বিনামূল্যে হ্যালো অক্সিজেন সেবা
jugantor
বিনামূল্যে হ্যালো অক্সিজেন সেবা

  সুস্থ থাকুন ডেস্ক  

৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করছে দুঃখ এবং সুখের গল্প, একটি জীবন রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এ সিলিন্ডার। বিপদের মুহূর্তে একটা অক্সিজেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলতে পারবে ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরাম ও ফুলগাজীর একজন রোগীই। জেলা সদর ও অন্য উপজেলাগুলোর চেয়ে একটু অনগ্রসর এ দুটি উপজেলা।

করোনা মহামারিতে পিছিয়ে পড়া এ জনপদের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ইয়াছিন শরীফ মজুমদার নামে এক যুবক।

পরশুরাম উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হলেও করোনাকালীন মরদেহ দাফন, সৎকার ও রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দেওয়ায় দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে পরিচিতি লাভ করেন স্বেচ্ছাসেবকের। ইতোমধ্যেই তার কর্মকাণ্ডের কথা ছড়িয়ে পড়ে পুরো জেলায়, তার দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে এসেছেন মানবিক এসব কাজে। পরশুরাম-ফুলগাজীর শ্বাসকষ্টের রোগীর স্বজনরা তাকে সীমান্তের অক্সিজেন ‘হিরো’ বলে চিনতে শুরু করেছেন। দিন কি রাত ২৪ ঘণ্টাই অক্সিজেন নিয়ে ছুটছেন তিনি।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদারের ‘হ্যালো অক্সিজেন সেবা’ কার্যক্রমে ১ বছরে সেবা পেয়েছে ১ হাজারের অধিক রোগী। ইতোমধ্যেই তার এ উদ্যোগটি সীমান্তবর্তী ফুলগাজী ও পরশুরাম এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। করোনা আক্রান্ত কিংবা যে কোনো ধরনের শ্বাসকষ্ট রোগীর অক্সিজেন দরকার হলেই ডাক পড়ছে হ্যালো অক্সিজেনের।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদার বলেন, ২০২০ সালের ২০ জুলাই ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন ৩০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে সেবা কার্যক্রম চলছে প্রতিনিয়তই।

এক বছরে রয়েছে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা। কিছু ভালো না আর কিছু দুঃখের অভিজ্ঞতায় কেটেছে গত বছর। অক্সিজেন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য মানুষ কেমন কষ্ট করে। আমাদের অক্সিজেন সেবা নিয়ে অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আবার এমনও স্মৃতি আছে অক্সিজেন নিয়ে যেতে যেতেই রোগী মারা গেছেন।

তেমনই একটি ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি, পরশুরাম পৌর এলাকায় কোলাপাড়া গ্রামের কোভিড আক্রান্ত রোগী গিয়াস উদ্দিনের জন্য তার স্বজন অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য কল দেন, বৃষ্টির মধ্যে আমরা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেখি রোগীর স্বজনদের কান্নার আহাজারি। তারা বলছেন কার জন্য অক্সিজেন নিয়ে আসছেন..., সত্যিই এ রকম হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি আর কখনো হতে হয়নি।

গত বছর অনেক দুঃখ-কষ্ট এবং স্বজনহারাদের কান্নার দৃশ্য দেখেছি, সত্যিই অনেক অনেক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। ক’দিন তার বাবা মারা গেছেন আজকে ৫ দিনের মাথার ছেলের মৃত্যু, মা-বোনের কান্নার দৃশ্য প্রতি মুহূর্তে চোখে ভেসে উঠছে, কিছুতেই এ দৃশ্য চোখের সামনে থেকে যাচ্ছে না।

ইয়াছিন শরীফ জানান, তার অক্সিজেন টিমে কাজ করছেন আবদুর রহিম হৃদয়, নুরুল ইসলাম সিজান, আমিনুল ইসলাম রানা, সাইফুল ইসলাম, জোটনচন্দ্র দাস, আজিজুল হাকিম আরাফাতসহ বেশ কয়েকজন যুবক।

ফোন করলেই বাসায় গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংযোগ দিয়ে আসছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। শুধু করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীই নন, অন্যান্য রোগীর জন্যও অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে তারাও বিনামূল্যে এ সেবা পাচ্ছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এতে বেড়ে গেছে অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদা। এর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে সংকটও। উচ্চমূল্যেও অক্সিজেন সিলিন্ডার পাচ্ছেন না অনেক রোগী। আমাদের মফস্বলেও এ সমস্যা ব্যাপক।

অনেকে তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। তাই প্রাথমিকভাবে সহযোগিতার জন্য এ উদ্যোগ নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে ৫টি সিলিন্ডার নিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করা হলেও এখন অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে ৩০টি। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে কার্যক্রমে সহায়তা করে আসছেন। সবার সহযোগিতায় এ কার্যক্রমে প্রসারতা আরও বাড়ানো হবে। ইয়াছিন শরীফ জানান, সিলিন্ডার বিভিন্ন মানুষ দিলেও রি-ফিল তিনি নিজেই করিয়ে থাকেন। প্রতি রি-ফিল আগে ১৫০ টাকা খরচ হলেও এখন খরচ হচ্ছে ২০০ টাকা। চাহিদা দেখে একটি মহল অক্সিজেনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার যে কোনো এলাকা থেকে ০১৮১৮৩৯৭৪৯৬, ০১৬৩২৪২২১৭৩, ০১৮৫০৫৯২৮৯১ নম্বরে ফোন করলে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ফি কিংবা জামানত নেওয়া হচ্ছে না। তবে, এ সেবা পেতে হলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয় রোগীদের।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদার উপজেলায় করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির দাফনের জন্য গঠনকৃত ‘করোনা দাফন’ টিমের প্রধান হিসাবেও উপজেলায় কাজ করছেন। ২০ জুলাই পর্যন্ত ৩১ জনের মরদেহ দাফন করেছে তার দাফন টিম।

বিনামূল্যে হ্যালো অক্সিজেন সেবা

 সুস্থ থাকুন ডেস্ক 
৩১ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করছে দুঃখ এবং সুখের গল্প, একটি জীবন রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এ সিলিন্ডার। বিপদের মুহূর্তে একটা অক্সিজেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলতে পারবে ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরাম ও ফুলগাজীর একজন রোগীই। জেলা সদর ও অন্য উপজেলাগুলোর চেয়ে একটু অনগ্রসর এ দুটি উপজেলা।

করোনা মহামারিতে পিছিয়ে পড়া এ জনপদের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ইয়াছিন শরীফ মজুমদার নামে এক যুবক।

পরশুরাম উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হলেও করোনাকালীন মরদেহ দাফন, সৎকার ও রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দেওয়ায় দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে পরিচিতি লাভ করেন স্বেচ্ছাসেবকের। ইতোমধ্যেই তার কর্মকাণ্ডের কথা ছড়িয়ে পড়ে পুরো জেলায়, তার দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে এসেছেন মানবিক এসব কাজে। পরশুরাম-ফুলগাজীর শ্বাসকষ্টের রোগীর স্বজনরা তাকে সীমান্তের অক্সিজেন ‘হিরো’ বলে চিনতে শুরু করেছেন। দিন কি রাত ২৪ ঘণ্টাই অক্সিজেন নিয়ে ছুটছেন তিনি।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদারের ‘হ্যালো অক্সিজেন সেবা’ কার্যক্রমে ১ বছরে সেবা পেয়েছে ১ হাজারের অধিক রোগী। ইতোমধ্যেই তার এ উদ্যোগটি সীমান্তবর্তী ফুলগাজী ও পরশুরাম এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। করোনা আক্রান্ত কিংবা যে কোনো ধরনের শ্বাসকষ্ট রোগীর অক্সিজেন দরকার হলেই ডাক পড়ছে হ্যালো অক্সিজেনের।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদার বলেন, ২০২০ সালের ২০ জুলাই ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন ৩০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে সেবা কার্যক্রম চলছে প্রতিনিয়তই।

এক বছরে রয়েছে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা। কিছু ভালো না আর কিছু দুঃখের অভিজ্ঞতায় কেটেছে গত বছর। অক্সিজেন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য মানুষ কেমন কষ্ট করে। আমাদের অক্সিজেন সেবা নিয়ে অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আবার এমনও স্মৃতি আছে অক্সিজেন নিয়ে যেতে যেতেই রোগী মারা গেছেন।

তেমনই একটি ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি, পরশুরাম পৌর এলাকায় কোলাপাড়া গ্রামের কোভিড আক্রান্ত রোগী গিয়াস উদ্দিনের জন্য তার স্বজন অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য কল দেন, বৃষ্টির মধ্যে আমরা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেখি রোগীর স্বজনদের কান্নার আহাজারি। তারা বলছেন কার জন্য অক্সিজেন নিয়ে আসছেন..., সত্যিই এ রকম হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি আর কখনো হতে হয়নি।

গত বছর অনেক দুঃখ-কষ্ট এবং স্বজনহারাদের কান্নার দৃশ্য দেখেছি, সত্যিই অনেক অনেক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। ক’দিন তার বাবা মারা গেছেন আজকে ৫ দিনের মাথার ছেলের মৃত্যু, মা-বোনের কান্নার দৃশ্য প্রতি মুহূর্তে চোখে ভেসে উঠছে, কিছুতেই এ দৃশ্য চোখের সামনে থেকে যাচ্ছে না।

ইয়াছিন শরীফ জানান, তার অক্সিজেন টিমে কাজ করছেন আবদুর রহিম হৃদয়, নুরুল ইসলাম সিজান, আমিনুল ইসলাম রানা, সাইফুল ইসলাম, জোটনচন্দ্র দাস, আজিজুল হাকিম আরাফাতসহ বেশ কয়েকজন যুবক।

ফোন করলেই বাসায় গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংযোগ দিয়ে আসছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। শুধু করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীই নন, অন্যান্য রোগীর জন্যও অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে তারাও বিনামূল্যে এ সেবা পাচ্ছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এতে বেড়ে গেছে অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদা। এর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে সংকটও। উচ্চমূল্যেও অক্সিজেন সিলিন্ডার পাচ্ছেন না অনেক রোগী। আমাদের মফস্বলেও এ সমস্যা ব্যাপক।

অনেকে তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। তাই প্রাথমিকভাবে সহযোগিতার জন্য এ উদ্যোগ নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে ৫টি সিলিন্ডার নিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করা হলেও এখন অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে ৩০টি। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে কার্যক্রমে সহায়তা করে আসছেন। সবার সহযোগিতায় এ কার্যক্রমে প্রসারতা আরও বাড়ানো হবে। ইয়াছিন শরীফ জানান, সিলিন্ডার বিভিন্ন মানুষ দিলেও রি-ফিল তিনি নিজেই করিয়ে থাকেন। প্রতি রি-ফিল আগে ১৫০ টাকা খরচ হলেও এখন খরচ হচ্ছে ২০০ টাকা। চাহিদা দেখে একটি মহল অক্সিজেনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার যে কোনো এলাকা থেকে ০১৮১৮৩৯৭৪৯৬, ০১৬৩২৪২২১৭৩, ০১৮৫০৫৯২৮৯১ নম্বরে ফোন করলে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ফি কিংবা জামানত নেওয়া হচ্ছে না। তবে, এ সেবা পেতে হলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয় রোগীদের।

ইয়াছিন শরীফ মজুমদার উপজেলায় করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির দাফনের জন্য গঠনকৃত ‘করোনা দাফন’ টিমের প্রধান হিসাবেও উপজেলায় কাজ করছেন। ২০ জুলাই পর্যন্ত ৩১ জনের মরদেহ দাফন করেছে তার দাফন টিম।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন