বর্ষায় সর্দিজ্বর থেকে সতর্ক থাকুন
jugantor
বর্ষায় সর্দিজ্বর থেকে সতর্ক থাকুন
চলছে বর্ষাকাল। এ সময় বৃষ্টিতে ভিজলে অনেকের সর্দি লেগে যেতে পারে। সঙ্গে যোগ হয় জ্বর। সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হলে কী করবেন এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক-

  ডা. একেএম আমিনুল হক  

১৮ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সর্দি বা ঠান্ডা উর্ধ্ব শ্বাসনালির একটি ভাইরাসজনিত প্রদাহ, যা প্রধানত নাক আক্রমণ করে থাকে। এতে গলা, সাইনাস ও কণ্ঠনালি আক্রান্ত হতে পারে। কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসার দুই দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। উপসর্গের মধ্যে কাশি, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, মাথাব্যথা ও জ্বর হয়। রোগী সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কোনো কোনো উপসর্গ তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। যাদের অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের অনেকের কখনো কখনো নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। দু’শতাধিক ভাইরাস সর্দির কারণ হতে পারে। এর মধ্যে রাইনো ভাইরাসই সবচেয়ে বেশি। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে এ ভাইরাস বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং পরোক্ষভাবে আশপাশের বস্তুর সংস্পর্শে এলে এবং পরবর্তীকালে মুখ বা নাক স্পর্শ করলে এ রোগ ছড়াতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কারণের মধ্যে রয়েছে শিশুদের ডে-কেয়ারে যাওয়া, ঠিকমতো না ঘুমানো এবং মানসিক চাপ ইত্যাদি। ভাইরাস দ্বারা কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া থেকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে উপসর্গ বেশি দেখা যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগীদেরও সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে উপসর্গের তীব্রতা থাকে বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জায় সর্দির প্রকোপ কম থাকে।

সর্দির কোনো টিকা নেই। প্রতিরোধের জন্য প্রধান কাজ হলো হাত ধোয়া। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা যাবে না এবং রোগী থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। অনেকে মাস্ক পরার উপদেশ দিয়ে থাকেন। সর্দি থেকে আরোগ্য লাভের কোনো ওষুধ নেই, তবে উপসর্গ নির্মূল করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল বা ব্যথানাশক অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের দরকার নেই। কাশির ওষুধ ব্যবহার করে উপকার পাওয়া যায়, এমন কোনো নজির নেই।

সংক্রামক রোগের মধ্যে সর্দি মানুষকে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে দুই থেকে চারবার সর্দিতে আক্রান্ত হতে পারে।

* উপসর্গ : সর্দির উপসর্গ বলতে বুঝায় নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা ও কাশি, কখনো কখনো মাংসপেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। বয়স্কদের বেলায় সাধারণত জ্বর থাকে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় সর্দিতে কাশি কম থাকে। যদিও সর্দির সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জার অনেক মিল আছে, তবুও কাশির সঙ্গে জ্বর থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কাই বেশি। শ্লেষ্মা বা সর্দির রং স্বচ্ছ থেকে হলুদ বা সবুজ পর্যন্ত হতে পারে।

* আনুষাঙ্গিক সমস্যা : সর্দি সাধারণত শুরু হয় ক্লান্তি দিয়ে, সঙ্গে শীত শীত অনুভূতি থাকে। হাঁচি থাকে, মাথাব্যথা থাকে এবং কয়েকদিন পর নাক দিয়ে পানি পড়ে ও কাশি শুরু হয়ে যায়। কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসার ১৬ ঘণ্টা পর উপসর্গ দেখা দেয় এবং রোগ শুরু হওয়ার দুই থেকে চার দিনের মাথায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। সর্দি সচরাচর ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কমে যায়, কিন্তু কখনো কখনো তিন সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। গড়ে কাশি ১৮ দিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের ভাইরাস সংক্রমণের পর কাশি দেখা দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও স্থায়ী হতে পারে।

* কারণ : ভাইরাস সর্দি হলো শ্বাসনালির উপরিভাগের ভাইরাস সংক্রমণ। এজন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রাইনো ভাইরাস, যা এক ধরনের পিকোরনা ভাইরাস। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই শতাধিক ভাইরাস সর্দির দায়ী।

* কীভাবে সংক্রমিত হয় : সর্দি সচরাচর বায়ুবাহিত ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা রোগীর নাকের নিঃসৃত রসের সংস্পর্শে এলে অথবা সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে এলে, রোগীর বিছানা ও জামাকাপড় প্রভৃতির সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হয়। এগুলোর মধ্যে রোগ ছড়ানোর কোনটি প্রধান বাহক তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, বায়ুবাহিত ক্ষুদ্র কণিকা হাত থেকে হাতে অথবা হাত থেকে বস্তুতে এবং বস্তু থেকে হাতে ছড়ায় বেশি। এ ভাইরাস পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে (রাইনো ভাইরাসের বেলায় ১৮ ঘণ্টার বেশি)। মানুষের হাত দ্বারা এ ভাইরাস পরিবেশ থেকে সংগৃহীত হয়। এরপর সেই হাত চোখ, নাকের সংস্পর্শে এসে সংক্রমণ তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার এবং স্কুলে এ রোগ ছড়ায় বেশি। কারণ, শিশুরা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে না। এ সংক্রমণ তারা বাসায় নিয়ে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হয়। যারা আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি বসে বা বসে থাকে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। রাইনো ভাইরাসজনিত সর্দি প্রথম দিনে ছড়ায় বেশি; এরপর তাদের সংক্রমণ ক্ষমতা কমে যায়।

* আবহাওয়া : ঐতিহ্যগতভাবে ধারণা করা হয়, ঠান্ডায় যেমন বৃষ্টি কিংবা শীতে অনাবৃত হলে সর্দি লাগে; এখান থেকেই এর নাম হয়েছে ঠান্ডা বা সর্দি। কোনো কোনো ভাইরাস বেশিরভাগ সময় শীত কিংবা বর্ষাকালে সর্দির কারণ হয়ে থাকে। কেন তারা বিশেষ ঋতুতে সক্রিয় হয়, তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। এমনও হতে পারে ঠান্ডা আবহাওয়া শ্বাসনালিতে পরিবর্তন আনে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় এবং কম আর্দ্রতার কারণে ভাইরাস বেশি হারে ছড়ায়। সম্ভবত শুষ্ক বাতাসের কারণে ক্ষুদ্র ভাইরাস কণিকা বেশি দূর ছড়ায় এবং বাতাসে বেশিক্ষণ অবস্থান করে। আবার বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার কারণেও এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশেষ ঋতুতে সর্দি সামাজিক কারণেও হতে পারে, যেমন-এসব ঋতুতে লোকজন বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতর কাটায়, আক্রান্ত লোকজনের কাছাকাছি থাকে, বিশেষ করে স্কুলের শিশুরা। শরীরের কম তাপমাত্রা সর্দির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ ব্যাপারে মতবিভেদ আছে; বেশিরভাগ প্রমাণ নির্দেশ করে, ঠান্ডা সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীলতা বাড়ায়।

* রোগ নির্ণয় : সর্দি সাধারণত নাক, গলা ও গলনালি সংক্রমণ করে থাকে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশ একই সঙ্গে সংক্রমিত হতে পারে। এটি সচরাচর নাক ও গলার কিছু অংশে প্রদাহ সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী নিজেই সমস্যা বুঝতে পারেন। এতে ভাইরাস কালচার সাধারণত করা হয় না এবং উপসর্গ দেখে ভাইরাসের ধরন নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

* প্রতিরোধ : সর্দির ভাইরাসের বিস্তার রোধে একমাত্র প্রয়োজনীয় উপায় হলো শারীরিক ব্যবস্থা নেওয়া। যেমন-হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, যে পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয় সেখানে গাউন পরা এবং তার পূনরায় ব্যবহার না করা, হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা। সর্দির ক্ষেত্রে আইসোলেশনের দরকার নেই। তবে সুস্থদের থেকে রোগীর দূরে থাকা মঙ্গল। কারণ অসুখটি খুবই বিস্তৃত এবং উপসর্গগুলো সৃনির্দিষ্ট নয়। যেহেতু সর্দির সঙ্গে অনেক ভাইরাস জড়িত এবং এগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল, সে জন্যই এদের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন দেওয়া খুবই কঠিন। বিস্তৃতভাবে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নিয়মিত হাত ধোয়া ভাইরাসের বিস্তার কমাতে সাহায্য করে। রোগীদের চার পাশে থাকার সময় মাস্ক পরা উপকারী। নিয়মিত ভিটামিন সি খেলে সর্দির ঝুঁকি কিংবা তীব্রতা কোনোটাই কমবে না, তবে স্থায়িত্ব কমতে পারে। হালকা গরম লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করলেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।

* চিকিৎসা : কোনো ওষুধ সংক্রমণের স্থায়িত্ব কমাতে পারে না। কাজেই চিকিৎসা হলো উপসর্গের নিরাময়। সঠিক সংক্ষিপ্ত ব্যবস্থা হলো প্রচুর পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়া, শরীরে পানিস্বল্পতা তৈরি না হয় সেদিক্ষে লক্ষ্য রাখা এবং হালকা গরম লবণযুক্ত পানি দ্বারা গড়গড়া করা। চিকিৎসায় যে উপকার পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই রোগীর মনের শান্তির জন্য।

* ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা : যেসব চিকিৎসা উপসর্গ নিরসনে সহায়তা করে তার মধ্যে ব্যথা কমানো ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেয়া যেতে পারে। বয়স্কদের বেলায় স্বল্প সময়ের জন্য নাকের ড্রপ ব্যবহার করলে সামান্য উপকার পাওয়া যায়। প্রথম এক বা দুই দিন হিস্টামিন নিবারক ওষুধ উপসর্গ উপশমে কাজ করে থাকে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপকার পাওয়া যায় না। বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঝিমুনিভাব দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের বেলায় নাকের ড্রপের মধ্যে সিউডোএফিড্রিন কার্যকর। ইপ্রাট্রোপিয়াম নামক স্প্রে নাকের পানি পড়া কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু এটি নাকের বন্ধ কমাতে পারে না।

* শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম : যদি জ্বর থাকে, সারা শরীরে মাংসপেশিতে ব্যথা থাকে বা ক্লান্তি দেখা দেয়, তবে ব্যায়াম না করাই ভালো। যদি উপসর্গ মাথাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ থাকা, হাঁচি অথবা সামান্য গলাব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে পরিমিত ব্যায়াম করা যেতে পারে।

* অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিভাইরাল দিয়ে চিকিৎসা : যেসব ভাইরাস দ্বারা সর্দি হয়, সেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা নেই। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অ্যান্টিবয়োটিক মোটের ওপর ক্ষতিই করে, যদিও এটি প্রায়ই ব্যবহার হয়ে থাকে। যেসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে থাকে, তার মধ্যে রোগী মনে করে যে অ্যান্টিবায়োটিকে তার উপকার হবে। চিকিৎসকরা মনে করে অ্যান্টিবায়োটিক সহায়ক হতে পারে এবং যেসব জটিলতা অ্যান্টিবায়োটিকে নিরাময় হয়, সেগুলোকে বাদ দেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এখন পর্যন্ত সর্দির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল নেই।

* রোগের গতির পূর্বাভাস : সর্দি সাধারণত মৃদু আকারে হয়ে থাকে এবং নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। বেশিরভাগ উপসর্গ সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। অর্ধেকের বেশি ১০ দিনের মধ্যে এবং ৯০ শতাংশের বেশি ১৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। যারা বেশি বৃদ্ধ, বেশি ছোট কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম; তাদের বেলায় তীব্র জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া জীবাণু দ্বারা আনুষঙ্গিক প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যার ফলে সাইনোসাইটিস, গলবিলের প্রদাহ এবং কানের প্রদাহ উল্লেখ্য।

বর্ষায় সর্দিজ্বর থেকে সতর্ক থাকুন

চলছে বর্ষাকাল। এ সময় বৃষ্টিতে ভিজলে অনেকের সর্দি লেগে যেতে পারে। সঙ্গে যোগ হয় জ্বর। সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হলে কী করবেন এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক-
 ডা. একেএম আমিনুল হক 
১৮ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সর্দি বা ঠান্ডা উর্ধ্ব শ্বাসনালির একটি ভাইরাসজনিত প্রদাহ, যা প্রধানত নাক আক্রমণ করে থাকে। এতে গলা, সাইনাস ও কণ্ঠনালি আক্রান্ত হতে পারে। কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসার দুই দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। উপসর্গের মধ্যে কাশি, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, মাথাব্যথা ও জ্বর হয়। রোগী সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কোনো কোনো উপসর্গ তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। যাদের অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের অনেকের কখনো কখনো নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। দু’শতাধিক ভাইরাস সর্দির কারণ হতে পারে। এর মধ্যে রাইনো ভাইরাসই সবচেয়ে বেশি। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে এ ভাইরাস বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং পরোক্ষভাবে আশপাশের বস্তুর সংস্পর্শে এলে এবং পরবর্তীকালে মুখ বা নাক স্পর্শ করলে এ রোগ ছড়াতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কারণের মধ্যে রয়েছে শিশুদের ডে-কেয়ারে যাওয়া, ঠিকমতো না ঘুমানো এবং মানসিক চাপ ইত্যাদি। ভাইরাস দ্বারা কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া থেকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে উপসর্গ বেশি দেখা যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগীদেরও সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে উপসর্গের তীব্রতা থাকে বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জায় সর্দির প্রকোপ কম থাকে।

সর্দির কোনো টিকা নেই। প্রতিরোধের জন্য প্রধান কাজ হলো হাত ধোয়া। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা যাবে না এবং রোগী থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। অনেকে মাস্ক পরার উপদেশ দিয়ে থাকেন। সর্দি থেকে আরোগ্য লাভের কোনো ওষুধ নেই, তবে উপসর্গ নির্মূল করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল বা ব্যথানাশক অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের দরকার নেই। কাশির ওষুধ ব্যবহার করে উপকার পাওয়া যায়, এমন কোনো নজির নেই।

সংক্রামক রোগের মধ্যে সর্দি মানুষকে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে দুই থেকে চারবার সর্দিতে আক্রান্ত হতে পারে।

* উপসর্গ : সর্দির উপসর্গ বলতে বুঝায় নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা ও কাশি, কখনো কখনো মাংসপেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। বয়স্কদের বেলায় সাধারণত জ্বর থাকে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় সর্দিতে কাশি কম থাকে। যদিও সর্দির সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জার অনেক মিল আছে, তবুও কাশির সঙ্গে জ্বর থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কাই বেশি। শ্লেষ্মা বা সর্দির রং স্বচ্ছ থেকে হলুদ বা সবুজ পর্যন্ত হতে পারে।

* আনুষাঙ্গিক সমস্যা : সর্দি সাধারণত শুরু হয় ক্লান্তি দিয়ে, সঙ্গে শীত শীত অনুভূতি থাকে। হাঁচি থাকে, মাথাব্যথা থাকে এবং কয়েকদিন পর নাক দিয়ে পানি পড়ে ও কাশি শুরু হয়ে যায়। কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসার ১৬ ঘণ্টা পর উপসর্গ দেখা দেয় এবং রোগ শুরু হওয়ার দুই থেকে চার দিনের মাথায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। সর্দি সচরাচর ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কমে যায়, কিন্তু কখনো কখনো তিন সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। গড়ে কাশি ১৮ দিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের ভাইরাস সংক্রমণের পর কাশি দেখা দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও স্থায়ী হতে পারে।

* কারণ : ভাইরাস সর্দি হলো শ্বাসনালির উপরিভাগের ভাইরাস সংক্রমণ। এজন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রাইনো ভাইরাস, যা এক ধরনের পিকোরনা ভাইরাস। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই শতাধিক ভাইরাস সর্দির দায়ী।

* কীভাবে সংক্রমিত হয় : সর্দি সচরাচর বায়ুবাহিত ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা রোগীর নাকের নিঃসৃত রসের সংস্পর্শে এলে অথবা সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে এলে, রোগীর বিছানা ও জামাকাপড় প্রভৃতির সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হয়। এগুলোর মধ্যে রোগ ছড়ানোর কোনটি প্রধান বাহক তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, বায়ুবাহিত ক্ষুদ্র কণিকা হাত থেকে হাতে অথবা হাত থেকে বস্তুতে এবং বস্তু থেকে হাতে ছড়ায় বেশি। এ ভাইরাস পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে (রাইনো ভাইরাসের বেলায় ১৮ ঘণ্টার বেশি)। মানুষের হাত দ্বারা এ ভাইরাস পরিবেশ থেকে সংগৃহীত হয়। এরপর সেই হাত চোখ, নাকের সংস্পর্শে এসে সংক্রমণ তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার এবং স্কুলে এ রোগ ছড়ায় বেশি। কারণ, শিশুরা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারে না। এ সংক্রমণ তারা বাসায় নিয়ে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হয়। যারা আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি বসে বা বসে থাকে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। রাইনো ভাইরাসজনিত সর্দি প্রথম দিনে ছড়ায় বেশি; এরপর তাদের সংক্রমণ ক্ষমতা কমে যায়।

* আবহাওয়া : ঐতিহ্যগতভাবে ধারণা করা হয়, ঠান্ডায় যেমন বৃষ্টি কিংবা শীতে অনাবৃত হলে সর্দি লাগে; এখান থেকেই এর নাম হয়েছে ঠান্ডা বা সর্দি। কোনো কোনো ভাইরাস বেশিরভাগ সময় শীত কিংবা বর্ষাকালে সর্দির কারণ হয়ে থাকে। কেন তারা বিশেষ ঋতুতে সক্রিয় হয়, তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। এমনও হতে পারে ঠান্ডা আবহাওয়া শ্বাসনালিতে পরিবর্তন আনে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় এবং কম আর্দ্রতার কারণে ভাইরাস বেশি হারে ছড়ায়। সম্ভবত শুষ্ক বাতাসের কারণে ক্ষুদ্র ভাইরাস কণিকা বেশি দূর ছড়ায় এবং বাতাসে বেশিক্ষণ অবস্থান করে। আবার বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার কারণেও এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশেষ ঋতুতে সর্দি সামাজিক কারণেও হতে পারে, যেমন-এসব ঋতুতে লোকজন বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতর কাটায়, আক্রান্ত লোকজনের কাছাকাছি থাকে, বিশেষ করে স্কুলের শিশুরা। শরীরের কম তাপমাত্রা সর্দির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ ব্যাপারে মতবিভেদ আছে; বেশিরভাগ প্রমাণ নির্দেশ করে, ঠান্ডা সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীলতা বাড়ায়।

* রোগ নির্ণয় : সর্দি সাধারণত নাক, গলা ও গলনালি সংক্রমণ করে থাকে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশ একই সঙ্গে সংক্রমিত হতে পারে। এটি সচরাচর নাক ও গলার কিছু অংশে প্রদাহ সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী নিজেই সমস্যা বুঝতে পারেন। এতে ভাইরাস কালচার সাধারণত করা হয় না এবং উপসর্গ দেখে ভাইরাসের ধরন নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

* প্রতিরোধ : সর্দির ভাইরাসের বিস্তার রোধে একমাত্র প্রয়োজনীয় উপায় হলো শারীরিক ব্যবস্থা নেওয়া। যেমন-হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, যে পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয় সেখানে গাউন পরা এবং তার পূনরায় ব্যবহার না করা, হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা। সর্দির ক্ষেত্রে আইসোলেশনের দরকার নেই। তবে সুস্থদের থেকে রোগীর দূরে থাকা মঙ্গল। কারণ অসুখটি খুবই বিস্তৃত এবং উপসর্গগুলো সৃনির্দিষ্ট নয়। যেহেতু সর্দির সঙ্গে অনেক ভাইরাস জড়িত এবং এগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল, সে জন্যই এদের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন দেওয়া খুবই কঠিন। বিস্তৃতভাবে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নিয়মিত হাত ধোয়া ভাইরাসের বিস্তার কমাতে সাহায্য করে। রোগীদের চার পাশে থাকার সময় মাস্ক পরা উপকারী। নিয়মিত ভিটামিন সি খেলে সর্দির ঝুঁকি কিংবা তীব্রতা কোনোটাই কমবে না, তবে স্থায়িত্ব কমতে পারে। হালকা গরম লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করলেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।

* চিকিৎসা : কোনো ওষুধ সংক্রমণের স্থায়িত্ব কমাতে পারে না। কাজেই চিকিৎসা হলো উপসর্গের নিরাময়। সঠিক সংক্ষিপ্ত ব্যবস্থা হলো প্রচুর পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়া, শরীরে পানিস্বল্পতা তৈরি না হয় সেদিক্ষে লক্ষ্য রাখা এবং হালকা গরম লবণযুক্ত পানি দ্বারা গড়গড়া করা। চিকিৎসায় যে উপকার পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই রোগীর মনের শান্তির জন্য।

* ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা : যেসব চিকিৎসা উপসর্গ নিরসনে সহায়তা করে তার মধ্যে ব্যথা কমানো ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেয়া যেতে পারে। বয়স্কদের বেলায় স্বল্প সময়ের জন্য নাকের ড্রপ ব্যবহার করলে সামান্য উপকার পাওয়া যায়। প্রথম এক বা দুই দিন হিস্টামিন নিবারক ওষুধ উপসর্গ উপশমে কাজ করে থাকে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপকার পাওয়া যায় না। বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঝিমুনিভাব দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের বেলায় নাকের ড্রপের মধ্যে সিউডোএফিড্রিন কার্যকর। ইপ্রাট্রোপিয়াম নামক স্প্রে নাকের পানি পড়া কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু এটি নাকের বন্ধ কমাতে পারে না।

* শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম : যদি জ্বর থাকে, সারা শরীরে মাংসপেশিতে ব্যথা থাকে বা ক্লান্তি দেখা দেয়, তবে ব্যায়াম না করাই ভালো। যদি উপসর্গ মাথাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ থাকা, হাঁচি অথবা সামান্য গলাব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে পরিমিত ব্যায়াম করা যেতে পারে।

* অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিভাইরাল দিয়ে চিকিৎসা : যেসব ভাইরাস দ্বারা সর্দি হয়, সেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা নেই। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অ্যান্টিবয়োটিক মোটের ওপর ক্ষতিই করে, যদিও এটি প্রায়ই ব্যবহার হয়ে থাকে। যেসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে থাকে, তার মধ্যে রোগী মনে করে যে অ্যান্টিবায়োটিকে তার উপকার হবে। চিকিৎসকরা মনে করে অ্যান্টিবায়োটিক সহায়ক হতে পারে এবং যেসব জটিলতা অ্যান্টিবায়োটিকে নিরাময় হয়, সেগুলোকে বাদ দেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এখন পর্যন্ত সর্দির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল নেই।

* রোগের গতির পূর্বাভাস : সর্দি সাধারণত মৃদু আকারে হয়ে থাকে এবং নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। বেশিরভাগ উপসর্গ সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। অর্ধেকের বেশি ১০ দিনের মধ্যে এবং ৯০ শতাংশের বেশি ১৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। যারা বেশি বৃদ্ধ, বেশি ছোট কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম; তাদের বেলায় তীব্র জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া জীবাণু দ্বারা আনুষঙ্গিক প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যার ফলে সাইনোসাইটিস, গলবিলের প্রদাহ এবং কানের প্রদাহ উল্লেখ্য।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন