দেশসেরা কৃষক অঞ্জু সরকার

যশোর জেলার কেশবপুর থানার মূলগ্রামের অঞ্জু সরকার পেয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড। নারী ক্যাটাগরিতে তিনি বছরের সেরা কৃষক । তাকে নিয়ে লিখেছেন রীতা ভৌমিক

  যুগান্তর ডেস্ক    ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো পুরস্কারই আনন্দের। কাজের স্বীকৃতি পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। কঠোর পরিশ্রম আর নিজের চেষ্টায় আমি ভাগ্য বদলেছি। বড় ছেলে রূপচাঁদ সরকারকে দেশের বাইরে থেকে ফুলের ডিজাইনের উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে এনেছি। ব্যবসা দেখার পাশাপাশি ও এমএ পড়ছে। ছোট ছেলে রত্নাকর সরকার বিদেশে থাকে। স্বামীও কাজ করেন- এভাবেই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করলেন অঞ্জু সরকার।

মাগুরা জেলার দিঘলকান্দি গ্রামের মেয়ে অঞ্জু সরকার ছেলেবেলায় মাকে হারান। বাবা আর বিয়ে করেননি। বড় বোন ছোট দুই বোন, দুই ভাইকে আগলে রাখেন। বাবার কৃষি কাজের আয় দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলত। অভাবের সংসারে বাবা ১৬ বছর বয়সে অঞ্জুকে বিয়ে দেয় যশোর জেলার কেশবপুর থানার মূলগ্রামে। ওর স্বামীর নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করতেন। তাও নিয়মিত না। ২৮ বছর আগে শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি দেখেন দুবেলা ভাতই জোটে না তাদের। শ্বশুর-শাশুড়ি স্বামী, দেবর-ননদ একসঙ্গে থাকতেন। ভাশুর, জা, তাদের চার বাচ্চা নিয়ে আলাদা থাকতেন। শ্বশুর বিল থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতেন। যেদিন মাছ ধরতেন সেদিন খাবার জুটত। যেদিন মাছ পেতেন না সেদিন আধপেটা খেয়ে থাকতে হতো সবাইকে। দুপুরে খাবার খেলে রাতে খাবার জুটত না। নতুন বিয়ে হয়ে আসা অঞ্জুর এভাবেই তিনমাস কেটে যায়। বুড়ো শ্বশুরের ওপর এতগুলো মানুষের দায়িত্ব তার খুবই খারাপ লাগে। তাই তার স্বামীকে জানান, তিনিও মাঠের কাজে যাবেন। দু’জনে মিলে ধান কাটা, সবজি ক্ষেতে সবজি তোলার কাজ করবেন।

এ প্রসঙ্গে অঞ্জু সরকার বলেন, কাজ অনুযায়ী ১৫ থেকে ২০ টাকা অথবা এক কেজি চাল পেতাম। এই দিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ নিয়ে খেতাম। বাচ্চা পেটে এলো। কাজ করতে কষ্ট হতো। তাও কাজ করতাম। এরিমধ্যে দুই ছেলে হল। মাঠে বস্তা বিছিয়ে ছেলেদের শুইয়ে অথবা বসিয়ে কাজ করতাম। সংসার বড় হওয়ায় অভাব যেন জেঁকে বসে। মেজ বোন ভারত থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে আমার সংসারে অভাব দেখে বললেন, ‘সারাদিন কাজ করেও ছেলেপুলেকে পেট পুরে খাওয়াতে পারিস না। আমার ওখানে চলে আয়। ওখানে একদিন কাজ করলে দু-তিনদিন খাওয়া যায়।’ বোনের পরামর্শে ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে কলারোয়া দিয়ে ভারতে যাই। ভারতে দিদির বাড়ির পাশে ফুলবাগানে কাজ নিই। মালিক নারী। সেখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কম। আমার মাথায় এলো কাজ শিখতে হবে। সেখানে পরিচয় হল ঝিকরগাছার গদখালির এক ফুল চাষীর সঙ্গে। তিনি ওখান থেকে গাঁদা ফুলের চারা এনে দেশে বিক্রি করেন। তার সঙ্গে কথা হল। তাকে বললাম, দেশেই ফুল গাছের চারা তৈরি করে দিলে তিনি বিক্রি করে দিতে পারবেন কিনা? তিনি সাদরে রাজি হলেন এবং জানালেন, এতে তাকে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে চারা নিতে ভারতে আসতে হবে না। তার আশ্বাসে সিদ্ধান্ত নিই, ভারত থেকে গাঁদা ফুলের চারা নিয়ে যদি বাংলাদেশে চাষ করা হয় তাহলে আমি কেন পারব না! আমার মতো দেশের দরিদ্র নারীদের এই কাজে যুক্ত করলে ওরাও পারবে। সেখানে গাঁদা ফুলের চারা তৈরি শিখে কিছু বীজ নিয়ে দেশে ফিরে এলাম। নিজের জায়গা নেই। অন্যের জমি চেয়ে নিলাম। কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে জমি তৈরি করে বীজ লাগালাম। চারা তৈরি হলে ঝিকরগাছার গদখালিতে গিয়ে ওই লোকের সঙ্গে দেখা করি। তাকে চারাগুলো দেখিয়ে বললাম, দেখেন তো চারাগুলো হয়েছে কিনা? তিনি গাঁদা ফুলের চারা দেখে খুশি হলেন। শুধু পরামর্শ দিলেন, যাতে আমি কাউকে না জানাই গাঁদা ফুলের চারা বাংলাদেশের। এটা আমি তৈরি করছি। এটা জানলে লোকে চারা কিনবে না। বিক্রির স্বার্থে আমি বিষয়টি গোপন রাখি। তিনি সঠিক মূল্য দিয়ে চারা কিনে নেন।

এখানেই থেমে থাকেননি অঞ্জু সরকার। ব্যবসা বড় করতে তিনি গদখালি থেকে সামান্য গাঁদা ফুল কিনে রাস্তায়, গাড়িতে গাড়িতে বিক্রি করতেন। এই আয় থেকে সঞ্চয় করেন। এরপর ঢাকা আহসানিয়া মিশন থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এবং সঞ্চিত টাকা মিলিয়ে পাঁচ কাঠা জমি বন্ধক নেন। সেই জমিতে নিজে গাঁদা ফুলের চাষ শুরু করেন। গ্রামের মেয়েরা তার জমিতে কাজ করতেন। যে যেরকম কাজ করতেন তিনি সেরকম মজুরি পেতেন। গাছে ফুলে ছেয়ে যায়। ফুল বিক্রির জন্য তিনি বিভিন্ন উপায় বের করেন। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে তাদের বাড়ি ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিনিময়ে তাদের বলেন, ইচ্ছে হলে তারা টাকা দিবেন, নইলে খাইয়ে দিবেন। শুধু বিয়েবাড়িই নয়, অফিস, দোকানে হালখাতা হলে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিতেন। ধীরে ধীরে ফুল বিক্রির বাজার বাড়তে থাকে। ফুলের পসার বাড়ায় কেশবপুর বাজারে শুভেচ্ছা ফুলঘর নামে একটি দোকান দেন। চার বিঘা জমি কিনে ফুল চাষ করেন। এখন তার তত্ত্বাবধানে ৮০ জন লোক কাজ করছেন। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর জেলায় ছয়টি ফুলের দোকান দিয়েছেন। এলাকার যুবকরা তার দোকানে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কাজ করেন। একটা বাস, পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেট কার কিনেছেন। পিকআপ ভ্যান আর প্রাইভেট কার ফুল বিক্রির কাজে ব্যবহৃত হয়।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে থানা পর্যায়ে পেয়েছেন জয়িতা পুরস্কার। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছেন কৃষি পুরস্কার। একই বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর থেকে পেয়েছেন দু’লাখ টাকা পুরস্কার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter