কা দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে রোগীদের দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়- এন্ডোভাস্কুলার কয়েলিং অথবা ক্লিপিং। রোগীর অভিভাবকরা ক্লিপিং সার্জারি বেছে নেন এবং বৃহস্পতিবার প্রায় সাত ঘণ্টার সফল অপারেশন শেষে রোগীর জ্ঞান ফেরে। মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালক সার্কল অব উইলিসের একেবারে সামনের দিকে একটি রক্তানালিতে ফোস্কাটি ছিল।

ক্রেনিয়েক্টমি (মাথার খুলি কেটে) করে মস্তিষ্কের কোনো ইনজুরি না করে এ জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার করেন ডা. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে নিবেদিত স্ট্রোক সার্জন টিম। এ ক্ষেত্রে কয়েলিং সার্জারিতে ঊরুর অংশে রক্তনালিতে ছিদ্র করে নলের সাহায্যে ফোস্কাটি পূর্ণ করে দেওয়া হয় যেন পরে এখান থেকে আর রক্তক্ষরণ না হয়। এটি অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল পদ্ধতি।

কেস-২ : একজন মধ্যবয়সি মহিলা সপ্তাহ খানেক আগে বিকালে হঠাৎ লক্ষ করেন তার ডান দিক আর নাড়াতে পারছেন না। সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথাও অনুভব করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি হন সিটিস্ক্যানে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ধরা পড়ায়। সোমবার তার মস্তিষ্কের এমআরআই করলে ধরা পড়ে বাম পাশে একগুচ্ছ রক্তনালির একটি টিউমার যা আর্টারিও-ভেনাস ম্যালফর্মেশন বা এভিএম নামে পরিচিত। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এ টিউমার থাকতে পারে।

কিন্তু মস্কিষ্কের চাপ সব সময় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। এ ধরনের টিউমার বা রক্তক্ষরণের কারণে খুলির অভ্যন্তরীণ আয়তন মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে মাথাব্যথা হয়, প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে কোনো এক দিকে। এ ধরনের জটিল রক্তনালির টিউমারজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসায় এখন হাইব্রিড নিউরোসার্জারি চিকিৎসা বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি কমপ্রিহেনসিভ এপ্রোচ হিসেবেও পরিচিত।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে নিউরো ক্যাথল্যাবে কেমিক্যাল এম্বোলাইজেশন করে রক্তনালিকে বন্ধ করলে ব্লিডিং কমে আসে এবং টিউমার সংকুচিত হয়। এন্ডোভাস্কুলার এ পদ্ধতি নিরাপদ। পরপরই ক্রেনিয়েক্টমি করে খুলি সরিয়ে মস্তিষ্কের সুস্থ অংশ থেকে এ রক্তনালির টিউমারকে আলাদা করা হয়।

সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া এ অত্যাধুনিক সার্জারিতে আটজনের একটি দল ১১ ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচার শেষে রোগীর জ্ঞান ফেরায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্ট্রোকের জন্য বেশ কয়েকটি সার্জারি পদ্ধতি পৃথিবীজুড়ে স্বীকৃত- যার সবক’টি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভগে চালু রয়েছে। সরকারিভাবে নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট অ্যান্ড স্ট্রোক ইন্টারভেনশনের জন্য আলাদা ইউনিট রয়েছে। বেসরকারিভাবে ঢাকায় মুষ্টিমেয় কিছু সেন্টার থাকলেও দেশজুড়ে স্ট্রোক সেবা প্রদানের জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতি জেলায় আলাদা স্ট্রোক সেন্টার করা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : এমবিবিএস পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি, নিউরোসার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন