হৃদরোগীদের ঈদ উৎসব পালন

  অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফউল্লাহ ০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠান পরিণত হয় উৎসবে, উৎসবের একটি মূল অংশ হল খাওয়ার আতিশয্য। এক্ষেত্রে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা, হৃদরোগীদের বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

উৎসবে খাওয়া-দাওয়া

উৎসবের একটি মূল অংশ হল ভোজ, খাওয়ার আতিশয্যকেও মানুষ তখন প্রশ্রয় দেন। এতে আনন্দ ও উল্লাসের মধ্যে অতিভোজ হয়ে যায় অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টিমণ্ডা ও চর্বি থেকে গ্রহণ থেকে। এসবের বাহুল্য ঘটে দিনে-রাতের ভোজে, এতে শরীরের ওজন বাড়ে। উৎসবে রয়ে সয়ে খেলে বাঁচে শরীর। যাদের ডায়াবেটিস হৃদরোগ ও কিডনি রোগ আছে, তারা তো বিশেষ সাবধান হবেনই। উৎসবের ছোঁয়া লাগানোর জন্য সামান্য খাবার খাওয়া যেতেই পারে। বেশি হলে স্বাস্থ্য তো ঝুঁকির মুখে পড়বে। শরীর যাতে ভালো থাকে উৎসবের দিনে সেজন্যও আছে পরামর্শ।

ভোজে যাওয়ার আগে বাড়িতে স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খেয়ে তবে বের হবেন। পেটে ক্ষুধা থাকলে বেশি বেশি খাওয়ার আগ্রহ বাড়ে। স্বাস্থ্যকর নয় এমন সব খাবার প্রশ্রয় দেয়ায় মনের ইচ্ছা তুঙ্গে ওঠে।

সুবুদ্ধিসম্পন্ন আহার কী বলবে? Sensible Eating সঙ্গত আহার, ভোজন? গোশতের রেজালা, ভুনা, পোলাও সামনে আছে, সেই সঙ্গে সালাদ ও বোরহানি আছে। সালাদ, স্যুপ ও বোরহানি বেশি করে খেয়ে দুয়েক টুকরো গোশত সামান্য পোলাও খাওয়া তাই তো ভালো। নিয়ম রক্ষা হল মান বাঁচল, স্বাস্থ্যও বাঁচল। আরেকটি কথা, উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ব্যায়াম কিন্তু চালিয়ে যেতেই হবে। বাড়তি ক্যালরি কিছু হলেও ঝরে পড়ার সুযোগ পাবে।

ভোজে যাওয়ার আগে ফলাহার করে, এক মুঠো বাদাম খেয়ে বেরোলে তেমন ভোজ করতে পারবেন না ভোজের টেবিলে। ব্যায়ামের কর্মসূচি বিরতি টানা একেবারে অনুচিত হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, এমনকি ভ্রমণের সময়ও শরীর চর্চা চলবে। প্রচুর পানি পান করতে হবে। ভোজের সময় হাতের কাছে পানির বোতল থাকতেই হবে। শরবত, কোমল পানীয় ড্রিঙ্কস এসব বর্জন করলে ভালো। এতে আবশ্যক ক্যালরি যোগ হবে শরীরে, শুনতে কেমন লাগবে জানি না, তবু বলি, মিষ্টি আর চকলেটের প্যাকেট উপহার না দিয়ে ফল ও বাদামের প্যাকেট উপহার দিলে বেশ স্বাস্থ্যকর হয় কিন্তু এমন চর্চা শুরু করতে পারেন না কেউ? স্বাস্থ্যকর আহারের চর্চা উৎসাহিত করা উচিত, কেবল রোগীকে দেখার সময় ফল হাতে নিয়ে না।

ভোজন ও অতিভোজন এমন কালচার তো চলে আসছে। সে ট্রাডিশন সামনে চলছে তবে থাক না ট্রাডিশন, সুমিত আহার করলেই হল, ঐতিহ্য রাখা ভালো। এতে মূলবোধ ঠিক থাকে সমাজে।

ভোজে যোগদান করলে খাবার টেবিলে গেলে খাওয়াতে বিরতি দিতে হবে গোশত, চর্বি, ঘি ও ভাত কম খেতে হবে। এমন যদি কেউ থাকেন আর তিনি যদি বিবাহিত হন, তাহলে জীবনসঙ্গী সাহায্য করতে পারেন, কী দেখলে লোভ উথলে ওঠে তা তিনি জানবেন এবং ধরুন, জামার বোতাম টেনে ধরে বা খোঁচা মেরে নিবৃত্ত করতে পারে, তখন খাওয়া বন্ধ হবে।

উৎসবে অনুষ্ঠানে যেসব খাবার দেয়া হয় এর কয়েকটির মধ্যে লুকিয়ে আছে যে পরিমাণ ক্যালরি তেমন উদাহরণ দেই। এক কাপ চা, দুই চা চামচ ঘন দুধ ও দুই চা চামচ চিনি, ব্যস ৭০ ক্যালরি পান করা হয়ে গেল। কোমল পানীয় (৩৫০ মিলিমিটার ১৪৫ ক্যালরি, টমেটো জুস (১০০ মিলি) ৪০ ক্যালরি, কমলা জুস (১০০ মিলি) ৬১ ক্যালরি।

একটি বড় সমুসা ২১০ ক্যালরি। আইসক্রিম (১০০ গ্রাম ছোট ক্যান) ২০০ ক্যালরি, গোলাপ জাম (দুটো ছোট) ২৮০ ক্যালরি। দুটি রসগোল্লা ১১০ ক্যালরি, একটি পরোটা ১৮০ ক্যালরি, কাবাব চারটি ৩০৮ ক্যালরি।

বিরিয়ানি গোশত এসবের ক্যালরি আর গুনে দেখলাম না। অনেক যে হবে তা বোধগম্য। তাই বলছিলাম রয়ে সয়ে খেলে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা যাবে। অনেকে ভোজের সময় বেশি খাওয়ার জন্য আগের বেলা না খেয়ে থাকেন, এটা কিন্তু ঠিক নয়। কোনো বেলার খাবার বাদ দিলে হিতের চেয়ে বিপরীত হবে। এতে ভোজের সময় প্রচুর খাওয়া হবে। হালকা প্রাতরাশ স্ন্যাকস চলুক। খেতে হবে সচেতনভাবে, কেবল ক্ষুধা পেলেই খেতে হয় মন খারাপ হলে বেশি খাওয়া হয়। প্লেটে থাকুক সবজি-সালাদ, ফলের টুকরো ও দধি। অল্প গোশত বিরিয়ানি হবে। এভাবেই চলবে উৎসব। সগৌরবে। স্বাস্থ্য থাকবে ভালো।

হৃদরোগীরাও কোরবানির মাংস খেতে পারবেন। কিন্তু বাড়তি কোলেস্টেরল বার্ন করে ফেলতে হবে।

আমরা জানি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা হার্টের রোগীদের রেড মিট বা গরু, খাসি, ভেড়া ইত্যাদির মাংস খেতে বারণ করে থাকেন। সামনে কোরবানি তাই গরু খাসির মাংস তো সবার কাছেই একটু বেশি সহজলভ্য হবে। এসব মাংস খাওয়ার ব্যাপারে কারা বেশি সতর্ক হবেন? কাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের মাংস এড়িয়ে চলা ভালো? অনেকের মনেই এই প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, তারাই গরু-খাসির মাংস বা রেড মিট এড়িয়ে চলবেন যাদের ওভার ওয়েট বা ওজন বেশি, হাই বা উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল আছে। বিশেষ করে যাদের ২০০ মিলিগ্রামের বেশি কোলেস্টেরল আছে। তাদের জন্যই এই ধরনের মাংস নিষেধ। অনেকের জন্য কোরবানির মাংস বা রেড মিট খাওয়া নিষেধ নয় বা নিরাপদ নয় বা নিরাপদে খেতে পারে, বিশেষ করে যাদের লো কোলেস্টেরল, লো বডি ওয়েট (শরীরের ওজন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম) তার জন্য নিষেধের কোনো ব্যাপার নেই। ধরুন কারও কোলেস্টেরল ১৩ তার জন্য গরু-খাসির মাংস কোনো সমস্যা নয়। কোরবানির মাংস মানেই তো রেড মিট। আমরা অনেক সময় শুনি একটা বয়সের পর রেড মিট কম খাওয়া উচিত বা খাওয়ার ব্যাপারে বাছবিচার করা উচিত। এই রেড মিট খাওয়ার ব্যাপারে বয়সের একটা ভার বোধ আছে। চল্লিশের পর রেড মিট খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। বুঝে শুনে খাওয়া উচিত। আর চল্লিশের পর সবারই কোলেস্টেরল চেক করা উচিত। বিশেষ করে ফ্যামিলির যদি কারও হাই কোলেস্টেরল থাকে তখন কোলেস্টেরল চেক করে নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে কোলেস্টেরেলের মাত্রা বুঝে খেতে হবে। হাই কোলেস্টেরল হলে এড়িয়ে চলবেন, লো হলে খেতে পারবেন।

যাদের হাই কোলেস্টেরল বা ওভার ওয়েট (স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ওজন বেশি) তাদের জন্য কোরবানির মাংস বা রেড মিট খাওয়া একেবারে নিষেধ নয়। তবে একটু কেয়ারফুল হওয়া বা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

তারপরও কোরবানির মাংস গ্রহণের ব্যাপারে অনেকেই খুব বাড়াবাড়ি নিষেধ করে থাকেন, আমি কোরবানির মাংস খাওয়াটা কোনোভাবেই একটা নিষেধের বেড়াজাল আটকাতে চাই না। তবে হ্যাঁ যাদের হাই কোলেস্টেরল আছে, তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। যিনি হাই কোলেস্টেরল নিয়ে এ ধরনের মাংস খাবেন তাকে মনে রাখতে হবে, তিনি যেটুকু খেলেন সেটাকে বার্ন আউট করতে হবে। অর্থাৎ বাড়তি এই কোলেস্টেরলকে ব্যবহার করে ফেলতে হবে। এজন্য একটু বেশি হাঁটতে হবে। বাড়তি ব্যায়াম করতে হবে। বিষয়টা হচ্ছে কোলেস্টেরল সারপ্লাস হলেই সেটা রক্তনালির ভেতরের দেয়ালে জমে ও সমস্যা সৃষ্ট করে। কারও শরীরে কোলেস্টেরল কম থাকলে, তার তো আর কোরবানির মাংস খাওয়ার পর সারপ্লাস হওয়ার সুযোগ নেই। আর যারা কোলেস্টেরল লোয়ারিং ড্রাগ কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ) খাচ্ছেন তাদের তো বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এমন অনেকেই আছেন রেড মিট খাওয়া নিষেধ, হার্টে হয়তো কিছুটা ব্লক আছে কিংবা স্টেনটিং করা হয়েছে এ ধরনের রোগীদের অনেক সময় আত্মীয়-স্বজনরা আশ্বস্ত করার জন্য বলে থাকেন, কোরবানির মাংস একটু করে খেলে বিশেষ কিছু হবে না। এ সম্পর্কে মন্তব্য হচ্ছে, এগুলো আসলে উভয়পক্ষ থেকেই অতিরঞ্জিত করে বলা হয়।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মুন্নু মেডিকেল কলেজ, চেম্বার : কেসি হাসপাতাল, দক্ষিণখান

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter