বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ পালিত
jugantor
বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ পালিত
এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রক্ষা করতে এখনই দরকার সতর্কতা এবং সচেতনতা

  ডা. মো: আব্দুল হাফিজ শাফী  

২৬ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ। এন্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর নভেম্বর মাসে এটি পালিত হয়। আমাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে নানাবিধ রোগ হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে যেসব ওষুধ ধ্বংস করতে পারে সেগুলো এন্টিবায়োটিক। তাই এর আবিস্কার বিশ্ববাসীর জন্য আশির্বাদস্বরূপ। এ ওষুধগুলো সাধারণত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রাচীর বা ভেতরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে বা ভেঙে ফেলে। সমস্যা হচ্ছে, দীর্ঘদিন একই এন্টিবায়োটিক নিয়ম না মেনে প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে, টিকে থাকার তাগিদে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের গঠনগত পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট সেই ওষুধকে অকার্যকর করে ফেলতে পারে।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ হলো এমন একটি অবস্থা, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া এন্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ফেলে, তখন তারা ধ্বংস না হয়ে নিজেরা স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই এন্টিবায়োটিকে সে রোগ তো কমেই না, বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষের এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয় না, হয় তার শরীরে যে ব্যাকটেরিয়া আছে সেগুলোর। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলতে আমরা বুঝি ব্যাকটেরিয়ার এক ধরনের শক্তি অর্জন করা বা এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার পদ্ধতি। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া যখন এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার একটি পথ শিখে ফেলে তাই রেজিস্ট্যান্ট।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন হয়

* সঠিক পরিমাণে এবং সময়মতো এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ না করলে। ওষুধের মাত্রা (dose) নিয়মতান্ত্রিকভাবে মেনে না চলা, অবহেলা করা আমাদের দেশের মানুষের অন্যতম মানসিকতা। একদিকে কম মাত্রায় ওষুধ গ্রহণ করলে জীবাণু ধ্বংস না হয়ে তা জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উসকে দেয়; অন্যদিকে অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে তা দেহে বিষক্রিয়া ছড়ায়।

* প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছভাবে এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে। যেমন-ভাইরাল জ্বরে এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। মৌসুমি জ্বর, পেট খারাপ, সর্দিকাশি অধিকাংশই ভাইরাসজনিত। ভাইরাসের বিপরীতে এন্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।

* রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে থেকে এন্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণে। তা ছাড়া এখনো গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার হার কম। দেখা যায় অসুখ হলে উপায়ন্তর না ভেবে অনেকেই কাছের গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে ছুটে যান। তখন সে পল্লি চিকিৎসক যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বা নিশ্চিত না হয়ে সব রোগেরই চিকিৎসায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন। এন্টিবায়োটিক যেন তাদের কাছে সর্বরোগের দাওয়াই। এ ক্ষেত্রে গুণগত মানহীন কোম্পানির এন্টিবায়োটিক ও আর্থিক লাভ তাদের অনেককে প্ররোচিত করে।

* অনেক সময় দেখা যায়, চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও সে অনুযায়ী এন্টিবায়োটিকের কোর্স কমপ্লিট করা হয় না। সাধারণভাবে বোঝালে ব্যাপারটি এরকম-মনে করুন কারও গলার টনসিলে (Acute infection) প্রদাহ হয়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে টনসিলাইটিসের জন্য এক ধরনের এন্টিবায়োটিক খাবার ওষুধ ব্যবহার করা শুরু করলেন। ডাক্তার বললেন, অন্তত সাত দিন ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু চার দিনের মাথায় দেখা গেল গলাব্যথা-জ্বর ভালো হতে শুরু করেছে এবং রোগী তখন এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন; তখন টনসিল ইনফেকশন ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে যে, সব ব্যাকটেরিয়া মরেনি, যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ওই ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। এটা বিপজ্জনক।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে করণীয়

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সালের পর এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে বেশিরভাগ এন্টিবায়োটিকেরই কার্যকারিতা থাকবে না। এর মারাত্মক ভয়াবহতা এড়াতে আমাদের যা করতে হবে-

ষওষুধ খাওয়া শুরু করার পর সুস্থ অনুভব করলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিকের কোর্স অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে। মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না।

ষডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো এন্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। নিুমানের এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।

ষওষুধ বিপণনে যুক্ত ফার্মেসি-ব্যবসায়ীদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোয় তাদের সহযোগিতা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি করতে হবে।

লেখক : নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড- নেক সার্জন, রেজিস্ট্রার, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ পালিত

এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রক্ষা করতে এখনই দরকার সতর্কতা এবং সচেতনতা
 ডা. মো: আব্দুল হাফিজ শাফী 
২৬ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্ব এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ। এন্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর নভেম্বর মাসে এটি পালিত হয়। আমাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে নানাবিধ রোগ হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে যেসব ওষুধ ধ্বংস করতে পারে সেগুলো এন্টিবায়োটিক। তাই এর আবিস্কার বিশ্ববাসীর জন্য আশির্বাদস্বরূপ। এ ওষুধগুলো সাধারণত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রাচীর বা ভেতরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে বা ভেঙে ফেলে। সমস্যা হচ্ছে, দীর্ঘদিন একই এন্টিবায়োটিক নিয়ম না মেনে প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে, টিকে থাকার তাগিদে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের গঠনগত পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট সেই ওষুধকে অকার্যকর করে ফেলতে পারে।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ হলো এমন একটি অবস্থা, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া এন্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। এসব ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরা এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ফেলে, তখন তারা ধ্বংস না হয়ে নিজেরা স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই এন্টিবায়োটিকে সে রোগ তো কমেই না, বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষের এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয় না, হয় তার শরীরে যে ব্যাকটেরিয়া আছে সেগুলোর। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলতে আমরা বুঝি ব্যাকটেরিয়ার এক ধরনের শক্তি অর্জন করা বা এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার পদ্ধতি। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া যখন এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার একটি পথ শিখে ফেলে তাই রেজিস্ট্যান্ট।

 

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন হয়

* সঠিক পরিমাণে এবং সময়মতো এন্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ না করলে। ওষুধের মাত্রা (dose) নিয়মতান্ত্রিকভাবে মেনে না চলা, অবহেলা করা আমাদের দেশের মানুষের অন্যতম মানসিকতা। একদিকে কম মাত্রায় ওষুধ গ্রহণ করলে জীবাণু ধ্বংস না হয়ে তা জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উসকে দেয়; অন্যদিকে অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে তা দেহে বিষক্রিয়া ছড়ায়।

* প্রয়োজন ছাড়া যথেচ্ছভাবে এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে। যেমন-ভাইরাল জ্বরে এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। মৌসুমি জ্বর, পেট খারাপ, সর্দিকাশি অধিকাংশই ভাইরাসজনিত। ভাইরাসের বিপরীতে এন্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।

* রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে থেকে এন্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণে। তা ছাড়া এখনো গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার হার কম। দেখা যায় অসুখ হলে উপায়ন্তর না ভেবে অনেকেই কাছের গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে ছুটে যান। তখন সে পল্লি চিকিৎসক যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বা নিশ্চিত না হয়ে সব রোগেরই চিকিৎসায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন। এন্টিবায়োটিক যেন তাদের কাছে সর্বরোগের দাওয়াই। এ ক্ষেত্রে গুণগত মানহীন কোম্পানির এন্টিবায়োটিক ও আর্থিক লাভ তাদের অনেককে প্ররোচিত করে।

* অনেক সময় দেখা যায়, চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও সে অনুযায়ী এন্টিবায়োটিকের কোর্স কমপ্লিট করা হয় না। সাধারণভাবে বোঝালে ব্যাপারটি এরকম-মনে করুন কারও গলার টনসিলে (Acute infection) প্রদাহ হয়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে টনসিলাইটিসের জন্য এক ধরনের এন্টিবায়োটিক খাবার ওষুধ ব্যবহার করা শুরু করলেন। ডাক্তার বললেন, অন্তত সাত দিন ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু চার দিনের মাথায় দেখা গেল গলাব্যথা-জ্বর ভালো হতে শুরু করেছে এবং রোগী তখন এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন; তখন টনসিল ইনফেকশন ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে যে, সব ব্যাকটেরিয়া মরেনি, যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ওই ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। এটা বিপজ্জনক।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে করণীয়

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সালের পর এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে বেশিরভাগ এন্টিবায়োটিকেরই কার্যকারিতা থাকবে না। এর মারাত্মক ভয়াবহতা এড়াতে আমাদের যা করতে হবে-

ষওষুধ খাওয়া শুরু করার পর সুস্থ অনুভব করলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিকের কোর্স অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে। মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না।

ষডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো এন্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। নিুমানের এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।

ষওষুধ বিপণনে যুক্ত ফার্মেসি-ব্যবসায়ীদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোয় তাদের সহযোগিতা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি করতে হবে।

লেখক : নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড- নেক সার্জন, রেজিস্ট্রার, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন