ফুসফুস সুস্থ রাখতে চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ
jugantor
দৈনিক যুগান্তর-এভারকেয়ার আয়োজিত ওয়ার্ল্ড লাং ডে’তে আলোচকবৃন্দ
ফুসফুস সুস্থ রাখতে চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ

   

০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে মানুষের প্রধান পাঁচটি মৃত্যুর দুটিই হচ্ছে শ্বাসতন্ত্রের অসুখ। এর একটি হচ্ছে ব্রঙ্কোজেনিক কার্সিনোমা বা ফুসফুসে ক্যানসার এবং অন্যটি হচ্ছে সিওপিডি বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ। অন্য রোগগুলো হচ্ছে অ্যাজমা, যক্ষ্মা ও নিউমোনিয়া। এদের সঙ্গে পৃথিবীতে আরেকটি বক্ষব্যাধি যুক্ত হয়েছে যার নাম কোভিড, যা প্রধানত ফুসফুসকেই আক্রমণ করে। নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসেবায় পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের সমান ও সার্বজনীন সুযোগ-সুবিধা ও অ্যাকসেস না থাকায় কোনো কোনো দেশ, শ্রেণিপেশার মানুষ রোগ-শোকে বেশি ভুগছেন।

বিশ্ব ফুসফুস দিবসে দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের গোলটেবিল আলোচনায় এ বক্তব্যগুলো উঠে এসেছে। এতে সভাপতিত্ব করেছেন দৈনিক যুগান্তরের উপ-সম্পাদক এহসানুল হক বাবু এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সুস্থ থাকুন পাতার সম্পাদক ডা. ফাহিম আহমেদ রূপম।

ফুসফুসের যত্নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে

ফুসফুসের রোগগুলোর মধ্যে এখন কোভিডকে এক নম্বর হিসাবে ধরা যায়। কারণ করোনা ভাইরাস প্রধানত নাসারন্ধ্র বা ফুসফুসের মাধ্যমেই পুরো শরীরে ছড়ায়। ফুসফুসের যত্নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে কারণ এ অঙ্গ ভালো থাকলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও ভালো থাকবে। ফুসফুসের বর্ধন জন্মের পরও দশ বছর ধরে চলতে থাকে। তাই শৈশব থেকেই এ অঙ্গের যত্ন নিলে ফুসফুস তার ফুল রিসার্ভ নিয়ে আমাদের সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখবে। গর্ভবতী যদি দূষণমুক্ত পরিবেশে এবং ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকে এবং যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি বা বিশ্রাম পায় তাহলে অনাগত সন্তানের ফুসফুসও সুগঠিত হবে। গর্ভবতীকে সব ধরনের টিকা দেওয়াও জরুরি। বাসায় যদি পোষা পাখি, বিড়াল, মোটা কার্পেট, ভারী পর্দা ও সার্বক্ষণিক এসিতে কেউ থাকে তাহলে তার ফুসফুস রোগাক্রান্ত হতে পারে। ঘরে ক্রস ভেন্টিলেশন অর্থাৎ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল বা বের হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে, তাহলে ঘরের ভেতর থাকা ডাস্ট মাইট বা অ্যালার্জেন বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে। সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে এ তথ্য ছড়িয়ে ফুসফুসের যত্নে অ্যাডভোকেসি ও অ্যাকশন প্লান তৈরি করতে হবে। পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই কিন্তু এর সুষম বণ্টন থাকা চাই। তাহলেই পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষ অপুষ্টি বা রোগ-শোকে কম ভুগবে।

-অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাহেদুর রহমান খান, প্রাক্তন পরিচালক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসাতাল, ঢাকা।

স্ক্রিনিং করে রোগ শনাক্ত নিশ্চিত করতে হবে

অ্যাজমা, সিওপিডি, ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, অকুপেশনাল লাং ডিজিজ-এ অসুখে রোগীরা ভুগতে ভুগতে এক সময় তাদের কাজের উৎপাদনশীলতা কমে আসে, মানসিক অবশাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং রোগীরা পঙ্গুত্ববরণ করেন। এ রোগীদের নিয়ে এমন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই তারা সঠিক চিকিৎসা পান এবং কর্মক্ষম থাকেন। অ্যাজমা চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের যে GINA গাইডলাইন আছে, সে অনুযায়ী চারটি ফোকাসিং পয়েন্ট আছে। প্রথমটি হচ্ছে রোগটি সুনিশ্চিতভাবে ডায়াগনোসিস করে রোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা বা জ্ঞান দিতে হবে। এর পর অ্যাজমা রোগের সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক ম্যানেজমেন্ট প্রদান করতে হবে। অ্যাজমা রোগের জটিলতাগুলো জানিয়ে ফুসফুসকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যথাস্থানে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর ফলে রোগীরা হঠাৎ করে সংকটাপন্ন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও আইসিইউতে থেকে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। এভারকেয়ার হাসপাতালে অ্যাজমা ও বক্ষব্যাধির সমস্যাগুলো সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে জটিল বক্ষব্যাধির রোগীদের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ম্যানেজমন্ট প্রদানের জন্য বোর্ড করে স্বল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

-অধ্যাপক ডা. রৌশনী জাহান, সিনিয়র কনস্যালটেন্ট ও কোঅডিনেটর রেসপিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

পরিবেশ দূষণ রোধে উদ্যোগ প্রয়োজন

ফুসফুসের অসুস্থতার অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে পরিবেশ বা বায়ুমণ্ডলের বিষাক্ততাকে। ফুসফুস আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করছে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফুসফুস যখন অসুস্থতায় আক্রান্ত হয় তখন কিন্তু এ পরিমাণ অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং এ থেকেই এই অঙ্গসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন শুরু হয়। কোভিডসহ ফুসফুসের অন্যান্য মারাত্মক অসুস্থতায় ন্যাসাল ক্যানুলা থেকে শুরু করে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর ব্যবহার করেও যখন ফুসফুস কাজ করে না তখন শরীরের বাইরে একটি সার্কিট করে ইকমো (ECMO) নামক আধুনিক চিকিৎসাও আমরা দিয়েছি। উন্নত দেশে এ ইকমোতেও কাজ না হলে ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়। কোভিডসহ ফুসফুসের জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের শুধু মেডিকেশনই নয় ফুসফুসের ব্যায়াম, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ারও আমরা অ্যাডভাইস দিয়ে থাকি। পরিবেশ দূষণ বা কলকারখানা, যানবাহন, বাসার জ্বালানি থেকে যে বিষাক্ত গ্যাসের নির্গমন হয় তা যদি শূন্যের কাছাকাছি আনতে না পারি তাহলে ফুসফুসের রোগগুলোও নিয়ন্ত্রণে আনা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

-ডা. এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, রেসপিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

একই ছাদের নিচে রোগীরা যেন চিকিৎসা পায়

কোভিডের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব ফুসফুস দিবস পালনের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। সবার জন্য সুস্থ ফুসফুস শুধু থিম বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে সচেতনতা বাড়ানো ও তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিতের জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অতীব জরুরি। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে এভারকেয়ারের মতো টারশিয়ারি লেভেলে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআইয়ে ১০০% কভারেজ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার লক্ষ্যমাত্রায় অর্জন, মানুষের আয়ুস্কাল বাড়া এগুলো সবই আমাদের দেশের অর্জন। হাসপাতালে রোগীর ক্লিনিক্যাল সেবায় আমরা অনেক কিছু করতে পেরেছি। হার্ট, লাং লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের অবকাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে। কিডনি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন বাংলাদেশে হচ্ছে। কোভিড মহামারিতে অনেক রোগী দেশে চিকিৎসা নিয়েছেন, যারা বাইরে যেতে পারেন নাই। এটিও আমাদের স্বাস্থ্য খাতের একটি অর্জন। মেডিকেল ট্যুরিজমে প্রতি বছর ৪ মিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা একই ছাদের নিচে যেন করা যায়। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য বিমার সম্প্রসারণে আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে রোগীদের আর বিদেশে যেতে হবে না।

- ডা. আরিফ মাহমুদ, পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিস, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

শিশুকে ব্যায়ামের প্রতি আগ্রহী করাতে হবে

যদি ২-৩ মিনিট সঠিকভাগে শ্বাস নেওয়া না যায় তাহলে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ফুসফুসের প্রধান পাঁচটি রোগ হচ্ছে-নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, যক্ষ্মা, সিওপিডি ও ফুসফুসের ক্যানসার। এ রোগগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের অ্যাজমা রোগের প্রারম্ভেই ব্রঙ্কোডায়ালেটর দিয়ে চিকিৎসা নিলে ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পরামর্শ মেনে চললে শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে কোনো সমস্যা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকালের অ্যাজমা বয়সকালে ভালোও হয়ে যায়। শিশুকে ব্রেস্ট ফিডিং বা মায়ের বুকের দুধ পান করালে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায় এবং ইনফেকশাস ডিজিজ থেকে শিশুরা দূরে থাকে। ওরস্যালাইনের ব্যবহার ডায়রিয়া চিকিৎসা সহজ করেছে। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুরোধ করার জন্য সামাজিক সচেতনতা ও শিশুর বাবা-মায়ের শিশুকে বৈজ্ঞানিকভাবে লালন-পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ শিশুদের নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সংক্রমিত রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। শিশুরা যেন ঘরের এবং বাইরের যে কোন ধুলা ও ধোঁয়া থেকে দূরে থাকে সেজন্য অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। শিশুদের কোভিডের টিকা প্রদানেও বাবা-মাকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে খেলাধুলা ও সাঁতার কাটানোর অভ্যাস শিশুকাল থেকে গড়ে তুলতে হবে।

-অধ্যাপক ডা. ইশতিয়াক হোসাইন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নবজাতক ও শিশু রোগ বিভাগ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

বিশ্বব্যাপী চিকিৎসার বৈষম্য কমানো প্রয়োজন

নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউতে সেসব রোগীকে সাপোর্ট বা মনিটর করা হয় যাদের ওয়ার্ড, কেবিন বা বহির্বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। আইসিইউ সেটআপে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা আছে এমন রোগীদের সংখ্যাই বেশি। এ রোগীদের বেশিরভাগেরই সুনির্দিষ্ট পরিমাপে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এভারকেয়ার হসপিটালের মেডিকেল আইসিইউতে অনেক কোভিড রোগীকে আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে সুস্থ করে বাসায় পাঠাতে সক্ষম হয়েছি। ন্যাসাল ক্যানুলা, ফেস মাস্ক, হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা বা ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের যন্ত্র দিয়ে এসব রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। কখন, কোন রোগীকে, কী ধরনের সাপোর্ট দিতে হবে তা আমরা সঠিকভাবে অ্যাসেস করে থাকি এবং রোগীকে কোন পর্যায়ে, কীভাবে সাপোর্ট থেকে উইড্রো করতে হবে তা নিরুপণ করাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিডের সময় এ রোগীদের যেন ভেন্টিলেশন না লাগে এবং রোগীর ফুসফুস যেন ফাইব্রোসিস বা চুপসে না যায় সে লক্ষ্যে আমরা সময় মতো হাইফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা দিয়ে অক্সিজেন দিয়েছি। রোগীকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার আগে আমরা নির্ধারণ করে থাকি এ রোগীদের কতখানি আমরা এ চিকিৎসার মাধ্যমে বেনিফিট দিতে পারব। যে রোগীরা রোগে ভোগান্তির শেষ পর্যায়ে বা টার্মিনাল অবস্থায় আছে তাদের আমরা প্যালিয়েটিভ সেবা দিয়ে থাকি।

- ডা. মাহফুজ আহমেদ চৌধুরী, এসোসিয়েট কনসালটেন্ট, মেডিকেল আইসিইউ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো জরুরি

কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর এখনও অনেক রোগী পোস্ট কোভিড সিনড্রোম বা লং কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে। তারা ফুসফুসে ফাইব্রোসিস বা শুকিয়ে যাওয়া, ব্রেইন ফগ বা মেমোরিতে গোলযোগ হওয়া, হৃদযন্ত্র ও এর রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যা এবং হার্টবিট অনেক বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কোভিডে এখনো কিন্তু আমরা আক্রান্ত হচ্ছি, হয়তো বা ততটা মারাত্মক লক্ষণ সৃষ্টি করছে না, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনও কম হচ্ছে কিন্তু রোগীদের কিছুদিন আইসোলেট বা আলাদা থাকতে হয়। এভাবে একদিন কোভিড সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু-জ্বরের মতো পৃথিবীতে থেকে যাবে। কোভিডে বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বিশ্বের মধ্যে ৪৫তম। অর্থাৎ ৪৪টি দেশে আমাদের থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও যেন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের রোগীদের সমানভাবে সাপোর্ট দিতে পারি সে লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এ জন্য আমাদের দেশে রিসার্চ দরকার। গবেষণা হয় বিশ্বের এমন ১০টি দেশের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশের অবস্থান ৭ম। আমরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। এ ক্ষেত্রে এগোতে না পারলে আমরা রোগীদের বিশ্বমানের চিকিৎসা দিতে পারব না। আমাদের দেশে এন্টি মাইক্রোবিয়াল রেসিসটেন্স বা অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রতিরোধী হওয়ার পেছনে কোয়াক বা অপ্রশিক্ষিত বা অশিক্ষিত চিকিৎসা প্রদানকারী ব্যক্তিরা অনেকাংশে দায়ী। তাদের জবাবদিহিতা বা শাস্তির আওতায় না আনলে এ সমস্যার উত্তরণ হবে না। সরকারি হাসপাতালেও রোগীদের কিছু ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেডিকেল আইটেম কেনার জন্য নিজের অর্র্থ খরচ করতে হয়। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট শতকরা ১ ভাগ থেকে ৫ ভাগে উন্নিত করলে এ সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব। বায়ুদূষণে আমরা পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে একটি। ফুসফুসের সুস্বাস্থ্যে ব্রিদিং এক্সারসাইজ, প্রাণায়াম ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা আবশ্যক। আজকের এ আয়োজন তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এভারকেয়ার ও দৈনিক যুগান্তরের একটি প্রক্রিয়া শুরু হলো মাত্র। আশা করি এটি অব্যাহত থাকবে।

-অধ্যাপক ডা. কাজি তারিকুল ইসলাম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অনেক সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি

বছরব্যাপীই ফুসফুসের যত্নে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। মানুষের মৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণের একটি হচ্ছে সিওপিডি। প্রতি বছর এ অসুখে প্রায় ২০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, এদের মধ্যে ৩২ লাখের মৃত্যু হচ্ছে। একদিকে নগরায়ণ হচ্ছে, আমরা আধুনিক হচ্ছি অন্যদিকে হাঁপানির আক্রমণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অ্যাজমাতে প্রতি বছর ২৬৫ মিলিয়ন ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে। আরেকটি মরণব্যাধি ফুসফুসের ক্যানসার। ২০২০ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ২২ লাখ নতুন রোগী আক্রান্ত হচ্ছে; এদের মধ্যে ১৮ লাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে ইনফেকশাস ডিজিজ নিউমোনিয়া, বয়স্করাও এতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগীদের ২৪ লাখ প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করছে। নভোচারীরা দেখছেন, পৃথিবী ক্রমশ ধূসর অর্থাৎ বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে, বাতাস দূষিত হয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে, নীল জলরাশির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পৃথিবীতে যে সভ্যতাই গড়ে উঠছে, কালের পরিক্রমায় তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপরও শিল্পায়ন ও নগরায়ণ হয়েই চলছে এবং আমরা জানা-অজানা বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত হচ্ছি। ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির ব্যবহার হচ্ছে, বায়ো ফুয়েল খরচ হচ্ছে। গাছ কেটে জ্বালানি তৈরি করছি, এটিও কিন্তু বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার ফুসফুস। এর ফলে অক্সিজেনের অভাবে আমরা হাঁসফাঁস করছি। সীমিত সম্পদ, সীমিত মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও কোভিডের সময় চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে মানবসেবায় কাজ করেছে। এ সমন্বিত উদ্যোগের একটি লক্ষ্য ছিল ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, একটি জীবনও যেন বাঁচানো যায় তার জন্য নিরন্তর কাজ করা। সরকার এ ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। সময় মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহ করেছে। যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং জনগণকে এ কাজে সম্পৃক্ত করলে সব লক্ষ্য পূরণ সহজ হয়। একদিকে আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে অন্যদিকে সক্ষমতাও বেড়েছে। যে কোনো স্বাস্থ্য সচেতনতায় যদি যুগান্তরকে পাশে পাই তাহলে আন্দোলনে রূপ নেবে।

-অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক, রোগ নিয়ন্ত্রণ, লাইন ডিরেক্টর সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শগুলো তুলে ধরতে চাই

দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ে এসে টেকনিক্যাল বিষয়ের বক্তব্যগুলো সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও গুণী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমরা জানতে পারলাম কোভিড বা শ্বাসতন্ত্রের অসুখে ভুগছেন এমন অনেক রোগীরই অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে। হাসপাতালে বা চিকিৎসকের চেম্বারে এ অক্সিজেন থেরাপি দিতে রোগীদের অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সুস্থ থাকার জন্য বিনামূল্যে প্রকৃতি থেকে প্রতিনিয়ত অক্সিজেন সরবরাহ করে চলছে। এ শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমেই আমরা প্রতিমুহূর্তে সব ধরনের কাজ করতে ও কথা বলতে সক্ষম হচ্ছি। ধূমপান যেহেতু ফুসফুসের রোগের অন্যতম কারণ, তাই ধূমপান থেকে বিরত থাকা চিকিৎসাসেবায় জড়িত কর্মীসহ সবার কর্তব্য বলে মনে করি। রোগীদের কোয়ালিটি অব লাইফ নিশ্চিতকরণের জন্য রোগীকে শুধু প্রেসক্রিপশন বা অ্যাডভাইস দিয়েই শেষ না করে, বাড়ি ফেরার পরও আপনারা চিকিৎসকরা যদি রোগীদের ফলোআপে রাখেন তাহলে রোগীর আরোগ্য অনেক সহজ হয়ে যায়। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এক্সারসাইজ যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক যে কোনো ধরনের তথ্য যুগান্তরে লেখার জন্য আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আমরা এ লেখাগুলো সাদরে গ্রহণ করব।

-এহসানুল হক বাবু

উপ-সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

বক্তাদের সুপারিশ

* স্ক্রিনিং ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করতে হবে।

* শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ফুসফুস ভালো রাখার অন্যতম উপায়।

* বায়ু দূষণ, জল দূষণ, মৃত্তিকা দূষণ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একযোগে কাজ করতে হবে।

* ধুলা, ধোঁয়া ও ঠাণ্ডা থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।

* ঘরে ক্রস ভেন্টিলেশন হাউস ডাস্ট প্রতিরোধে সহায়ক।

* শিশু এবং বয়স্কদের সব ধরনের টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।

* জ্বালানীর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।

* একই ছাদের নিচে সকল রোগীকে চিকিৎসা প্রদানের জন্য লজিস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে।

* দেশের সকল জনগণকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা প্রয়োজন।

* গর্ভবতী পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও ধোয়া মুক্ত পরিবেশে থাকলে অনাগত শিশু সুস্থ ফুসফুস পাবে।

* ঘরে পোষা বিড়াল, পাখি ও কার্পেট ফুসফুসের রোগের কারণ।

* চুলার ধোঁয়া ও লাকড়ি চুলায় রান্না করা থেকে ফুসফুসের রোগ হয়।

* ফুসফুসের রোগ থেকে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়।

* আইসিইউর প্রধান চিকিৎসা রোগীদের নিয়ন্ত্রিত উপায়ে অক্সিজেন থেরাপি প্রদান।

* রোগীদের রোগ সম্পর্কে কাউন্সিলিং চিকিৎসা প্রদান সহজ হয়।

* লাং ট্রান্সপ্লানটেশনের অবকাঠামো তৈরি এখন থেকে শুরু হওয়া বাঞ্চনীয়।

* ডাযাবেটিস ও বক্ষব্যাধির রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার টিকা নিবেন।

* ফুসফুসের চিকিৎসায় পুনর্বাসন পদ্ধতি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।

* অ্যাজমার চিকিৎসায় ইনহেলার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

দৈনিক যুগান্তর-এভারকেয়ার আয়োজিত ওয়ার্ল্ড লাং ডে’তে আলোচকবৃন্দ

ফুসফুস সুস্থ রাখতে চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ

  
০১ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে মানুষের প্রধান পাঁচটি মৃত্যুর দুটিই হচ্ছে শ্বাসতন্ত্রের অসুখ। এর একটি হচ্ছে ব্রঙ্কোজেনিক কার্সিনোমা বা ফুসফুসে ক্যানসার এবং অন্যটি হচ্ছে সিওপিডি বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ। অন্য রোগগুলো হচ্ছে অ্যাজমা, যক্ষ্মা ও নিউমোনিয়া। এদের সঙ্গে পৃথিবীতে আরেকটি বক্ষব্যাধি যুক্ত হয়েছে যার নাম কোভিড, যা প্রধানত ফুসফুসকেই আক্রমণ করে। নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসেবায় পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের সমান ও সার্বজনীন সুযোগ-সুবিধা ও অ্যাকসেস না থাকায় কোনো কোনো দেশ, শ্রেণিপেশার মানুষ রোগ-শোকে বেশি ভুগছেন।

বিশ্ব ফুসফুস দিবসে দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের গোলটেবিল আলোচনায় এ বক্তব্যগুলো উঠে এসেছে। এতে সভাপতিত্ব করেছেন দৈনিক যুগান্তরের উপ-সম্পাদক এহসানুল হক বাবু এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সুস্থ থাকুন পাতার সম্পাদক ডা. ফাহিম আহমেদ রূপম।

ফুসফুসের যত্নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে

ফুসফুসের রোগগুলোর মধ্যে এখন কোভিডকে এক নম্বর হিসাবে ধরা যায়। কারণ করোনা ভাইরাস প্রধানত নাসারন্ধ্র বা ফুসফুসের মাধ্যমেই পুরো শরীরে ছড়ায়। ফুসফুসের যত্নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে কারণ এ অঙ্গ ভালো থাকলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও ভালো থাকবে। ফুসফুসের বর্ধন জন্মের পরও দশ বছর ধরে চলতে থাকে। তাই শৈশব থেকেই এ অঙ্গের যত্ন নিলে ফুসফুস তার ফুল রিসার্ভ নিয়ে আমাদের সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখবে। গর্ভবতী যদি দূষণমুক্ত পরিবেশে এবং ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকে এবং যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি বা বিশ্রাম পায় তাহলে অনাগত সন্তানের ফুসফুসও সুগঠিত হবে। গর্ভবতীকে সব ধরনের টিকা দেওয়াও জরুরি। বাসায় যদি পোষা পাখি, বিড়াল, মোটা কার্পেট, ভারী পর্দা ও সার্বক্ষণিক এসিতে কেউ থাকে তাহলে তার ফুসফুস রোগাক্রান্ত হতে পারে। ঘরে ক্রস ভেন্টিলেশন অর্থাৎ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল বা বের হওয়ার সুযোগ থাকতে হবে, তাহলে ঘরের ভেতর থাকা ডাস্ট মাইট বা অ্যালার্জেন বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে। সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে এ তথ্য ছড়িয়ে ফুসফুসের যত্নে অ্যাডভোকেসি ও অ্যাকশন প্লান তৈরি করতে হবে। পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই কিন্তু এর সুষম বণ্টন থাকা চাই। তাহলেই পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষ অপুষ্টি বা রোগ-শোকে কম ভুগবে।

-অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাহেদুর রহমান খান, প্রাক্তন পরিচালক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসাতাল, ঢাকা।

স্ক্রিনিং করে রোগ শনাক্ত নিশ্চিত করতে হবে

অ্যাজমা, সিওপিডি, ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, অকুপেশনাল লাং ডিজিজ-এ অসুখে রোগীরা ভুগতে ভুগতে এক সময় তাদের কাজের উৎপাদনশীলতা কমে আসে, মানসিক অবশাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং রোগীরা পঙ্গুত্ববরণ করেন। এ রোগীদের নিয়ে এমন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই তারা সঠিক চিকিৎসা পান এবং কর্মক্ষম থাকেন। অ্যাজমা চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের যে GINA গাইডলাইন আছে, সে অনুযায়ী চারটি ফোকাসিং পয়েন্ট আছে। প্রথমটি হচ্ছে রোগটি সুনিশ্চিতভাবে ডায়াগনোসিস করে রোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা বা জ্ঞান দিতে হবে। এর পর অ্যাজমা রোগের সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক ম্যানেজমেন্ট প্রদান করতে হবে। অ্যাজমা রোগের জটিলতাগুলো জানিয়ে ফুসফুসকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যথাস্থানে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর ফলে রোগীরা হঠাৎ করে সংকটাপন্ন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও আইসিইউতে থেকে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। এভারকেয়ার হাসপাতালে অ্যাজমা ও বক্ষব্যাধির সমস্যাগুলো সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে জটিল বক্ষব্যাধির রোগীদের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ম্যানেজমন্ট প্রদানের জন্য বোর্ড করে স্বল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

-অধ্যাপক ডা. রৌশনী জাহান, সিনিয়র কনস্যালটেন্ট ও কোঅডিনেটর রেসপিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

পরিবেশ দূষণ রোধে উদ্যোগ প্রয়োজন

ফুসফুসের অসুস্থতার অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে পরিবেশ বা বায়ুমণ্ডলের বিষাক্ততাকে। ফুসফুস আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করছে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফুসফুস যখন অসুস্থতায় আক্রান্ত হয় তখন কিন্তু এ পরিমাণ অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং এ থেকেই এই অঙ্গসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন শুরু হয়। কোভিডসহ ফুসফুসের অন্যান্য মারাত্মক অসুস্থতায় ন্যাসাল ক্যানুলা থেকে শুরু করে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর ব্যবহার করেও যখন ফুসফুস কাজ করে না তখন শরীরের বাইরে একটি সার্কিট করে ইকমো (ECMO) নামক আধুনিক চিকিৎসাও আমরা দিয়েছি। উন্নত দেশে এ ইকমোতেও কাজ না হলে ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়। কোভিডসহ ফুসফুসের জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের শুধু মেডিকেশনই নয় ফুসফুসের ব্যায়াম, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ারও আমরা অ্যাডভাইস দিয়ে থাকি। পরিবেশ দূষণ বা কলকারখানা, যানবাহন, বাসার জ্বালানি থেকে যে বিষাক্ত গ্যাসের নির্গমন হয় তা যদি শূন্যের কাছাকাছি আনতে না পারি তাহলে ফুসফুসের রোগগুলোও নিয়ন্ত্রণে আনা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

-ডা. এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, রেসপিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

একই ছাদের নিচে রোগীরা যেন চিকিৎসা পায়

কোভিডের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব ফুসফুস দিবস পালনের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। সবার জন্য সুস্থ ফুসফুস শুধু থিম বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে সচেতনতা বাড়ানো ও তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিতের জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অতীব জরুরি। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে এভারকেয়ারের মতো টারশিয়ারি লেভেলে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআইয়ে ১০০% কভারেজ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার লক্ষ্যমাত্রায় অর্জন, মানুষের আয়ুস্কাল বাড়া এগুলো সবই আমাদের দেশের অর্জন। হাসপাতালে রোগীর ক্লিনিক্যাল সেবায় আমরা অনেক কিছু করতে পেরেছি। হার্ট, লাং লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের অবকাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে। কিডনি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন বাংলাদেশে হচ্ছে। কোভিড মহামারিতে অনেক রোগী দেশে চিকিৎসা নিয়েছেন, যারা বাইরে যেতে পারেন নাই। এটিও আমাদের স্বাস্থ্য খাতের একটি অর্জন। মেডিকেল ট্যুরিজমে প্রতি বছর ৪ মিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা একই ছাদের নিচে যেন করা যায়। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য বিমার সম্প্রসারণে আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে রোগীদের আর বিদেশে যেতে হবে না।

- ডা. আরিফ মাহমুদ, পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিস, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

শিশুকে ব্যায়ামের প্রতি আগ্রহী করাতে হবে

যদি ২-৩ মিনিট সঠিকভাগে শ্বাস নেওয়া না যায় তাহলে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ফুসফুসের প্রধান পাঁচটি রোগ হচ্ছে-নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, যক্ষ্মা, সিওপিডি ও ফুসফুসের ক্যানসার। এ রোগগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের অ্যাজমা রোগের প্রারম্ভেই ব্রঙ্কোডায়ালেটর দিয়ে চিকিৎসা নিলে ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পরামর্শ মেনে চললে শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে কোনো সমস্যা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকালের অ্যাজমা বয়সকালে ভালোও হয়ে যায়। শিশুকে ব্রেস্ট ফিডিং বা মায়ের বুকের দুধ পান করালে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায় এবং ইনফেকশাস ডিজিজ থেকে শিশুরা দূরে থাকে। ওরস্যালাইনের ব্যবহার ডায়রিয়া চিকিৎসা সহজ করেছে। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুরোধ করার জন্য সামাজিক সচেতনতা ও শিশুর বাবা-মায়ের শিশুকে বৈজ্ঞানিকভাবে লালন-পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ শিশুদের নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সংক্রমিত রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। শিশুরা যেন ঘরের এবং বাইরের যে কোন ধুলা ও ধোঁয়া থেকে দূরে থাকে সেজন্য অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। শিশুদের কোভিডের টিকা প্রদানেও বাবা-মাকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে খেলাধুলা ও সাঁতার কাটানোর অভ্যাস শিশুকাল থেকে গড়ে তুলতে হবে।

-অধ্যাপক ডা. ইশতিয়াক হোসাইন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নবজাতক ও শিশু রোগ বিভাগ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

বিশ্বব্যাপী চিকিৎসার বৈষম্য কমানো প্রয়োজন

নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউতে সেসব রোগীকে সাপোর্ট বা মনিটর করা হয় যাদের ওয়ার্ড, কেবিন বা বহির্বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। আইসিইউ সেটআপে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা আছে এমন রোগীদের সংখ্যাই বেশি। এ রোগীদের বেশিরভাগেরই সুনির্দিষ্ট পরিমাপে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এভারকেয়ার হসপিটালের মেডিকেল আইসিইউতে অনেক কোভিড রোগীকে আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে সুস্থ করে বাসায় পাঠাতে সক্ষম হয়েছি। ন্যাসাল ক্যানুলা, ফেস মাস্ক, হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা বা ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের যন্ত্র দিয়ে এসব রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। কখন, কোন রোগীকে, কী ধরনের সাপোর্ট দিতে হবে তা আমরা সঠিকভাবে অ্যাসেস করে থাকি এবং রোগীকে কোন পর্যায়ে, কীভাবে সাপোর্ট থেকে উইড্রো করতে হবে তা নিরুপণ করাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিডের সময় এ রোগীদের যেন ভেন্টিলেশন না লাগে এবং রোগীর ফুসফুস যেন ফাইব্রোসিস বা চুপসে না যায় সে লক্ষ্যে আমরা সময় মতো হাইফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা দিয়ে অক্সিজেন দিয়েছি। রোগীকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার আগে আমরা নির্ধারণ করে থাকি এ রোগীদের কতখানি আমরা এ চিকিৎসার মাধ্যমে বেনিফিট দিতে পারব। যে রোগীরা রোগে ভোগান্তির শেষ পর্যায়ে বা টার্মিনাল অবস্থায় আছে তাদের আমরা প্যালিয়েটিভ সেবা দিয়ে থাকি।

- ডা. মাহফুজ আহমেদ চৌধুরী, এসোসিয়েট কনসালটেন্ট, মেডিকেল আইসিইউ, এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো জরুরি

কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর এখনও অনেক রোগী পোস্ট কোভিড সিনড্রোম বা লং কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে। তারা ফুসফুসে ফাইব্রোসিস বা শুকিয়ে যাওয়া, ব্রেইন ফগ বা মেমোরিতে গোলযোগ হওয়া, হৃদযন্ত্র ও এর রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যা এবং হার্টবিট অনেক বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কোভিডে এখনো কিন্তু আমরা আক্রান্ত হচ্ছি, হয়তো বা ততটা মারাত্মক লক্ষণ সৃষ্টি করছে না, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনও কম হচ্ছে কিন্তু রোগীদের কিছুদিন আইসোলেট বা আলাদা থাকতে হয়। এভাবে একদিন কোভিড সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু-জ্বরের মতো পৃথিবীতে থেকে যাবে। কোভিডে বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বিশ্বের মধ্যে ৪৫তম। অর্থাৎ ৪৪টি দেশে আমাদের থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও যেন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের রোগীদের সমানভাবে সাপোর্ট দিতে পারি সে লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এ জন্য আমাদের দেশে রিসার্চ দরকার। গবেষণা হয় বিশ্বের এমন ১০টি দেশের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশের অবস্থান ৭ম। আমরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। এ ক্ষেত্রে এগোতে না পারলে আমরা রোগীদের বিশ্বমানের চিকিৎসা দিতে পারব না। আমাদের দেশে এন্টি মাইক্রোবিয়াল রেসিসটেন্স বা অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রতিরোধী হওয়ার পেছনে কোয়াক বা অপ্রশিক্ষিত বা অশিক্ষিত চিকিৎসা প্রদানকারী ব্যক্তিরা অনেকাংশে দায়ী। তাদের জবাবদিহিতা বা শাস্তির আওতায় না আনলে এ সমস্যার উত্তরণ হবে না। সরকারি হাসপাতালেও রোগীদের কিছু ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেডিকেল আইটেম কেনার জন্য নিজের অর্র্থ খরচ করতে হয়। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট শতকরা ১ ভাগ থেকে ৫ ভাগে উন্নিত করলে এ সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব। বায়ুদূষণে আমরা পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে একটি। ফুসফুসের সুস্বাস্থ্যে ব্রিদিং এক্সারসাইজ, প্রাণায়াম ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা আবশ্যক। আজকের এ আয়োজন তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এভারকেয়ার ও দৈনিক যুগান্তরের একটি প্রক্রিয়া শুরু হলো মাত্র। আশা করি এটি অব্যাহত থাকবে।

-অধ্যাপক ডা. কাজি তারিকুল ইসলাম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অনেক সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি

বছরব্যাপীই ফুসফুসের যত্নে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। মানুষের মৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণের একটি হচ্ছে সিওপিডি। প্রতি বছর এ অসুখে প্রায় ২০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, এদের মধ্যে ৩২ লাখের মৃত্যু হচ্ছে। একদিকে নগরায়ণ হচ্ছে, আমরা আধুনিক হচ্ছি অন্যদিকে হাঁপানির আক্রমণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অ্যাজমাতে প্রতি বছর ২৬৫ মিলিয়ন ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে। আরেকটি মরণব্যাধি ফুসফুসের ক্যানসার। ২০২০ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ২২ লাখ নতুন রোগী আক্রান্ত হচ্ছে; এদের মধ্যে ১৮ লাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে ইনফেকশাস ডিজিজ নিউমোনিয়া, বয়স্করাও এতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগীদের ২৪ লাখ প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করছে। নভোচারীরা দেখছেন, পৃথিবী ক্রমশ ধূসর অর্থাৎ বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে, বাতাস দূষিত হয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে, নীল জলরাশির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পৃথিবীতে যে সভ্যতাই গড়ে উঠছে, কালের পরিক্রমায় তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপরও শিল্পায়ন ও নগরায়ণ হয়েই চলছে এবং আমরা জানা-অজানা বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত হচ্ছি। ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির ব্যবহার হচ্ছে, বায়ো ফুয়েল খরচ হচ্ছে। গাছ কেটে জ্বালানি তৈরি করছি, এটিও কিন্তু বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার ফুসফুস। এর ফলে অক্সিজেনের অভাবে আমরা হাঁসফাঁস করছি। সীমিত সম্পদ, সীমিত মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও কোভিডের সময় চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে মানবসেবায় কাজ করেছে। এ সমন্বিত উদ্যোগের একটি লক্ষ্য ছিল ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, একটি জীবনও যেন বাঁচানো যায় তার জন্য নিরন্তর কাজ করা। সরকার এ ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। সময় মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহ করেছে। যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং জনগণকে এ কাজে সম্পৃক্ত করলে সব লক্ষ্য পূরণ সহজ হয়। একদিকে আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে অন্যদিকে সক্ষমতাও বেড়েছে। যে কোনো স্বাস্থ্য সচেতনতায় যদি যুগান্তরকে পাশে পাই তাহলে আন্দোলনে রূপ নেবে।

-অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক, রোগ নিয়ন্ত্রণ, লাইন ডিরেক্টর সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শগুলো তুলে ধরতে চাই

দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ে এসে টেকনিক্যাল বিষয়ের বক্তব্যগুলো সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও গুণী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমরা জানতে পারলাম কোভিড বা শ্বাসতন্ত্রের অসুখে ভুগছেন এমন অনেক রোগীরই অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে। হাসপাতালে বা চিকিৎসকের চেম্বারে এ অক্সিজেন থেরাপি দিতে রোগীদের অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সুস্থ থাকার জন্য বিনামূল্যে প্রকৃতি থেকে প্রতিনিয়ত অক্সিজেন সরবরাহ করে চলছে। এ শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমেই আমরা প্রতিমুহূর্তে সব ধরনের কাজ করতে ও কথা বলতে সক্ষম হচ্ছি। ধূমপান যেহেতু ফুসফুসের রোগের অন্যতম কারণ, তাই ধূমপান থেকে বিরত থাকা চিকিৎসাসেবায় জড়িত কর্মীসহ সবার কর্তব্য বলে মনে করি। রোগীদের কোয়ালিটি অব লাইফ নিশ্চিতকরণের জন্য রোগীকে শুধু প্রেসক্রিপশন বা অ্যাডভাইস দিয়েই শেষ না করে, বাড়ি ফেরার পরও আপনারা চিকিৎসকরা যদি রোগীদের ফলোআপে রাখেন তাহলে রোগীর আরোগ্য অনেক সহজ হয়ে যায়। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এক্সারসাইজ যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক যে কোনো ধরনের তথ্য যুগান্তরে লেখার জন্য আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আমরা এ লেখাগুলো সাদরে গ্রহণ করব।

-এহসানুল হক বাবু

উপ-সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

বক্তাদের সুপারিশ

* স্ক্রিনিং ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করতে হবে।

* শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ফুসফুস ভালো রাখার অন্যতম উপায়।

* বায়ু দূষণ, জল দূষণ, মৃত্তিকা দূষণ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একযোগে কাজ করতে হবে।

* ধুলা, ধোঁয়া ও ঠাণ্ডা থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।

* ঘরে ক্রস ভেন্টিলেশন হাউস ডাস্ট প্রতিরোধে সহায়ক।

* শিশু এবং বয়স্কদের সব ধরনের টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।

* জ্বালানীর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।

* একই ছাদের নিচে সকল রোগীকে চিকিৎসা প্রদানের জন্য লজিস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে।

* দেশের সকল জনগণকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা প্রয়োজন।

* গর্ভবতী পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও ধোয়া মুক্ত পরিবেশে থাকলে অনাগত শিশু সুস্থ ফুসফুস পাবে।

* ঘরে পোষা বিড়াল, পাখি ও কার্পেট ফুসফুসের রোগের কারণ।

* চুলার ধোঁয়া ও লাকড়ি চুলায় রান্না করা থেকে ফুসফুসের রোগ হয়।

* ফুসফুসের রোগ থেকে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়।

* আইসিইউর প্রধান চিকিৎসা রোগীদের নিয়ন্ত্রিত উপায়ে অক্সিজেন থেরাপি প্রদান।

* রোগীদের রোগ সম্পর্কে কাউন্সিলিং চিকিৎসা প্রদান সহজ হয়।

* লাং ট্রান্সপ্লানটেশনের অবকাঠামো তৈরি এখন থেকে শুরু হওয়া বাঞ্চনীয়।

* ডাযাবেটিস ও বক্ষব্যাধির রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার টিকা নিবেন।

* ফুসফুসের চিকিৎসায় পুনর্বাসন পদ্ধতি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।

* অ্যাজমার চিকিৎসায় ইনহেলার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন