স্বপ্ন মা : যারা স্বপ্ন বুনে তা বাস্তবায়িত করেন

  রীতা ভৌমিক ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেয়ে কোলে মারিয়া বেগম ও ছেলেকে বই দেখাচ্ছেন সালমা খাতুন।
মেয়ে কোলে মারিয়া বেগম ও ছেলেকে বই দেখাচ্ছেন সালমা খাতুন। ছবি: আ.হ.ম. ফয়সাল

হতদরিদ্র মায়েরা মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্যকে জয় করেছেন। জায়াপতি সম্মাননাপ্রাপ্ত দু’জন মা টুঙ্গিপাড়ার মারিয়া বেগম ও মুজিবনগরের সালমা খাতুন।

মারিয়া বেগম

যে কোনো পুরস্কারই আনন্দের বললেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার নিলফা বয়রা গ্রামের মারিয়া বেগম।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার পর তার বিয়ে হয়। স্বামী চা বিক্রি করতেন। চা বিক্রি করে মাসে দেড় হাজার টাকাও আয় হতো না। এ টাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হতো তার। এরই মধ্যে গর্ভবতী হন।

অভাবের সংসারে তিনবেলা খাবার জোটে না। মহিলা ওয়ার্ড মেম্বারের মাধ্যমে জানতে পারেন সরকার দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা দেবেন। তিনি তার ছবি, আলট্রাসনোগ্রাফের ফটোকপি উপজেলা মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন কর্মসূচিতে জমা দেন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার তালিকাভুক্ত হন।

মারিয়া বেগম মাসে ৩৫০ টাকা করে মোট ২৪ মাস এ ভাতা পান। ভাতার এ টাকা দিয়ে তিনি গর্ভকালীন সময়ে পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন। এএনসি ও পিএনসি চেকআপ করেছেন ও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলেছেন।

তার কোলজুড়ে আসে মেয়ে। মেয়ের জন্মের সময় তার কোনো সমস্যাই হয়নি। মেয়ের বয়স ছয়মাস হলে ওকেও পুষ্টিকর খাবার খাইয়েছেন। মেয়ে শিশু শ্রেণীতে পড়ছে। মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার সাতটি শর্ত পূরণ করায় মারিয়া বেগম ২০১৫ সালে স্বপ্ন প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত হন।

মহিলা বিষয়ক অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়িত এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ডরপ-এর সহযোগিতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্বপ্ন প্যাকেজ থেকে মারিয়া বেগম পেয়েছেন একটি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্ড।

সে সঙ্গে একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি/বিনোদন কার্ড, বাসস্থানের জন্য একটি টিনের ঘর, স্বাস্থ্যসম্মত একটি ল্যাট্রিন এবং আয় বৃদ্ধি ও জীবিকা নির্বাহের জন্য জীবিকায়ন উপকরণ হিসেবে একটি বকনা গাভী।

এ প্রসঙ্গে মারিয়া বেগম বলেন, বসবাসের জন্য আমাদের নিজের কোনো ঘর ছিল না। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ভাসুর, ননদ সবাই একটি ঘরে থাকতাম। এখন স্বপ্ন প্যাকেজ থেকে পাওয়া টিনের ঘরটি পাওয়ায় নিজের একটি ঘর হয়েছে। বাড়িতে পায়খানা ছিল না। এখন স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহার করছি। বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজি চাষ করায় পুষ্টির চাহিদা মিটচ্ছে।

টিউবওয়েল হওয়ায় বিশুদ্ধ পানি পান করছি। স্বপ্ন প্যাকেজের আওতায় গাভী পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণটাকে কাজে লাগিয়ে যত্নসহকারে গাভী লালন পালন করি। গাভী বড় হলে ছয় মাস পর তা বিক্রি করে একটি উন্নত জাতের গাভী কিনি। এ গাভীটি সাত-আট কেজি দুধ দেয়। নিজেদের দুধের চাহিদা মিটিয়ে বাকি দুধ বিক্রি করি।

দুধ বিক্রির টাকা জমিয়ে ষাট হাজার টাকা সঞ্চয় করি। সে টাকা দিয়ে একটি এড়ে বাছুর কিনেছি। স্বামীকে একটি মুদি দোকান করে দেই। স্বামীর বেকারত্ব ঘুচেছে। মুদি দোকান ভালোভাবে চলছে। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে গাভী আর ষাঁড় পালন করছি।

ব্যবসা এবং গাভী পালন করে মাসে প্রায় পনেরো হাজার টাকা আয় হচ্ছে। সংসারের খরচের পর সঞ্চয়ও করছি। সংসারের অভাব দূর হয়েছে। দ্বিতীয় সন্তানও মেয়ে হয়েছে। ওর বয়স এক বছর। দুটি সন্তানই যথেষ্ট।

সংসার ছোট রাখতে জন্মনিয়ন্ত্রণের অস্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করছি। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে সংসারের আরও উন্নতি করব। মেয়ে দুটোকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই।

পরিবারে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখন তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে নেন। স্বপ্ন প্যাকেজ কর্মসূচির সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এলাকায় মারিয়া বেগম একজন সচেতন নারী হিসেবে পরিচিত।

মারিয়া বেগম শ্বশুর-শাশুড়ি, প্রতিবেশীদের কাছেও এখন সম্মানের পাত্রী। নিজে যা শিখেছেন তা প্রতিবেশীদেরও জানাচ্ছেন। ‘বটমলাইনিং স্বপ্ন মা একের ভেতর সতের’ জায়াপতি সম্মাননা পেয়েছেন মারিয়া বেগম।

সালমা খাতুন

মেশিনে অর্ডারি কাঁথা সেলাই করছিলেন মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরের আনন্দবাস গ্রামের গৃহবধূ সালমা খাতুন। এখন তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। নিজের ঘর হয়েছে।

একটি সেলাই মেশিন কিনেছেন। দুটো গরু, রাজহাঁস, পাতিহাঁস পালন করছেন। উঠোনে শাকসবজি চাষ করছেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে সংসারের প্রতিটি কাজের সিদ্ধান্ত নেন।

বছর চারেক আগে তাদের সংসারের এ চিত্র ছিল না। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে বিয়ে হয়ে যায় তার। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গর্ভবতী হন তিনি। এদিকে বেকার স্বামী। শ্বশুরের একার আয়ে এতগুলো মানুষের খাবার জোগাড় করতেই নুন আনতে পানতা ফুরোয়।

এক ঘরেই শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ, স্বামীকে নিয়ে বসবাস করতেন। গর্ভবতী সালমা খাতুন ২০১১-১২ সালে মাতৃত্বকালীন ভাতার তালিকাভুক্ত হন। মাসে ৩৫০ টাকা করে ২৪ মাস মাতৃত্বকালীন ভাতা পান ।

এ প্রসঙ্গে সালমা খাতুন বলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতার টাকা দিয়ে গর্ভকালীন সময়ে ডিম, দুধ কিনে খেয়েছি। নিয়মিত এএনসি ও পিএনসি চেকআপ করছি। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলছি।

সুস্থ স্বাভাবিকভাবে আমার সন্তানের জন্ম হয়েছে। সন্তানকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াইছি। স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে জন্মনিয়ন্ত্রণের অস্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করছি। মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার সাতটি শর্ত পূরণ করায় ২০১৫ সালে স্বপ্ন প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত হই।

মহিলা বিষয়ক অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়িত এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ডরপ-এর সহযোগিতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্বপ্ন প্যাকেজ থেকে সালমা খাতুন পেয়েছেন একটি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্ড।

একটি ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতি/বিনোদন কার্ড’, বাসস্থানের জন্য একটি টিনের ঘর, স্বাস্থ্যসম্মত একটি ল্যাট্রিন এবং জীবিকা নির্বাহ ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য জীবিকায়ন উপকরণ হিসেবে একটি গাভী।

স্বপ্ন প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সালমা খাতুনের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। উঠোন প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় নানা ধরনের মৌসুমি শাকসবজি করলা, পুঁইশাক, বেগুন ইত্যাদি চাষ করেন।

স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজি চাষ করে নিজেদের পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছেন। বাড়তি শাকসবজি প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করেন। গাভী লালন-পালন করেন। গাভী বাছুর দিয়েছে। বাছুর বড় হয়ে গাভী হয়েছে।

একটি গাভী থেকে এখন দুটো গাভী। দুটি গাভীর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা। প্রত্যেক গাভী তিন থেকে চার কেজি দুধ দেয়। নিজেদের দুধের চাহিদা মিটিয়ে বাকি দুধ বিক্রি করেন। শাকসবজি, দুধ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালান।

এর মধ্য থেকে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে সঞ্চয় করেন। সঞ্চয়কৃত টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন, চারটি রাজহাঁস এবং আঠারটি পাতিহাঁস কেনেন। বিশুদ্ধ পানি পান করার জন্য একটি টিউবওয়েল দেন।

সেলাই মেশিন কেনায় কেন আগ্রহী হলেন জানতে চাইলে সালমা খাতুন বলেন, আমার প্রতিবেশীদের অনেকেরই সেলাই মেশিন আছে। তারা ঘরে বসেই সেলাই করে রোজগার করছেন। এতে ঘরে বসে কাজও হয়। স্

বামী-সন্তান-সংসার সামলাতেও সমস্যা হয় না। ওদের দেখাদেখি আমিও সেলাই মেশিন কেনায় আগ্রহী হই। ওদের সেলাই দেখে দেখেই আমিও সেলাই শিখি। অর্ডারকারীরা কাপড় সেটিং করে দেয়। আমি সেলাই করি।

প্রতি কাঁথায় ২০০ টাকা মজুরি পাই। অর্ডারি কাপড় এবং কাঁথা সেলাই করে প্রতি মাসে হাজার চারেক টাকা রোজগার হয়।

সেলাই কাজ, গাভী পালন, শাকসবজি চাষ, রাজহাঁস ও পাতিহাঁস পালন এসব মিলে তাদের মাসে প্রায় হাজারদশেক টাকা আয় হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে একদিকে তাদের বেকারত্ব ঘুচছে। অন্যদিকে তাদের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন। হয়েছেন স্বাবলম্বী।

স্বপ্ন প্রকল্পের সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়ে সালমা খাতুন নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সমাজের একজন সচেতন নারী হিসেবে অন্যদের সচেতন করছেন। নিজে যা শিখেছেন তা প্রতিবেশীদেরও জানাচ্ছেন।

পরিবারের সব সিদ্ধান্ত স্বামী-স্ত্রী দুজনে আলোচনার মাধ্যমে নেন। শ্বশুর-শাশুড়িও সালমা খাতুনকে আর গঞ্জনা দেয় না। বরং পুত্রবধূর সাফল্যে তারাও আনন্দিত। প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি অনুকরণীয়।

সালমা খাতুন এ মাসেই ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাবেন। নিজে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি দারিদ্র্যতার কারণে। ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবেন। মানুষের মতো মানুষ করবেন। দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন সালমা খাতুন এবার ‘বটমলাইনিং স্বপ্ন মা একের ভেতর সতের’ জায়াপতি সম্মাননা পেয়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×