স্বাবলম্বী হলে একজন মেয়ের মনের শক্তি বাড়ে : ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু

  মিজানুর রহমান ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাবলম্বী হলে একজন মেয়ের মনের শক্তি বাড়ে : ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু
ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু

‘মা সুস্থ, শিশু সুস্থ, পরিবারে শান্তি’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছেন ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু। এলাকার অভিভাবকরা বাল্যবিয়ের ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। তাদের মধ্যে বাল্যবিয়ের প্রতি একটি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে।

মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎ করে বাবা-মার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তার। স্বামী পেশায় একজন প্রকৌশলী। সময়টা ১৯৮৩ সাল। স্বামীর অনুপ্রেরণায় তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। মেডিকেলে ভর্তি হন।

ডাক্তারি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন তার স্বামী রোকনউদ্দীন মাহমুদ। তাদের ঘর আলো করে আসে দুই ছেলেমেয়ে। ছেলে তানিম বিন মাহমুদ একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে এবং মেয়ে তাসমিয়াহ মাহমুদ পেশায় একজন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ধাওড়া গ্রামে। মা আনজু আরা বেগম জেলা শহরের হামদহের সাধুপতিরাম স্কুল ও বাবা আবদুর রশিদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। এক ভাই দুই বোনের মধ্যে ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু বড়।

ডা. রাশেদা সুলতানা রনজুর মতে, তার বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়ে ডাক্তার হবেন। ছোটবেলা থেকে বড় মেয়েকে নিয়ে এ স্বপ্নই দেখেছেন তার বাবা। কিন্তু তিনি হতে চেয়েছিলেন একজন গণিতবিদ। অবশেষে বাবার স্বপ্ন পূরণে ডাক্তারি পড়েন। মেয়ে ডাক্তার হওয়ায় বাবার স্বপ্নও পূরণ হয়েছে।

বাবার মনে আত্মতুষ্টি ভরে থাকত সবসময়। বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করেন তিনি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা থেকে পদোন্নতি পান ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি। সিভিল সার্জন হিসেবে প্রথম যোগদান করেন মেহেরপুর জেলায়। ওই বছরের ৫ মার্চ বদলি হয়ে সিভিল সার্জন হিসেবে ঝিনাইদহে যোগদান করেন তিনি। কর্মদক্ষতা, সততার পুরস্কার হিসেবে উপ-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ৬ উপজেলা ও ৬ পৌরসভার মানুষদের উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের নিরলসভাবে কাজ করছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু বলেন, জেলা সদরের প্রধান হাসপাতালসহ পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১৭৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকসহ অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসক, সেবিকারা কি স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন তা আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

৬৮টি ইউনিয়নসহ পৌরসভার স্বাস্থ্যসহকারী, এক হাজারেরও বেশি বিভিন্ন স্তরের ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন কিনা এটাও দেখতে হয়। শুধু এ দায়িত্ব পালন করেই দায়িত্ব শেষ হয় না আমার; পাশাপাশি সংসারও সামলাতে হয় নিপুণভাবে।

ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু ঝিনাইদহ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮১ সালে সরকারি কে.সি. কলেজ থেকে যশোর বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের মধ্যে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে।

১৯৮৭ সালে এমবিবিএস পাস করেন। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯১ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। এরপর তাকে আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি।

ইভটিজিং, বাল্যবিয়ে মেয়েদের জীবনকে হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে অল্পবয়সে গর্ভবতী হওয়ায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাবলম্বী হলে একজন মেয়ের মনের শক্তি বাড়ে।

এজন্য সঠিক বয়সে বিয়ে এবং সন্তান ধারণ করতে হবে। তাহলে তার মানসিক ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে যে কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এভাবেই একজন নারীর ক্ষমতায়ন হবে।

সিভিল সার্জন হিসেবে ঝিনাইদহে যোগদানের পরপরই ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, শিশু পরিচর্যা, নিরাপদ গর্ভধারণ, গর্ভবতী মায়েদের সচেতনতা সৃষ্টি, মাতৃমৃত্যুর হার কমানোসহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নিরাপদ প্রসবের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখছেন।

মেয়েদের প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী জটিলতা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন। এর মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত উঠোন বৈঠক এবং মা সমাবেশ করা হচ্ছে। বাল্যবিয়ে বন্ধ এবং অকাল গর্ভধারণের বিষয়ে স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের সচেতন করার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মা হওয়ার ক্ষেত্রে মেয়েদের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

নারী শিক্ষা প্রসারে ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে আর্থিক সাহায্য করে থাকেন তিনি। তিনি মনে করেন প্রকৃত শিক্ষা একজন নারীকে আদর্শবান ও কর্তৃত্ববান করে গড়ে তোলে। আদর্শ মায়ের সন্তান দেশের জন্য গর্ব হতে পারে।

এ সিদ্ধান্তগুলো নিতে কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা এ সম্পর্কে ডা. রাশেদা সুলতানা রনজু বলেন, কর্মক্ষেত্রে কখনোই কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি। তবে মাঝে মাঝে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাকে। একজন দায়িত্বশীল মানুষের উচিত শান্তভাবে সেসব ঝুঁকি সামাল দেয়া।

ডা. রাশেদা সুলতানা রনজুর স্বপ্ন অবসরকালীন সময়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যক্তি উদ্যোগে হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করবেন। কারণ সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালনের পর বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরেছেন তিনি। এর মধ্যে চলতি বছরের জুনে ইন্দোনেশিয়া ও চীন ঘুরে এসেছেন। ওই সব দেশের অভিজ্ঞতাকে সামনের দিনগুলোতে কাজে লাগাতে চান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×