শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়কারী একজন অন্তরা আহমেদ

  রীতা ভৌমিক ২০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র আড়াই বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হন অন্তরা আহমেদ। ছোটবেলায় শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হলেও মনোবল হারাননি তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধীকতাকে জয় করে তিনি পৌঁছেছেন তার লক্ষ্যে। যোগ্যতার সঙ্গে ঊনত্রিশ বছর কাজ করেছেন এবি ব্যাংকে। ১৯৯০ সালে চাকরির সুবাদে রাজশাহী থেকে ঢাকায় স্থায়ী হন তিনি। এইচ আর বিভাগে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বিভিন্ন বিভাগে বদলি হন তিনি। প্রত্যেক বিভাগেই যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন অন্তরা আহমেদ।

পত্রিকায় এবি ব্যাংকের চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। লিখিত পরীক্ষায় নির্বাচিত হলে মৌখিক পরীক্ষার ডাক পড়ে তার। ক্রাচে ভর করে ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করলে তাকে দেখে সবাই অবাক হয়ে যান। মৌখিক পরীক্ষায় তাকে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের বদলে শারীরিক সমস্যা নিয়েই প্রশ্ন করা হয় বেশি। ভাইভা বোর্ডের পরীক্ষকদের সবার উত্তরই তিনি শান্তভাবে বিনয়ের সঙ্গে দেন।

এ প্রসঙ্গে অন্তরা আহমেদ বলেন, অনেকদিন হয়ে যায়, চাকরিতে যোগদানের কোনো পত্র পাই না। মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। বোর্ড মির্টিংয়ে ডাকা হল আমাকে। এবার ব্যাংকের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি পারবে?’ আমিও যুতসই উত্তর দিলাম, ‘আমি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করেছি। নিজের পায়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না। কিন্তু কাজ করতে পারি। এই চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে আরেকজনের কথা না বললেই নয়। তিনি ব্যরিস্টার রফিক উল হক। আমার দুলাভাইয়ের বন্ধু। ব্যারিস্টার রফিক উল হক ছিলেন সেসময়ে এবি ব্যাংকের একজন আইনজীবী। তারই সহযোগিতায় অবশেষে এবি ব্যাংকে চাকরি সুযোগ হল।

বাবা আবু মোহাম্মদ আনসার আলীর চাকরির সূত্রে সিরাজগঞ্জের মেয়ে অন্তরা আহমেদ বেড়ে ওঠেন রাজশাহীতে। আড়াই বছর বয়সে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবা-মা, ভাইবোনদের সঙ্গে সিরাজগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেবার সেখানে প্রচণ্ড বন্যা হয়। অন্তরার জ্বর আসে। কিছুতেই জ্বর কমছে না। মা বেগম ডালিয়া খাতুন খেয়াল করলেন, যে মেয়েটি সারা ঘরময় ছুটে বেড়ায়। সে দাঁড়াতে পারছে না। মা অনেক চেষ্টা করেও যখন অন্তরাকে দাঁড় করাতে পারলেন না তখনই গ্রামের চিকিৎসকের ওপর নির্ভর না করে রাজশাহীতে নিয়ে এলেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখলেন অন্তরা পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হল। ঢাকার চিকিৎসকরাও জানালেন, অন্তরা পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছে। আমেরিকান ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. গাস্ট ১৯৭৫ সালে দেশে এলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য। তিনি অন্তরার পায়ে কয়েকবার অস্ত্রোপচার করেন। ডা. গাস্টের চিকিৎসাসেবা এবং মায়ের অক্লান্ত পরিচর্যা, পরিবারের সবার সহযোগিতায় অন্তরা দুই ক্র্যাচে ভর করে দাঁড়াতে পারেন।

স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে না পারলেও লেখাপড়া থেমে যায়নি অন্তরার। মায়ের কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি তার। এ প্রসঙ্গে অন্তরা আহমেদ বলেন, বাড়িতে মায়ের কাছে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করি। ডা. গাস্টের চিকিৎসায় ক্রাচে ভর করে হাঁটতে পারায় ১৯৭৫ সালে রাজশাহী সরকারি পি-এন হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। প্রধান শিক্ষক বেগম রাহেলা খাতুন ছিলেন অমায়িক একজন মানুষ। প্রথম দিনই তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে আমাকে সুন্দরভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্লাসে সহকর্মীদের সঙ্গে আমার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমার জীবনে তাদের অবদান অনেক। এই স্কুল থেকে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে এসএসসি পাস করি। রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮১ সালে এইচএসসি এবং ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে স্নাতক ও ১৯৮৫ সালে স্নাতকোত্তর করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্রাচে ভর করে রেলিং ধরে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতাম। বন্ধুদের কেউ একজন ব্যাগ, একজন একটা ক্রাচ নিতেন। বন্ধুদের সহযোগিতায় এভাবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করি।

চাকরির যোগদানপত্র হাতে পেলেন অন্তরা। ১৯৯০ সালে এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় মতিঝিলে এইচ আর বিভাগে জুনিয়র এসিস্টেন্ট হিসেবে যোগদান করলেন। ভাইবোনরা ঢাকায় থাকেন। প্রথম দিন বড় দুলাভাই তাকে অফিসে পৌঁছে দিলেন। তিন মাস বড় বোনের বাসা থেকে অফিস করলেন। এরপর বেইলি রোডের মহিলা হোস্টেলে উঠলেন। তিন বছর পর ঢাকার ফার্মগেটে একটি ফ্ল্যাট কিনে মাকে নিয়ে উঠলেন। কাজের সুবিধার্থে অফিসের ভেতর চলাচলের জন্য পরবর্তীতে হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন।

দীর্ঘক্ষণ একটানা কাজ করতে হতো অন্তরাকে। সহকর্মীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া সম্পর্কে অন্তরা বলেন, প্রথম এবং শেষ এমডি এ কে এম গাফফার এবং এমডি তারিক আফজাল। এই দু’জন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে খুবই আন্তরিক ব্যবহার পেয়েছি। তাদের সহযোগিতায় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিশ্রমকেও পরিশ্রম মনে হয়নি। সহকর্মীদের কাছ থেকে কাজ শিখেছি। সবার সহযোগিতায়, সুন্দর ব্যবহারে আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে পেরেছি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আমার কাজে কখনও বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। এবি ব্যাংক আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। আমার ভেতর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। আমিও অন্য স্বাভাবিক মানুষদের মতো সমান তালে কাজ করতে পারি। আমার জীবনের সেরাটা দিতে পারি। আমিও অন্যদের চেয়ে কর্মদক্ষতায়, যোগ্যতায় পিছিয়ে নেই। সহকর্মীদের সঙ্গে ছুটিতে দলবেঁধে অনেক দেশে বেড়াতে গেছি। ওরাও আমাকে কখনও একজন প্রতিবন্ধী হিসেবে দেখেনি। ওদের সুযোগ্য সহকর্মী হিসেবেই দেখেছেন। ভালো বেসেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন। একটি পরিবারের মতো সবাই মিলেমিশে ছিলাম এতগুলো বছর।

দীর্ঘ ঊনত্রিশ বছরের কর্মজীবনে সিনিয়র এসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবসর নেন অন্তরা আহমেদ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×