সর্বগ্রাসী রোগ ডায়াবেটিস

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিম উদ্দীন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ডায়াবেটিস যে কোনো সময় যে কোনো বয়সে যে কোনো লোকের হতে পারে। ডায়াবেটিস চিকিৎসা করে কন্ট্রোল করা যায়, কিওর করা যায় না। কন্ট্রোলে রাখতে পারলে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন সম্ভব।

চিকিৎসা : তিনটি অত্যাবশ্যকীয় জিনিস-১. লাইফ স্টাইল পরিবতর্ন ২. ওষুধ ৩. এডুকেশন

লাইফস্টাইল পরিবর্তন : খদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে হবে যেন ওজন স্বাভাবিক থাকে। লাইফস্টাইল পরিবর্তন মানে অফিস টাইম বদলানো নয় বা ঘুমের অভ্যাস বা দৈনন্দিন জীবন পাল্টিয়ে ফেলা নয়। ডায়াবেটিস রোগীকে ডিসিপ্লিনড হতে হবে। একজনের লাইফপ্যার্টান ঠিক রেখেও ডিসিপ্লিনড হওয়া সম্ভব। স্থূলকায় লোকের ডায়াবেটিস হওয়ার আশংকা ৬০% বেশি। তাই ওজন স্বাভাবিক করতে হবে, উচ্চতা অনুযায়ী সবারই একটা ওজন বজায় রাখতে হয়, কায়িক শ্রম বা পেশা অনুযায়ী ক্যালরি বরাদ্দ ঠিক করতে হবে। এক কথায় বললে জিহ্বা ছোট পা লম্বা করতে হবে; হিসেব করে খেতে হবে ও শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে। লক্ষ্য হবে প্রাথমিক অবস্থার চেয়ে ৭% ওজন কমানো এবং তা ধরে রাখা। তবে ৫% কমাতে পারলেই গ্লাইসেমিক কন্ট্রোলের সুবিধা পাওয়া যায়।

ডায়াবেটিস রোগীর খাবার : ডায়াবেটিসের খাবার মানে সবকিছু বাদ দিতে হবে তা নয়; যাই খান যেভাবেই খান টোটাল ক্যালরি ঠিক রাখতে হবে। আসলে মিষ্টি ছাড়া সবই খাওয়া যাবে তবে হিসেব করে খেতে হবে (eat everything but with moderation not elimination)। অফিসের চা কফিতে চিনি (হালকা চিনি! বলে কিছু নেই) দেয়া হয়, কন্ডেনসড মিল্ক দেয়া হয়, এগুলোতে গ্লুকোজ বাড়ে তাই বাদ দিতে হবে। প্রচলিত খাদ্যদ্রব্যের মধ্যেই সিলেক্ট করে খেতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবারই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও প্রতিকারের প্রধান উপায়। এটা ঠিক প্রেশার বেশি থাকলে পাতে লবণ খাওয়া যাবে না, চর্বি জাতীয় খাবার হিসেব করতে হবে। কিডনি রোগ হলে এক স্টেজে পানি ও আমিষ (০.৮ গ্রাম/কেজি) হিসেব করে খেতে হয়। শরীরে শর্করার জন্য যে ইনসুলিন নিঃসরণ হয় প্রোটিন তা আরও বাড়ায়। টোটাল ক্যালরির ২০-৩৫% চর্বি জাতীয় খাবার হতে হবে, কোন আপার লিমিট নেই, তবে পরিমাণ নয় গুণ (যেমন মনোআনস্যচরেটেড ফ্যাটি এসিড-গ্লুকোজ ও লিপিড কমায়) তবে লো গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স কার্বোহাইড্রিড ও ওমেগা৩ ফ্যাটি এসিড গ্লুকোজ কন্ট্রোলে সাহায্য করে না। সবার জন্য পাতে লবণ না খাওয়াই উত্তম।

ব্যায়াম : ব্যায়াম ওজন ঠিক রাখে, ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা বাড়ায়। অনেকভাবেই ব্যায়াম করা যায় তবে হাঁটাই সর্বোত্তম। আপনার ডায়াবেটিস আছে অথচ হাঁটবেন না তা হবে না, হতে পারে না!! ব্যায়াম করতে পারলেই লাভ। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪৫ মি হাঁটুন, এমন হাঁটুন যাতে গা ঘামে, যাতে ক্ষুধা লাগে যাতে পালস বাড়ে; যাতে মানুষ বুঝে আপনি ডায়াবেটিসের জন্য হাঁটছেন। টারগেট পাল্স রেট : ২২০ বিয়োগ বয়স-এর ৫০-৭০%। সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মি. হাঁটতে হবে এটা ৩-৫ দিনে হতে পারে তবে পরপর ২ দিন মিস করা যাবে না। সপ্তাহে ২ দিন রেজিস্ট্যান্স (মাসলস স্ট্রেংদেনিং, ফ্রি ওয়েট বা ওয়েট মেশিন) এক্সারসাইজ করা দরকার। বাচ্চাদের দিনে ৬০ মিনিট করা উচিত। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে ১/৪ অংশ মানুষের ডায়াবেটিস হয়। ৯০, মিনিটের বেশি একটানা বসে না থেকে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থাকলে বা কিছুক্ষণ হাঁটলে উপকার হয়।

কাদের ব্যায়াম করা ঠিক নয় : অটনমিক নিউরোপ্যাথি থাকলে ব্যায়ামের আগে কার্ডিয়াক ইভালুয়েশন, পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি থাকলে পা পরীক্ষা, ওয়েট বিয়ারিং ব্যায়াম না করা ভালো। প্রলিফারিটিফ রেটিনপ্যাথি থাকলে চিকিৎসার আগে ব্যায়াম না করা ভালো। সিক্রেটগগ ও ইনসুলিন চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের ব্লাড গ্লুকোজ ৬ মিমোলের কম থাকলে ব্যায়ামের আগে কিছু শর্করা জাতীয় খাবার খেয়ে নেয়া ভালো। কিডনির রোগীর ব্যায়ামের নিষেধ নেই।

ডায়াবেটিস না হলেও সবাইকে ধূমপান ছাড়তে বলতে হবে কারণ ধূমপায়ী হলে ডায়াবেটিস হওয়ার আশংকা ৬০% বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিস রোগীর প্রাসঙ্গিক সমস্যা

ভ্যাক্সিন : ২৫-৬৫ বছরের রোগীদের যারা নিউমোনিয়ায় মারা যায় ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা অন্যদের তুলনায় ২.৫ গুণ, সবাইকে তাই নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নিতে উৎসাহিত করতে হবে। হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন সবার জন্য অত্যাবশ্যক কারণ ট্রান্সমিশনের সমূহ আশংকা।

মানসিক রোগ : ডিপ্রেসনের আশংকা ২০-২৫%। ডায়াবেটিসের সঙ্গে ডিপ্রেসন থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশংকা দ্বিগুণ।

ডায়াবেটিস ডিস্ট্রেস সবকিছুতেই নেগেটিভ এ্যাটিচুড হয় ১৮-৪৫% এর।

ফ্যাটি লিভার : অতিরিক্ত হেপাটিক ট্রান্সামাইনেস আসলে যাদের বিএমআই, ওয়েস্ট সারকামফারেন্স ও ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি এবং এইচডিএল কম তাদের সবারই থাকে। ৭০% ডায়াবেটিস রোগীর এবং ১০০% মোটা মানুষের এটা থাকে। ওজন কমালে, লিপিডের চিকিৎসা করলে ডায়াবেটিস কন্ট্রোল করলেই উপকার হয়। অন্য ওষুধ লাগে না। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৫ গুণের (১০০) বেশি হলে অন্য রোগ যেমন ভাইরাল হেপাটাইটিস, অটইমুন হেপাটাইটিস, লুপাস হেপাটাইটিস, উইলসনস ডিজিজ ইত্যাদির জন্য পরীক্ষা করতে হয়। এগুলো না হলে ট্যাবলেট দিয়েই চিকিৎসা করা যায়। ইনসুলিন আবশ্যক নয়।

(বাকি অংশ পরবর্তী সংখ্যায়)

লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, বারডেম ঢাকা