মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকেই পথ চলছেন মিনু বিল্লাহ

  দিল মনোয়ারা মনু ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযোদ্ধা মিনু বিল্লাহ
মুক্তিযোদ্ধা মিনু বিল্লাহ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বলা যায় নারী-পুরুষের সম্মিলিত ধারার যুদ্ধ। দেশমাতৃকার এ দুরূহ সংকটে আমাদের দেশের শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেনি।

তাদের পরিপূর্ণ সহযোগিতা, সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিরঙ্কুশ ত্যাগ নিয়ে এ যুদ্ধ এগিয়ে চলেছে সাহসের সঙ্গে দিনের পর দিন। এমনি এক গৌরবময় বিজয়গাঁথার অংশীদার আজকের আলোকিত মুক্তিযোদ্ধা মিনু বিল্লাহ। দেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী। যিনি নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভানেত্রী হিসেবে বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশেষ অবদান রেখে এগিয়ে চলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ত্যাগী এক আলোকিত পরিবারের মেয়ে তিনি। তাদের পরিবার এ যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তার ভাইরা এবং দুই বোনের স্বামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে নন্দিত হয়েছেন।

এক বোনের স্বামী দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে একটি গৌরবময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন; যা আমাদের অহঙ্কারের। মিনু বিল্লাহ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রী এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কলকাতায় যান।

সময়টা আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। সেই সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বাসা ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ঠিক উল্টোদিকে। পঁচিশ মার্চ কালো রাত্রিতে কীভাবে যে আমরা বেঁচে গেলাম তা বুঝিয়ে বলার ভাষা আমার জানা নেই।

আমাদের পুরো বাড়ির জানালাগুলোতে ভারী পর্দা আবার তার ওপরে চাদর ঝুলিয়ে রাখা হতো যাতে আলো আসতে না পারে। বাড়িতে যে মেয়েরা আছে তা যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায়।

এমনি একটি দমবন্ধ অবস্থায় তখন দিন কাটছিল আমাদের। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক এ কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের ক্লাসে যোগ দেয়ার কথা বলা হচ্ছিল বারবার। কিন্তু আমি যাইনি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যোগ দেই একেবারে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। মুক্তিযুদ্ধে আমি যাব এ প্রত্যয় আমার ছিল। কিন্তু একা নয়, পরিবারের সবাইকে নিয়ে।

আমার দুলাভাই বিখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদ, আমার বোন সারা মাহমুদ ও তাদের একমাত্র কন্যা শাওন মাহমুদসহ আমি সেখানে যাব এমন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমাদের যাওয়ার দশ-বারো দিন আগেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানিবাহিনীর সদস্যরা আমাকে সেখানে নাচের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য তাগাদা দেয়।

একদিন দুটো জিপ এলো আমিসহ অন্য শিল্পীদের নেয়ার জন্য। আমাকে লুকিয়ে রেখে আমার মা ভাইয়ের মাধ্যমে খবর পাঠালেন, ‘মিনু অসুস্থ, তাই যেতে পারবে না।’ কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা সে কথা বিশ্বাস করল না।

দ্বিতীয়বার পায়ে ব্যথা পেয়েছি নাচতে পারব না বলা সত্ত্বেও তাদের বিরত করা গেল না। যাচাই করার জন্য পাকিস্তানি সেনারা আমাকে দেখতে চাইল! আমার পুরো পরিবার অসহায়বোধ করলেন। পরের দিন আসবে বলে ওরা চলে গেল। রাতে কারফিউ ছিল। গোটা রাতটা ভয়ঙ্কর আশঙ্কার মধ্যে কাটালাম।

পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই আমার সাহসী মা আমায় বোরখা পরিয়ে জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল খালাম্মার বাসায় রেখে এলেন। মা দুলাভাই আলতাফ মাহমুদকে বলেছিলেন, ‘মিনুকে আমি ঢাকায় রাখতে আর সাহস পাচ্ছি না। তুমি ওকে কলকাতায় রেখে আস। ওর ইচ্ছানুযায়ী মুক্তিযুুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য।’

দুলাভাই আলতাফ মাহমুদ তখন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার করতেন লুকিয়ে লুকিয়ে। সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধে লোক পাঠানোর জন্য বেশ কয়েকটি দল গঠিত হয়েছিল। যারা বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনানুসারে বিভিন্ন সময় নানা জনকে পাঠাতে সাহায্য করতেন। ঢাকায় বিশেষ কাজের জন্য দুলাভাইয়ের যাওয়া সম্ভব হল না ।

তিনি আমাকে বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাৎ চৌধুরীর সঙ্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। আমাদের সঙ্গে তখন জাওয়াদুল করিমের পরিবারও ছিলেন। অতঃপর আমি পৌঁছলাম খালেদ মোশাররফের অধীনে দুই নম্বর সেক্টরে বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে। পরে জেনেছিলাম এ হাসপাতালটি তৈরি হয়েছে হাবলু চৌধুরী নামের এক হৃদয়বান ব্যক্তির দান করা জমির ওপর।

এ হাসপাতাল গঠনে ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী এবং ডা. মবিন চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ওনারা দুজন তখন পড়াশোনা করছিলেন লন্ডনে।

পড়া শেষ না করে দেশমাতৃকার ডাকে অধিক পরিমাণে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। ক্যাপ্টেন আখতার, সুলতানা কামালসহ আরও অনেক মুক্তিকামী নারী-পুরুষ তখন সেই হাসপাতালে ছিলেন।

হাসপাতালে তখন চিকিৎসা দিতেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারাই আমাদের ইনজেকশন দেয়া থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার খুঁটিনাটি বিষয় হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

কিন্তু যখন মাইন আক্রমণে মারাত্মক জখমের রোগী আসতেন তখন তাদের কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল না আমাদের। তবে বুলেটে আক্রান্ত রোগী এলে চিকিৎসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য আমাদের ডাকা হতো। দিনের বেলা রোজ আমাদের আট ঘণ্টার ডিউটি থাকত। রাতের ডিউটি করতেন ছেলেরা।’

মিনু বিল্লাহ নভেম্বর মাস পর্যন্ত এ ক্যাম্পের কাজে নিবেদিত ছিলেন। এ হাসপাতালে রেডিও না থাকায় দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধ এবং ধ্বংসযজ্ঞের খবর সেভাবে পেতেন না। তবে কনভয় চলাচল দেখে এর ভয়াবহতা বুঝতে পারতেন।

নভেম্বর মাসে শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সদের রেখে তাদের সবাইকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

তিনি তখন জাওয়াদুল করিমের পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। ছোট একটা ঘরে একসঙ্গে পনের জনের মতো।

সেখানে অবস্থানের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধা আসমা, রেশমারা তিন বোনের কাছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের অসাধারণ সুরকার মহান দেশপ্রেমিক আলতাফ মাহমুদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পান। সেই খবর অনেকেই জানতেন কিন্তু কেউ ঘুর্ণাক্ষরেও তাকে জানতে দেননি। তবে খালেদ মোশাররফ মাঝে মাঝেই এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। সবাইকে বলতেন, ‘মিনুকে দেখে রেখ।’

এক নদী কষ্ট, তার সঙ্গে দেশের জয়ের আনন্দ নিয়ে নিজ ভূমে ফিরে আসেন তিনি। দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা, দায়বদ্ধতার কারণে এখনও দেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে ভাবেন। ভাবতে চান। দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে শুরু করেন দ্বিতীয় সংগ্রাম। সে সংগ্রাম নাচের মাধ্যমে দেশ এবং মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার।

শান্ত, স্নিগ্ধ সহজ-সরল মিনু বিল্লাহ এখনও দেশের জন্য যুদ্ধ করছেন সংস্কৃতি নিয়ে সমাজ প্রগতির ক্ষেত্রে বিরাজমান সব অন্তরায়ের বিরুদ্ধে। থাকতে চান প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরোধাদের সঙ্গে।

তাই নৃত্যশিল্পী সংস্থার মাধ্যমে তার কাজ চলছে দেশ ও দেশের অভ্যন্তরে। ভারতের নৃত্যগুরু মুন্নী মহাপাত্র ও ইপসিতা বারুইর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে ওডিসি নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।

মিনু বিল্লাহ ঢাকায় পল্লবীতে প্রথম ওডিসি নৃত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। সেখানে দেশি ও বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি তার নাচ নিয়ে দেশ, বিদেশে নৃত্য আয়োজনে অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন।

বহু ওয়ার্কশপ সেমিনারে অংশগ্রহণ করে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আলোচিত হয়েছেন। তার বড় কোনো আকাক্সক্ষা নেই। কর্মসম্পাদনেই তুষ্ট। এ ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ব আশ্চর্য শক্তিবলে অশুভের সঙ্গে আপোষহীন থেকে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন এটা অনেকের প্রত্যাশা ছিল। তিনি তা করতে পেরেছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×