এ্যালোভেরার অনেক গুণ

  অধ্যাপক ড. জাকিয়া বেগম ২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এলোভেরা

প্রায় ৫ হাজার বছর আগে থেকেই মানুষের ‘ঘৃতকুমারী’ বা ‘এ্যালোভেরা’ পাতার বিভিন্ন ঔষধি ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ধারণা ছিল বলে জানা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এবং চীনা ও ব্রিটিশ হারবাল চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

উদ্ভিদটির পাতার ঠিক নিচে বিদ্যমান হলুদাভ তরল নির্যাস এবং ভেতরকার জেলির মতো ঘন পিচ্ছিল বস্তু দুটিই বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পিচ্ছিল অংশটির প্রায় ৯৯% অংশজুড়েই থাকে পানি।

স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ২০০টি সক্রিয় উপাদান এ উদ্ভিদটিতে বিদ্যমান। এটিতে এ, সি, ই, ফলিক এসিড, কোলিন, বি-১, বি-২ ইত্যাদি উপকারী ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, সোডিয়াম, লোহা, পটাসিয়াম, কপার, ম্যাগনেসিয়াম জাতীয় খনিজ পদার্থ ছাড়াও আছে বিভিন্ন প্রকার এনজাইম, ফ্যাটিএসিড এবং জৈব যৌগ (এ্যামাইনো এসিড)।

মানব শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ২২টি এ্যামাইনো এসিডের মধ্যে ৮টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয় যার প্রায় সবকটিই ঘৃতকুমারীতে বিদ্যমান আছে বলে মনে করা হয়। এর জেলি বিদ্যমান ‘এ্যসেমানন’ নামক জটিল শ্বেতসারজাতীয় উপাদানটি খাদ্যস্থ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানকে কোষকলা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এতে ফ্যাটি-এসিডের পরিমাণ আছে সন্তোষজনক মাত্রায় যেগুলোর মধ্যে স্টেরল, ক্যাম্পস্টেরল, সাইটোস্টেরল নামক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাটি-এসিড তিনটি রক্তে চর্বির মাত্রা কমিয়ে আনে এবং কোলেস্টরেলের মাত্রা হ্রাস করতে সাহায্য করে।

এটি রক্তের সঞ্চালন বৃদ্ধি করে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এবং রক্তস্থ লোহিত কণিকাগুলোর পরিব্যাপ্তি বাড়িয়ে তোলে, রক্তচাপ কমায়, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমিয়ে এনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তের আঠালো ভাব কমিয়ে এনে হার্ট এ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস করে। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে ঘৃতকুমারীর রস সেবনে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকোপতা অনেকাংশে কমে আসে।

এটি অন্ত্রের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় অন্ত্রস্থ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করে নিয়ে বৃহদান্ত্রের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এভাবে এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমিয়ে এনে পরিপাকতন্ত্রকে পরিষ্কার ও প্রশমিত করে তুলে হজমশক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে ‘ইরিটেবল বাউল সিনড্রোম’ এবং এসিড রিফ্লাক্স রোগের প্রশমন ঘটে এবং কৃমির প্রকোপও কমে আসে। সঠিক মাত্রায় খাদ্য শোষণ এবং বর্জ্য বর্জনের মাধ্যমে ওজন হ্রাসের ক্ষেত্রেও এটি বিশেষভাবে সহায়ক হয়ে থাকে।

ত্বককে সূর্যরশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। ত্বকে রক্ত প্রবাহ ও অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়ে ত্বকের কোমলতা ও নমনীয়তা বৃদ্ধি করে এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ধরে রেখে ত্বককে সজীব করে তুলতেও সাহায্য করে। এতে আছে ‘প্রোটিওলাইটিক’ নামক এনজাইম যা মাথার ত্বকস্থ মরা কোষকলাগুলোকে মেরামত করে খুশকি দূর করে ও চুলের বৃদ্ধি ঘটাতে এবং চুলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

শুধু সৌন্দর্য রক্ষাতেই নয় ত্বকের বিভিন্ন অসুস্থতা যেমন; সোরিয়াসিস, সেবোরিয়া, স্বল্পমাত্রার পোড়া বা ঘষা লাগার ক্ষেত্রেও এটি বেশ কার্যকর। পুরুষদের জনন অঙ্গের হার্পীসজাতীয় প্রদাহের চিকিৎসায়ও এটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। ত্বকের যত্নে এটি সাধারণত বাইরে থেকেই ব্যবহার করা হয়।

এ্যালোভেরা পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের নিজস্ব খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে বলেও ধারণা করা হয়। এতে বিদ্যমান পলিস্যাকারাইড্স রক্তস্থ রোগ-প্রতিরোধক শ্বেতকণিকাগুলোকে উজ্জীবিত করে তোলে যা ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ রোধে ভূমিকা রাখে। প্রচুর পরিমাণে এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিদ্যমান থাকায় এটি রোগ-প্রতিরোধক ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে যা শরীরের পক্ষে বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও দূষণের মতো পরিবেশগত চাপ সহ্য করা সহজতর করে তোলে এবং বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকেও মন্থর করতে সাহায্য করে।

ক্ষারীয় পরিবেশে শরীরে রোগের প্রকোপ কম হয়। খাদ্যে অম্লের পরিমাণ বেশি হলে তা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসুস্থতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। ঘৃতকুমারী শরীরকে ক্ষারীয় করে তুলে সুস্থতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

এ্যালোভেরা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া মুক্ত নয় বলে এটি সেবনে কিছু সতর্কতা গ্রহণ করাও জরুরি। বেশি মাত্রায় সেবনের ফলে মৃদু থেকে জটিল কিছু পার্র্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার আশঙ্কা আছে যেগুলোর মধ্যে হজমতন্ত্রকে উত্তেজিত করে তোলার কারণ থেকে ডায়রিয়াসহ পেটের বিভিন্ন সমস্যা, পাকস্থলির পেশির সংকোচন, যকৃৎ ও পিত্তথলিতে প্রদাহ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এতে বিদ্যমান ‘এ্যলয়েন’ নামক উপাদানটি ‘কোলন’-এর জন্য বেশ ক্ষতিকর বলে জানা গেছে।

লেখক : পরমাণু বিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter