শুরুতেই ধরা পড়লে ক্যান্সার রোগ সারানো যায়
jugantor
শুরুতেই ধরা পড়লে ক্যান্সার রোগ সারানো যায়
সম্প্রতি উদযাপিত হলো বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। দিবস মানেই গণসচেতনতা, তাই বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ডেন্টাল সাইন্স-মেডিপ্লাস-এর উদ্যোগে ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে একত্রিত হয়েছিলেন দেশের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে বদলানোর প্রত্যয়ে যার যার অবস্থান থেকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গিকার করা হয় এ বৈঠকে

  সংকলন : ডা. রোমান খাঁন  

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শরীরের কোনো ক্ষত না শুকালে গুরুত্ব দিন

ডা. মো. রকিবুল হোসেন রুমী

নগরজীবনের ব্যস্ততায় নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা আমাদের যেন ক্রমেই বাড়ছে। অসংক্রমিত রোগ যেমন- ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো রোগগুলো বেড়ে চলছে। এক সময় দেখা যেত, বয়স বাড়লে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু এখন যে কোনো বয়সে নানা জটিল রোগে আক্রান্তের ঘটনা ঘটছে। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, আর ক্যান্সারের মধ্যে মুখের ক্যান্সার অন্যতম। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সবাই যদি নিজেদের সচেতন রাখি, ক্যান্সারের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে উৎসাহিত হই, সঠিক সময়ে যথাযথ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেই, তাহলেই এর ভয়াবহতা অনেকাংশে কমবে। মুখের ক্যান্সারকে যারা পুষে রাখে, তাদের মধ্যকার বড় অংশের পরিণতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

ক্যান্সার শনাক্তের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। শরীরের যে কোনো ক্ষত না শুকালে, অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে, মূত্র বা মল ত্যাগের অস্বাভাবিকতা, স্তনের গঠনের পরিবর্তন, গিলতে অসুবিধা, ক্রমান্বয়ে ওজন হ্রাস ও ক্ষুধামন্দা, গলায় কর্কশ শব্দ, কাশি, অকারণ ক্লান্তি, প্রায়ই জ্বর জ্বর অনুভূতি ইত্যাদি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত রোগের কারণ নিশ্চিত হতে হবে।

ক্যান্সার হতে পারে এমন কোনো কিছু থেকে বিরত থাকব, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হব ও শারীরিক অস্বাভাবিকতায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেব। করোনার সময়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের সর্বাধিক সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে যাদের চিকিৎসা চলছে। কারণ ক্যান্সারে আক্রান্ত শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় কোভিডের জটিলতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখক : আহ্বায়ক, বিএফডিএস, চেয়ারম্যান, পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ, ঢাকা

মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা উচিত

মেজর জেনারেল ডা. গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী

কোনো রোগী দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তখন সেই দন্ত চিকিৎসকের উচিত হবে তার পুরো মুখগহ্বর সঠিকভাবে পরীক্ষা করা, মুখে ক্যান্সার বা ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ উপস্থিত আছে কিনা দেখা। যারা রোগী হিসাবে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে যাবেন তাদের উচিত হবে চিকিৎসকের কাছে জানতে চাওয়া যে তার মুখে ক্যান্সারের কোনো উপসর্গ আছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা।

সাধারণত মুখের ক্যান্সার মুখের ভিতর সাদা বা লাল বর্ণের ক্ষত হয়ে শুরু হতে পারে বা কোথাও ফুলে যেতে পারে, কোথাও ব্যথা হতে পারে, অবস হয়ে যেতে পারে এবং কারো যদি বাঁধানো দাঁত থাকে যাকে আমরা ডেনচার বলি সেই দাঁতগুলো উঁচু হয়ে যেতে পারে, জিহ্বা নাড়াতে সমস্যা হতে পারে, খাবার গিলতে বা চিবাতে সমস্যা হতে পারে- এসব সমস্যা দেখা দিলেই সাবধান হতে হবে যে তার মুখে ক্যান্সারের কোনো পূর্ব লক্ষণ আছে কিনা। যখনই কোনো সন্দেহজনক আচরণ লক্ষণীয় হবে তখনই তা চিহ্নিত করে রোগ নিরূপণ করতে হবে। সঠিকভাবে রোগ নিরূপণ করার জন্য মুখের সেই অংশের টিস্যু নিয়ে একটি পরীক্ষা করে বায়োপসি করা হয়। এ ছাড়াও সিটি স্ক্যান, এমআরঅ্যাই ও এক্সরের সাহায্য নেয়া হয়। কখনো কখনো ক্যান্সার যথেষ্ট বড় হয়ে থাকে যার সীমা বোঝা যায় না, সেই সীমা বোঝার জন্য রেডিওলোজি পরীক্ষা করা হয়। যখনই রোগ নিরূপণ হয়ে গেল তখন আর দেরি করা উচিত নয়, তখনই চিকিৎসা শুরু করে দেয়া উচিত।

তিন প্রকার চিকিৎসা হয়েছে- প্রথমত সার্জারি, দ্বিতীয়ত কেমোথেরাপি, তৃতীয়ত রেডিওথেরাপি।

যখন ক্যান্সারের আকার অনেক ছোট থাকে তখন সার্জারি বেশি ফলপ্রসূ। এজন্য প্রত্যেকের উচিত প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সারের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা। দেশে ক্যান্সারের জন্য ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক ভালো চিকিৎসক রয়েছেন। কেমোথেরাপির জন্যেও ভালো ব্যবস্থা রয়েছে এমনকি রেডিওথেরাপির জন্যও অনেক ভালো ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু ক্যান্সারটি অনেক বড় হয়ে যায় এবং সার্জারির পর্যায়ে না থাকে তখন কেমোথেরাপি দিয়ে বা রেডিওথেরাপি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। সব চিকিৎসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও রোগীর উচিত চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা যেন এই রোগ আবার হতে না পারে এবং আবার যদিও হয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা।

লেখক : সভাপতি, ডিআইএবি, প্রতিষ্ঠাতা, রাফিস ডেন্টাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সেন্টার

অপচিকিৎসা ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম কারণ

অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন

ক্যান্সার নামক জটিল রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আমাদের সচেতনতা সেভাবে বাড়ছে না। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অনুমান করতে এখন আর খুব কষ্ট করতে হয় না, পরিচিত মহলেই ভুক্তভোগী রোগী পাওয়া যায়।

এ রোগের চিকিৎসা এখন অনেক উন্নত, তবুও ক্যান্সারের জটিলতায় প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করছে অগণিত রোগী। কারণ হিসাবে রোগীদের উদাসীনতা ও অপচিকিৎসাকে অন্যতম বলা যায়। ক্যান্সারের মাত্রা ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা দিয়েও অনেক সময় ভালো ফল আসে না, অথচ শুরুতে এর সফলতা প্রায় শতভাগ।

মুখের ক্যান্সার শনাক্তের সহজ উপায় রয়েছে, মুখের মধ্যে কোনো ঘা বা ক্ষত যে কোনো বর্ণের হোক, ব্যথা হোক বা না হোক যদি দীর্ঘ সময় রয়ে যায় তাহলে সেটিকে অবহেলা করা যাবে না। ক্ষতের ধরন নিশ্চিত করতে ডেন্টাল ক্লিনিকে যেতে হবে, সাজসজ্জা বা স্বল্প খরচ ভেবে যেন অনুমোদনহীন চিকিৎসাকেন্দ্রে অপচিকিৎসার শিকার হতে না হয়। রোগ প্রতিরোধে সঠিক জ্ঞান অর্জনে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য জানার চেষ্টা করি, স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত হই, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত রাখি। চলমান কোভিড আতঙ্কে করোনাভাইরাসের সংক্রমন থেকে বাঁচতে শরীরের প্রবেশ দ্বারগুলোর নিরাপত্তায় সঠিক নিয়মে মাস্ক ব্যবহার করা, ভাইরাসমুক্ত হাত নিশ্চিত না হলে মুখ, নাক বা চোখে হাত না দেয়া।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সভাপতি, বামোস

ক্যান্সার হওয়ার পূর্ব লক্ষণগুলো জানতে হবে

অধ্যাপক ডা. ইসমত আরা হায়দার

১৪০৫ সালে ইউরোপীয়ান চিকিৎসকরা বলেছেন, মুখের ক্যান্সারের পূর্বের ক্ষত কম বিপজ্জনক রোগ, কিন্তু এ ঘাগুলো পরবর্তী সময়ে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে। ১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রস্তাব দিয়েছে, কোষকলার গঠনগত পরিবর্তনের অংশে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১-৫ শতাংশ জনগণ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে বয়সের গড় ৫০-৬৯ বছর পর্যন্ত এবং ৫ শতাংশ জনগণের গড় বয়স ৩০-এর কম। ক্যান্সার হওয়ার পূর্বের রোগগুলো হচ্ছে- leukoplakia, oral submucous fibrosis, erythroplakia এবং verrucous carcinoma. লিউকোপ্লাকিয়ায় সাদা প্যাঁচ সেসব মানুষের হয়, যারা পান-সুপারি এবং সিগারেটে আসক্ত। oral submucosal fibrosis হলে submucosal tissue fibrosis হয়ে যায়, এর পরিপ্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে রোগীর হাঁ করা কমে আসে। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা হলে, এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এর জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং পান-সুপারি এবং সিগারেটের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান (ওএমএস), ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল

মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা কোথায় নিবেন

অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর বুলবুল

মুখের ক্যান্সারের তত্ত্বগত কারণগুলো আমাদের সবারই জানা আছে কিন্তু বাংলাদেশে এর ভয়াবহতা বা প্রকোপের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে- তার অন্যতম কারণ হচ্ছে দাঁতের চিকিৎসার জন্য যথাযথ চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কোয়াকের কাছে চিকিৎসা নেয়া। বাংলাদেশে দাঁতের চিকিৎসার বৈধ প্রাকটিশনার, যারা বিডিএস ডিগ্রি অর্জন করেছে তারা। বাংলাদেশে মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, সিলেট মেডিকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজগুলোর ডেন্টাল ইউনিটের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ, মহাখালীর ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, কিছু বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ অথবা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ডেন্টাল ইউনিট এবং বাংলাদেশের কোনো কোনো কর্পোরেট হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে যেসব রোগী বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রেফার্ড হয়ে আসেন তাদের অনেকেই কোয়াকের কাছে চিকিৎসা নেয়ার কারণে এ পরিস্থিতির শিকার। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী বিডিএস ডিগ্রি ব্যতীত কেউ দাঁতের চিকিৎসা দিতে পারে না এবং কেউ যদি এরকম চিকিৎসা দেয় তাহলে সেটি একটি দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতও অবৈধ প্রাকটিশনারদের ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বনের ব্যাপারে রায় দিয়েছেন। সর্বোপরি স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপরে দায়িত্ব রয়েছে যে অবৈধ প্রাকটিশনারদের নজরদারিতে রেখে ব্যবস্থা গ্রহণ।

লেখক : অধ্যক্ষ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, মহাসচিব, বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি

মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা রোগ প্রতিরোধে জরুরি

ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার (মুসা)

ওরাল ক্যান্সার দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষত আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। এর মূল কারণ এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, অভিরুচি, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তি বিশেষে বদঅভ্যাস। যেমন- সুপারি-জর্দা চিবানো, তামাক ও অ্যালকোহলের ব্যবহার। ‘গ্লোবোকান’-এর সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে ওরাল ক্যান্সারের প্রকোপ ও মৃত্যুহার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বেশি এবং পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

ওরাল ক্যান্সার মূলত জিহ্বা, মুখ, মুখের পেছনে গলা ও ঠোঁটের স্কোয়ামাশ টিস্যুতে হয়ে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

ওরাল ক্যান্সারের কারণ

* পান, সুপারি, গুল, জর্দা, সিগারেটসহ অন্যান্য তামাক বা তামাকজাত পণ্য গ্রহণ।

* বেশিমাত্রায় অ্যালকোহল পান।

* বংশগত কারণ।

* সূর্যের আলোতে অতিরিক্ত অবস্থান, বিশেষত অল্প বয়সে।

* ঠোঁট বা মুখে দীর্ঘদিনের ঘা।

* হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি)। নির্দিষ্ট এইচপিভি স্ট্রেনগুলো স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার (এসিসি) জন্য দায়ী।

প্রতিরোধ

* তামাক, তামাকজাত পণ্য ও অ্যালকোহল সেবন পুরোপুরি বাদ দেওয়া।

* সূর্যের আলোতে সরাসরি অবস্থান না করা।

* দাঁতের নিয়মিত যত্ন নেওয়া। মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা শরীরের অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের জন্য জরুরি।

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রচুর সবজি ও ফল থাকা উচিত। সবুজ-লাল-হলুদ-বেগুনিসহ নানা রঙের সবজি ও ফলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।

বছরে দু’বার ডেন্টাল চেকআপ করলে, মুখের ক্যান্সার বা যে-কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা প্রথমেই ধরা পড়ে। ফলে তা দ্রুত প্রতিকার করা সম্ভব হয়।

লেখক : পরিচালক (ডেন্টাল শিক্ষা), স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধ করতে পারে

ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ

ক্যান্সার রোগটির নাম শুনলেই মরার আগেই আমরা যেন মরে যাই! আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

আমাদের দেশে মেয়েদের জরায়ু মুখের ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের পরেই মুখ গহ্বরের ক্যান্সারের রোগী বেশি দেখা যায়। মুখের ক্যান্সার হঠাৎ করে পূর্ণতা পায় না, শুরু থেকে অবহেলা, কুসংস্কার, অশিক্ষা, দরিদ্রতা, অপচিকিৎসাসহ নানা কারণে এ রোগ জটিল হয়ে ওঠে। ক্যান্সার ছড়ানোর ওপর ভিত্তি করে একে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়।

দেশের অন্যতম ডেন্টাল সংগঠন বিএফডিএসের বয়স তিন বছরের মতো হলেও অগণিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের জনগণকে স্বাস্থ্য রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে নানা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন- করোনাকালে ডায়াবেটিসের সঙ্গে মুখের সম্পর্ক, মুখগহ্বর স্বাস্থ্য দিবসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য দিবসে নিয়মিতভাবে দেশসেরা চিকিৎসকের অংশগ্রহণে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন।

ক্যান্সার হচ্ছে শরীরের কোনো কোষের অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। মুখের মধ্যে নানা ধরনের ক্ষত হতে পারে, যদি কোনো ক্ষত বা ঘা দু’সপ্তাহের বেশি রয়ে যায় তবে অবশ্যই কোনো কোয়াক বা হাতুড়ে চিকিৎসকের অপচিকিৎসার শিকার না হয়ে ন্যূনতম বিডিএস ডিগ্রিধারী ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অনেক সময় ক্ষতটি কোনো ব্যথা বা কষ্ট বা অন্য কোনো উপসর্গ ছাড়াই বাড়তে থাকে; তাই সমগ্র বিশ্বের চিকিৎসকরা ছয় মাস পরপর ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে জোরালো তাগিদ দেয়। নিজের মুখের অভ্যন্তরে নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বড় হা করে দেখতে হবে কোথাও কোনো অস্বাভাবিক রং, ঘা, গোটা বা ক্ষত দেখা যায় কিনা।

সঠিক নিয়মে নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত রাখতে হবে; পাশাপাশি তাজা ফরমালিনমুক্ত মৌসুমি ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, টকদই, ছোট মাছ, আঁশযুক্ত খাবারসহ সুষম খাবারে মনোযোগী হতে হবে। চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাদ্য কমাতে হবে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান ও রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে ব্যায়াম করতে হবে; পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিতে হবে। শরীরের যে কোনো অস্বাভাবিকতায় নিজ বুদ্ধিতে, গুগলস থেকে বা অন্য কারও পরামর্শে সমাধান না খুঁজে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে হবে।

লেখক : সদস্য সচিব, বিএফডিএস, রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান, ঢাকা

সংকলন : ডা. রোমান খাঁন

শুরুতেই ধরা পড়লে ক্যান্সার রোগ সারানো যায়

সম্প্রতি উদযাপিত হলো বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। দিবস মানেই গণসচেতনতা, তাই বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ডেন্টাল সাইন্স-মেডিপ্লাস-এর উদ্যোগে ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে একত্রিত হয়েছিলেন দেশের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে বদলানোর প্রত্যয়ে যার যার অবস্থান থেকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গিকার করা হয় এ বৈঠকে
 সংকলন : ডা. রোমান খাঁন 
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শরীরের কোনো ক্ষত না শুকালে গুরুত্ব দিন

ডা. মো. রকিবুল হোসেন রুমী

নগরজীবনের ব্যস্ততায় নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা আমাদের যেন ক্রমেই বাড়ছে। অসংক্রমিত রোগ যেমন- ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো রোগগুলো বেড়ে চলছে। এক সময় দেখা যেত, বয়স বাড়লে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু এখন যে কোনো বয়সে নানা জটিল রোগে আক্রান্তের ঘটনা ঘটছে। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, আর ক্যান্সারের মধ্যে মুখের ক্যান্সার অন্যতম। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সবাই যদি নিজেদের সচেতন রাখি, ক্যান্সারের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে উৎসাহিত হই, সঠিক সময়ে যথাযথ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেই, তাহলেই এর ভয়াবহতা অনেকাংশে কমবে। মুখের ক্যান্সারকে যারা পুষে রাখে, তাদের মধ্যকার বড় অংশের পরিণতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

ক্যান্সার শনাক্তের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। শরীরের যে কোনো ক্ষত না শুকালে, অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে, মূত্র বা মল ত্যাগের অস্বাভাবিকতা, স্তনের গঠনের পরিবর্তন, গিলতে অসুবিধা, ক্রমান্বয়ে ওজন হ্রাস ও ক্ষুধামন্দা, গলায় কর্কশ শব্দ, কাশি, অকারণ ক্লান্তি, প্রায়ই জ্বর জ্বর অনুভূতি ইত্যাদি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত রোগের কারণ নিশ্চিত হতে হবে।

ক্যান্সার হতে পারে এমন কোনো কিছু থেকে বিরত থাকব, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হব ও শারীরিক অস্বাভাবিকতায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেব। করোনার সময়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের সর্বাধিক সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে যাদের চিকিৎসা চলছে। কারণ ক্যান্সারে আক্রান্ত শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় কোভিডের জটিলতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লেখক : আহ্বায়ক, বিএফডিএস, চেয়ারম্যান, পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ, ঢাকা

মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা উচিত

মেজর জেনারেল ডা. গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী

কোনো রোগী দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তখন সেই দন্ত চিকিৎসকের উচিত হবে তার পুরো মুখগহ্বর সঠিকভাবে পরীক্ষা করা, মুখে ক্যান্সার বা ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ উপস্থিত আছে কিনা দেখা। যারা রোগী হিসাবে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে যাবেন তাদের উচিত হবে চিকিৎসকের কাছে জানতে চাওয়া যে তার মুখে ক্যান্সারের কোনো উপসর্গ আছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা।

সাধারণত মুখের ক্যান্সার মুখের ভিতর সাদা বা লাল বর্ণের ক্ষত হয়ে শুরু হতে পারে বা কোথাও ফুলে যেতে পারে, কোথাও ব্যথা হতে পারে, অবস হয়ে যেতে পারে এবং কারো যদি বাঁধানো দাঁত থাকে যাকে আমরা ডেনচার বলি সেই দাঁতগুলো উঁচু হয়ে যেতে পারে, জিহ্বা নাড়াতে সমস্যা হতে পারে, খাবার গিলতে বা চিবাতে সমস্যা হতে পারে- এসব সমস্যা দেখা দিলেই সাবধান হতে হবে যে তার মুখে ক্যান্সারের কোনো পূর্ব লক্ষণ আছে কিনা। যখনই কোনো সন্দেহজনক আচরণ লক্ষণীয় হবে তখনই তা চিহ্নিত করে রোগ নিরূপণ করতে হবে। সঠিকভাবে রোগ নিরূপণ করার জন্য মুখের সেই অংশের টিস্যু নিয়ে একটি পরীক্ষা করে বায়োপসি করা হয়। এ ছাড়াও সিটি স্ক্যান, এমআরঅ্যাই ও এক্সরের সাহায্য নেয়া হয়। কখনো কখনো ক্যান্সার যথেষ্ট বড় হয়ে থাকে যার সীমা বোঝা যায় না, সেই সীমা বোঝার জন্য রেডিওলোজি পরীক্ষা করা হয়। যখনই রোগ নিরূপণ হয়ে গেল তখন আর দেরি করা উচিত নয়, তখনই চিকিৎসা শুরু করে দেয়া উচিত।

তিন প্রকার চিকিৎসা হয়েছে- প্রথমত সার্জারি, দ্বিতীয়ত কেমোথেরাপি, তৃতীয়ত রেডিওথেরাপি।

যখন ক্যান্সারের আকার অনেক ছোট থাকে তখন সার্জারি বেশি ফলপ্রসূ। এজন্য প্রত্যেকের উচিত প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সারের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা। দেশে ক্যান্সারের জন্য ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক ভালো চিকিৎসক রয়েছেন। কেমোথেরাপির জন্যেও ভালো ব্যবস্থা রয়েছে এমনকি রেডিওথেরাপির জন্যও অনেক ভালো ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু ক্যান্সারটি অনেক বড় হয়ে যায় এবং সার্জারির পর্যায়ে না থাকে তখন কেমোথেরাপি দিয়ে বা রেডিওথেরাপি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। সব চিকিৎসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও রোগীর উচিত চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা যেন এই রোগ আবার হতে না পারে এবং আবার যদিও হয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা।

লেখক : সভাপতি, ডিআইএবি, প্রতিষ্ঠাতা, রাফিস ডেন্টাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সেন্টার

অপচিকিৎসা ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম কারণ

অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন

ক্যান্সার নামক জটিল রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আমাদের সচেতনতা সেভাবে বাড়ছে না। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অনুমান করতে এখন আর খুব কষ্ট করতে হয় না, পরিচিত মহলেই ভুক্তভোগী রোগী পাওয়া যায়।

এ রোগের চিকিৎসা এখন অনেক উন্নত, তবুও ক্যান্সারের জটিলতায় প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করছে অগণিত রোগী। কারণ হিসাবে রোগীদের উদাসীনতা ও অপচিকিৎসাকে অন্যতম বলা যায়। ক্যান্সারের মাত্রা ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা দিয়েও অনেক সময় ভালো ফল আসে না, অথচ শুরুতে এর সফলতা প্রায় শতভাগ।

মুখের ক্যান্সার শনাক্তের সহজ উপায় রয়েছে, মুখের মধ্যে কোনো ঘা বা ক্ষত যে কোনো বর্ণের হোক, ব্যথা হোক বা না হোক যদি দীর্ঘ সময় রয়ে যায় তাহলে সেটিকে অবহেলা করা যাবে না। ক্ষতের ধরন নিশ্চিত করতে ডেন্টাল ক্লিনিকে যেতে হবে, সাজসজ্জা বা স্বল্প খরচ ভেবে যেন অনুমোদনহীন চিকিৎসাকেন্দ্রে অপচিকিৎসার শিকার হতে না হয়। রোগ প্রতিরোধে সঠিক জ্ঞান অর্জনে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য জানার চেষ্টা করি, স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত হই, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত রাখি। চলমান কোভিড আতঙ্কে করোনাভাইরাসের সংক্রমন থেকে বাঁচতে শরীরের প্রবেশ দ্বারগুলোর নিরাপত্তায় সঠিক নিয়মে মাস্ক ব্যবহার করা, ভাইরাসমুক্ত হাত নিশ্চিত না হলে মুখ, নাক বা চোখে হাত না দেয়া।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সভাপতি, বামোস

ক্যান্সার হওয়ার পূর্ব লক্ষণগুলো জানতে হবে

অধ্যাপক ডা. ইসমত আরা হায়দার

১৪০৫ সালে ইউরোপীয়ান চিকিৎসকরা বলেছেন, মুখের ক্যান্সারের পূর্বের ক্ষত কম বিপজ্জনক রোগ, কিন্তু এ ঘাগুলো পরবর্তী সময়ে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে। ১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রস্তাব দিয়েছে, কোষকলার গঠনগত পরিবর্তনের অংশে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১-৫ শতাংশ জনগণ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে বয়সের গড় ৫০-৬৯ বছর পর্যন্ত এবং ৫ শতাংশ জনগণের গড় বয়স ৩০-এর কম। ক্যান্সার হওয়ার পূর্বের রোগগুলো হচ্ছে- leukoplakia, oral submucous fibrosis, erythroplakia এবং verrucous carcinoma. লিউকোপ্লাকিয়ায় সাদা প্যাঁচ সেসব মানুষের হয়, যারা পান-সুপারি এবং সিগারেটে আসক্ত। oral submucosal fibrosis হলে submucosal tissue fibrosis হয়ে যায়, এর পরিপ্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে রোগীর হাঁ করা কমে আসে। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা হলে, এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এর জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং পান-সুপারি এবং সিগারেটের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান (ওএমএস), ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল

মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা কোথায় নিবেন

অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর বুলবুল

মুখের ক্যান্সারের তত্ত্বগত কারণগুলো আমাদের সবারই জানা আছে কিন্তু বাংলাদেশে এর ভয়াবহতা বা প্রকোপের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে- তার অন্যতম কারণ হচ্ছে দাঁতের চিকিৎসার জন্য যথাযথ চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কোয়াকের কাছে চিকিৎসা নেয়া। বাংলাদেশে দাঁতের চিকিৎসার বৈধ প্রাকটিশনার, যারা বিডিএস ডিগ্রি অর্জন করেছে তারা। বাংলাদেশে মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, সিলেট মেডিকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজগুলোর ডেন্টাল ইউনিটের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ, মহাখালীর ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, কিছু বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ অথবা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ডেন্টাল ইউনিট এবং বাংলাদেশের কোনো কোনো কর্পোরেট হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে যেসব রোগী বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রেফার্ড হয়ে আসেন তাদের অনেকেই কোয়াকের কাছে চিকিৎসা নেয়ার কারণে এ পরিস্থিতির শিকার। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী বিডিএস ডিগ্রি ব্যতীত কেউ দাঁতের চিকিৎসা দিতে পারে না এবং কেউ যদি এরকম চিকিৎসা দেয় তাহলে সেটি একটি দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতও অবৈধ প্রাকটিশনারদের ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বনের ব্যাপারে রায় দিয়েছেন। সর্বোপরি স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপরে দায়িত্ব রয়েছে যে অবৈধ প্রাকটিশনারদের নজরদারিতে রেখে ব্যবস্থা গ্রহণ।

লেখক : অধ্যক্ষ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, মহাসচিব, বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি

মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা রোগ প্রতিরোধে জরুরি

ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার (মুসা)

ওরাল ক্যান্সার দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষত আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। এর মূল কারণ এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, অভিরুচি, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তি বিশেষে বদঅভ্যাস। যেমন- সুপারি-জর্দা চিবানো, তামাক ও অ্যালকোহলের ব্যবহার। ‘গ্লোবোকান’-এর সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে ওরাল ক্যান্সারের প্রকোপ ও মৃত্যুহার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বেশি এবং পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

ওরাল ক্যান্সার মূলত জিহ্বা, মুখ, মুখের পেছনে গলা ও ঠোঁটের স্কোয়ামাশ টিস্যুতে হয়ে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

ওরাল ক্যান্সারের কারণ

* পান, সুপারি, গুল, জর্দা, সিগারেটসহ অন্যান্য তামাক বা তামাকজাত পণ্য গ্রহণ।

* বেশিমাত্রায় অ্যালকোহল পান।

* বংশগত কারণ।

* সূর্যের আলোতে অতিরিক্ত অবস্থান, বিশেষত অল্প বয়সে।

* ঠোঁট বা মুখে দীর্ঘদিনের ঘা।

* হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি)। নির্দিষ্ট এইচপিভি স্ট্রেনগুলো স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার (এসিসি) জন্য দায়ী।

প্রতিরোধ

* তামাক, তামাকজাত পণ্য ও অ্যালকোহল সেবন পুরোপুরি বাদ দেওয়া।

* সূর্যের আলোতে সরাসরি অবস্থান না করা।

* দাঁতের নিয়মিত যত্ন নেওয়া। মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা শরীরের অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের জন্য জরুরি।

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রচুর সবজি ও ফল থাকা উচিত। সবুজ-লাল-হলুদ-বেগুনিসহ নানা রঙের সবজি ও ফলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।

বছরে দু’বার ডেন্টাল চেকআপ করলে, মুখের ক্যান্সার বা যে-কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা প্রথমেই ধরা পড়ে। ফলে তা দ্রুত প্রতিকার করা সম্ভব হয়।

লেখক : পরিচালক (ডেন্টাল শিক্ষা), স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধ করতে পারে

ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ

ক্যান্সার রোগটির নাম শুনলেই মরার আগেই আমরা যেন মরে যাই! আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

আমাদের দেশে মেয়েদের জরায়ু মুখের ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের পরেই মুখ গহ্বরের ক্যান্সারের রোগী বেশি দেখা যায়। মুখের ক্যান্সার হঠাৎ করে পূর্ণতা পায় না, শুরু থেকে অবহেলা, কুসংস্কার, অশিক্ষা, দরিদ্রতা, অপচিকিৎসাসহ নানা কারণে এ রোগ জটিল হয়ে ওঠে। ক্যান্সার ছড়ানোর ওপর ভিত্তি করে একে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়।

দেশের অন্যতম ডেন্টাল সংগঠন বিএফডিএসের বয়স তিন বছরের মতো হলেও অগণিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের জনগণকে স্বাস্থ্য রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে নানা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন- করোনাকালে ডায়াবেটিসের সঙ্গে মুখের সম্পর্ক, মুখগহ্বর স্বাস্থ্য দিবসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য দিবসে নিয়মিতভাবে দেশসেরা চিকিৎসকের অংশগ্রহণে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন।

ক্যান্সার হচ্ছে শরীরের কোনো কোষের অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। মুখের মধ্যে নানা ধরনের ক্ষত হতে পারে, যদি কোনো ক্ষত বা ঘা দু’সপ্তাহের বেশি রয়ে যায় তবে অবশ্যই কোনো কোয়াক বা হাতুড়ে চিকিৎসকের অপচিকিৎসার শিকার না হয়ে ন্যূনতম বিডিএস ডিগ্রিধারী ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অনেক সময় ক্ষতটি কোনো ব্যথা বা কষ্ট বা অন্য কোনো উপসর্গ ছাড়াই বাড়তে থাকে; তাই সমগ্র বিশ্বের চিকিৎসকরা ছয় মাস পরপর ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে জোরালো তাগিদ দেয়। নিজের মুখের অভ্যন্তরে নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বড় হা করে দেখতে হবে কোথাও কোনো অস্বাভাবিক রং, ঘা, গোটা বা ক্ষত দেখা যায় কিনা।

সঠিক নিয়মে নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত রাখতে হবে; পাশাপাশি তাজা ফরমালিনমুক্ত মৌসুমি ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, টকদই, ছোট মাছ, আঁশযুক্ত খাবারসহ সুষম খাবারে মনোযোগী হতে হবে। চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাদ্য কমাতে হবে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান ও রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে ব্যায়াম করতে হবে; পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিতে হবে। শরীরের যে কোনো অস্বাভাবিকতায় নিজ বুদ্ধিতে, গুগলস থেকে বা অন্য কারও পরামর্শে সমাধান না খুঁজে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হতে হবে।

লেখক : সদস্য সচিব, বিএফডিএস, রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান, ঢাকা

সংকলন : ডা. রোমান খাঁন

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন