আজমীরার চায়ের স্টলের গল্প

  আব্বাস আলী ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রেলগেটের পরিত্যক্ত দুটি ইটের ঘর। একসময় ওই ঘরে রেলের গেটম্যান থাকতেন। এখন ওই ঘরে আর গেটম্যান থাকেন না। আর এ পরিত্যক্ত ঘরের একপাশে টিনের বেড়া। অপর পাশে পলিথিনে ঘেরা। নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা সদর-আবাদপুকুর সড়কের রেলগেটের পরিত্যক্ত এ দুটো ঘরে বসবাস করেন আজমীরা। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন।

জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে চা বিক্রিকে বেছে নিয়েছেন আজমীরা। তার নামেই রাখা হয়েছে ‘আজমীরা টি স্টল’। আর ওই পরিত্যক্ত দুটো ঘরের একটিতে বসবাস। যেটি একটু বড়। আর অপরটি একটু ছোট। ছোট ঘরেই আজমীরা চায়ের দোকান সাজিয়েছেন। রেললাইনের একেবারে কাছেই তার চায়ের দোকান।

আজমীরার গ্রামের বাড়ি উপজেলার বিষ্ণুপুর দিঘীর পাড়ে। বাবা-মায়ের সঙ্গে বিশ বছর আগে আজমীরা রেলগেটের এ পরিত্যক্ত ভবনে এসে উঠেছেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে আজমীরা দ্বিতীয়। সবার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাবা আজিজার রহমান আকন্দ প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটি বাজারে চায়ের দোকান করেন। বাবার একার আয়ে পরিবারের আটজন মানুষের খাবার জোগাড় হয়ে ওঠে না। অভাবের সংসারে তার লেখাপড়ার তেমন সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেক কষ্টে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। খরচ চালাতে না পারায় বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। সংসারে দু-মুঠো ভাতের জোগাড় করতে ঘরের পাশেই দেন চায়ের দোকান। তাও দেখতে দেখতে দশ-এগারো বছর হয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী চায়ের সঙ্গে নানারকমের বিস্কুট, কেক, রুটি, কলা, চকলেট, পান ও বিড়ি-সিগারেটও রেখেছেন। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো বেচা বিক্রি হয়। লাভের অংশটা পরিবারের কাজেই খরচ করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে আজমীরা বলেন, রেললাইনে দোকান হওয়ায় ভোর থেকে শুরু হয় চা বেচার কাজ। চলে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। শুধু চা বিক্রিই করেন না আজমীরা। রেললাইন পার হওয়া মানুষদের সতর্কও করেন। তার কারণে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে কয়েকটি জীবন। সাক্ষীও হয়ে আছেন কয়েকটি দুর্ঘটনার। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী ট্রেনের আসা-যাওয়া এ পথে। এ রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে ট্রাক, ট্রাক্টর, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ভটভটি, অটো চার্জার, ভ্যান, সাইকেলসহ লাখো মানুষের পারাপার।

আজমীরা বলেন, রেলের পুরনো ঘরে বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করি। নওগাঁ-নাটোর সড়ক হবে শুনছি। রাস্তা হলে এ ঘরটি ভাঙা হতে পারে। তখন আর এখানে থাকতে পারব না। কোথায় থাকব জানি না। নতুন গেটম্যান নেয়া হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় গেটম্যান আসতে পারেন না। এ সময় ট্রেন চলে আসলে লোকজনকে সতর্ক করি। অনেক সময় নিজেরাই গেট নামিয়ে দিই। যারা রেললাইন পারাপার হয় ট্রেন আসছে কিনা, সেটা না দেখেই পার হয়ে যায়। অনেকে আবার ট্রেন কাছাকাছি আসলেও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। তখন হাত উঁচিয়ে এবং হাঁক/ডাক দিয়ে লোকজনকে সতর্ক করে থামিয়ে দিই। প্রায় তিন বছর আগে এখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। উপজেলার রাজাপুর বালুভরা গ্রামে হামিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তার মেয়েকে রাতে সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠিয়ে দেন সান্তাহারে। মেয়েকে ট্রেনে উঠিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আবার ফিরে আসছিলেন। অসাবধানতাবশত রেললাইন পার হওয়ার সময় চলন্ত মোটরসাইকেলে ট্রেনের ধাক্কা লাগে। ওই সময় সবাই ভাত খাচ্ছিলাম। একটা বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। এসে দেখি মাথায় আঘাত লেগে রেললাইনের পাশে পড়ে আছেন।

চায়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা ভ্যানচালক ময়নুল হক বলেন, তিনি অনেক মানুষকে রেল দুর্ঘটনার থেকে বাঁচিয়েছেন সচেতন করে। গেটম্যান আসতে দেরি করলে নিজেরাই গেট নামিয়ে দেয়।

উপজেলার মালশন গ্রামের সবুজ সরদার বলেন, নিয়মিত রেললাইন পার হয়ে উপজেলায় আসা-যাওয়া করতে হয়। মাস কয়েক আগে একদিন বিকেলে একটা কাজের জন্য তড়িঘড়ি করে উপজেলা বাজারের দিকে আসছিলাম। রেলগেট পড়ে আছে। পার হওয়ার চেষ্টা করতেই চায়ের স্টলের ওই মেয়ে হাঁক দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। দেখি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রেন চলে আসছে। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×