ডেঙ্গি জ্বর হলে কী খাবার খাবেন
jugantor
ডেঙ্গি জ্বর হলে কী খাবার খাবেন

  আখতারুন নাহার আলো  

১৮ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর এই পাঁচ মাস ডেঙ্গি জ্বরের মৌসুম। এই কারণে এ সময় সবাই সাবধানে থাকা উচিত। যেহেতু এই রোগ মশাবাহিত সে জন্য খাবার দিয়ে একে প্রতিরোধ করা তেমন সম্ভব নয়। ডেঙ্গি জ্বরে আক্রান্ত হলে রক্তের প্ল্যাটিলেট বা অনুচক্রিকা কমে যাওয়াটাই সমস্যা। আর এই প্ল্যাটিলেটের কাজ হলো রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করা। কিছু কিছু খাবার আছে যা এই প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন-

লেবুর রস : লেবুতে আছে ভিটামিন সি, লৌহ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও সামান্য ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। লেবু দেহে লৌহ শোষণে সাহায্য করে রক্তস্বল্পতা দূর করে। এটি রক্তের প্ল্যাটিলেট বাড়ায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লেবুর রস এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং ত্বকের উপরিভাগের কোষের পুষ্টি জোগানোর ক্ষমতা রয়েছে। লেবু রক্তচাপ কমায়। সর্দি-কাশি সারায় ও জ্বর কমাতে সাহায্য করে। তবে প্ল্যাটিলেট কমাতে কাগজি লেবুর চেয়ে শরবতি লেবুর ভূমিকা বেশি। ১০০ গ্রাম লেবুতে আছে ৪৭ ক্যালরি, ৪০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, লৌহ ২.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪৭ মিলিগ্রাম।

আমলকী : ভিটামিন সি সমৃদ্ধ কষযুক্ত এই ফলটির নিজস্ব স্বাদ না থাকলেও এটি অন্যান্য খাবারের স্বাদ বাড়ায়। এটি খাবারে রুচি বাড়ায় বলে একে রোচনিও বলা হয়। আমলকী রক্তের প্ল্যাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং অকাল বার্ধক্য রোধ করে। এছাড়া বমি ভাব ও এসিডিটি দূর করে। আমলকী কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাধরা, রক্ত স্বল্পতা ও জ্বরে ভালো কাজ করে। একটি কমলালেবুতে যতটুকু ভিটামিন সি আছে, আলমলকীতে আছে তার বিশগুণ বেশি।

ডালিম : যে কোনো অসুস্থতায় পথ্য হিসাবে ডালিম বেশ জনপ্রিয়। এতে আছে শর্করা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ফলিক এসিড ও পটাশিয়াম। ১০০ গ্রাম ডালিমে আছে ৭৪ ক্যালরি। এটি ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণে এবং ডায়ারিয়ায় বেশ উপকারী। এছাড়া প্রদাহ ও প্রোস্টেট ক্যানসারের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে। ডালিম প্ল্যাটিলেট বাড়ায় ও রক্তস্বল্পতা রোধ করে। প্রতিদিন ১ কাপ ডালিমের রস পান করলে ডেঙ্গি রোগী উপকৃত হবেন।

পেঁপে : কাঁচা পাকা উভয় ধরনের পেঁপে এবং পেঁপের পাতা ডেঙ্গির ওষুধ হিসাবে কার্যকর। মালয়েশিয়ার এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এক গবেষণায় দেখা যায়-পেঁপে এবং পেঁপের পাতার রস দ্রুত প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। কাঁচা পেঁপে সহজপাচ্য। হজমকারক এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এতে থাকে পেঁপেইন নামক এনজাইম। পাকা পেঁপেতে আছে বিটা ক্যারোটিন। যা ত্বক ও চোখের জন্য উপকারী। অন্ত্রের গোলোযোগ ও কিডনির পাথর গঠনে প্রতিরোধক হিসাবে পেঁপে কাজ করে।

মিষ্টি কুমড়া : মিষ্টি কুমড়া ও কুমড়ার বিচি রক্তের প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ, বায়ু দূষণ, সবজির রাসায়নিক ও পেস্টিসাইডের ফলে দেহে ফ্রি রেডিক্যালস তৈরি হয়। এতে দেহ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। মিষ্টিকুমড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলে এই ক্ষতির হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। এতে আছে ভিটামিন এ বা বিটাক্যারোটিন। যা চুল, ত্বক ও চোখের জন্য উপকারী। মিষ্টিকুমড়া আর্টারির দেওয়ালে চর্বি জমতে দেয় না বলে এটা কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি থাকার জন্য ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এতে ট্রিপটোফ্যান আছে বলে অনিদ্রায় উপকারী। মিষ্টি কুমড়া খেলে মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। কুমড়ার বিচিতে আছে যথেষ্ট পরিমাণে জিংক। এটাও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ ও কিডনিতে পাথর গঠনে বাধা দেয়।

ঘৃতকুমারী : একে অ্যালোভেরাও বলা হয়। ঘৃতকুমারীর জুস রক্তের সংক্রমণ দূর করে রক্তকে বিশুদ্ধ রাখে। এটি রক্তের প্ল্যাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ঘৃতকুমারী পিত্তরস ক্ষরণ করে ও খিদে বাড়ায়। পেট জ্বালার ক্ষেত্রে পেটে শীতল আমেজ আনে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। পুড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ সেই স্থানে ঘৃতকুমারীর জেলি লাগালে ফোসকা পড়ার হাত থেকে বাঁচা যায়। পোড়া দাগও মিলিয়ে যায়। পাঁচ গ্রাম ঘৃতকুমারীর রস চিনি মিশিয়ে বিকালের দিকে খেলে ঠাণ্ডাজনিত সামস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায় এবং জ্বরেরও উপশম হয়।

লেখক : চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান (অব.), বারডেম। সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামলী ও অ্যাডভান্স হাসপাতাল, ঢাকা

ডেঙ্গি জ্বর হলে কী খাবার খাবেন

 আখতারুন নাহার আলো 
১৮ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর এই পাঁচ মাস ডেঙ্গি জ্বরের মৌসুম। এই কারণে এ সময় সবাই সাবধানে থাকা উচিত। যেহেতু এই রোগ মশাবাহিত সে জন্য খাবার দিয়ে একে প্রতিরোধ করা তেমন সম্ভব নয়। ডেঙ্গি জ্বরে আক্রান্ত হলে রক্তের প্ল্যাটিলেট বা অনুচক্রিকা কমে যাওয়াটাই সমস্যা। আর এই প্ল্যাটিলেটের কাজ হলো রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করা। কিছু কিছু খাবার আছে যা এই প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন-

লেবুর রস : লেবুতে আছে ভিটামিন সি, লৌহ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও সামান্য ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। লেবু দেহে লৌহ শোষণে সাহায্য করে রক্তস্বল্পতা দূর করে। এটি রক্তের প্ল্যাটিলেট বাড়ায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লেবুর রস এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং ত্বকের উপরিভাগের কোষের পুষ্টি জোগানোর ক্ষমতা রয়েছে। লেবু রক্তচাপ কমায়। সর্দি-কাশি সারায় ও জ্বর কমাতে সাহায্য করে। তবে প্ল্যাটিলেট কমাতে কাগজি লেবুর চেয়ে শরবতি লেবুর ভূমিকা বেশি। ১০০ গ্রাম লেবুতে আছে ৪৭ ক্যালরি, ৪০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, লৌহ ২.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪৭ মিলিগ্রাম।

আমলকী : ভিটামিন সি সমৃদ্ধ কষযুক্ত এই ফলটির নিজস্ব স্বাদ না থাকলেও এটি অন্যান্য খাবারের স্বাদ বাড়ায়। এটি খাবারে রুচি বাড়ায় বলে একে রোচনিও বলা হয়। আমলকী রক্তের প্ল্যাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং অকাল বার্ধক্য রোধ করে। এছাড়া বমি ভাব ও এসিডিটি দূর করে। আমলকী কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাধরা, রক্ত স্বল্পতা ও জ্বরে ভালো কাজ করে। একটি কমলালেবুতে যতটুকু ভিটামিন সি আছে, আলমলকীতে আছে তার বিশগুণ বেশি।

ডালিম : যে কোনো অসুস্থতায় পথ্য হিসাবে ডালিম বেশ জনপ্রিয়। এতে আছে শর্করা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ফলিক এসিড ও পটাশিয়াম। ১০০ গ্রাম ডালিমে আছে ৭৪ ক্যালরি। এটি ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণে এবং ডায়ারিয়ায় বেশ উপকারী। এছাড়া প্রদাহ ও প্রোস্টেট ক্যানসারের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে। ডালিম প্ল্যাটিলেট বাড়ায় ও রক্তস্বল্পতা রোধ করে। প্রতিদিন ১ কাপ ডালিমের রস পান করলে ডেঙ্গি রোগী উপকৃত হবেন।

পেঁপে : কাঁচা পাকা উভয় ধরনের পেঁপে এবং পেঁপের পাতা ডেঙ্গির ওষুধ হিসাবে কার্যকর। মালয়েশিয়ার এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এক গবেষণায় দেখা যায়-পেঁপে এবং পেঁপের পাতার রস দ্রুত প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। কাঁচা পেঁপে সহজপাচ্য। হজমকারক এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এতে থাকে পেঁপেইন নামক এনজাইম। পাকা পেঁপেতে আছে বিটা ক্যারোটিন। যা ত্বক ও চোখের জন্য উপকারী। অন্ত্রের গোলোযোগ ও কিডনির পাথর গঠনে প্রতিরোধক হিসাবে পেঁপে কাজ করে।

মিষ্টি কুমড়া : মিষ্টি কুমড়া ও কুমড়ার বিচি রক্তের প্ল্যাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ, বায়ু দূষণ, সবজির রাসায়নিক ও পেস্টিসাইডের ফলে দেহে ফ্রি রেডিক্যালস তৈরি হয়। এতে দেহ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। মিষ্টিকুমড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলে এই ক্ষতির হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। এতে আছে ভিটামিন এ বা বিটাক্যারোটিন। যা চুল, ত্বক ও চোখের জন্য উপকারী। মিষ্টিকুমড়া আর্টারির দেওয়ালে চর্বি জমতে দেয় না বলে এটা কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি থাকার জন্য ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এতে ট্রিপটোফ্যান আছে বলে অনিদ্রায় উপকারী। মিষ্টি কুমড়া খেলে মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। কুমড়ার বিচিতে আছে যথেষ্ট পরিমাণে জিংক। এটাও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ ও কিডনিতে পাথর গঠনে বাধা দেয়।

ঘৃতকুমারী : একে অ্যালোভেরাও বলা হয়। ঘৃতকুমারীর জুস রক্তের সংক্রমণ দূর করে রক্তকে বিশুদ্ধ রাখে। এটি রক্তের প্ল্যাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ঘৃতকুমারী পিত্তরস ক্ষরণ করে ও খিদে বাড়ায়। পেট জ্বালার ক্ষেত্রে পেটে শীতল আমেজ আনে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। পুড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ সেই স্থানে ঘৃতকুমারীর জেলি লাগালে ফোসকা পড়ার হাত থেকে বাঁচা যায়। পোড়া দাগও মিলিয়ে যায়। পাঁচ গ্রাম ঘৃতকুমারীর রস চিনি মিশিয়ে বিকালের দিকে খেলে ঠাণ্ডাজনিত সামস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায় এবং জ্বরেরও উপশম হয়।

লেখক : চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান (অব.), বারডেম। সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামলী ও অ্যাডভান্স হাসপাতাল, ঢাকা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন