ফুটবলার জয়া চাকমা রেফারি আর কোচও

  আদীব আরিফ ১৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাম তার জয়া চাকমা। ফুটবলের জয়া তিনি। ফুটবলই তার ধ্যান-জ্ঞান ও সাধনার বিষয়। কেনই বা হবে না। একসময় তিনি ছিলেন জাতীয় নারী দলের ফুটবলার। এরপর দেশে ইতিহাস সৃষ্টি করে হয়েছেন প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনাকারী বাংলাদেশি নারী রেফারি। ২০১৬ সালে বিকেএসপিতে নারী ফুটবল দলের কোচ হিসেবে যোগদান করেছেন। বেশ সুনাম কুড়িয়ে ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে হয়েছেন সেরা কোচ।

‘ফুটবল আমাকে সম্মান এনে দিয়েছে, ফুটবল আমাকে অর্থ দিয়েছে, ফুটবল আমাকে আজকের জয়া চাকমা তৈরি করেছে।’ বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন জয়া চাকমা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যখন মেয়েদের ফুটবল খেলার কথা চিন্তাই করতে পারেন না তখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন ফুটবলে নারীর বিশ্ব জয়ের। আর এ বিশ্ব জয়ে একজন অগ্রদূত হিসেবে নিজের ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

তার খেলাধুলার শুরুটা হয়েছিল স্কুলে। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ২০০১ সাল, রাঙ্গামাটি জেলায় লং জাম্পে প্রথম হয়ে চট্টগ্রামে বিভাগীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। নিজ জেলা শহরের বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের জায়গাটা তৈরি করে নিলেন। খেলাধুলার মাধ্যমে নানা জায়গা ঘুরে দেখার বিষয়টি ছোট্ট জয়ার মনে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। রাঙ্গামাটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ২০০২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখানে তিনি গার্লস গাইড ও অ্যাথলেটিক্সে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দৌড়, লংজাম্প, হাইজাম্প ইভেন্টগুলোয় প্রথম হন। মায়ের আগ্রহে তখন কারাতেও শিখতেন। জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ২০০৩ সালে হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টেও অংশগ্রহণ করেন। ২০০৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্শা নিক্ষেপে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হন। ওই বছরই রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে তিন মাসের ফুটবল ক্যাম্প শুরু হয়। স্কুল ও জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের খেলায় পারদর্শিতার কারণে ফুটবল ক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। সেই থেকেই তার ফুটবলের খেলোয়াড় হিসেবে তার যাত্রা শুরু। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ঢাকায় আন্তঃজেলা ফুটবল টুর্নামেন্টে নিজ জেলা রাঙ্গামাটি অপরাজিত হয়। অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সবার নজর কাড়েন তিনি। ২০০৭ সালে ইন্দো-বাংলা গেমসে জাতীয় দলে ডাক পান। ১ম ম্যাচে সাবস্টিটিউট হিসেবে খেলেন ২০ মিনিট। সেবার বাংলাদেশ টিম রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এরপর ঘরোয়া ফুটবলের পাশাপাশি ইন্দো-বাংলা গেমস, এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বাছাই টুর্নামেন্ট ও ২০১০ এসএ গেমসে খেলেছেন তিনি। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মোট ১২টি ম্যাচ খেলেছেন জয়া। ফুটবলের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান। জাতীয় দলের খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় ২০০৯-২০১০ সেসনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় তার খেলোয়াড় ও ব্যক্তিগত জীবনে বিরাট পরিবর্তন আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্ডবল দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রতি বছর তিনি দ্রুততম মানবী হন। এ ছাড়া তিনি অ্যাথলেট দলের সদস্যও ছিলেন।

জাতীয় দলে থাকতেই ২০১০ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের রেফারিংয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০১২ সালে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রশিক্ষক সাদাত হোসেনের পরামর্শে রেফারিংয়ে মনোনিবেশ করেন। ২০১২ সালে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে নিয়মিত রেফারিং শুরু করেন জয়া চাকমা। পরের বছরই শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপের ভারত বনাম ইরানের খেলা পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা শুরু করেন। এরপর ২০১৫ সালে নেপাল ও ২০১৬ তাজিকিস্তানে এএফসি টুর্নামেন্টে রেফারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক ফুটবল উৎসবে মোট ১৭টা ম্যাচ পরিচালনা করেন। ঢাকায় ২০১৭ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ও ২০১৮ সালে ভুটান টুর্নামেন্টে চালিয়েছেন মোট ৭টি ম্যাচ। জয়া চাকমা এখন পর্যন্ত মোট ৩৮টি আন্তর্জাতিক খেলা রেফারি হিসেবে পরিচালনা করেছেন।

রেফারি পরিচালনায় নিজ অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জয়া চাকমা বলেন, বিশ্বের প্রথম নারী রেফারি জার্মানির বিবিয়ানা স্টেইনহস ও উজবেকিস্তানের রাফসান আমার এই পথচলার অনুপ্রেরণা। তারা আমার পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের তৈয়ব হাসান সামসুজ্জামানও আমার অনুপ্রেরণা। আমি নারী ফুটবল ম্যাচের রেফারি হলেও বাংলাদেশের ছেলেদের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ছেলেদের ম্যাচ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালন করার সুযোগ আমার হয়েছে।

জয়া চাকমা ২০১৬ সালের নভেম্বরে বিকেএসপির কোচ হিসেবে যোগদান করেন। বিকেএসপির নারী ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোচের জগতে প্রবেশ করে প্রথম টুর্নামেন্টেই চমক দেখিয়েছেন। ২০১৭ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ‘সুব্রত মুখার্জি গোল্ডকাপ’ টুর্নামেন্টে অনূর্ধ্ব-১৭ দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। ওই টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুসারে সেরা কোচেরও পুরস্কার পান তিনি। ২০১৮ সালেও একই টুর্নামেন্টে আবারও চ্যাম্পিয়ন হয় তার কোচিং এ বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা দল। সেরা কোচের পুরস্কারও ঘরে তুলেছেন তিনি।

একই সঙ্গে কোচ ও রেফারির আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা প্রসঙ্গে জয়া চাকমা বলেন, প্রথমত বিকেএসপি এ বিষয়ে খুবই কো-অপারেটিভ। যখনই কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ আসে তারা আমাকে অনুমতি প্রদান করে। আর একজন রেফারি হিসেবে সরাসরি ম্যাচ পরিচালনা করায় মাঠে খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো বুঝতে সুবিধা হয়। কোথায় তাদের ভুল হয় তা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। সেই অভিজ্ঞতা আমি কাজে লাগাই যখন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

আজকের এ অবস্থানে আসতে জয়ার অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জয়া চাকমার মতে, প্রথম যখন এলাকায় খেলাধুলা শুরু করি তখন অনুশীলন থেকে ফেরার পথে ছেলেরা টিজ করত। ওদের এ আচরণের বিরুদ্ধে আমি সবসময় প্রতিবাদ করতাম। তখন অনেক সময় ওদের সঙ্গে মারামারি করতে হতো। এ নিয়ে এলাকার লোকের তার মা-বাবাকে নানা কথা শুনাতেও ছাড়তেন না। তারা বলতেন মেয়ে বিগড়ে যাবে, লাফাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবা না। এরপর প্রথম যখন রেফারিং শুরু করেন তখনও অনেকে বলতেন, এসবে টাকা-পয়সা নেই। মেয়েরা কখনও রেফারিং করে নাকি? এসব নেতিবাচক কথার মধ্যে ইতিবাচক কিছু খুঁজে নিতেন। এ ছাড়া একজন নারী হিসেবে যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয় সে সবকিছুই তার ক্ষেত্রে ঘটেছে। তিনি শুধু তার লক্ষ্যে অটল ছিলেন।

জয়া চাকমার জন্ম ১৯৯২ সালের ৬ জানুয়ারি। বাবা মায়ের দেয়া নাম জয় মতি চাকমা। তা থেকে হয়ে যান জয়া চাকমা। খেলাধুলায় বাবা-মাও মেয়েকে খুব উৎসাহ দিতেন। তার মা-ই প্রথম মেয়ে হালকা পাতলা দুর্বল হওয়ায় তাকে সাহসী করার জন্য কারাতে প্রশিক্ষণে ভর্তি করে দেন। জয়ার বাবা সঞ্জীবন চাকমা কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। আর মা মালতি চাকমা রাঙ্গামাটিতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তিন বোনের মধ্যে জয়া সবার বড়। মেজ বোন কেয়া বেতারে উপস্থাপনা করেন। ছোট বোন মায়া কলেজে পড়ার পাশাপাশি কারাতে খেলেন।

জয়া চাকমা বলেন, আমার এ পথচলায় মা-বাবা, স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক ও প্রশিক্ষক অনেকেরই অবদান রয়েছে। বিশেষ করে রাঙ্গামাটির নিরুপা দেওয়ান, স্কুল শিক্ষক অঞ্জুলিকা খীসা, বীণা প্রভা চাকমা, পরিতোষ দেওয়ান বিকেএসপির কোচ ও আমার প্রথম কোচ, জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় বরুণ দেওয়ান প্রমুখ।

নারী খেলোয়াড়দের একটা কথা মনে রাখতে হবে, খেলাধুলার পাশাপাশি অবশ্যই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় একটা সময় থেমে যেতে হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×