মাদকাসক্ত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে বিষ পান করছে শিশু

  রীতা ভৌমিক ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকাসক্ত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে বিষ পান করছে শিশু
প্রতীকী ছবি

তিন মাসের ছেলেকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন রত্না। ক্ষুধায় চিৎকার করে কান্না করছে শিশুটি। কিন্তু মায়ের বুকের দুধ পান করতে তার প্রচণ্ড অনীহা।

অনেক জোরাজুরি করেও ছেলেকে বুকের দুধ পান করাতে পারলেন না তিনি। বিরক্ত হয়ে পুঁটলি থেকে একটা বড়ি বের করে খেলেন। এরপর ছেলেকে বুকের দুধ দিতেই দুধ পান করতে থাকে।

এ সম্পর্কে রত্না (আসল নাম নয়) বললেন, গর্ভকালীন অবস্থায় নিয়মিতই মাদক নিতাম। সন্তান হওয়ার মাসতিনেক আগে এবং পরে খদ্দের না পাওয়ায় রোজগার ছিল না। টাকার অভাবে মাদক কিনতে পারতাম না।

এর-ওর কাছে চেয়ে-চিন্তে নেশা করতাম। নেশা না করে ওকে বুকের দুধ দিলে ছেলে দুধ পান করতে চাইত না। যদি জোর করে দুধ পান করানোর চেষ্টা করতাম তাহলে বমি করত। চিৎকার করে কান্না করত।

ওর শরীরে কাঁপুনি দিত। যেদিন খদ্দের পাই হাতে টাকা আসে। সেদিন নেশা করতাম। নেশা করে বুকের দুধ পান করাতেই ছেলে স্বাভাবিক হয়ে যেত। কখনো ঘুমিয়ে পড়ত। কখনো খেলাধুলা করত।

কিছুদিন এভাবে চললেও ধীরে ধীরে ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুকিয়ে যায়। শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে শিশু বিভাগের একজন ডাক্তার দেখাই। ডাক্তারই প্রথম আমাকে জানালেন, গর্ভকালীন সময়ে আমি মাদক নেয়ায় আমার গর্ভের সন্তান মাদকের সংস্পর্শে চলে এসেছে। নেশা করে ওকে বুকের দুধ পান করানোয় বুকের দুধের মাধ্যমে ও মাদক গ্রহণ করছে।

অর্থাৎ দুধের বদলে বিষাক্ত পদার্থ পান করেছে। এর ফলে আমি ও আমার সন্তান উভয়ের জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছি। আমাদের দু’জনেরই চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার বলেছেন, নেশা করে শিশুকে দুধ পান করানো যাবে না। নেশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বড়ি দিয়েছে। ছেলে দুধ পান করতে না চাইলে বড়ি খেয়ে দুধ দিলে পান করতে আর অনীহা প্রকাশ করে না।

এক কৃষক পরিবারের মেয়ে রত্না। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সরল বিশ্বাসে স্বামীর হাত ধরে শহরে এসেছিলেন। সেই স্বামী তাকে একজন মাদকাসক্ত যৌনকর্মীতে পরিণত করে।

অথচ রত্না লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। প্রাইমারির গণ্ডি পেরুতেই তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনরা ওর বাবা-মাকে বুঝিয়েছিলেন মেয়েমানুষের এত লেখাপড়া করে কি হবে?

বিয়ের পর স্বামীর ঘরে হাঁড়ি ঠেলবে, পোলাপান মানুষ করবে। মেয়ের বয়স চৌদ্দতে পড়েছে। একে আর ঘরে রাখা যাবে না। পাত্রের খোঁজও মিলল। গ্রামেরই একজনের আত্মীয়। পাত্র ঢাকায় থাকে। মেয়ে তার সুখেই থাকবে। কোনো খোঁজ-খবর না নিয়েই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন বাবা-মা।

গ্রামের মেঠোপথে ছুটে বেড়ানো রত্না স্বামীর হাত ধরে ঢাকায় আসেন। স্বামী তাকে নিয়ে তোলে একতলা বাড়ির একটি ছোট্ট ঘরে। দু’দিন যেতে না যেতেই স্বামী তার বন্ধু-বান্ধবদের ঘরে নিয়ে আসে। তাস খেলে, সবাই মিলে কলকিতে টান দেয়। রত্না ভাবে, গ্রামের মতো হয়তো ওরাও কলকিতে তামাক খায়। স্বামী ওকেও কলকিতে টান দিতে জোরাজুরি করে। এভাবেই ও গাঁজার নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

স্বামী কি কাজ করে জানে না ও। বিয়ের মাসদু’য়েক যেতে না যেতেই বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ওকে এক বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে একটি ঘরে ওকে বসিয়ে রেখে আসছি বলে ওর স্বামী বেরিয়ে আসে।

ওই ঘরে ঢুকে কয়েকজন যুবক ওকে ধর্ষণ করে। চিৎকার করতে গেলে মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেয়। ওরা জানায়, চিৎকার করে কোনো লাভ নেই। ওদের কাছে তার স্বামী তাকে বিক্রি করে দিয়েছে। দিনের পর দিন একটি ঘরে বন্দি করে ওর ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। সুযোগ পেয়ে একদিন ওখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় ও।

সেখান থেকে আর স্বামীর ঘরে ফিরে যায়নি সে। বাবার বাড়িতেও আর জায়গা হয়নি তার। এরপর ওর জায়গা হয় রাস্তায়। ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীতে পরিণত হয় সে। খদ্দেরদের অনেকে নেশা করে। তাদের সঙ্গে সেও নেশা করে। গর্ভে সন্তান এলেও নেশা ছাড়তে পারেনি সে।

মাদকাসক্ত মা শিশুকে বুকের দুধ পান করালে শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী বলেন, একজন মাদকাসক্ত মা মাদক গ্রহণের পর শিশুকে বুকের দুধ পান করালে বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে মাদক ছড়িয়ে পড়ে।

কারণ বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে মেথডন, অ্যামফিটামিন, মেথামফেটামিন ইত্যাদি বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করে। যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ সব উপাদানের পরিমাণ বেশি হলে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।

উচ্চমাত্রার মাদক গ্রহণ করে একজন মা শিশুকে বুকের দুধ পান করালে, মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে তা শিশুর শরীরে প্রবেশ করে শিশুর হৃদযন্ত্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুও হতে পারে।

এ ছাড়া মাদকাসক্ত মায়ের বুকের দুধ পান করায় শিশুর ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করে না। শিশুর হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়। মা ও শিশু দু’জনেরই মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এমনকি গর্ভবতী মায়ের মাদক সেবনের মাধ্যমে তার গর্ভের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। গর্ভকালীন মাদক সেবনে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। অর্থাৎ গর্ভপাত হতে পারে।

গর্ভকালীন প্রথম থেকে তিন মাসের মধ্যে গর্ভবতী মা মাদক নেয়ায় শিশুর বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী এই দু’ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে গর্ভবতী মা মাদক গ্রহণ করলে শিশুর হার্ট ও লিভারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাত থেকে নয় মাসের মধ্যে গর্ভবতী মা মাদক গ্রহণ করলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে অপূর্ণাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।

শিশুর ওজন কম হবে অথবা মৃত সন্তান প্রসব করবে। গর্ভবতী মা নিয়মিত মাদক গ্রহণ করায় শিশুর শরীরে মাদক ছড়িয়ে পড়ে। ওই শিশু জন্মের পর মা মাদক সেবন না করে তাকে বুকের দুধ পান করালে সে দুধ পানে অনীহা প্রকাশ করে।

কিন্তু মাদক সেবনের পর মা ওই শিশুকে দুধ পান করালে সে দুধ পান করে। শিশুর আচরণগত এই লক্ষণগুলোই বলে দেয়, গর্ভকালীন শিশু মায়ের মাদক সেবনের মাধ্যমে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে।

শুধু নিুবিত্তই নয়, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের হার বাড়ছে। এর ফলে মাদকাসক্ত মায়ের পাশাপাশি তার গর্ভের সন্তান বা নবজাতকও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ সমস্যা থেকে তাদের বেরিয়ে আনতে সচেতনতা দরকার।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×