নিয়মিত ব্যায়ামে সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন
jugantor
নিয়মিত ব্যায়ামে সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন

  ডা. রফিক আহমেদ  

২৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ থেকে ২ হাজার ৫শ’ বছর আগে আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রেটিস বলে গেছেন মানুষের জন্য সেরা ওষুধ হল- হাঁটা। চিকিৎসা শাস্ত্রেই যে হাঁটা বা ব্যায়ামের উপকারিতা জানানো হয়েছে তা নয় এর ব্যাপকতা শরীর চর্চা, বাত ব্যথা, প্যারালাইসিসসহ আরও অনেক জায়গায় স্থান পেয়েছে। ব্যায়াম বলতে আমরা বুঝি শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম অথবা নিয়মিত এমন কিছু করা যার ফলে শরীর হয় প্রশান্ত এবং মানসিক অশান্তি হয় দূরীভূত। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করা আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা সবার জন্য অপরিহার্য। ব্যায়াম একজন মানুষের মানসিক এবং শারীরিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে কারণেই বলা হয়েছে ‘সুস্থ মন সুস্থ দেহ’। আমাদের শরীর অসার (মৃত) হওয়া অর্থ আমাদের মনেরও মৃত্যু ঘটা। সুতরাং শরীরকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত নিয়মিত এবং পরিমিত ব্যায়াম করা।

ব্যায়াম আমাদের শরীরকে শারীরিক যোগ্যতা এবং স্বাস্থ্য সবলতা ঠিক রাখে। সুস্থ সতেজ রাখে। কেবলমাত্র তাই নয়, আমাদের শরীরের পুনঃগঠনের বিশেষ অবদান রাখে। ব্যায়াম আমাদের পেশিশক্তি বৃদ্ধি করে, ওজন কমানোয় সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যায়াম তারুণ্যকে ধরে রাখতে এবং বয়স ও বার্ধক্যের গতি কমিয়ে দেয়। ব্যায়াম হৃদপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হৃদযন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ব্যায়াম আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং অনেক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

ব্যায়াম হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস না হতে সাহায্য করে এবং অনেক ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা পালন করে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। স্বাস্থ্যই মানুষের মূল্যবান সম্পদ।

যেসব কারণে ব্যায়ামের প্রয়োজন

নিয়মিত, পরিমিত ব্যায়াম যারা করেন তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং স্বাস্থ্য সবলতা বজায় থাকে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শারীরিক, কায়িক পরিশ্রম এবং ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

এ যুগের ছেলে-মেয়েরা, যুবক-যুবতীরা বেশি ফাস্টফুড আহার করে তারা মুটিয়ে যায় এবং বার্ধক্যের আগেই বার্ধক্যে উপনীত হয়। মেদ বহুল ব্যক্তির খাদ্যের প্রয়োজন বেশি কিন্তু তাতে স্নেহ জাতীয় খাবার কম থাকা উচিত, পক্ষান্তরে ক্ষীণ দেহ ব্যক্তির খাদ্যের প্রয়োজন কম কিন্তু তা স্নেহ জাতীয় হওয়া উচিত। মেদ বহুল ব্যক্তিদের এই যে রুগ্নতা যা একটি সামাজিক সমস্যাও বটে। যদি কেউ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হয়, তারা সুখী হতে পারে না এবং জাতির জন্যও তারা কোনো অবদান রাখতে পারে না। সুতরাং এসব বাধা বিপত্তি এড়িয়ে চলার জন্য যুব সমাজকে এখনই সচেতন হতে হবে এবং আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকে ব্যায়াম করতে হবে।

ব্যায়াম ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কাজেই প্রতিটি স্কুল, কলেজে সঠিকভাবে ব্যায়ামের জন্য পাঠ্যসূচি থাকা উচিত। যারা ব্যায়ামের ওপরে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ তাদের ক্লাস নেয়ার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করেন। প্রতিটি স্কুল-কলেজে খেলার মাঠ থাকতে হবে। শরীর চর্চা ও খেলাধুলাতে জীবনের প্রথম থেকেই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন; যাতে করে এর সুফল সারাজীবন ধরে ভোগ করা যায়।

অফিস, আদালত, কর্মক্ষেত্রে ব্যায়ামাগার থাকাও প্রয়োজন। বিশ্রাম, আনন্দ এবং সুস্থ দেহ মন কাজের গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্যায়ামের বিকল্প ব্যায়াম ছাড়া আর ভালো কিছু হতে পারে না।

মনের জন্য যেমন গান-দেহের জন্য তেমন ব্যায়ামের প্রয়োজন। সুস্থ আত্মা শারীরিক উন্নতির জন্য সহায়ক। আর সুস্থ দেহ মনকে উন্নত ও দৃঢ় করে এবং জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করে। নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ব্যায়াম করার মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অতিরিক্ত মোটা হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

মানুষের শরীর একটি দুর্গ বিশেষ। একে শত্র“র আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলে শরীর চর্চার মাধ্যমে অবশ্যই সুদৃঢ় করতে হবে।

চল্লিশ হল তারুণ্যের বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার সময়। আর পঞ্চাশ হল বার্ধক্যের তারুণ্য। সব রোগ একটি বয়সের দিকেই দৌঁড়ায়-আর সেটি হচ্ছে বার্ধক্য। সময়ের কাছে সবাইকে আÍসমর্পণ করতে হয়। তবু আমরা যতদূর সম্ভব প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করি। রুগ্ন দেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে। সুখের বিপরীত নাম হল অসুখ। অসুখ হলেই আমরা বুঝতে পারি সুস্থ থাকা কতটা জরুরি। সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন দিতে পারে আপনাকে, আমাকে দীর্ঘ জীবন। আমরা সবাই দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করি। আমাদের সবার উচিত, শারীরিক, কায়িক পরিশ্রম করা। ব্যায়ামের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সময় বের করে নেয়া। সকালের ব্যায়াম শরীরের জন্য বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশি উপকারী। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা, শরীরের ঘাম ঝরানো-মনকে সতেজ করে, বিষণ্ণতা দূর করে, ঘুম ভালো হয়, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কাজেই আর দেরি নয়, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, শরীরটাকে সুস্থ রাখুন। সবারই সচেতন হতে হবে, তার কর্মে, বিশ্রামে এবং ব্যায়ামে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

নিয়মিত ব্যায়ামে সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন

 ডা. রফিক আহমেদ 
২৮ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ থেকে ২ হাজার ৫শ’ বছর আগে আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রেটিস বলে গেছেন মানুষের জন্য সেরা ওষুধ হল- হাঁটা। চিকিৎসা শাস্ত্রেই যে হাঁটা বা ব্যায়ামের উপকারিতা জানানো হয়েছে তা নয় এর ব্যাপকতা শরীর চর্চা, বাত ব্যথা, প্যারালাইসিসসহ আরও অনেক জায়গায় স্থান পেয়েছে। ব্যায়াম বলতে আমরা বুঝি শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম অথবা নিয়মিত এমন কিছু করা যার ফলে শরীর হয় প্রশান্ত এবং মানসিক অশান্তি হয় দূরীভূত। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করা আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা সবার জন্য অপরিহার্য। ব্যায়াম একজন মানুষের মানসিক এবং শারীরিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে কারণেই বলা হয়েছে ‘সুস্থ মন সুস্থ দেহ’। আমাদের শরীর অসার (মৃত) হওয়া অর্থ আমাদের মনেরও মৃত্যু ঘটা। সুতরাং শরীরকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত নিয়মিত এবং পরিমিত ব্যায়াম করা।

ব্যায়াম আমাদের শরীরকে শারীরিক যোগ্যতা এবং স্বাস্থ্য সবলতা ঠিক রাখে। সুস্থ সতেজ রাখে। কেবলমাত্র তাই নয়, আমাদের শরীরের পুনঃগঠনের বিশেষ অবদান রাখে। ব্যায়াম আমাদের পেশিশক্তি বৃদ্ধি করে, ওজন কমানোয় সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যায়াম তারুণ্যকে ধরে রাখতে এবং বয়স ও বার্ধক্যের গতি কমিয়ে দেয়। ব্যায়াম হৃদপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হৃদযন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ব্যায়াম আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং অনেক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

ব্যায়াম হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস না হতে সাহায্য করে এবং অনেক ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা পালন করে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। স্বাস্থ্যই মানুষের মূল্যবান সম্পদ।

যেসব কারণে ব্যায়ামের প্রয়োজন

নিয়মিত, পরিমিত ব্যায়াম যারা করেন তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং স্বাস্থ্য সবলতা বজায় থাকে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শারীরিক, কায়িক পরিশ্রম এবং ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

এ যুগের ছেলে-মেয়েরা, যুবক-যুবতীরা বেশি ফাস্টফুড আহার করে তারা মুটিয়ে যায় এবং বার্ধক্যের আগেই বার্ধক্যে উপনীত হয়। মেদ বহুল ব্যক্তির খাদ্যের প্রয়োজন বেশি কিন্তু তাতে স্নেহ জাতীয় খাবার কম থাকা উচিত, পক্ষান্তরে ক্ষীণ দেহ ব্যক্তির খাদ্যের প্রয়োজন কম কিন্তু তা স্নেহ জাতীয় হওয়া উচিত। মেদ বহুল ব্যক্তিদের এই যে রুগ্নতা যা একটি সামাজিক সমস্যাও বটে। যদি কেউ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হয়, তারা সুখী হতে পারে না এবং জাতির জন্যও তারা কোনো অবদান রাখতে পারে না। সুতরাং এসব বাধা বিপত্তি এড়িয়ে চলার জন্য যুব সমাজকে এখনই সচেতন হতে হবে এবং আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকে ব্যায়াম করতে হবে।

ব্যায়াম ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কাজেই প্রতিটি স্কুল, কলেজে সঠিকভাবে ব্যায়ামের জন্য পাঠ্যসূচি থাকা উচিত। যারা ব্যায়ামের ওপরে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ তাদের ক্লাস নেয়ার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করেন। প্রতিটি স্কুল-কলেজে খেলার মাঠ থাকতে হবে। শরীর চর্চা ও খেলাধুলাতে জীবনের প্রথম থেকেই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন; যাতে করে এর সুফল সারাজীবন ধরে ভোগ করা যায়।

অফিস, আদালত, কর্মক্ষেত্রে ব্যায়ামাগার থাকাও প্রয়োজন। বিশ্রাম, আনন্দ এবং সুস্থ দেহ মন কাজের গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্যায়ামের বিকল্প ব্যায়াম ছাড়া আর ভালো কিছু হতে পারে না।

মনের জন্য যেমন গান-দেহের জন্য তেমন ব্যায়ামের প্রয়োজন। সুস্থ আত্মা শারীরিক উন্নতির জন্য সহায়ক। আর সুস্থ দেহ মনকে উন্নত ও দৃঢ় করে এবং জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করে। নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ব্যায়াম করার মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অতিরিক্ত মোটা হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

মানুষের শরীর একটি দুর্গ বিশেষ। একে শত্র“র আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলে শরীর চর্চার মাধ্যমে অবশ্যই সুদৃঢ় করতে হবে।

চল্লিশ হল তারুণ্যের বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার সময়। আর পঞ্চাশ হল বার্ধক্যের তারুণ্য। সব রোগ একটি বয়সের দিকেই দৌঁড়ায়-আর সেটি হচ্ছে বার্ধক্য। সময়ের কাছে সবাইকে আÍসমর্পণ করতে হয়। তবু আমরা যতদূর সম্ভব প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করি। রুগ্ন দেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে। সুখের বিপরীত নাম হল অসুখ। অসুখ হলেই আমরা বুঝতে পারি সুস্থ থাকা কতটা জরুরি। সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন দিতে পারে আপনাকে, আমাকে দীর্ঘ জীবন। আমরা সবাই দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করি। আমাদের সবার উচিত, শারীরিক, কায়িক পরিশ্রম করা। ব্যায়ামের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সময় বের করে নেয়া। সকালের ব্যায়াম শরীরের জন্য বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশি উপকারী। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা, শরীরের ঘাম ঝরানো-মনকে সতেজ করে, বিষণ্ণতা দূর করে, ঘুম ভালো হয়, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কাজেই আর দেরি নয়, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, শরীরটাকে সুস্থ রাখুন। সবারই সচেতন হতে হবে, তার কর্মে, বিশ্রামে এবং ব্যায়ামে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন