শিশুদের পেটব্যথার কারণ ও সমাধান
jugantor
মেডিসিন ও সার্জিক্যাল পর্ব (৩)
শিশুদের পেটব্যথার কারণ ও সমাধান

  অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নবজাতক থেকে শুরু করে স্কুলগামী বেশিরভাগ শিশুই জীবনের কোনো না কোনো সময় পেটব্যথায় ভোগে। পেটব্যথা বিভিন্ন কারণে হয়। যেমন, খাদ্যনালিতে জীবাণু সংক্রমণ ও ডায়রিয়া বা আমাশয়, প্রস্রাবে সংক্রমণ, গ্যাস ও অ্যাসিডিটি, খাবারে অ্যালার্জি, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম এবং কৃমি সংক্রমণ। এ ছাড়া টিউমার, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ কিছু সার্জিক্যাল সমস্যায়ও শিশুর পেটব্যথা হতে পারে।

স্কুলগামী শিশুর মানসিক সমস্যার কারণে অথবা কিছু শিশু বাবা-মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ কিংবা সহানুভূতি পাওয়ার জন্য অকারণে পেটব্যথার কথা বলে থাকে।

এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন

অকারণে পেটব্যথা

৩ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুর ঘন ঘন পেটব্যথার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশই কোনো রোগের জন্য হয় না। এটাই হলো অকারণে পেটে ব্যথা বা ‘ফাংশনাল এবডোমিনাল পেইন’। এ ধরনের ব্যথার নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। মানসিক কারণে সাধারণত এমন সমস্যা হয়ে থাকে। এ ধরনের পেটব্যথায় শিশুরা অত্যধিক মানসিক চাপে ভোগে, কিছুটা সিরিয়াস প্রকৃতির হয়ে থাকে। শিশু স্কুলে যেতে না চাইলে, পড়া ভালো না লাগলে, পরিবারে অশান্তি থাকলে, বন্ধুরা কোনো বিষয় নিয়ে উত্ত্যক্ত করলে, হঠাৎ বাসা পরিবর্তন বা বন্ধু বিচ্ছেদ ইত্যাদির কারণে পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ব্যথা কিন্তু ইচ্ছাকৃত নয়, বরং তার মনের ভেতরের মানসিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে পেটব্যথার মাধ্যমে।

মানসিক ও শারীরিক কারণে ব্যথার মধ্যে পার্থক্য

* তিন বছরের নিচে শিশুর পেটব্যথা হলে তা সাধারণত রোগের কারণেই হয়ে থাকে।

* রোগের কারণে ব্যথা হলে শিশুরা সুনির্দিষ্টভাবে ব্যথার জায়গাটা দেখাতে পারে আর মানসিক কারণে হলে সেভাবে দেখাতে পারে না বা একেকবার একেক স্থানে দেখায়।

* ব্যথার সঙ্গে জ্বর, র‌্যাশ, হাড়ে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হলে বুঝতে হবে অবশ্যই সেই ব্যথার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

* ঘুমের মধ্যে ব্যথা হলে এবং ব্যথার কারণে শিশুর ঘুম ভেঙে গেলে কখনোই তা মানসিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

গ্যাসজনিত ব্যথা

বড়দের মতো শিশুদেরও পেটে গ্যাস হয়। নবজাতকের পেটে গ্যাস হয় মায়ের দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতির ত্রুটির কারণে। এতে বাচ্চারা বাতাস খেয়ে ফেলে, তাই পেটে গ্যাস হয়। বাচ্চাদের মধ্যে কান্না খুব স্বাভাবিক কারণ। কান্নার মাধ্যমে শিশুরা তাদের অস্বস্তি প্রকাশ করে এবং তাদের প্রয়োজনীয়তার প্রতি পিতামাতার মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদি শিশু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ক্রমাগত অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁদতে থাকে তবে সেটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

তিন মাসের অধিক পেটব্যথা

তিন মাসের অধিক পেট ব্যথা সাধারণত কোনো গুরুতর অসুস্থতা বা রোগের কারণে হয় না। তিন থেকে চার মাসের কম বয়সি শিশুরা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাঁদতে থাকলে এবং প্রতিদিন বা সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন সন্ধ্যার পর থেকে এবং প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে অবিরত কাঁদতে থাকলে তবে তা সাধারণত এ ধরনের পেটব্যথা হয়। এটি সাধারণত জন্মের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরে দেখা যায় এবং তিন থেকে চার মাস বয়স হলে আর থাকে না। পরিপাকনালিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ‘গাট মাইক্রোবায়োম’ নামক ব্যাক্টেরিয়াল কলোনি গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে যা পরিপাকনালির অপরিপক্বতা নামে পরিচিত। এ ধরনের ব্যথার ক্ষেত্রে বুকে ও পিঠে হাত দিয়ে মালিশ করলে, তলপেটের দিকে চেপে ধরলে শিশুর আরামবোধ হয়।

গ্যাসজনিত ব্যথা

শিশুদের একইসঙ্গে নানা রকমের খাবার খাওয়ানো শুরু করলে গ্যাসজনিত ব্যথা দেখা দেয়। এ ছাড়া, বড় শিশুরা অতি ভোজন, মসলাযুক্ত বা তৈলাক্ত কিংবা ঝাল খাবার, আচার ইত্যাদি খেলে পেটে এসিডিটি হয়ে ব্যথা হয়। এ ক্ষেত্রে এসিডিটির ওষুধ খেতে হবে। তবে ব্যথা প্রকট হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য

যেসব শিশু গরুর দুধ বা বোতলের দুধ খায়, পাশাপাশি ৬ মাসের পর অপরিকল্পিতভাবে অন্য কঠিন খাবার খেতে শুরু করে বা শুধু সুজি, চালের গুঁড়ার খাবার খায়-তাদের পেটে ব্যথার অন্যতম কারণ কোষ্ঠকাঠিন্য। দুই কিংবা তিন দিন ধরে ঠিকমতো পায়খানা না হলে তা পেটের ভেতর জমে থেকে ব্যথার সৃষ্টি করে। এজন্য শিশুকে নরম খাবার দিতে হবে। অবস্থা জটিল হলে শক্ত খাবারের পরিবর্তে তরলজাতীয় খাবার যেমন সাগুদানা, মাতৃদুগ্ধ বেশি বেশি খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া কিছু ব্যায়াম করানো যেতে পারে যেমন সাইকেলের মতো শিশুর পা দুটোকে চালনা করা। বড় শিশুদের শাক-সবজি, আঁশযুক্ত খাবার ও ফল-মূল খাওয়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মলত্যাগ করায় অভ্যস্ত করতে হবে।

খাবার কিংবা দুধে অ্যালার্জি

শিশুর কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়ানোর ফলে পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে গরুর দুধ বা গুঁড়াদুধের casein-lactalbumin and μ¦ lactoglobulin প্রতি অ্যালার্জি থেকে থাকে। অ্যালার্জি আছে বিষয়টি সন্দেহ হলে বা নিশ্চিত হলে তা খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এ ধরনের জটিলতায় অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কৃমি

কৃমি হলে বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, পেট মোটা বা ভারি হওয়া, খাবারে অরুচি, মুখে থুথু ওঠা এবং কোনো কোনো কৃমিতে পায়ুপথের আশপাশে চুলকানি হতে পারে। কৃমি হলে সাধারণত অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। নোংরা পরিবেশ, অনিরাপদ পানি পান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খালি পায়ে হাঁটা কৃমি সংক্রমণের জন্য দায়ী। ওষুধ নিয়ম মেনে খেলে আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সহজেই কৃমি দূর করা যায়। প্রতি তিন মাস পরপর পরিবারের সবাই একটি করে অ্যালবেনডাজল বড়ি সেবন করলে অথবা মেবেনডাজল পরপর তিন দিন খেতে হয়। সাত দিন পর দ্বিতীয় ডোজ খেতে হয়। শিশুদেরও একইভাবে সিরাপ খাওয়াতে হবে। তবে, দুই বছরের নিচে কোনো শিশুকে খাওয়াতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বয়সভেদে সমস্যা ও কারণ

দুই বছরের নিচে শিশুদের সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, ডায়রিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া প্রভৃতি কারণে পেটব্যথা হয়। অন্ত্রে প্যাঁচ খাওয়া বা ইনটাসাসেপশন নামের জটিল সমস্যাও হয়ে থাকে। বড় শিশু ও বালক-বালিকাদের বেলায় এসব ছাড়া কৃমি, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, প্রস্রাবে সংক্রমণ, অগ্ন্যাশয় ও যকৃতে কোনো সমস্যা সন্দেহ করা যেতে পারে। কিশোরীদের বেলায় মাসিক-সংক্রান্ত সমস্যা ও প্রস্রাবের সংক্রমণের দিকে অধিক মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ বয়সের বালক-বালিকার বেলায় মানসিক চাপ ও আঘাত, এমনকি খাদ্যে বিষক্রিয়ার কথাও ভাবতে হবে।

উপদেশ ও সতর্কতা

* নবজাতক ও ছোট শিশুদের প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর বাচ্চার ঢেঁকুর তোলানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে মাথা উঁচু করে সোজা করে খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার খাওয়ানোর পর কাঁধে নিয়ে আস্তেআস্তে তার পিঠে চাপড় দিতে হবে। এতে বাতাস বের হয়ে যায়।

* গ্যাসের সমস্যা এবং শিশুদের পেটব্যথা উপশম করাতে হাঁটু বাঁকানো ব্যায়াম কার্যকর। বাচ্চাকে চিত করে শোওয়ানোর পর তার পা দুটিকে হাঁটুর দিকে ভাঁজ করে পা দুটি পেটের দিকে ঠেলে দিতে হবে। এ ব্যায়ামটি দৈনিক চার থেকে পাঁচবার পুনরাবৃত্তি করলে ভালো।

* ছোট শিশুদের প্রথম খাবারে অভ্যাস করার সময় ধীরে ধীরে প্রথমে তরল, নরম খাবার, তার পর খিচুড়ি বা পিসপাস অর্থাৎ চাল, ডাল, সবজি, ছোট মাছ, মুরগির মাংস, ডিমমিশ্রিত খাবার। কোনো খাবারে অ্যালার্জি আছে কি না, খেয়াল করতে হবে এবং সেটি বাদ দিতে হবে। খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। শিশুদের হাত ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে।

কখন হাসপাতালে নেবেন

ব্যথা যদি খুব তীব্র হয়, সঙ্গে জ্বর থাকে, অনবরত বমি হয়, পেট শক্ত হয়ে যায়, মলের বা বমির সঙ্গে রক্ত দেখা দেয় বা পিত্তবমি হয়, সে ক্ষেত্রে শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কারণ জানার আগে শিশুকে কিছুই খাওয়ানো উচিত নয়। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

মেডিসিন ও সার্জিক্যাল পর্ব (৩)

শিশুদের পেটব্যথার কারণ ও সমাধান

 অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নবজাতক থেকে শুরু করে স্কুলগামী বেশিরভাগ শিশুই জীবনের কোনো না কোনো সময় পেটব্যথায় ভোগে। পেটব্যথা বিভিন্ন কারণে হয়। যেমন, খাদ্যনালিতে জীবাণু সংক্রমণ ও ডায়রিয়া বা আমাশয়, প্রস্রাবে সংক্রমণ, গ্যাস ও অ্যাসিডিটি, খাবারে অ্যালার্জি, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম এবং কৃমি সংক্রমণ। এ ছাড়া টিউমার, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ কিছু সার্জিক্যাল সমস্যায়ও শিশুর পেটব্যথা হতে পারে।

স্কুলগামী শিশুর মানসিক সমস্যার কারণে অথবা কিছু শিশু বাবা-মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ কিংবা সহানুভূতি পাওয়ার জন্য অকারণে পেটব্যথার কথা বলে থাকে।

এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন

অকারণে পেটব্যথা

৩ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুর ঘন ঘন পেটব্যথার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশই কোনো রোগের জন্য হয় না। এটাই হলো অকারণে পেটে ব্যথা বা ‘ফাংশনাল এবডোমিনাল পেইন’। এ ধরনের ব্যথার নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। মানসিক কারণে সাধারণত এমন সমস্যা হয়ে থাকে। এ ধরনের পেটব্যথায় শিশুরা অত্যধিক মানসিক চাপে ভোগে, কিছুটা সিরিয়াস প্রকৃতির হয়ে থাকে। শিশু স্কুলে যেতে না চাইলে, পড়া ভালো না লাগলে, পরিবারে অশান্তি থাকলে, বন্ধুরা কোনো বিষয় নিয়ে উত্ত্যক্ত করলে, হঠাৎ বাসা পরিবর্তন বা বন্ধু বিচ্ছেদ ইত্যাদির কারণে পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ব্যথা কিন্তু ইচ্ছাকৃত নয়, বরং তার মনের ভেতরের মানসিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে পেটব্যথার মাধ্যমে।

মানসিক ও শারীরিক কারণে ব্যথার মধ্যে পার্থক্য

* তিন বছরের নিচে শিশুর পেটব্যথা হলে তা সাধারণত রোগের কারণেই হয়ে থাকে।

* রোগের কারণে ব্যথা হলে শিশুরা সুনির্দিষ্টভাবে ব্যথার জায়গাটা দেখাতে পারে আর মানসিক কারণে হলে সেভাবে দেখাতে পারে না বা একেকবার একেক স্থানে দেখায়।

* ব্যথার সঙ্গে জ্বর, র‌্যাশ, হাড়ে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হলে বুঝতে হবে অবশ্যই সেই ব্যথার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

* ঘুমের মধ্যে ব্যথা হলে এবং ব্যথার কারণে শিশুর ঘুম ভেঙে গেলে কখনোই তা মানসিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

গ্যাসজনিত ব্যথা

বড়দের মতো শিশুদেরও পেটে গ্যাস হয়। নবজাতকের পেটে গ্যাস হয় মায়ের দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতির ত্রুটির কারণে। এতে বাচ্চারা বাতাস খেয়ে ফেলে, তাই পেটে গ্যাস হয়। বাচ্চাদের মধ্যে কান্না খুব স্বাভাবিক কারণ। কান্নার মাধ্যমে শিশুরা তাদের অস্বস্তি প্রকাশ করে এবং তাদের প্রয়োজনীয়তার প্রতি পিতামাতার মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদি শিশু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ক্রমাগত অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁদতে থাকে তবে সেটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

তিন মাসের অধিক পেটব্যথা

তিন মাসের অধিক পেট ব্যথা সাধারণত কোনো গুরুতর অসুস্থতা বা রোগের কারণে হয় না। তিন থেকে চার মাসের কম বয়সি শিশুরা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাঁদতে থাকলে এবং প্রতিদিন বা সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন সন্ধ্যার পর থেকে এবং প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে অবিরত কাঁদতে থাকলে তবে তা সাধারণত এ ধরনের পেটব্যথা হয়। এটি সাধারণত জন্মের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরে দেখা যায় এবং তিন থেকে চার মাস বয়স হলে আর থাকে না। পরিপাকনালিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ‘গাট মাইক্রোবায়োম’ নামক ব্যাক্টেরিয়াল কলোনি গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে যা পরিপাকনালির অপরিপক্বতা নামে পরিচিত। এ ধরনের ব্যথার ক্ষেত্রে বুকে ও পিঠে হাত দিয়ে মালিশ করলে, তলপেটের দিকে চেপে ধরলে শিশুর আরামবোধ হয়।

গ্যাসজনিত ব্যথা

শিশুদের একইসঙ্গে নানা রকমের খাবার খাওয়ানো শুরু করলে গ্যাসজনিত ব্যথা দেখা দেয়। এ ছাড়া, বড় শিশুরা অতি ভোজন, মসলাযুক্ত বা তৈলাক্ত কিংবা ঝাল খাবার, আচার ইত্যাদি খেলে পেটে এসিডিটি হয়ে ব্যথা হয়। এ ক্ষেত্রে এসিডিটির ওষুধ খেতে হবে। তবে ব্যথা প্রকট হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য

যেসব শিশু গরুর দুধ বা বোতলের দুধ খায়, পাশাপাশি ৬ মাসের পর অপরিকল্পিতভাবে অন্য কঠিন খাবার খেতে শুরু করে বা শুধু সুজি, চালের গুঁড়ার খাবার খায়-তাদের পেটে ব্যথার অন্যতম কারণ কোষ্ঠকাঠিন্য। দুই কিংবা তিন দিন ধরে ঠিকমতো পায়খানা না হলে তা পেটের ভেতর জমে থেকে ব্যথার সৃষ্টি করে। এজন্য শিশুকে নরম খাবার দিতে হবে। অবস্থা জটিল হলে শক্ত খাবারের পরিবর্তে তরলজাতীয় খাবার যেমন সাগুদানা, মাতৃদুগ্ধ বেশি বেশি খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া কিছু ব্যায়াম করানো যেতে পারে যেমন সাইকেলের মতো শিশুর পা দুটোকে চালনা করা। বড় শিশুদের শাক-সবজি, আঁশযুক্ত খাবার ও ফল-মূল খাওয়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মলত্যাগ করায় অভ্যস্ত করতে হবে।

খাবার কিংবা দুধে অ্যালার্জি

শিশুর কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়ানোর ফলে পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে গরুর দুধ বা গুঁড়াদুধের casein-lactalbumin and μ¦ lactoglobulin প্রতি অ্যালার্জি থেকে থাকে। অ্যালার্জি আছে বিষয়টি সন্দেহ হলে বা নিশ্চিত হলে তা খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এ ধরনের জটিলতায় অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কৃমি

কৃমি হলে বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, পেট মোটা বা ভারি হওয়া, খাবারে অরুচি, মুখে থুথু ওঠা এবং কোনো কোনো কৃমিতে পায়ুপথের আশপাশে চুলকানি হতে পারে। কৃমি হলে সাধারণত অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। নোংরা পরিবেশ, অনিরাপদ পানি পান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খালি পায়ে হাঁটা কৃমি সংক্রমণের জন্য দায়ী। ওষুধ নিয়ম মেনে খেলে আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সহজেই কৃমি দূর করা যায়। প্রতি তিন মাস পরপর পরিবারের সবাই একটি করে অ্যালবেনডাজল বড়ি সেবন করলে অথবা মেবেনডাজল পরপর তিন দিন খেতে হয়। সাত দিন পর দ্বিতীয় ডোজ খেতে হয়। শিশুদেরও একইভাবে সিরাপ খাওয়াতে হবে। তবে, দুই বছরের নিচে কোনো শিশুকে খাওয়াতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বয়সভেদে সমস্যা ও কারণ

দুই বছরের নিচে শিশুদের সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, ডায়রিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া প্রভৃতি কারণে পেটব্যথা হয়। অন্ত্রে প্যাঁচ খাওয়া বা ইনটাসাসেপশন নামের জটিল সমস্যাও হয়ে থাকে। বড় শিশু ও বালক-বালিকাদের বেলায় এসব ছাড়া কৃমি, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, প্রস্রাবে সংক্রমণ, অগ্ন্যাশয় ও যকৃতে কোনো সমস্যা সন্দেহ করা যেতে পারে। কিশোরীদের বেলায় মাসিক-সংক্রান্ত সমস্যা ও প্রস্রাবের সংক্রমণের দিকে অধিক মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ বয়সের বালক-বালিকার বেলায় মানসিক চাপ ও আঘাত, এমনকি খাদ্যে বিষক্রিয়ার কথাও ভাবতে হবে।

উপদেশ ও সতর্কতা

* নবজাতক ও ছোট শিশুদের প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর বাচ্চার ঢেঁকুর তোলানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে মাথা উঁচু করে সোজা করে খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার খাওয়ানোর পর কাঁধে নিয়ে আস্তেআস্তে তার পিঠে চাপড় দিতে হবে। এতে বাতাস বের হয়ে যায়।

* গ্যাসের সমস্যা এবং শিশুদের পেটব্যথা উপশম করাতে হাঁটু বাঁকানো ব্যায়াম কার্যকর। বাচ্চাকে চিত করে শোওয়ানোর পর তার পা দুটিকে হাঁটুর দিকে ভাঁজ করে পা দুটি পেটের দিকে ঠেলে দিতে হবে। এ ব্যায়ামটি দৈনিক চার থেকে পাঁচবার পুনরাবৃত্তি করলে ভালো।

* ছোট শিশুদের প্রথম খাবারে অভ্যাস করার সময় ধীরে ধীরে প্রথমে তরল, নরম খাবার, তার পর খিচুড়ি বা পিসপাস অর্থাৎ চাল, ডাল, সবজি, ছোট মাছ, মুরগির মাংস, ডিমমিশ্রিত খাবার। কোনো খাবারে অ্যালার্জি আছে কি না, খেয়াল করতে হবে এবং সেটি বাদ দিতে হবে। খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। শিশুদের হাত ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে।

কখন হাসপাতালে নেবেন

ব্যথা যদি খুব তীব্র হয়, সঙ্গে জ্বর থাকে, অনবরত বমি হয়, পেট শক্ত হয়ে যায়, মলের বা বমির সঙ্গে রক্ত দেখা দেয় বা পিত্তবমি হয়, সে ক্ষেত্রে শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কারণ জানার আগে শিশুকে কিছুই খাওয়ানো উচিত নয়। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন