সংগ্রামী এক নারীর নাম ফাতেমা

  এটিএম সামসুজ্জোহা ২০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুতা আর ঝুট কাপড় দিয়ে টেবিল ম্যাটস, ফ্লোর ম্যাটস তৈরি করছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাদিহাট জোতপাড়া গ্রামের ফাতেমা বেগম। সংগ্রামী ও আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী টেবিল ম্যাটস, ফ্লোর ম্যাটস ও পাপোশ তৈরি করে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, স্বাবলম্বী করেছেন অন্যদেরও। অতি সাধারণ হয়েও এখন তিনি অসাধারণ। তার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এলাকার তিনশ’ পরিবার। নতুন করে গড়ে উঠেছে আরও ২০টি তাঁত শিল্প। সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার পথের বাঁকে থাকে ছোট ছোট অনেক গল্প। যে গল্প বিশ্বাসের, যে গল্প পরিশ্রমের, যে গল্প ধৈর্য্য ধারণের, যে গল্প সাহসিকতার। অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা ফাতেমার জীবনের গল্প গ্রামবাংলার আর পাঁচটি নারীর মতোই। ছোটবেলা থেকে অভাবের মধ্যে বড় হওয়া। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি বড়। অভাবের সংসার, মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সেই বাবা-মা তার বিয়ে দেন। এক অভাবের সংসার থেকে আরেক অভাবের সংসারে গিয়ে পড়েন তিনি। বিয়ের দুই বছরের মাথায় সন্তানের মা হন ফাতেমা। এরপর কোলজুড়ে আসে আরও দুই সন্তান। সংসারের সদস্য বেড়েছে কিন্তু রোজগার বাড়েনি। অভাব যেন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। ঠাকুরগাঁয়ে কাজ নেই। তার স্বামী মো. বাবুল হক সিদ্ধান্ত নেন কাজের জন্য ভারতে যাবেন। ১৯৯৯ সালে চোরাপথে কাজের সন্ধানে ভারতে যান তার স্বামী।

পাঞ্জাব প্রদেশে গার্মেন্টে শ্রমিকের কাজ নেন বাবুল। আড়াই বছর কাজ করে বেতন থেকে জমানো ১৫ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেন তার স্বামী। ওই টাকা দিয়ে শুরু করেন মুদির দোকান। মুদি দোকানের আয়ে কিছুদিন ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু বাকি-বকেয়া পড়ায় ধীরে ধীরে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। স্বামীর এ অবস্থায়ও মনোবল হারান না ফাতেমা। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। সামান্য পুঁজি, স্বামীর সঞ্চয়ী অভিজ্ঞতা এবং একটি এনজিও থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় ফাতেমার পথচলা। চারটি হ্যান্ড লুম (তাঁত মেশিন) কিনে বাড়িতেই স্থাপন করেন পাপোশ তৈরির কারখানা।

এ প্রসঙ্গে ফাতেমা বেগম বলেন, অভাবের সংসারেও মনোবল হারাইনি। ২০০৪ সালে চারটি তাঁত মেশিন দিয়ে পাপোশ তৈরির কাজ শুরু করি। পাপোশ তৈরির আয় থেকে ৫০টি তাঁত হয়েছে। আমাদের উৎপাদিত পাপোশের কদর এখন দেশজুড়ে। দেশের বাইরেও বিক্রি হচ্ছে আমাদের বানানো পাপোশ, টেবিল ম্যাটস ও ফ্লোর ম্যাটস। জাপান, ইউরোপসহ মধ্যপাচ্যের দেশগুলোতে যাচ্ছে কারুশিল্পের এসব পণ্য। বাহারি নকশা ও টেকসই হওয়ায় দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। তবে পুঁজি স্বল্পতার কারণে তাঁতের সংখ্যা বাড়াতে পারছি না।

কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বছরের সেরা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পুরস্কৃত হওয়ায় অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ফাতেমা বেগম বলেন, মাত্র ৫ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে মেসার্স ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ নামে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলি। এখানে আমি সুতা আর গার্মেন্টের ঝুট কাপড় দিয়ে পাপোশ, ওয়াল ম্যাটস, টেবিল ম্যাটস ও ফ্লোরম্যাটস তৈরি করি। যা আমার ভাগ্য পরিবর্তন করেছে। এ পুরস্কার আমাকে আরও আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। এক সময় আমি একাই এই কাজ করতাম। প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক শ্রমিক তৈরি করছি। এখন শ্রমিক আর কারখানার দেখাশোনা করি। আমার স্বামী পাপোশ, ওয়াল ম্যাটস, টেবিল ম্যাটস ও ফ্লোরম্যাটসের কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাতের কাজ করছেন। আমার কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছেন এলাকার প্রায় দেড়- দুইশ’ নারী ও পুরুষ। তাদের মধ্যে স্কুল কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন তৈরি হয় কমপক্ষে ৩ হাজার পাপোশ। আর এই পাপোশ বিক্রির টাকায় চলে ওইসব খেটে খাওয়া শ্রমিকের সংসার। চলে অনেকের লেখাপড়ার খরচ। একেকজন দৈনিক আয় করেন ২ থেকে ৩শ’ টাকা।

জীবন যুদ্ধ ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর ফাতেমার পরিবারে এখন আনন্দ আর আনন্দ। বসতভিটাসহ ১৫-২০ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন এক কালের হতদরিদ্র ফাতেমা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×