ডিম্বাশয়ের ক্যানসার : চিকিৎসাব্যবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা
jugantor
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার : চিকিৎসাব্যবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা

  ডা. কাজী ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ  

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার বা ওভারিয়ান ক্যানসার মহিলাদের ক্যানসারের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নবম স্থান দখল করে আছে এবং মহিলা ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুর পঞ্চম কারণ। মহিলাদের ক্যানসারের শতকরা চার ভাগই ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। প্রতিটি মহিলা তার সারা জীবনে শতকরা ১.৫ ভাগ ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বহন করে চলে।

কারণ

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারণ জানা নেই। পরিবারের কারও এ ধরনের সমস্যা থাকলে এ রোগ হতে পারে। তুলনামূলক কম বয়সে যাদের মাসিক শুরু হয় এবং অধিক বয়সকাল পর্যন্ত চালু থাকে তাদের এ ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। যারা কমপক্ষে ৫ বছর জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেয়েছেন এবং বাচ্চাদের নিয়মমতো দুধ পান করিয়েছে তাদের এ রোগের ঝুঁকি কম।

চিকিৎসা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই সূচনায় ধরা পড়ে না। ডিম্বাশয়ে টিউমার ছোট থাকা অবস্থায় কোনো উপসর্গ প্রকাশ করে না। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই নির্ণয় হয় ৩য় বা ৪র্থ ধাপে।

অপারেশন

যে ধাপেই ধরা পড়ুক না কেন, সব ক্ষেত্রেই সার্জারি/অপারেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। অপারেশনের মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব ক্যানসার কোষ অপসারণ করা যাবে; ততই রোগীর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এ রোগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সার্জনের (গাইনি অনকোলজিস্ট) মাধ্যমে চিকিৎসা করানো উত্তম। যদিও আমাদের দেশে গাইনি অনকোলজিস্টের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।

কেমোথেরাপি

যেহেতু সূচনায় ধরা পড়ে না, সেহেতু প্রায় সব ক্ষেত্রেই অপারেশনের পর কেমোথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। টিউমারের আকৃতি বা বিস্তৃতির কারণে যদি শুরুতে অপারেশন সম্ভব না হয় সে ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির মাধ্যমে অপারেশনের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

সৌভাগ্যজনকভাগে অধিকাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই ‘প্লাটিনাম’ সেনসিটিভ। অর্থাৎ প্লাটিনাম দ্বারা তৈরি একাধিক ওষুধ (Cisplatin/Carboplatin) এ রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর। প্লাটিনাম ওষুধের সঙ্গে এক বা একাধিক ওষুধ ব্যবহার করে কার্যকারিতা আরও বাড়ানো যায়।

চিকিৎসা সম্ভাবনা

দেহের ক্যানসার প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার নিমিত্তে এবং ক্যানসার কোষের পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে কিছু এন্টিবডি ব্যবহার করে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী এক নতুন ধরনের ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়, যা জিনগত ত্রুটিসম্পন্ন ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে কার্যকর। এগুলোকে বলা হয় টার্গেটেড থেরাপি। এটা ইমিউনো থেরাপি নামেও পরিচিতি। প্রায় দুই দশক আগে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সঙ্গে কিছু জিনগত ত্রুটির সম্পর্ক নির্ণয় হয়েছে।

সমস্যা

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো হচ্ছে-

* অসচেতনতা, অশিক্ষা, অবৈজ্ঞানিক পন্থার ওপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদির কারণে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটে।

* গাইনি অনকোলাজিস্টের অপ্রতুলতা।

* ফ্রোজেন সেকশন বায়োপসি বা তাৎক্ষণিক বায়োপসি, এ রোগের অপারেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমাদের দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই এর ব্যবস্থা নেই।

* কোমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপির মূল্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।

* জেনেটিক টেস্টিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জিন ল্যাব আমাদের দেশে নেই।

সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য দেশের ৮টি বিভাগে ৮টি বিশেষায়িত এবং সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রের কাজ চলমান। আশা করা যায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে।

লেখক : আবাসিক চিকিৎসক, রেডিওথেরাপি বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার : চিকিৎসাব্যবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা

 ডা. কাজী ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ 
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার বা ওভারিয়ান ক্যানসার মহিলাদের ক্যানসারের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নবম স্থান দখল করে আছে এবং মহিলা ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুর পঞ্চম কারণ। মহিলাদের ক্যানসারের শতকরা চার ভাগই ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। প্রতিটি মহিলা তার সারা জীবনে শতকরা ১.৫ ভাগ ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বহন করে চলে।

কারণ

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারণ জানা নেই। পরিবারের কারও এ ধরনের সমস্যা থাকলে এ রোগ হতে পারে। তুলনামূলক কম বয়সে যাদের মাসিক শুরু হয় এবং অধিক বয়সকাল পর্যন্ত চালু থাকে তাদের এ ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। যারা কমপক্ষে ৫ বছর জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেয়েছেন এবং বাচ্চাদের নিয়মমতো দুধ পান করিয়েছে তাদের এ রোগের ঝুঁকি কম।

চিকিৎসা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই সূচনায় ধরা পড়ে না। ডিম্বাশয়ে টিউমার ছোট থাকা অবস্থায় কোনো উপসর্গ প্রকাশ করে না। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই নির্ণয় হয় ৩য় বা ৪র্থ ধাপে।

অপারেশন

যে ধাপেই ধরা পড়ুক না কেন, সব ক্ষেত্রেই সার্জারি/অপারেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। অপারেশনের মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব ক্যানসার কোষ অপসারণ করা যাবে; ততই রোগীর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এ রোগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সার্জনের (গাইনি অনকোলজিস্ট) মাধ্যমে চিকিৎসা করানো উত্তম। যদিও আমাদের দেশে গাইনি অনকোলজিস্টের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।

কেমোথেরাপি

যেহেতু সূচনায় ধরা পড়ে না, সেহেতু প্রায় সব ক্ষেত্রেই অপারেশনের পর কেমোথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। টিউমারের আকৃতি বা বিস্তৃতির কারণে যদি শুরুতে অপারেশন সম্ভব না হয় সে ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির মাধ্যমে অপারেশনের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

সৌভাগ্যজনকভাগে অধিকাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারই ‘প্লাটিনাম’ সেনসিটিভ। অর্থাৎ প্লাটিনাম দ্বারা তৈরি একাধিক ওষুধ (Cisplatin/Carboplatin) এ রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর। প্লাটিনাম ওষুধের সঙ্গে এক বা একাধিক ওষুধ ব্যবহার করে কার্যকারিতা আরও বাড়ানো যায়।

চিকিৎসা সম্ভাবনা

দেহের ক্যানসার প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার নিমিত্তে এবং ক্যানসার কোষের পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে কিছু এন্টিবডি ব্যবহার করে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী এক নতুন ধরনের ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়, যা জিনগত ত্রুটিসম্পন্ন ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে কার্যকর। এগুলোকে বলা হয় টার্গেটেড থেরাপি। এটা ইমিউনো থেরাপি নামেও পরিচিতি। প্রায় দুই দশক আগে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সঙ্গে কিছু জিনগত ত্রুটির সম্পর্ক নির্ণয় হয়েছে।

সমস্যা

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো হচ্ছে-

* অসচেতনতা, অশিক্ষা, অবৈজ্ঞানিক পন্থার ওপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদির কারণে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটে।

* গাইনি অনকোলাজিস্টের অপ্রতুলতা।

* ফ্রোজেন সেকশন বায়োপসি বা তাৎক্ষণিক বায়োপসি, এ রোগের অপারেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমাদের দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই এর ব্যবস্থা নেই।

* কোমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপির মূল্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে।

* জেনেটিক টেস্টিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জিন ল্যাব আমাদের দেশে নেই।

সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য দেশের ৮টি বিভাগে ৮টি বিশেষায়িত এবং সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রের কাজ চলমান। আশা করা যায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে।

লেখক : আবাসিক চিকিৎসক, রেডিওথেরাপি বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন