করোনার ভ্যাকসিন ও এর কার্যকারিতা
jugantor
করোনার ভ্যাকসিন ও এর কার্যকারিতা

  ডা. মো. ফারুক হোসেন  

০১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে দেশে করোনার সঙ্গে সাউথ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের মিল রয়েছে শতকরা ৮১ ভাগ। সাউথ আফ্রিকার এ ধরন ৭০ ভাগ বেশি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। আই.সি.ডি.ডি.আর.বি-এর গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিবে। টিকার ওপর ভরসা করে আর পথ চলা যাবে না। তা ছাড়া টিকা দেওয়ার পরেও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট বা ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট N501Y নামক মিউটেশনের উপস্থিতির কারণে এটি দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। ধারণা করা হয় সংক্রমণ ক্ষমতা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন মাত্র ১০ শতাংশ সুরক্ষা দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া E484K মিউটেশনের উপস্থিতি, যা প্রমাণ করে নতুন এই ভাইরাসের ধরনটির মাঝে প্রতিরোধ ক্ষমতা এড়ানোর কৌশল রয়েছে। এ কারণেই আমাদের দেশে অনেক বেশি জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন অবশ্যই দিতে হবে। কারণ করোনা অরিজিনাল স্ট্রেইন এবং অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলো থেকে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে শতকরা ৬৪ ভাগ কার্যকর। জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দুই থেকে আট ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। একটি মাত্র ডোজ দিলেই চলে। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাস শুধু অক্সফোর্ডের টিকা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের টিকার কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়। সম্প্রতি ইসরাইলে একটি গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ফাইজারের টিকা কাজ করে না। তবে ইসরাইলের এ গবেষণা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে একথা সত্য যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ভাইরাস ফাইজারের টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তবে ফাইজারের টিকা দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অক্সফোর্ডের টিকার চেয়ে বেশি কাজ করে। জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর মাধ্যমে নতুন মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব। তা ছাড়া নতুন ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে থাকে। তাই আমাদের দেশে আরও বেশি পরিমাণে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। কারণ আমাদের দেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন। যারা অক্সফোর্ডের টিকা দ্বিতীয় ডোজ এখনো নেননি তাদের অবশ্যই দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায়ও নেই। যে পর্যন্ত বিশ্বের সবগুলো দেশ টিকা না পাবে সে পর্যন্ত বিশ্ব করোনাভাইরাস মুক্ত হতে পারবে না। যারা অন্য একটি ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের টিকার একটি বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ সংক্রান্ত ঘোষণা কেবলমাত্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা থেকে দিতে হবে। জিনোম সিকোয়েন্সিং অব্যাহত রাখলে টিকার নতুন সংস্করণ অথবা নতুন টিকা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় জিনোম সিকোয়েন্সিং অব্যাহত না রাখলে আমাদের পক্ষে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবচেয়ে মূল্যবান কথা এবং মূল কথা সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্রীয় অবস্থা অনুযায়ী লকডাউনও প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক : মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

dr.faruqu@gmail.com

করোনার ভ্যাকসিন ও এর কার্যকারিতা

 ডা. মো. ফারুক হোসেন 
০১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে দেশে করোনার সঙ্গে সাউথ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের মিল রয়েছে শতকরা ৮১ ভাগ। সাউথ আফ্রিকার এ ধরন ৭০ ভাগ বেশি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। আই.সি.ডি.ডি.আর.বি-এর গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিবে। টিকার ওপর ভরসা করে আর পথ চলা যাবে না। তা ছাড়া টিকা দেওয়ার পরেও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট বা ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট N501Y নামক মিউটেশনের উপস্থিতির কারণে এটি দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। ধারণা করা হয় সংক্রমণ ক্ষমতা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন মাত্র ১০ শতাংশ সুরক্ষা দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া E484K মিউটেশনের উপস্থিতি, যা প্রমাণ করে নতুন এই ভাইরাসের ধরনটির মাঝে প্রতিরোধ ক্ষমতা এড়ানোর কৌশল রয়েছে। এ কারণেই আমাদের দেশে অনেক বেশি জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন অবশ্যই দিতে হবে। কারণ করোনা অরিজিনাল স্ট্রেইন এবং অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলো থেকে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে শতকরা ৬৪ ভাগ কার্যকর। জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দুই থেকে আট ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। একটি মাত্র ডোজ দিলেই চলে। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাস শুধু অক্সফোর্ডের টিকা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের টিকার কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়। সম্প্রতি ইসরাইলে একটি গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ফাইজারের টিকা কাজ করে না। তবে ইসরাইলের এ গবেষণা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে একথা সত্য যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ভাইরাস ফাইজারের টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তবে ফাইজারের টিকা দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অক্সফোর্ডের টিকার চেয়ে বেশি কাজ করে। জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর মাধ্যমে নতুন মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব। তা ছাড়া নতুন ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে থাকে। তাই আমাদের দেশে আরও বেশি পরিমাণে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। কারণ আমাদের দেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন। যারা অক্সফোর্ডের টিকা দ্বিতীয় ডোজ এখনো নেননি তাদের অবশ্যই দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায়ও নেই। যে পর্যন্ত বিশ্বের সবগুলো দেশ টিকা না পাবে সে পর্যন্ত বিশ্ব করোনাভাইরাস মুক্ত হতে পারবে না। যারা অন্য একটি ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের টিকার একটি বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ সংক্রান্ত ঘোষণা কেবলমাত্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা থেকে দিতে হবে। জিনোম সিকোয়েন্সিং অব্যাহত রাখলে টিকার নতুন সংস্করণ অথবা নতুন টিকা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় জিনোম সিকোয়েন্সিং অব্যাহত না রাখলে আমাদের পক্ষে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে সবচেয়ে মূল্যবান কথা এবং মূল কথা সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্রীয় অবস্থা অনুযায়ী লকডাউনও প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক : মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

dr.faruqu@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন