একাত্তরের দুই বীর কন্যা

পাকিস্তানি সেনারা অনেক মেয়েকে নির্যাতন করছে : রিজিয়া বেগম

  শিল্পী নাগ ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানি সেনারা অনেক মেয়েকে নির্যাতন করছে
সন্ধ্যা রাণী ঘোষ ও রিজিয়া বেগম। ছবি: রকিবুল আলম খান

একাত্তরে অনেক নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে, অনেক মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি জাতীয় পতাকা পেয়েছি। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেলাম সেসব বীর নারীদের সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।

রিজিয়া বেগম এবং সন্ধ্যা রাণীর মতো বীর কন্যারা আজও মানুষের নানা কটূক্তি, প্রশ্নবানে বিদ্ধ হন। সেই বীর কন্যারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। লিখেছেন-

বঙ্গবন্ধু আমার আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মানুষের নানা গঞ্জনা সহ্য করেও বাঁইচ্যা আছি। জীবনে যত কষ্টই আসুক আমি আদর্শচ্যুত হব না। এভাবেই বললেন ‘চেষ্টা’ কর্তৃক বীর কন্যা সংবর্ধনাপ্রাপ্ত রিজিয়া বেগম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে রিজিয়া। অভাবের সংসার। অন্যের বাড়িতে গৃহস্থি, মাটি কাটার কাজ করে তার স্বামী যা পেতেন তাতে নুন আনতে পানতা ফুরোত। কোনো কোনো দিন আধপেটা খেয়েই দিন পার করতেন। দুই ছেলে মারা গেছে। ১৯৭০ সাল। দেশে নির্বাচনের জোয়ার বইছে।

অভাবের কারণে কাজের সন্ধানে তার স্বামী আবু মিয়া সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় এলেন। সঙ্গে এলেন স্ত্রী রিজিয়াও। তেজগাঁয়ের তেজতুরী বাজারে মাসে এক আনায় একটি টালির ঘর ভাড়া নেন।

রাজমিস্ত্রির জোগালির (সহকারী) কাজ নেন। যা রোজগার হয় তা দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে কোনোরকমে দিন চলে যায়। একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা রাতের অন্ধকারে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাসার আশপাশের টিউবয়েল ভেঙে ফেলে। রান্না, খাওয়ার পানি নেই।

পাকিস্তানি সেনারা মেয়েদের, যুবকদের দেখামাত্র ধরে নিয়ে যায়। স্বামীর কাজ নেই। খাবার কোথা থেকে আনবেন। ড্রেনের পানি, হোটেল থেকে ভাতের মার (ফেন) এনে স্বামী-স্ত্রী কোনোরকমে দিন পার করেন। নভেম্বর মাসে তাদের বাসার পাশে তেজগাঁও এতিমখানার তিনতলা ভবনে পাকিস্তানি সেনারা হেলিকপ্টার থেকে বোম ফেলে।

মুহূর্তে ভবনের জায়গাটা পুকুরে পরিণত হয়ে যায়। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তার স্বামী ঘর থেকে বের হন কাজের সন্ধানে। তিন দিন হয়ে যায় আর ঘরে ফেরেন না। রিজিয়া বেগম স্বামীর খোঁজ না পেয়ে পাগল প্রায় হয়ে ওঠেন।

এ প্রসঙ্গে রিজিয়া বেগম বলেন, তিন দিন ধরে স্বামীর খোঁজ নাই। আশপাশের মানুষও কিছু বলতে পারেন না। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আত্মীয়-স্বজন কেউ নাই।

কে আমার সোয়ামিরে খুঁইজ্যা আনব। সোয়ামির খোঁজে পাগলের মতো হাঁটতে হাঁটতে বাংলামটর চইল্যা আসি। বাংলামটরের পশ্চিম দিকে জঙ্গলের কাছে দেখি পাকিস্তানি সেনারা ২০ থেকে ২৫ জন মেয়েকে নির্যাতন করছে। ওখান দিয়া যাইতেই একজন বাঙালি পুরুষ পাকিস্তানি সেনাদের আমাকে দেখিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সেনারা আমার দিকে আসতেই আমি ভয়ে কাঁপতে থাকি। এরপরও দ্রুত হাঁটা দিই। পাকিস্তানি সেনারা উর্দুতে আমাকে দাঁড়াইতে বলে। আমি ওদের কথা বুঝতে পারি না।

কিভাবে ওদের হাত থেকে বাঁচব সেটাও মাথায় কাজ করে না। চার-পাঁচজন পাকিস্তানি সেনা আমাকে ধরে ফেলে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। অজ্ঞান অবস্থায় ওরা আমার ওপর নির্যাতন চালায়।

তিন দিন পর ওরা আমাকে সোনারগাঁ হোটেলের সামনে জঙ্গলে কাদা পানিতে ফেলে দিয়ে যায়। অজ্ঞান অবস্থায় ১৬ ডিসেম্বর একজন বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা আমাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে দিয়ে আসে। সেখানে ডাক্তার চিকিৎসা করার পর আমার জ্ঞান ফিরে। একটু সুস্থ হলে একজন লোক আমাকে নঙ্গরখানায় নিয়ে আসে।

পরে জানতে পারি পাকিস্তানি সেনারা আমার সোয়ামিরেও ধইর‌্যা নিয়া গেছিল। একজন পরিচিত লোক আমার স্বামীরে উদ্ধার করেন। সোয়ামি আমারে ঘরে না পাইয়া দেশে চইল্যা যান।

মাস দুয়েক পর ঢাকায় ফির‌্যা আইস্যা লঙ্গরখানায় আমারে খুঁইজ্যা পায়। সোয়ামি আমারে শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি নিয়া যায়। বাবা-মা ছোটবেলায় মারা গেছেন। চাচারা আমার বিয়া দিছে। তারা আমারে জায়গা দেয় না। কিন্তু সোয়ামি বলছেন, ‘আমি বিয়া করছি, ওকে ছাড়ব না।’ কয়েকবছর আগে সোয়ামি মারা গেছেন। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই বেশি দিন হয় না। পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের কারণে আজও আমি অসুস্থ।

জঙ্গল থেকে আমাকে উদ্ধার করেন : সন্ধ্যা রাণী ঘোষ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সিলেটের হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে দুই মাসের গর্ভবতী সন্ধ্যা রাণী ঘোষ স্বামী হরি ঘোষের সঙ্গে হবিগঞ্জের আদাউর বাপের বাড়ি আসেন। স্বামী আশুগঞ্জে মিষ্টির দোকানে চাকরি করেন। বাপের বাড়িতে মা আর বড় ভাই ছাড়া কেউ নেই।

ওদিকে খবর পেলেন পাকিস্তানি সেনারা তার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে ঢুকে অনেক মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের সঙ্গে আমার দেবরকেও হত্যা করেছে। পাকিস্তানি সেনাদের আসার খবর শুনে মা-মেয়ে জঙ্গলে লুকায়। স্বামী, ভাই কোথায় রয়েছে জানেন না। মাস দুয়েক ধরে এরকমই চলছে। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে চুলায় হাঁড়ি বসে না। না খেয়েই দিন যাচ্ছে।

মে মাসের দিকে মা সন্ধ্যা রাণীকে বললেন, ‘আজ কয়টা ভাত রান্না কর।’ মায়ের কথামতো সন্ধ্যা হাঁড়িতে চাল ধুয়ে চুলায় বসান। এমনসময় গ্রামের লোকেরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেন। পাকিস্তানি সেনারা আদাউর গ্রামে আসছে।

এ প্রসঙ্গে ‘চেষ্টা’ কর্তৃক বীরকন্যা সংবর্ধনাপ্রাপ্ত সন্ধ্যা রাণী ঘোষ বলেন, গাট্টি বোচকা নিয়ে লোকজন দৌড়াছে। মা মাঝ ঘরে দাঁড়াইয়াছিল। আমি রান্নাঘরে চুলায় ভাতের হাঁড়ি বসাইছি।

এমনসময় চার-পাঁচজন পাকিস্তানি সেনা আমাদের বাড়িতে ঢুকে। পালানোর সময় পেলাম না। পাকিস্তানি সেনারা আমাকে ধরতে এলে মা দৌড়াইয়া আসে। পাকিস্তানি সেনারা মাকে রাইফেলের বাট দিয়া আঘাত করে। মা মাটিতে পড়ে যান। ওরা আমাকে ধরে হাইস্কুলের সামনে জঙ্গলে নিয়ে যায়। ভয়ে জ্ঞান হারাই।

অজ্ঞান অবস্থায় পাকিস্তানি সেনারা আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ওখানেই পড়েছিলাম। উত্তর গ্রামের একজন বৃদ্ধ শহিদ মিয়া জঙ্গল থেকে আমাকে উদ্ধার করে তার বাড়িতে নিয়ে যান। তিনি ডাক্তার দিয়ে আমাকে চিকিৎসা করান। তার পরিবারের লোকেরা আমার সেবা শুশ্রূষা করেন। জানতে পারলাম, আমার গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হল। তারা খবর নিয়ে জানালেন, বাড়িতে মা, স্বামী, ভাই কেউ নেই। তারা ভারতে চলে গেছেন। ভেবেছেন আমি মারা গেছি।

আমি ভাবছি তারা মারা গেছেন। তাদের খোঁজ না পেয়ে আমি পাগলের মতো হয়ে যাই। ওখান থেকে মানুষের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসি। একটা বস্তিতে থাকি। বাসা বাড়িতে কাজ করি। বছর দুয়েক রাস্তায় কাগজ টুকাই। খাবার জোগাড় করতে পারলে খাই, নইলে অনাহারে থাকি। পুরনো ঢাকায় কাকাতো বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করি।

এরিমধ্যে ব্র্যাক সেন্টারে ধাত্রীর চাকরি পাই। আমার খোঁজে স্বামী ওই বোনের বাড়িতে যায়। বোনের মাধ্যমে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ হল। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে কাজ করে সংসার চালাই। ’৭৫ সালে ছেলে হয়। আমাদের সংসারে দুই ছেলে চার মেয়ে। গ্রামে আর ফিরতে পারিনি সম্ভ্রম হারানোর কারণে। জমি বিক্রি করে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। স্বামী অসুস্থ।

নাখালপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকি। বছর দুয়েক ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাই। একটু সরকারি সহযোগিতা পেলে একটা দোকান দিয়ে চলতে পারতাম।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×