স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে নারী পোশাক কর্মীরা পাচ্ছেন স্বাস্থ্যসেবা

পোশাক শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নারী পোশাক কর্মীদের সুস্বাস্থ্য। তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে। আর অসুস্থতার কারণে বাড়বে অনুপস্থিতির হার। এর ফলে গার্মেন্ট সেক্টর অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা হচ্ছে। লিখেছেন -

  রীতা ভৌমিক ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সপ্তাহখানেক ধরেই পেটব্যথায় ভুগছেন মুনিমা। ওদিকে আবার জরায়ুর মুখে দানার মতো অনুভব করছেন। প্রায় রাতেই জ্বর হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না তার। পেটব্যথা নিয়েই কাজ করছেন মিলেনিয়াম টেক্সটাইলস (সাউদার্ন) লিমিটেডের সেলাই অপারেটর মুনিমা। এ মাসের প্রথম রোববার, হঠাৎ করেই পেটব্যথার মাত্রা বেড়ে যায়। শেষমেশ খাবারের ব্রেকে পোশাক কারখানার মেডিকেল অফিসারকে দেখান। কিন্তু সেদিন তার নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্যে যাওয়ার অনুমতি মিলল না। তিনি চিকিৎসক দেখানোর অনুমতি পেলেন বৃহস্পতিবার।

এ প্রসঙ্গে মুনিমা (আসল নাম নয়) বললেন, গত বছর স্বাস্থ্যবীমা কার্ড করেছি। আমরা পোশাককর্মীরা স্বাস্থ্যবীমা কার্ড নিয়ে আশুলিয়ার জামগরা নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলে কাস্টমার কেয়ারের কর্মরত ব্যক্তি এবং নার্সরা আমাদের অবজ্ঞার চোখে দেখেন। কিন্তু গাইনি চিকিৎসক আমার সমস্যাগুলো খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে শোনেন। চেকআপ করে আমার প্রস্রাব পরীক্ষা এবং ওষুধের নাম লিখে দেন। চিকিৎসায় কোনো টাকা লাগেনি। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি।

লাইজু বেগম মিলেনিয়াম টেক্সটালইস (সাউদার্ন) লিমিটেডে সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলের বয়স আট বছর। পোশাক কারখানায় কাজ করায় ঠিকমতো ছেলের যত্ন নিতে পারেন না। তাই গ্রামে মায়ের কাছে ছেলেকে রেখেছেন। মাস ছয়েক আগে দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হন তিনি। চার মাস পেরিয়ে যায়। স্বাস্থ্যবীমা কার্ড থাকলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি তিনি। কয়েকদিন ধরেই খাওয়ায় অরুচি হচ্ছিল তার। এদিকে গর্ভবতীকে পোশাক কারখানায় মেডিকেল রিপোর্ট জমা দিতে হয়। চিকিৎসক না দেখানোয় সেটিও দেয়া হয়নি তার। অসুস্থবোধ হওয়ায় পোশাক কারখানার মেডিকেল অফিসারকে দেখান। মেডিকেল অফিসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে পাঠান। আলট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে তার সন্তান কয়েকদিন আগেই গর্ভে মারা গেছে। নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হন তিনি। দশ দিন সেখানে চিকিৎসাসেবা নিলেও মৃত সন্তান প্রসব করাতে ব্যর্থ হন চিকিৎসকরা।

কিছুটা অভিযোগের সুরে লাইজু বেগম বলেন, আলট্রাসনোগ্রাফিতে কোনো টাকা লাগেনি ঠিকই, চিকিৎসার কিছুই হয়তো আমরা বুঝি না। তবে দশ দিন কম সময় নয়। ওরা আমার জরায়ুর মুখে পাইপ ঢুকিয়ে রাখে। আমার শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। আমার স্বামী জোরপূর্বক আমাকে সাভারের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করায়। সেখানে চিকিৎসার আধঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মৃত সন্তান প্রসব করি। স্বাস্থ্যবীমা কার্ড থাকায় নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ছাড়পত্র বাবদ দু’হাজার টাকা দিই। পোশাককর্মী হওয়ায় চিকিৎসাসেবায় আমরা এভাবেই অবহেলার শিকার হই।

এ বিষয়ে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক অপারেশন রফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি অবগত নন। সাধারণ হাসপাতালগুলোর মতোই স্বাস্থ্যবীমার আওতায় চারটি পোশাক কারখানার কর্মীদের সেবা দেয়া হয়। মিলেনিয়াম টেক্সটাইলস (সাউদার্ন) লিমিটেড এবং ফ্যাশন হাউজ (সাউদার্ন) লিমিটেড এই দুটো পোশাক কারখানার কর্মীরা এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে বেশি আসেন। অন্য দুটি পোশাক কারখানার কর্মীরা চিকিৎসাসেবা নিতে কম আসেন। প্রতিদিন শিফট অনুযায়ী কাস্টমার কেয়ারে ২৪ এবং ৭০ জন সেবিকা রোগীদের সেবা প্রদান করেন। পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিষদের সঙ্গে প্রতি মাসে একবার সভা হয়। এ সভায় জানতে চাওয়া হয়, আমাদের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ রয়েছে কিনা। কিন্তু কখনও এমন মন্তব্য শোনা যায়নি।

মিলেনিয়াম টেক্সটাইলস (সাউদার্ন) লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার বাসু দেবের মতে, কোনো পোশাককর্মী অসুস্থ হলে মেডিকেল অফিসার যদি মনে করেন তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে দ্রুতই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। মিলেনিয়াম টেক্সটাইলস (সাউদার্ন) লিমিটেড এবং ফ্যাশন হাউজ (সাউদার্ন) লিমিটেড এই দুটো পোশাক কারখানার ১ হাজার ৮৪১ জন কর্মীর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় এসেছেন। যে পোশাককর্মী স্বাস্থ্যবীমার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হননি তারা অসুস্থ হলেও একইভাবে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

এসএনভি’র ইনক্লোসিভ বিজনেস অ্যাডভাইজার মো. জামাল উদ্দিনের মতে, পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসএনভি নেদারল্যান্ডস ২০১৫ সালে ক্ষুদ্র স্বাস্থ্যবীমা (পাইলট স্কিম) হাতে নিয়েছে। এর আওতায় টঙ্গীর তিনটি পোশাক কারখানার হাজারতিনেক পোশাককর্মীকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন বারোটি পোশাক কারখানার ৪০ হাজার পোশাককর্মীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা হয়েছে। শতকরা ৮০ ভাগ নারী পোশাককর্মী স্বাস্থ্যবীমার আওতায় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। গার্মেন্ট সেক্টরে স্টেক হোল্ডারদের পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্যবীমার সুফলতা সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। এও বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবীমার আওতায় পোশাককর্মীরা এলে তারা কী কী সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। স্বাস্থ্যবীমার মডেল উন্নয়ন করায় পোশাক কারখানার মালিকরাও একে ভালো উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যে পোশাক কারখানার কর্মীরা স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসেননি সেসব পোশাক কারখানার কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মীদেরও স্বাস্থ্যবীমার আওতায় অন্তর্ভুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করছেন। পোশাক কারখানা ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পোশাককর্মীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা, সেবা নেয়ার আগ্রহ এবং কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতির হার বেড়েছে। যার ফলে সামগ্রিক গার্মেন্ট সেক্টরে উন্নয়নের ধারা বহমান। এসএনভি পোশাককর্মীদের স্বাস্থোন্নয়নে ‘এডাকশন প্ল্যান’ নামে তিন বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে পোশাক কারখানার মালিক এবং কর্মী উভয়ই স্বাস্থ্যবীমার প্রিমিয়ার শেয়ার করছে। এসএনভি গবেষণার মাধ্যমে পোশাক কারখানার মালিক এবং কর্মী উভয়ের সুফলতার দিকগুলো তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের দিকটিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×