মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা কেন জরুরি
jugantor
মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা কেন জরুরি

  ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ  

২২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জীবদ্দশায় ডেন্টাল রোগ, যেমন দাঁত ক্ষয়, শিনশিন করা, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, নানা ধরনের ক্ষত বা ঘা, মুখে দুর্গন্ধ, বিবর্ণ ও আঁকাবাঁকা দাঁত, চোয়ালের হাড় ভাঙা, ক্যান্সার, লালা গ্রন্থির সমস্যা, মুখ শুষ্ক ও জ্বালাপোড়া, মুখ খুলতে কষ্ট ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেনি- এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এসব সমস্যার সিংহভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নিজেদের সঠিক জ্ঞানে সচেতন করার মধ্য দিয়ে।

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয়

সকাল ও রাতে খাবার পর নিয়ম মেনে দাঁতের সব পৃষ্ঠ পরিষ্কার, ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টার ডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার জানা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এনে মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের পরিবর্তে স্বাস্থ্যবান্ধব খাবারে উৎসাহিত হওয়া যেমন- মৌসুমী তাজা ফলমূল, শাকসবজি, ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, টকদইসহ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার। ধূমপান, পান জর্দা, গুল, অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকতে হবে। মুখের বেশিরভাগ রোগে শুরুতেই তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না বলে ছয় মাস অন্তর বৈধ ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগের শুরুতেই ধরা পড়ে আর চিকিৎসাব্যবস্থাও হয় সহজ ও নামমাত্র খরচে। বৈধ শব্দটি ব্যবহারের কারণ হলো, দেশে এখনো আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে বিডিএস ডিগ্রি ব্যতীত বা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন ছাড়া ডেন্টাল চিকিৎসার মতো অতি সংবেদনশীল চিকিৎসা প্রদানের দুঃসাহস দেখাচ্ছে, যেখানে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।

মুখের চিকিৎসায় অহেতুক ভয়

বর্তমানে দেশে প্রায় তেরো হাজার অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিৎসক থাকলেও ২০০০ সালের আগের সংখ্যাটা ছিল মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি। ফলে বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অনেকটা নিরুপায় হয়ে ভুয়া চিকিৎসকের কাছে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে একধরনের আস্থাহীনতায় ভুগত। দাঁতের ফিলিং পড়ে যায়, রুট ক্যানেল চিকিৎসার কিছু দিন পর দাঁত ফেলে দিতে হয়, স্কেলিং করালে দাঁত দুর্বল ও ফাঁকা হয়ে যায়, দাঁত ফেললে চোখের ক্ষতি, শিশুর দুধ দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজন নেই, যন্ত্রপাতি জীবাণু মুক্ত নয়, চিকিৎসায় অসহনীয় ব্যথা, অনেক খরচ এমন নানা ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারণা থেকে রোগকে পুষে রাখে অনেকে, ফলে অপূরণীয় স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা কেন জরুরি

জাপানের মানুষের মধ্যে একটা প্রবাদ আছে, সার্বিক সুস্থতার জন্য আশি বছর বয়সে কমপক্ষে ৮টি সুস্থ দাঁত সংরক্ষণ করতে হবে, আমাদেরও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হবে, সচেষ্ট হতে হবে স্বাস্থ্য রক্ষায়। সুস্থ ও সুন্দর দাঁত হোক আমাদের গর্ব।

মুখ আমাদের শরীরের প্রধান প্রবেশদ্বার, বাড়ির প্রবেশ দ্বার অরক্ষিত থাকলে যেমন বাড়িটি নিরাপত্তাহীন, তেমনি মুখের স্বাস্থ্য ভালো না রাখলে মুখসহ সমগ্র শরীর ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ মুখের রোগ শুধু মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, রক্ত সঞ্চালনের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে যেতে পারে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে। আবার শারীরিক অনেক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ মুখের মধ্যে প্রকাশ পায়।

সুস্থ দাঁতের অভাবে অপুষ্টি, খাবারে স্বাদ না পাওয়া, পর্যাপ্ত চর্বণ না হওয়া, চোয়ালের অস্থি ও অস্থি সন্ধিতে সমস্যা, মানসিক শক্তি ও প্রাণচাঞ্চলতা কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বহানি, স্পষ্ট উচ্চারণে বাধাসহ নানা সমস্যা দেখা যায়। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মুখের রোগ থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসে রোগ, ক্যান্সার, অপরিণত গর্ভপাত, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগের জটিলতা বেড়ে যাওয়াসহ নানা জটিলতার যোগসূত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে কোভিডের জটিলতার সঙ্গেও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি উঠে আসছে, মুখের সঠিক পরিচর্যায় শরীরে করোনাভাইরাস প্রবেশের অন্যতম বড় পথ, মুখগহ্বর অনেকটা নিরাপদে থাকে।

লেখক : রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান, ঢাকা

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা কেন জরুরি

 ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ 
২২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জীবদ্দশায় ডেন্টাল রোগ, যেমন দাঁত ক্ষয়, শিনশিন করা, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, নানা ধরনের ক্ষত বা ঘা, মুখে দুর্গন্ধ, বিবর্ণ ও আঁকাবাঁকা দাঁত, চোয়ালের হাড় ভাঙা, ক্যান্সার, লালা গ্রন্থির সমস্যা, মুখ শুষ্ক ও জ্বালাপোড়া, মুখ খুলতে কষ্ট ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেনি- এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এসব সমস্যার সিংহভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নিজেদের সঠিক জ্ঞানে সচেতন করার মধ্য দিয়ে।

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয়

সকাল ও রাতে খাবার পর নিয়ম মেনে দাঁতের সব পৃষ্ঠ পরিষ্কার, ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টার ডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার জানা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এনে মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের পরিবর্তে স্বাস্থ্যবান্ধব খাবারে উৎসাহিত হওয়া যেমন- মৌসুমী তাজা ফলমূল, শাকসবজি, ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, টকদইসহ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার। ধূমপান, পান জর্দা, গুল, অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকতে হবে। মুখের বেশিরভাগ রোগে শুরুতেই তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না বলে ছয় মাস অন্তর বৈধ ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগের শুরুতেই ধরা পড়ে আর চিকিৎসাব্যবস্থাও হয় সহজ ও নামমাত্র খরচে। বৈধ শব্দটি ব্যবহারের কারণ হলো, দেশে এখনো আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে বিডিএস ডিগ্রি ব্যতীত বা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন ছাড়া ডেন্টাল চিকিৎসার মতো অতি সংবেদনশীল চিকিৎসা প্রদানের দুঃসাহস দেখাচ্ছে, যেখানে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।

মুখের চিকিৎসায় অহেতুক ভয়

বর্তমানে দেশে প্রায় তেরো হাজার অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিৎসক থাকলেও ২০০০ সালের আগের সংখ্যাটা ছিল মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি। ফলে বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অনেকটা নিরুপায় হয়ে ভুয়া চিকিৎসকের কাছে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে একধরনের আস্থাহীনতায় ভুগত। দাঁতের ফিলিং পড়ে যায়, রুট ক্যানেল চিকিৎসার কিছু দিন পর দাঁত ফেলে দিতে হয়, স্কেলিং করালে দাঁত দুর্বল ও ফাঁকা হয়ে যায়, দাঁত ফেললে চোখের ক্ষতি, শিশুর দুধ দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজন নেই, যন্ত্রপাতি জীবাণু মুক্ত নয়, চিকিৎসায় অসহনীয় ব্যথা, অনেক খরচ এমন নানা ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারণা থেকে রোগকে পুষে রাখে অনেকে, ফলে অপূরণীয় স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা কেন জরুরি

জাপানের মানুষের মধ্যে একটা প্রবাদ আছে, সার্বিক সুস্থতার জন্য আশি বছর বয়সে কমপক্ষে ৮টি সুস্থ দাঁত সংরক্ষণ করতে হবে, আমাদেরও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হবে, সচেষ্ট হতে হবে স্বাস্থ্য রক্ষায়। সুস্থ ও সুন্দর দাঁত হোক আমাদের গর্ব।

মুখ আমাদের শরীরের প্রধান প্রবেশদ্বার, বাড়ির প্রবেশ দ্বার অরক্ষিত থাকলে যেমন বাড়িটি নিরাপত্তাহীন, তেমনি মুখের স্বাস্থ্য ভালো না রাখলে মুখসহ সমগ্র শরীর ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ মুখের রোগ শুধু মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, রক্ত সঞ্চালনের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে যেতে পারে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে। আবার শারীরিক অনেক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ মুখের মধ্যে প্রকাশ পায়।

সুস্থ দাঁতের অভাবে অপুষ্টি, খাবারে স্বাদ না পাওয়া, পর্যাপ্ত চর্বণ না হওয়া, চোয়ালের অস্থি ও অস্থি সন্ধিতে সমস্যা, মানসিক শক্তি ও প্রাণচাঞ্চলতা কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বহানি, স্পষ্ট উচ্চারণে বাধাসহ নানা সমস্যা দেখা যায়। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মুখের রোগ থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসে রোগ, ক্যান্সার, অপরিণত গর্ভপাত, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগের জটিলতা বেড়ে যাওয়াসহ নানা জটিলতার যোগসূত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে কোভিডের জটিলতার সঙ্গেও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি উঠে আসছে, মুখের সঠিক পরিচর্যায় শরীরে করোনাভাইরাস প্রবেশের অন্যতম বড় পথ, মুখগহ্বর অনেকটা নিরাপদে থাকে।

লেখক : রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান, ঢাকা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন