স্বপ্নজয়ী সালেহা

স্বপ্নজয়ী সালেহা বেগম। একটি প্রত্যন্ত গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। যেখানে কাছাকাছি স্কুল ছিল না। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষার সম্প্রসারণ করার। এই স্বপ্নকে পুঁজি করে ৩২ বছর আগে নিজের বাড়িতে পাঠশালা খুলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিজেই পড়াতেন। শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নানা প্রতিকূলতার মধ্যে চার বছর পর তিনি স্থানীয় লোকদের সহযোগিতায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। লিখেছেন-

  কামরুল হাসান ১৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালেহা বেগমের জন্ম গলাচিপার রনগোপালদীতে এক কৃষক পরিবারে। আর্থিক সংকটের কারণে নিজ জন্মস্থান ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর মধ্য চরমোন্তাজ গ্রামে। এসেই পড়েন মহাসংকটে। সেখানে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাও বাড়ি থেকে অনেক দূরে। দূরত্বের কারণে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া এখানে কোনো হাসপাতাল নেই। নারীরা নানা অসুখে ভুগছেন। বাড়িতে বাড়িতে স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের পড়ার সুযোগ নেই। গ্রামগুলো জোয়ারে ডুবত, ভাটায় ভাসত।

অভাবের কারণে সালেহার পরিবার এই গ্রামে এসেছিলেন। কিন্তু সালেহা বেগম চেয়েছিলেন, বদল আসুক। মানুষগুলো প্রাণে বাঁচুক। ডাক্তার তৈরি হোক। কিন্তু কাছাকাছি প্রাইমারি স্কুলই যদি না থাকে, তা হলে শিশুদের শিক্ষার ভিতটা হবে কী করে? ভবিষ্যতের কৃতী ডাক্তার তৈরির জন্য শিক্ষার ভিত মজবুত হওয়া দরকার। এই সত্যিটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন তিনি। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে ১৯৮৬ সালে নিজ বাড়িতে স্কুল খোলেন। নিজেই ওইসব শিশুদের পড়াতেন। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকদের সহযোগিতায় ১৯৯০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুষ্টি চাল তুলে শিক্ষকের বেতন দেন। সালেহার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে ‘মধ্য চরমোন্তাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে জাতীয়করণ করা হয়।

৭৫ বছর বয়সের সালেহা এ প্রসঙ্গে বলেন, পাঠশালায় সিলেবাস মেনে প্রথাগত পড়াশোনা না হলেও বাংলা, অঙ্কসহ আরও কিছু বিষয় পড়াতাম। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাড়িতে তাদের সংকুলান হচ্ছিল না। এরই মধ্যে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষ প্রতিবেশীদের উদ্বুদ্ধ করি। কিন্তু সমালোচনার কারণে উদ্যোগ নড়বড়ে হলেও গ্রামের ১৫ জন নারী ও কয়েকজন পুরুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহযোগিতায় সাগরতীরের একখণ্ড খাস জমিতে ১৯৯০-এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিজেদের গোয়ালঘরের চাল, খড় (নাড়া), খুঁটি, খেজুর গাছের পাতা দিয়ে এক কক্ষের ঘর তোলা হয়। কলাগাছের পাতা দিয়ে ঘরের চারপাশের বেড়া দেয়া হয়। নূর নাহার নামের এক শিক্ষিকাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি চাল তুলে তার বেতন পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে ‘স্যাপ বাংলাদেশ’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ওই স্কুলে বয়স্ক শিক্ষা শুরু করে। তখন আমি সংস্থার লোকদের বলি- ‘আমাদের বয়স নেই। পড়ালেখা করে কি করব। চাকরি-বাকরি করতে পারব না। তারচেয়ে আমাগো পোলাপানের লেহাপড়ার জন্য এই স্কুলে একটি টিনশেড ঘর করে দেন। এরপর তারা আমার কথা শুনে প্রথম ৩ হাজার এবং পরে ১০ হাজার টাকা দেয়। হেই টাকা দিয়া চৌচালা টিনশেড ঘর করি। আরও একজন মাস্টার হজলে আলী খাকে রাহি। হেরে গ্রামেগোনে মুষ্টি চাউল উডাইয়া বেতন দিই।’

একপর্যায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে যায়। তখন টিনশেড ঘরে সংকুলন হচ্ছিল না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির গ্রামে আসেন। সালেহার নেতৃত্বে একদল নারী সেখানে ছুটে যান। স্কুলের জন্য একটি টিনশেড ঘর দাবি করেন। সে অনুযায়ী একতলা একটি টিনের ঘর তুলে দেন। এভাবেই ২০১২ সালে বিদ্যালয়টি রেজিস্টারভুক্ত হয়। ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। ২০১৫ সালে ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবন তৈরির কাজ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান এইড ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় অ্যাকশন এইড ওই ভবন নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করে।

মধ্য চরমোন্তাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম বলেন, এই ইউনিয়নের ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছেলেমেয়েরা এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। একতলা এই ভবনের ৪টি কক্ষে ২৪৮ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করান সম্ভব হচ্ছে না। এই বিদ্যালয়ে একটি ভবন দরকার।

এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম সগির বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের উদ্যোগে ২০১৬ সালে সালেহা বেগমকে সংবর্ধিত করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×