রোগীর নিরাপত্তায় ওষুধের যৌক্তিক প্রয়োগ কাম্য
jugantor
বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত গোলটেবিলে বক্তারা
রোগীর নিরাপত্তায় ওষুধের যৌক্তিক প্রয়োগ কাম্য

   

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর কম-বেশি সবাই জীবনের কোনো না কোনো স্তরে ওষুধ সেবন করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষে শুধু রোগী। অন্য পক্ষে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিক্রেতা, ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং ওষুধ প্রশাসনসহ আরও অনেকেই জড়িত। ওষুধ প্রস্তুত থেকে ওষুধ সেবন, ওষুধ রাখা ও বানানো, মান যাচাই করা এবং নীতি নির্ধারণের যে কোনো পর্যায়েই ভুল ত্রুটিজনিত কারণে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন বিপন্ন হতে পারে। এ জন্য চাই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়, সঠিক ওষুধ প্রয়োগ ও রোগীকে রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা। এ নিয়ে বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে দৈনিক যুগান্তর একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। আয়োজনে দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তাদের মতামত তুলে ধরেন। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

এখন বাংলাদেশেও ক্যানসারের ড্রাগ তৈরি হচ্ছে

ফার্মাকোভিজিল্যান্স সঠিক ও জোরদারভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল বাংলাদেশে নেই। বাজার অর্থনীতির এ সময়ে সবাই মুনাফার দিকে ছোটার কারণে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও মনিটরিংয়ে আমাদের মনোযোগ কম। পাবলিক সেক্টরে চিকিৎসার কোয়ালিটি ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের কর্মচারীদেরও শিক্ষিত ও সচেতন করতে হবে। ২০০৪-২০০৫ সালে সাইটোটক্সিক বা ক্যানসারের ড্রাগ লাগেজের মাধ্যমে আমাদের দেশে আসত এবং আমরা তাই প্রেসক্রাইব করতে বাধ্য হতাম। তখন কোল্ড চেইন ও ওষুধের মেয়াদ উত্তীর্ণের বিষয়টি গুরুত্ব পেত না। এখন বাংলাদেশেও ক্যানসারের ড্রাগ তৈরি হচ্ছে এবং রপ্তানিও হচ্ছে। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে এবং ফার্মাকোভিজিল্যান্সের দিকে তাদের সুনজর রয়েছে। স্বাস্থ্য সেক্টরে মিডিয়ার নেগেটিভ রিপোর্ট আমাদের রোগীদের বিদেশ তথা পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে উৎসাহী করছে। আমার অনুরোধ স্বাস্থ্য সেক্টরের পজিটিভ নিউজগুলো গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে, তাহলে রোগীরা দেশেই সেবা পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাবলিক হেলথ সেক্টরে কোনো কিছু ক্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের পরও সরকারকে শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট দিতে হয়, ফলে খরচ আরও বেড়ে যায়। এটি মিডিয়া অতিরিক্ত মূল্য এসব ক্রয় করা হয় বলে প্রচার করে।

- অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালক, জাতীয় ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে

রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরাপদ ওষুধ সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীকে তার সমস্যার কথাগুলো চিকিৎসককে জানাতে হবে। চিকিৎসকেরও রোগীর সব সমস্যা জেনে চিকিৎসাপত্র প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াও কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না। চিকিৎসকের কর্তব্য হচ্ছে, কোনো রোগীকে ওষুধ দিলে কতদিন, কতবার, কত ডোজে খাবে এবং কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানানো। ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ উৎপাদনের পর ও বাজারজাতকরণের আগে তদারকি জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, গণমাধ্যম ও রোগীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। এজন্য বাড়াতে হবে জনবল। চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। যাতে সব রোগীকে ঢাকামুখী হতে না হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সসহ অনেক ওষুধ অকার্যকর হয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ তার অধীনে থাকা সব সংস্থাকেই চিকিৎসার কোয়ালিটির জন্য সক্রিয় থাকতে হবে। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে এই খাতে জনবল বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে অবশ্যই এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

- অধ্যাপক ডা. এম এ হাই, পরিচালক, বাংলাদেশ ক্যানসার হসপিটাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার হোম।

কিছু ওষুধের উচ্চমূল্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে আজ অনেক আধুনিক ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং দেশের মানুষ সেগুলো স্বল্প মূল্যেও পাচ্ছেন। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুরোপুরি বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর একটি কারণ হচ্ছে-ওষুধ অধিদপ্তরের আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করার ও জনবলের অভাব। নতুন নতুন ওষুধ প্রায় প্রতিদিনই বাজারে আসছে কিন্তু এপিআই কোয়ালিটি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে কি? নতুন ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না করেই তা বাংলাদেশের বাজারে আসছে। আমি মনে করি আমাদের জনগোষ্ঠীর ওপরে এ ওষুধ প্রয়োগের আগে তা পরীক্ষা করা জরুরি। আর একটি বিষয় হচ্ছে, গরিব মানুষের জন্য কিছু ওষুধের উচ্চমূল্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। টিপিআই বা ট্রেড প্রাইজ এবং এমআরপি বা খুচরা মূল্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। পাশাপাশি সব এমবিবিএস চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক করা অতীব জরুরি। এমবিবিএস রেজিস্ট্রেশন নেই এমন কেউ কোনো ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার অনুমতি দেওয়ারও সুযোগ নেই। এন্টিবায়োটিক তো নয়ই। অথচ বাংলাদেশের সিংহভাগ ওষুধ বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক ও পিপিআই অর্থাৎ গ্যাস্টিকের ওষুধ বেশি লিখে গ্রাম্য চিকিৎসকরা। এর নিয়ন্ত্রণের কি কোনো উপায় নেই? এটা দেখার দায়িত্ব কার?

- অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি এবং কোঅর্ডিনেটর, স্কয়ার অনকোলজি সেন্টার, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।

আধুনিক ক্যানসার ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম

ক্যানসার চিকিৎসায় সাইটোটক্সিক ভাগ ও হরমোন থেরাপি ছাড়াও বর্তমানে টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, বায়োলজিক্যাল এজেন্টস, মনোক্লোনাল এন্টিবডিসহ প্রায় ৯৫ ভাগ ড্রাগ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। সাইটোটক্সিক ড্রাগের সামান্য থেকে মারাত্মক সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে এমনকি অ্যানাফাইলেকটিক রিয়েকশনও হতে পারে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে যদি আমরা রোগীর এ রিয়েকশন ম্যানেজ করতে না পারি তাহলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি থাকতে পারে। বর্তমানে এ সাইড ইফেক্টগুলো বাজারে সহজলভ্য ড্রাগ দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। কনভেনশনাল সাইটোটক্সিক ড্রাগে ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। ঢাকার সিএমএইচ-এর ক্যানসার সেন্টারে ফার্মাসিস্টরা কাজ করছে এবং পুরো হসপিটালে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সিএমএইচ-এ ফেজ-২ ক্যানসার হসপিটালের কাজ চলছে যাতে সার্জিক্যাল অনকোলজি ও অত্যাধুনিক মেশিন সংযুক্ত হবে। পার্শ্ববর্তী দেশে ক্যানসার চিকিৎসা ও ওষুধের দাম কম হওয়ায় রোগীরা বিদেশমুখী হচ্ছে। ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করব তারা যেন দেশেই ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করতে পারে। তাহলে ওষুধের দাম সবার জন্য সহজলভ্য হবে।

- মেজর জেনারেল অধ্যাপক ডা. আজিজুল ইসলাম, কনসালটেন্ট ফিজিশিয়ান জেনারেল, সিএমএইচ, ঢাকা।

সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই পর্যাপ্ত নয়

সরকারি হাসপাতালে দেশের অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এ রোগীদের বেশিরভাগই দরিদ্র, যারা ক্যানসারের ওষুধ কেনার সামর্থ্য রাখেন না। জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সরকারি হাসপাতালে সব ক্যানসার রোগীকে ভর্তি করিয়ে অনেক সময়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ ক্যানসার রোগীরা ইনজেকটেবল ওষুধ পায় যার জন্য ডে কেয়ার বা হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই রোগীর তুলনায় কম থাকার কারণে তা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারের স্বল্পতা, রোগীর চাপ ও ইনফিউশন পাম্প না থাকার কারণে সরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপির ড্রাগগুলো সঠিক নিয়মে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীকে রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে কাউন্সেলিং করার পরও রোগীদের অসচেতনতা ও জ্ঞানের অভাবে কাক্সিক্ষত মানের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালের আশপাশের ফার্সেসিগুলোতে ক্যানসার ড্রাগগুলো কোল্ড চেইন মেইনটেন না করেই রাখা হচ্ছে। ফলে ওষুধের গুণাগুণ পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে এবং রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। এগুলোর দিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবারই নজর দেওয়া জরুরি।

- অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

রোগীকে নিরাপদে রাখার অন্যতম অনুষঙ্গ ওষুধ

আমরা যদি রোগীকে পরমাত্মীয় ভাবি তাহলে তার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে। রোগীকে নিরাপদে রাখার অন্যতম অনুষঙ্গ ওষুধ। বিজ্ঞানীদের প্রায় একদশক ধরে গবেষণায় যে নতুন কেমিক্যাল বা ওষুধ বাজারে এলো তার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চেয়ে নিরাপত্তা বেশি থাকে বলেই রোগীদের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। রোগীকে নিরাপদে রাখার জন্য ওষুধের প্রয়োগও নিরাপদ হতে হবে। এ জন্য হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার অর্থাৎ যারা ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ওষুধ বাজারজাতকরণের জন্য যে লাইসেন্স ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পেল পরবর্তীতে ড্রাগের লাইফ সাইকেল মনিটরিং করাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব। এ সময় ড্রাগের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসায় বেনিফিটের পাশাপাশি কোন ধরনের রোগীর ওপর কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তারও মনিটরিং ও রেকর্ড হওয়া প্রয়োজন। এ তথ্য জানা থাকলে ও তা রিপোর্ট হলে অন্তত ৫০ ভাগ অ্যাডভার্স ড্রাগ রিয়েকশন প্রতিরোধ করা যায়। ভ্যালিড রিপোর্ট করতে চাইলে যে রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে তাকে শনাক্ত করতে হবে, কোন ওষুধের জন্য এ সমস্যা হতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে, কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা জানতে হবে এবং কে বা কোন চিকিৎসক এটি রিপোর্ট করছে তাও জানতে হবে।

- ড. মো. আকতার হোসেন, উপ-পরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট, ফার্মাকোভিজিল্যান্স।

হসপিটাল ও ক্লিনিকে নার্সদের যথাযথ ট্রেনিং দিতে হবে

মানসম্পন্ন ওষুধ বাজারে বিপণন করার আগে ওষুধ কোম্পানি এবং ওষুধ প্রশাসনকে যথেষ্ট সাবধান হতে হবে এবং বিপণন পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য গুণগত সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। প্রয়োজনে মানহীন ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিতে হবে। এর পরবর্তী ধাপ হলো সারা দেশের হসপিটাল ক্লিনিক এবং চেম্বারের ডাক্তারদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওষুধ লেখা। হাতের লেখার প্রেসক্রিপশন রোগীকে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, কখন কোন ওষুধ কীভাবে খেতে হবে, কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এবং যদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাহলে কখন কোথায় যোগাযোগ করতে হবে তাও বুঝিয়ে বলতে হবে। হসপিটালে এবং ক্লিনিকে নার্সদের যথাযথ ট্রেনিং দিয়ে ওষুধজনিত সাইড ইফেক্ট থেকে রোগীদের কীভাবে নিরাপদে রাখতে হয় তা জানাতে হবে। বিশেষ করে সঠিক ওষুধ সঠিক সময়ে সঠিক ডোজে সঠিক রোগীকে পরিবেশন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধান হতে হবে এবং প্রটোকল ফলো করতে হবে।

- ডা. লুৎফুল লতিফ চৌধুরী

পরিপাকতন্ত্র ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

ফার্মেসিগুলোতে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার

রোগীদের জন্য নিরাপদ ওষুধ প্রয়োগে প্রাইভেট হাসপাতাল যেভাবে কাজ করছে পাবলিক সেক্টর সেভাবে কাজ করতে পারছে না। হেলথ কেয়ার সিস্টেম থেকে সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্টদের অবস্থান একেবারেই অনুপস্থিত। নিরাপদ ওষুধ সেবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফার্মেসি থেকে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট রোগীকে কীভাবে, কখন ও কতটা ওষুধ গ্রহণ করতে হবে তা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটি বেসরকারি পর্যায়ে হচ্ছে। শতকরা ৯০ ভাগ ওষুধ হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসি থেকে কেনা হয়। এ ফার্মেসিগুলোতে বিক্রেতারা ১-৩ মাসের ট্রেনিং ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে নিয়ে থাকেন। এটি চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ফার্মেসিগুলোতে অন্তত ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। ফার্মাকোভিজিল্যান্সের কার্যক্রম প্রত্যেক হাসপাতালে চালু করতে হবে। ডাক্তার ও নার্সদের ফার্মাকোথেরাপিউটিক ট্রেনিং দিতে হবে। অ্যানাফাইলেকটিক ড্রাগ রিয়েকশনের ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং জানা প্রয়োজন। ফার্মাকোভিজিল্যান্স টিমে ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের সহায়ক হিসাবে ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দিতে হবে। এতে রোগীর ভোগান্তি ও খরচ কমবে।

- অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার

ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশে অনেক ফার্মেসি আছে যেগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়

ওষুধের নিরাপত্তা বলতে বোঝানো হয়, সবার জন্য সুলভে ওষুধ সরবরাহ করা। অনেক ওষুধ বাজারে আছে যা দামি, তা কিন্তু ওষুধের নিরাপত্তার আওতায় পড়ে না। এর সঙ্গে যোগ করা যায় এ ওষুধ ব্যবহারে রোগীদের উপকার হবে; তেমন কোনো অপকার হবে না; তাও হচ্ছে ওষুধের নিরাপত্তা। আমাদের দেশে প্রায় ৭০ ভাগ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়, এখান থেকে প্রেসক্রাইবড ওষুধ তারা বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে কেনে। দেশে অনেক ফার্মেসি আছে যেগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়। এমন ফার্মেসিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এসব ওষুধের দোকানে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা অত্যাবশ্যক। শুধু ভালো ওষুধ তৈরি ও রপ্তানি করলেই চলবে না, ওষুধের বিপণন ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ডিসপেনসিং ব্যবস্থাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সব মডেল ফার্মেসিতে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। এটি না থাকার পরও কোনো মডেল ফার্মেসিকে এখন পর্যন্ত অ্যাক্রিডিটেশন বা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়নি।

- অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ

চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সব ক্ষেত্রেই আমাদের সচেতন ও দায়িত্ববান হতে হবে

আমি বিশ্বাস করি ‘নিরাপদ ওষুধ সেবন নিশ্চিতকরণ’ বিষয়ে আলোচনা একটি জন-অধিকারও বটে। যে কোনো মিশনকে কার্যকর করতে হলে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ- সীমাবদ্ধতা এবং দায়িত্বশীলতা। নির্দিষ্ট কাজের জন্য সীমাবদ্ধতা জানা থাকলে, তা সমাধান করা সহজ হয়ে ওঠে। ওষুধ প্রস্তুতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহণ, পরিমাণ নির্ধারণ, প্রয়োগ এবং পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণ-সর্বক্ষেত্রেই আমরা যদি দায়িত্ববান হতে পারি তবেই সাফল্য আসবে। চিকিৎসক হিসাবে একটা উদাহরণ দিতে পারি। ওষুধ প্রয়োগের আগে আমরা যদি ক্রস-চেক করে নিতে পারি, তবে ভুলের আশঙ্কা কমে আসবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সেবিকা এবং ফার্মাসিস্ট সবাইকে এ প্রক্রিয়ায় সজাগ থাকতে হবে। এজন্য শুধু দরকার সচেতনতা। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সমন্বয়। সঠিকভাবে কাজ করার ইচ্ছা হয়তো সবার থাকবে, কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে তা সফলতার মুখ নাও দেখতে পারে। আমি আশা রাখি, এ আলোচনা আমাদের সঠিক পথেই রাখবে এবং সবাইকে সমন্বিত করবে।

- ডা. অসীম কুমার সেনগুপ্ত

কনসালটেন্ট, অনকোলজি বিভাগ, ইউনাইটেড হসপিটাল।

বিশ্বজুড়ে বীকনকে ভ্যালুয়েবল প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চাই

বর্তমান সময়ে ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা ও রোগীর জন্য এর উপকারিতা গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি হচ্ছে। শুধু অ্যাডভার্স ড্রাগ রি-অ্যাকশন ও সাইড ইফেক্টেই এটি সীমাবদ্ধ নয়। রোগীদের জন্য ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার, ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন, কাউন্টার ফেস ও মেডিকেশনেও ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পোস্ট সর্ভিল্যান্স মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে রোগীর ওপর ওষুধের বিহেভিয়ার রেকর্ডও পর্যালোচনা করা হয়। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিশন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে এটি ভ্যালুয়েবল ও মর্যাদাসম্পন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তাই আমরা একটি বৃহৎ ও একটিভ ফার্মাকোভিজিল্যান্স টিম তৈরি করেছি। শুধু মুনাফা অর্জন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের ফ্যাক্টরির ফার্মাসিস্ট মার্কেট ও ডাক্তারদের কাছ থেকে ওষুধ সম্পর্কে যে রিপোর্ট আসে তা যথাযথভাবে মনিটর করে। এ ছাড়া কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ও কন্ট্রোল টিম রয়েছে। ডেডিকেটেড কোল্ড চেইন ভেনের মাধ্যমে আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওষুধ সরবরাহ করে থাকি। ক্যানসার চিকিৎসায় খুবই সফেসটিকেটেড ড্রাগ আমরা তৈরি করি।

- এসএম মাহমুদুল হক পল্লব

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্কেটিং ও সেলস, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

বক্তাদের সুপারিশ

* দেশের সব হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট থাকা অত্যাবশ্যক।

* ওষুধের পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্সের জন্য পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

* দেশেই ওষুধের কাঁচামাল পর্যাপ্ত তৈরি হলে ওষুধের দাম কমে আসবে।

* স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত সবার অ্যাডভার্স ড্রাগ রিয়েকশন ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং থাকা জরুরি।

* ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির আগে ডাক্তার ও রোগীর নাম ইলেকট্রনিক্যালি লিখে স্লিপ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।

* হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের হেলথ এডুকেশনের আওতায় আনতে হবে।

* অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা ও পরিবেশন করা থেকে ডাক্তার ও ফার্মেসির বিক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে।

* হেলথ সেক্টরের পজিটিভ নিউজ মিডিয়ায় পরিবেশন রোগীদের দেশে চিকিৎসামুখী করবে।

* দেশের সব ফার্মেসিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনিটরিংয়ে আনা প্রয়োজন।

* প্রত্যেক রোগীর নামে হেলথ কার্ড বা হেলথ নম্বর প্রদান করে ওষুধের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। তাহলে কোনো রোগী আগে কী ওষুধ ব্যবহার করেছে তার ইতিহাসও জানা থাকবে পরবর্তী চিকিৎসকের সুবিধার জন্য।

* ওষুধের মেয়াদ, সেলফ লাইফ, ওষুধ পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি হসপিটাল ফার্মাসিস্টদের তদারকি করতে হবে এবং নার্স ও ডাক্তারকে সার্বিকভাবে ওষুধ পরিবেশনা ও ম্যানেজমেন্টের ওপর নজর রাখতে হবে।

* যে কোনো ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে রোগীকেও ওষুধ বন্ধ করার আগাম পরামর্শ দিতে হবে।

বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত গোলটেবিলে বক্তারা

রোগীর নিরাপত্তায় ওষুধের যৌক্তিক প্রয়োগ কাম্য

  
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর কম-বেশি সবাই জীবনের কোনো না কোনো স্তরে ওষুধ সেবন করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষে শুধু রোগী। অন্য পক্ষে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিক্রেতা, ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং ওষুধ প্রশাসনসহ আরও অনেকেই জড়িত। ওষুধ প্রস্তুত থেকে ওষুধ সেবন, ওষুধ রাখা ও বানানো, মান যাচাই করা এবং নীতি নির্ধারণের যে কোনো পর্যায়েই ভুল ত্রুটিজনিত কারণে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন বিপন্ন হতে পারে। এ জন্য চাই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়, সঠিক ওষুধ প্রয়োগ ও রোগীকে রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা। এ নিয়ে বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে দৈনিক যুগান্তর একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। আয়োজনে দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তাদের মতামত তুলে ধরেন। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

এখন বাংলাদেশেও ক্যানসারের ড্রাগ তৈরি হচ্ছে

ফার্মাকোভিজিল্যান্স সঠিক ও জোরদারভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল বাংলাদেশে নেই। বাজার অর্থনীতির এ সময়ে সবাই মুনাফার দিকে ছোটার কারণে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও মনিটরিংয়ে আমাদের মনোযোগ কম। পাবলিক সেক্টরে চিকিৎসার কোয়ালিটি ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের কর্মচারীদেরও শিক্ষিত ও সচেতন করতে হবে। ২০০৪-২০০৫ সালে সাইটোটক্সিক বা ক্যানসারের ড্রাগ লাগেজের মাধ্যমে আমাদের দেশে আসত এবং আমরা তাই প্রেসক্রাইব করতে বাধ্য হতাম। তখন কোল্ড চেইন ও ওষুধের মেয়াদ উত্তীর্ণের বিষয়টি গুরুত্ব পেত না। এখন বাংলাদেশেও ক্যানসারের ড্রাগ তৈরি হচ্ছে এবং রপ্তানিও হচ্ছে। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে এবং ফার্মাকোভিজিল্যান্সের দিকে তাদের সুনজর রয়েছে। স্বাস্থ্য সেক্টরে মিডিয়ার নেগেটিভ রিপোর্ট আমাদের রোগীদের বিদেশ তথা পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে উৎসাহী করছে। আমার অনুরোধ স্বাস্থ্য সেক্টরের পজিটিভ নিউজগুলো গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে, তাহলে রোগীরা দেশেই সেবা পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাবলিক হেলথ সেক্টরে কোনো কিছু ক্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের পরও সরকারকে শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট দিতে হয়, ফলে খরচ আরও বেড়ে যায়। এটি মিডিয়া অতিরিক্ত মূল্য এসব ক্রয় করা হয় বলে প্রচার করে।

- অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালক, জাতীয় ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে

রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরাপদ ওষুধ সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীকে তার সমস্যার কথাগুলো চিকিৎসককে জানাতে হবে। চিকিৎসকেরও রোগীর সব সমস্যা জেনে চিকিৎসাপত্র প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াও কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না। চিকিৎসকের কর্তব্য হচ্ছে, কোনো রোগীকে ওষুধ দিলে কতদিন, কতবার, কত ডোজে খাবে এবং কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানানো। ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ উৎপাদনের পর ও বাজারজাতকরণের আগে তদারকি জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, গণমাধ্যম ও রোগীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। এজন্য বাড়াতে হবে জনবল। চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। যাতে সব রোগীকে ঢাকামুখী হতে না হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সসহ অনেক ওষুধ অকার্যকর হয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ তার অধীনে থাকা সব সংস্থাকেই চিকিৎসার কোয়ালিটির জন্য সক্রিয় থাকতে হবে। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে এই খাতে জনবল বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে অবশ্যই এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

- অধ্যাপক ডা. এম এ হাই, পরিচালক, বাংলাদেশ ক্যানসার হসপিটাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার হোম।

কিছু ওষুধের উচ্চমূল্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে আজ অনেক আধুনিক ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং দেশের মানুষ সেগুলো স্বল্প মূল্যেও পাচ্ছেন। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুরোপুরি বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর একটি কারণ হচ্ছে-ওষুধ অধিদপ্তরের আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করার ও জনবলের অভাব। নতুন নতুন ওষুধ প্রায় প্রতিদিনই বাজারে আসছে কিন্তু এপিআই কোয়ালিটি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে কি? নতুন ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না করেই তা বাংলাদেশের বাজারে আসছে। আমি মনে করি আমাদের জনগোষ্ঠীর ওপরে এ ওষুধ প্রয়োগের আগে তা পরীক্ষা করা জরুরি। আর একটি বিষয় হচ্ছে, গরিব মানুষের জন্য কিছু ওষুধের উচ্চমূল্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। টিপিআই বা ট্রেড প্রাইজ এবং এমআরপি বা খুচরা মূল্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। পাশাপাশি সব এমবিবিএস চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক করা অতীব জরুরি। এমবিবিএস রেজিস্ট্রেশন নেই এমন কেউ কোনো ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার অনুমতি দেওয়ারও সুযোগ নেই। এন্টিবায়োটিক তো নয়ই। অথচ বাংলাদেশের সিংহভাগ ওষুধ বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক ও পিপিআই অর্থাৎ গ্যাস্টিকের ওষুধ বেশি লিখে গ্রাম্য চিকিৎসকরা। এর নিয়ন্ত্রণের কি কোনো উপায় নেই? এটা দেখার দায়িত্ব কার?

- অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি এবং কোঅর্ডিনেটর, স্কয়ার অনকোলজি সেন্টার, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।

আধুনিক ক্যানসার ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম

ক্যানসার চিকিৎসায় সাইটোটক্সিক ভাগ ও হরমোন থেরাপি ছাড়াও বর্তমানে টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, বায়োলজিক্যাল এজেন্টস, মনোক্লোনাল এন্টিবডিসহ প্রায় ৯৫ ভাগ ড্রাগ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। সাইটোটক্সিক ড্রাগের সামান্য থেকে মারাত্মক সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে এমনকি অ্যানাফাইলেকটিক রিয়েকশনও হতে পারে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে যদি আমরা রোগীর এ রিয়েকশন ম্যানেজ করতে না পারি তাহলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি থাকতে পারে। বর্তমানে এ সাইড ইফেক্টগুলো বাজারে সহজলভ্য ড্রাগ দিয়ে ম্যানেজ করা যায়। কনভেনশনাল সাইটোটক্সিক ড্রাগে ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। ঢাকার সিএমএইচ-এর ক্যানসার সেন্টারে ফার্মাসিস্টরা কাজ করছে এবং পুরো হসপিটালে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সিএমএইচ-এ ফেজ-২ ক্যানসার হসপিটালের কাজ চলছে যাতে সার্জিক্যাল অনকোলজি ও অত্যাধুনিক মেশিন সংযুক্ত হবে। পার্শ্ববর্তী দেশে ক্যানসার চিকিৎসা ও ওষুধের দাম কম হওয়ায় রোগীরা বিদেশমুখী হচ্ছে। ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করব তারা যেন দেশেই ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করতে পারে। তাহলে ওষুধের দাম সবার জন্য সহজলভ্য হবে।

- মেজর জেনারেল অধ্যাপক ডা. আজিজুল ইসলাম, কনসালটেন্ট ফিজিশিয়ান জেনারেল, সিএমএইচ, ঢাকা।

সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই পর্যাপ্ত নয়

সরকারি হাসপাতালে দেশের অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এ রোগীদের বেশিরভাগই দরিদ্র, যারা ক্যানসারের ওষুধ কেনার সামর্থ্য রাখেন না। জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সরকারি হাসপাতালে সব ক্যানসার রোগীকে ভর্তি করিয়ে অনেক সময়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ ক্যানসার রোগীরা ইনজেকটেবল ওষুধ পায় যার জন্য ডে কেয়ার বা হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সাপ্লাই রোগীর তুলনায় কম থাকার কারণে তা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারের স্বল্পতা, রোগীর চাপ ও ইনফিউশন পাম্প না থাকার কারণে সরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপির ড্রাগগুলো সঠিক নিয়মে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীকে রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে কাউন্সেলিং করার পরও রোগীদের অসচেতনতা ও জ্ঞানের অভাবে কাক্সিক্ষত মানের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালের আশপাশের ফার্সেসিগুলোতে ক্যানসার ড্রাগগুলো কোল্ড চেইন মেইনটেন না করেই রাখা হচ্ছে। ফলে ওষুধের গুণাগুণ পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে এবং রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। এগুলোর দিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবারই নজর দেওয়া জরুরি।

- অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

রোগীকে নিরাপদে রাখার অন্যতম অনুষঙ্গ ওষুধ

আমরা যদি রোগীকে পরমাত্মীয় ভাবি তাহলে তার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে। রোগীকে নিরাপদে রাখার অন্যতম অনুষঙ্গ ওষুধ। বিজ্ঞানীদের প্রায় একদশক ধরে গবেষণায় যে নতুন কেমিক্যাল বা ওষুধ বাজারে এলো তার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চেয়ে নিরাপত্তা বেশি থাকে বলেই রোগীদের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। রোগীকে নিরাপদে রাখার জন্য ওষুধের প্রয়োগও নিরাপদ হতে হবে। এ জন্য হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার অর্থাৎ যারা ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ওষুধ বাজারজাতকরণের জন্য যে লাইসেন্স ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পেল পরবর্তীতে ড্রাগের লাইফ সাইকেল মনিটরিং করাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব। এ সময় ড্রাগের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসায় বেনিফিটের পাশাপাশি কোন ধরনের রোগীর ওপর কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তারও মনিটরিং ও রেকর্ড হওয়া প্রয়োজন। এ তথ্য জানা থাকলে ও তা রিপোর্ট হলে অন্তত ৫০ ভাগ অ্যাডভার্স ড্রাগ রিয়েকশন প্রতিরোধ করা যায়। ভ্যালিড রিপোর্ট করতে চাইলে যে রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে তাকে শনাক্ত করতে হবে, কোন ওষুধের জন্য এ সমস্যা হতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে, কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা জানতে হবে এবং কে বা কোন চিকিৎসক এটি রিপোর্ট করছে তাও জানতে হবে।

- ড. মো. আকতার হোসেন, উপ-পরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট, ফার্মাকোভিজিল্যান্স।

হসপিটাল ও ক্লিনিকে নার্সদের যথাযথ ট্রেনিং দিতে হবে

মানসম্পন্ন ওষুধ বাজারে বিপণন করার আগে ওষুধ কোম্পানি এবং ওষুধ প্রশাসনকে যথেষ্ট সাবধান হতে হবে এবং বিপণন পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য গুণগত সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। প্রয়োজনে মানহীন ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিতে হবে। এর পরবর্তী ধাপ হলো সারা দেশের হসপিটাল ক্লিনিক এবং চেম্বারের ডাক্তারদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওষুধ লেখা। হাতের লেখার প্রেসক্রিপশন রোগীকে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, কখন কোন ওষুধ কীভাবে খেতে হবে, কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এবং যদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাহলে কখন কোথায় যোগাযোগ করতে হবে তাও বুঝিয়ে বলতে হবে। হসপিটালে এবং ক্লিনিকে নার্সদের যথাযথ ট্রেনিং দিয়ে ওষুধজনিত সাইড ইফেক্ট থেকে রোগীদের কীভাবে নিরাপদে রাখতে হয় তা জানাতে হবে। বিশেষ করে সঠিক ওষুধ সঠিক সময়ে সঠিক ডোজে সঠিক রোগীকে পরিবেশন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধান হতে হবে এবং প্রটোকল ফলো করতে হবে।

- ডা. লুৎফুল লতিফ চৌধুরী

পরিপাকতন্ত্র ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

ফার্মেসিগুলোতে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার

রোগীদের জন্য নিরাপদ ওষুধ প্রয়োগে প্রাইভেট হাসপাতাল যেভাবে কাজ করছে পাবলিক সেক্টর সেভাবে কাজ করতে পারছে না। হেলথ কেয়ার সিস্টেম থেকে সরকারি পর্যায়ে ফার্মাসিস্টদের অবস্থান একেবারেই অনুপস্থিত। নিরাপদ ওষুধ সেবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফার্মেসি থেকে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট রোগীকে কীভাবে, কখন ও কতটা ওষুধ গ্রহণ করতে হবে তা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটি বেসরকারি পর্যায়ে হচ্ছে। শতকরা ৯০ ভাগ ওষুধ হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসি থেকে কেনা হয়। এ ফার্মেসিগুলোতে বিক্রেতারা ১-৩ মাসের ট্রেনিং ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে নিয়ে থাকেন। এটি চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ফার্মেসিগুলোতে অন্তত ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। ফার্মাকোভিজিল্যান্সের কার্যক্রম প্রত্যেক হাসপাতালে চালু করতে হবে। ডাক্তার ও নার্সদের ফার্মাকোথেরাপিউটিক ট্রেনিং দিতে হবে। অ্যানাফাইলেকটিক ড্রাগ রিয়েকশনের ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং জানা প্রয়োজন। ফার্মাকোভিজিল্যান্স টিমে ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের সহায়ক হিসাবে ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দিতে হবে। এতে রোগীর ভোগান্তি ও খরচ কমবে।

- অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার

ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশে অনেক ফার্মেসি আছে যেগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়

ওষুধের নিরাপত্তা বলতে বোঝানো হয়, সবার জন্য সুলভে ওষুধ সরবরাহ করা। অনেক ওষুধ বাজারে আছে যা দামি, তা কিন্তু ওষুধের নিরাপত্তার আওতায় পড়ে না। এর সঙ্গে যোগ করা যায় এ ওষুধ ব্যবহারে রোগীদের উপকার হবে; তেমন কোনো অপকার হবে না; তাও হচ্ছে ওষুধের নিরাপত্তা। আমাদের দেশে প্রায় ৭০ ভাগ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়, এখান থেকে প্রেসক্রাইবড ওষুধ তারা বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে কেনে। দেশে অনেক ফার্মেসি আছে যেগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়। এমন ফার্মেসিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এসব ওষুধের দোকানে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা অত্যাবশ্যক। শুধু ভালো ওষুধ তৈরি ও রপ্তানি করলেই চলবে না, ওষুধের বিপণন ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ডিসপেনসিং ব্যবস্থাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সব মডেল ফার্মেসিতে ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। এটি না থাকার পরও কোনো মডেল ফার্মেসিকে এখন পর্যন্ত অ্যাক্রিডিটেশন বা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়নি।

- অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ

চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সব ক্ষেত্রেই আমাদের সচেতন ও দায়িত্ববান হতে হবে

আমি বিশ্বাস করি ‘নিরাপদ ওষুধ সেবন নিশ্চিতকরণ’ বিষয়ে আলোচনা একটি জন-অধিকারও বটে। যে কোনো মিশনকে কার্যকর করতে হলে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ- সীমাবদ্ধতা এবং দায়িত্বশীলতা। নির্দিষ্ট কাজের জন্য সীমাবদ্ধতা জানা থাকলে, তা সমাধান করা সহজ হয়ে ওঠে। ওষুধ প্রস্তুতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহণ, পরিমাণ নির্ধারণ, প্রয়োগ এবং পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণ-সর্বক্ষেত্রেই আমরা যদি দায়িত্ববান হতে পারি তবেই সাফল্য আসবে। চিকিৎসক হিসাবে একটা উদাহরণ দিতে পারি। ওষুধ প্রয়োগের আগে আমরা যদি ক্রস-চেক করে নিতে পারি, তবে ভুলের আশঙ্কা কমে আসবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সেবিকা এবং ফার্মাসিস্ট সবাইকে এ প্রক্রিয়ায় সজাগ থাকতে হবে। এজন্য শুধু দরকার সচেতনতা। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সমন্বয়। সঠিকভাবে কাজ করার ইচ্ছা হয়তো সবার থাকবে, কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে তা সফলতার মুখ নাও দেখতে পারে। আমি আশা রাখি, এ আলোচনা আমাদের সঠিক পথেই রাখবে এবং সবাইকে সমন্বিত করবে।

- ডা. অসীম কুমার সেনগুপ্ত

কনসালটেন্ট, অনকোলজি বিভাগ, ইউনাইটেড হসপিটাল।

বিশ্বজুড়ে বীকনকে ভ্যালুয়েবল প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চাই

বর্তমান সময়ে ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা ও রোগীর জন্য এর উপকারিতা গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি হচ্ছে। শুধু অ্যাডভার্স ড্রাগ রি-অ্যাকশন ও সাইড ইফেক্টেই এটি সীমাবদ্ধ নয়। রোগীদের জন্য ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার, ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন, কাউন্টার ফেস ও মেডিকেশনেও ফার্মাকোভিজিল্যান্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পোস্ট সর্ভিল্যান্স মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিতে রোগীর ওপর ওষুধের বিহেভিয়ার রেকর্ডও পর্যালোচনা করা হয়। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিশন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে এটি ভ্যালুয়েবল ও মর্যাদাসম্পন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তাই আমরা একটি বৃহৎ ও একটিভ ফার্মাকোভিজিল্যান্স টিম তৈরি করেছি। শুধু মুনাফা অর্জন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের ফ্যাক্টরির ফার্মাসিস্ট মার্কেট ও ডাক্তারদের কাছ থেকে ওষুধ সম্পর্কে যে রিপোর্ট আসে তা যথাযথভাবে মনিটর করে। এ ছাড়া কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ও কন্ট্রোল টিম রয়েছে। ডেডিকেটেড কোল্ড চেইন ভেনের মাধ্যমে আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওষুধ সরবরাহ করে থাকি। ক্যানসার চিকিৎসায় খুবই সফেসটিকেটেড ড্রাগ আমরা তৈরি করি।

- এসএম মাহমুদুল হক পল্লব

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্কেটিং ও সেলস, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

বক্তাদের সুপারিশ

* দেশের সব হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট থাকা অত্যাবশ্যক।

* ওষুধের পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্সের জন্য পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

* দেশেই ওষুধের কাঁচামাল পর্যাপ্ত তৈরি হলে ওষুধের দাম কমে আসবে।

* স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত সবার অ্যাডভার্স ড্রাগ রিয়েকশন ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং থাকা জরুরি।

* ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির আগে ডাক্তার ও রোগীর নাম ইলেকট্রনিক্যালি লিখে স্লিপ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।

* হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের হেলথ এডুকেশনের আওতায় আনতে হবে।

* অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা ও পরিবেশন করা থেকে ডাক্তার ও ফার্মেসির বিক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে।

* হেলথ সেক্টরের পজিটিভ নিউজ মিডিয়ায় পরিবেশন রোগীদের দেশে চিকিৎসামুখী করবে।

* দেশের সব ফার্মেসিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনিটরিংয়ে আনা প্রয়োজন।

* প্রত্যেক রোগীর নামে হেলথ কার্ড বা হেলথ নম্বর প্রদান করে ওষুধের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। তাহলে কোনো রোগী আগে কী ওষুধ ব্যবহার করেছে তার ইতিহাসও জানা থাকবে পরবর্তী চিকিৎসকের সুবিধার জন্য।

* ওষুধের মেয়াদ, সেলফ লাইফ, ওষুধ পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি হসপিটাল ফার্মাসিস্টদের তদারকি করতে হবে এবং নার্স ও ডাক্তারকে সার্বিকভাবে ওষুধ পরিবেশনা ও ম্যানেজমেন্টের ওপর নজর রাখতে হবে।

* যে কোনো ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে রোগীকেও ওষুধ বন্ধ করার আগাম পরামর্শ দিতে হবে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন