ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে হাত জীবাণুমুক্তকরণ
jugantor
ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে হাত জীবাণুমুক্তকরণ

  ডা. জুহায়ের সাদমান খান  

৩১ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত দেড় বছরব্যাপী বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যবিধির আদর্শে আত্মরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনধারায় অনেক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মাস্ক ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধৌতকরণের মতো অভ্যাস আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোভিড সংক্রমণ রুখতে হাত জীবাণুমুক্ত রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। সারা দিনে সচেতন-অবচেতনভাবে বিভিন্ন জায়গায় হাতের ছোঁয়া লেগেই থাকে এবং তার ফলে যে কোনোভাবেই হাতে জীবাণু এসে পড়তে পারে। সেই হাত জীবাণুমুক্ত না করে অন্যান্য জায়গায় স্পর্শ করলে কিংবা নিজের বা অন্যের মুখায়ব স্পর্শ করলে খুব সহজেই এ ভাইরাস সংক্রমণ হওয়া সম্ভব।

হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো সাবান দিয়ে দু’হাতের সব নখ এবং ভাঁজসহ প্রতিটি অংশকে ২০ সেকেন্ড ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘষে কলের প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর শুকনো তোয়ালে কিংবা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে ফেলা। এতে করে হাতের ওপর জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের ময়লা দূর হওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাসসহ অধিকাংশ অণুবীক্ষণিক জীবাণু অকার্যকর হয়ে যায় এবং এদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকখানিই কমে যায়।

খাবারের আগে-পরে, ওয়াশরুম ব্যবহারের পরে, মুখ হাত দিয়ে ঢেকে হাঁচি-কাশি দেওয়ার আগে-পরে এবং যে কোনো বস্তু স্পর্শ করার আগে-পরে হাত ধুয়ে নেওয়া অবশ্যই উচিত। নিজ মুখমণ্ডলের যে কোনো অংশ (বিশেষ করে নাক, চোখ, ঠোঁট, মুখগহ্বর) ধরার আগে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে যে কোনো রোগীর শরীর (কোভিড পজিটিভ কিংবা নেগেটিভ) স্পর্শ করার আগে-পরে হাত পরিষ্কার করা অতি প্রয়োজনীয়।

নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ এবং সময় আমাদের ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনে নেই বললেই চলে। অধিকাংশ পাবলিক স্পটে (যেমন বাজারহাট) কিংবা অফিস আদালতে পর্যাপ্তভাবে হাইজেনিক স্যানিটেশনের অভাব দেখা যায়। বড় শহরগুলোতে যানজটে আটকে থেকে রাস্তায় কেটে যায় নাগরিকদের অনেকটুকু সময়।

এসব সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও মৌলিক সচেতনতার বৃদ্ধির ফলস্বরূপে এ মহামারিতে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বিভিন্ন ধরনের এলকোহল বেইজড হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

করোনাভাইরাস একটি ‘এনভেলোপড’ ভাইরাস-যার অর্থ হলো তার ভেতরে অবস্থিত ‘জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল’ (যেটার ফলে তারা বেঁচে থাকে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়) একটি লিপিডের ‘মলাট’ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং সুরক্ষিত।

এলকোহল বেইজড স্যানিটাইজার এ সুরক্ষাবলয়কেই ধ্বংস করে এবং সেটির ফলে পুরো ভাইরাসটিই অকার্যকর হয়ে যায়, এবং সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

‘সিডিসি’র পরামর্শ অনুযায়ী হ্যান্ড স্যানিটাইজারে এন্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করার জন্য তার মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ এলকোহল কন্টেন্ট থাকা জরুরি।

বিভিন্ন গবেষণাতে দেখা গেছে, ইথানোল বেইজড স্যানিটাইজারগুলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং এর সঙ্গে অল্প পরিমাণ আইসোপ্রোপাইল এলকোহলজুড়ে দিলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায় (বাজারে ক্লিনজেল, কেয়ার-অন, হ্যান্ডিজেল ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়)। হাতের সতেজতা রক্ষা করার জন্য গ্লিসারলসমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারও বাজারে চলছে (হ্যান্ডিসেইফ, হাইজিনেক্স প্রমুখ)।

বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে সবচেয়ে সহজলভ্য হলো ৭০ শতাংশ আইসোপ্রোপাইল এলকোহলের সঙ্গে ০.৫ শতাংশ ক্লোরহেক্সিডিন গ্লৌকোনেট মিশ্রিত সল্যুশন-যেগুলো হেক্সিসল, স্যানিটাইজা, জার্মিসল, ক্লোরোসল, ক্লিনসল, কেভিরাব ইত্যাদি নামে বর্তমানে সুলভমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। এরাও ভাইরাসের কার্যক্ষমতা লোপে দারুণ অবদান রাখে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাতভিত্তিক যে কোনো ধরনের কাজ করার আগে-পরে পর্যাপ্ত পরিমাণ (কমপক্ষে ৩ মিলি) সল্যুশন দুই হাতে নিয়ে যত্নসহকারে নখ এবং ভাজগুলোসহ সব অংশে মেখে নিতে হবে।

বারবার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার চেয়ে স্যানিটাইজার ব্যবহার করা অনেকখানি সহজ এবং সময় সংরক্ষণকারী পদ্ধতি।

আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই নিজ শরীরে এলকোহলের প্রয়োগ নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে।

বলে রাখা শ্রেয় যে ইসলামিক স্কলারদের মতে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শরীরকে জীবাণুমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে নন-ফার্মেন্টেড সিন্থেটিক এলকোহল প্রয়োগকে ‘তাহির’ (স্পর্শে হালাল) হিসাবে গণ্য করা হয় এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ব্যবহৃত এলকোহল যেহেতু এসব মানদণ্ড পূরণ করে, তাই এটির সঠিক ব্যবহারে শরীর কখনোই ‘নাপাক’ হবে না।

লেখক : রেজিস্ট্রার, সার্জারি বিভাগ, ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে হাত জীবাণুমুক্তকরণ

 ডা. জুহায়ের সাদমান খান 
৩১ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত দেড় বছরব্যাপী বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যবিধির আদর্শে আত্মরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনধারায় অনেক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মাস্ক ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধৌতকরণের মতো অভ্যাস আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোভিড সংক্রমণ রুখতে হাত জীবাণুমুক্ত রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। সারা দিনে সচেতন-অবচেতনভাবে বিভিন্ন জায়গায় হাতের ছোঁয়া লেগেই থাকে এবং তার ফলে যে কোনোভাবেই হাতে জীবাণু এসে পড়তে পারে। সেই হাত জীবাণুমুক্ত না করে অন্যান্য জায়গায় স্পর্শ করলে কিংবা নিজের বা অন্যের মুখায়ব স্পর্শ করলে খুব সহজেই এ ভাইরাস সংক্রমণ হওয়া সম্ভব।

হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো সাবান দিয়ে দু’হাতের সব নখ এবং ভাঁজসহ প্রতিটি অংশকে ২০ সেকেন্ড ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘষে কলের প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর শুকনো তোয়ালে কিংবা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে ফেলা। এতে করে হাতের ওপর জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের ময়লা দূর হওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাসসহ অধিকাংশ অণুবীক্ষণিক জীবাণু অকার্যকর হয়ে যায় এবং এদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকখানিই কমে যায়।

খাবারের আগে-পরে, ওয়াশরুম ব্যবহারের পরে, মুখ হাত দিয়ে ঢেকে হাঁচি-কাশি দেওয়ার আগে-পরে এবং যে কোনো বস্তু স্পর্শ করার আগে-পরে হাত ধুয়ে নেওয়া অবশ্যই উচিত। নিজ মুখমণ্ডলের যে কোনো অংশ (বিশেষ করে নাক, চোখ, ঠোঁট, মুখগহ্বর) ধরার আগে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে যে কোনো রোগীর শরীর (কোভিড পজিটিভ কিংবা নেগেটিভ) স্পর্শ করার আগে-পরে হাত পরিষ্কার করা অতি প্রয়োজনীয়।

নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ এবং সময় আমাদের ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনে নেই বললেই চলে। অধিকাংশ পাবলিক স্পটে (যেমন বাজারহাট) কিংবা অফিস আদালতে পর্যাপ্তভাবে হাইজেনিক স্যানিটেশনের অভাব দেখা যায়। বড় শহরগুলোতে যানজটে আটকে থেকে রাস্তায় কেটে যায় নাগরিকদের অনেকটুকু সময়।

এসব সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও মৌলিক সচেতনতার বৃদ্ধির ফলস্বরূপে এ মহামারিতে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বিভিন্ন ধরনের এলকোহল বেইজড হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

করোনাভাইরাস একটি ‘এনভেলোপড’ ভাইরাস-যার অর্থ হলো তার ভেতরে অবস্থিত ‘জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল’ (যেটার ফলে তারা বেঁচে থাকে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়) একটি লিপিডের ‘মলাট’ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং সুরক্ষিত।

এলকোহল বেইজড স্যানিটাইজার এ সুরক্ষাবলয়কেই ধ্বংস করে এবং সেটির ফলে পুরো ভাইরাসটিই অকার্যকর হয়ে যায়, এবং সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

‘সিডিসি’র পরামর্শ অনুযায়ী হ্যান্ড স্যানিটাইজারে এন্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করার জন্য তার মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ এলকোহল কন্টেন্ট থাকা জরুরি।

বিভিন্ন গবেষণাতে দেখা গেছে, ইথানোল বেইজড স্যানিটাইজারগুলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং এর সঙ্গে অল্প পরিমাণ আইসোপ্রোপাইল এলকোহলজুড়ে দিলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায় (বাজারে ক্লিনজেল, কেয়ার-অন, হ্যান্ডিজেল ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়)। হাতের সতেজতা রক্ষা করার জন্য গ্লিসারলসমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারও বাজারে চলছে (হ্যান্ডিসেইফ, হাইজিনেক্স প্রমুখ)।

বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে সবচেয়ে সহজলভ্য হলো ৭০ শতাংশ আইসোপ্রোপাইল এলকোহলের সঙ্গে ০.৫ শতাংশ ক্লোরহেক্সিডিন গ্লৌকোনেট মিশ্রিত সল্যুশন-যেগুলো হেক্সিসল, স্যানিটাইজা, জার্মিসল, ক্লোরোসল, ক্লিনসল, কেভিরাব ইত্যাদি নামে বর্তমানে সুলভমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। এরাও ভাইরাসের কার্যক্ষমতা লোপে দারুণ অবদান রাখে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাতভিত্তিক যে কোনো ধরনের কাজ করার আগে-পরে পর্যাপ্ত পরিমাণ (কমপক্ষে ৩ মিলি) সল্যুশন দুই হাতে নিয়ে যত্নসহকারে নখ এবং ভাজগুলোসহ সব অংশে মেখে নিতে হবে।

বারবার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার চেয়ে স্যানিটাইজার ব্যবহার করা অনেকখানি সহজ এবং সময় সংরক্ষণকারী পদ্ধতি।

আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই নিজ শরীরে এলকোহলের প্রয়োগ নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে।

বলে রাখা শ্রেয় যে ইসলামিক স্কলারদের মতে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শরীরকে জীবাণুমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে নন-ফার্মেন্টেড সিন্থেটিক এলকোহল প্রয়োগকে ‘তাহির’ (স্পর্শে হালাল) হিসাবে গণ্য করা হয় এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ব্যবহৃত এলকোহল যেহেতু এসব মানদণ্ড পূরণ করে, তাই এটির সঠিক ব্যবহারে শরীর কখনোই ‘নাপাক’ হবে না।

লেখক : রেজিস্ট্রার, সার্জারি বিভাগ, ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন