রত্নগর্ভা আমেনা খাতুনের গল্প

  আমিনুল মহিম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমেনা খাতুন। তার জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৫ মার্চ তিতাস নদী বিধৌত পশ্চাৎপদ এক জনপদে। ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার পাড়াতুলী গ্রামে। সেখানে ছিল না কোনো আধুনিক জীবনের ছোঁয়া। হেঁটে পথচলা কিংবা নৌকাই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। রক্ষণশীল সমাজে বেড়ে ওঠা এই নারী কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তবে শিক্ষার প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ ছিল রত্নগর্ভা এই মায়ের। অক্ষর জ্ঞানশূন্য এই নারী সেখান থেকেই আপন আলোয় প্রজ্বলিত করেছেন পরিবার সমাজ তথা রাষ্ট্রকে। নিজ সন্তানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়েছেন অনন্য নজির।

সময়টা ১৯৫২ সাল। তখনও কৈশোর কাটেনি আমেনা খাতুনের। বাবা-মা ওই বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দেন। তার স্বামী ছিলেন তখনকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ের কাজে সময় দিতে হয় তাকে। তাই সন্তানদের গড়ে তোলার পুরো দায়িত্ব আমেনা খাতুন নিজের কাঁধে তুলে নেন। অনেক যত্নে প্রত্যেক সন্তানকেই তিনি সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলেন।

এ প্রসঙ্গে আমেনা খাতুন বলেন, আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও আপন আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করেছি পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়েকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তাদের একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। øেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসার পাশাপাশি শাসনও করেছি। যাতে তারা পথ বিভ্রান্ত না হয়। আজ আমার সেই চেষ্টা সার্থক হয়েছে। আমার চার ছেলে দেশের শীর্ষস্থানীয় চার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে।

আমেনা খাতুনের বড় ছেলে অধ্যাপক ড. মো. ইদ্রিস মিঞা ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স করেন। তারপর যুক্তরাজ্যের স্টারলিং ইউনিভার্সিটি থেকে ফিশারিজে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা, জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস থেকে কমনওয়েলথ পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। দ্বিতীয় ছেলে অধ্যাপক ড. মো. ইউনুছ মিঞা। তিনিও ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ইন কৃষি রসায়ন এবং পিএইচডি করেন। তাইওয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো করেন। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক হিসেবে কমর্রত রয়েছেন। তৃতীয় ছেলে মো. ইয়াকুব মিঞা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম এবং জাপানের টোকিও ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল থেকে জাপানি ভাষায় ডিপ্লোমা কোর্স করেন। তিনি বর্তমানে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। চতুর্থ ছেলে অধ্যাপক ড. মো. ইউসুফ মিঞা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়ন বিষয়ে বিএসসি অনার্স, জাপানের কেইও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়ন বিষয়ে মাস্টার্স এবং সিরামিক্স প্রযুক্তিবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। জাপানের কিউটু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো, কানাডা এবং ফ্রান্স থেকে আরও দুটি পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো করেন। বর্তমানে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কমর্রত আছেন। পঞ্চম ছেলে অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরেস্টি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগ থেকে স্নাতক, জাপানের ইউকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলোজি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স এবং এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কমর্রত আছেন। তার চার মেয়ের মধ্যে সামছুন নাহার, রহিমা আক্তার, ফাতেমা বেগম এবং শেফালী আক্তারকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।

এভাবেই আমেনা খাতুন তার সন্তানদের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন। তার দ্যুতি ছড়িয়েছেন বিশ্বব্যাপী। সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তোলা এবং তাদের সাফল্য দেখাও একজন মায়ের স্বপ্ন। সন্তানের সাফল্য মায়ের জন্যও সম্মাননা বয়ে আনতে পারে, তার উদাহরণ এই রত্নগর্ভা মা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter