লড়াকু মনোভাবই জীবনের শক্তি

জিনি রোমেট্টি

  সাব্বিন হাসান ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লড়াকু মনোভাবই জীবনের শক্তি
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশনের (আইবিএম) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিনি এম. রোমেট্টি

বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি জগতে রোমেট্টি নামেই ভুবনখ্যাত। পুরো নাম ভার্জিনিয়া জিনি এম. রোমেট্টি। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশনের (আইবিএম) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেই বহুল পরিচিত। জন্ম ২৯ জুলাই, ১৯৫৭। জন্মেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে।

তিনিই প্রথম নারী হিসেবে আইবিএমের মতো সুবিশাল ব্র্যান্ডের সিইওর দায়িত্ব নিয়েছেন। মাত্র ১৫ বছর বয়স রোমেট্টি বাবা হারা হন। এরপর মা ছাড়াও চার সদস্যের সংসারে নেমে আসে কঠিন দুর্যোগ। মায়ের সঙ্গে কাজ করে ওই সময়টা সামলে নিয়েছেন। ঘরে ও বাইরে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ১৯৭৯ সালে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সে’ গ্রাজুয়েশন করেন।

১৯৮১ সালে সিস্টেম অ্যানালিস্ট হিসেবে আইবিএমে চাকরি নেন। তার আগে তিনি জেনারেল মোটরসে ইন্টার্ন করেছিলেন। চাকরির মাত্র ১০ বছরের মাথায় আইবিএম কনসাল্টিং গ্রুপে যুক্ত হন। তার হাত ধরেই একটু একটু করে ধাপে ধাপে এগিয়েছে আইবিএম।

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী ফরচুন, ব্লুমবার্গ এবং ফোর্বসের শীর্ষ ৫০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় তিনি জায়গা করে রেখেছেন। প্রসঙ্গত বর্তমানে বিশ্বের কয়েকজন সর্বোচ্চ বেতনভুক্ত সিইওর মধ্যে রোমেট্টি অন্যতম। আইবিএম থেকে তিনি বছরে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার বেতন পেয়ে থাকেন।

২০১১ সালে আইবিএম পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে আর মানোন্নয়নে সিইও হিসেবে ‘ভার্জিনিয়া রোমেট্টি’র নাম ঘোষণা করে। পুরো বিশ্বেই এ ঘোষণায় হইচই পড়ে যায়। সমালোচনা মুখর হয়ে ওঠে বিশেষজ্ঞরা। সেই সময় মার্কিন মিডিয়া আইবিএমের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সময়ের ব্যবধানে শঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে নিজের দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

কর্পোরেট দুনিয়ায় এখন আলোচিত নাম রোমেট্টি। কম্পিউটিং জগতের দাপুটে প্রতিষ্ঠান আইবিএমের সঙ্গে তার নামজুড়ে রচিত হয়েছে ইতিহাস। তিনি একাধারে আইবিএম চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট এবং সিইও তিনটি দায়িত্বে কাজ করেন। প্রসঙ্গত আইবিএমকে শুধু কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে টেকনোলজি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পেছনে তার অসাধারণ ভূমিকা আছে। শত বছরের আইবিএম ইতিহাসে জিনি রোমেট্টি হচ্ছেন নবম সিইও।

বিগত সময়ে সর্বোচ্চ গতির সুপার কম্পিউটারের মালিক ছিল চীন। তবে চীনকে টপকে সুপার কম্পিউটার তৈরির শীর্ষে উঠে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইবিএম। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ নব্য ধারণার সুপার কম্পিউটারটি উন্মোচন করেছে। যার নাম ‘সামিট’। মার্কিন বহুজাতিক আইটি প্রতিষ্ঠান আইবিএম ও এনভিডিয়া যৌথভাবে এ সুপার কম্পিউটার তৈরি করেছে। প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ দুই লাখ ট্রিলিয়ন হিসাব করার ক্ষমতা রাখে এটি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সায়েন্টিফিক সুপার কম্পিউটার টাইটানের চেয়েও এটি আট গুণ বেশি ক্ষমতাধর। ফলে বিশ্বের পাঁচ শতাধিক সুপার কম্পিউটারের তালিকার শীর্ষে এখন সামিট। এটি নির্মাণে সময় লেগেছে চার বছর। সামনে থেকে যার নেতৃত্ব দিয়েছেন রোমেট্টি।

এ প্রসঙ্গে দেয়া সাক্ষাৎকারে রোমেট্টি জানান, এ সুপার কম্পিউটার বাস্তব অর্জনগুলোর মধ্যে সেরা আবিষ্কার। এটি স্মার্ট এবং সর্বোচ্চ গতির সুপার কম্পিউটার। অতীতে কঠিন কোনো পরীক্ষা করতে গবেষকদের হাজারো বছর লেগে যেত। কিন্তু সামিট তার সমাধান দেবে মাত্র একদিনেই। এর ব্যবহারে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্যর চিকিৎসা উদ্ভাবিত হবে। সামিট আসার আগে বিশ্বের দ্রুততম সুপার কম্পিউটার উদ্ভাবক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল পঞ্চম।

রোমেট্টির নেয়া সিদ্ধান্তে ৩ হাজর ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে ওপেন-সোর্সকোড সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান রেড হ্যাট কিনে নেয় আইবিএম। মূলত রেড হ্যাটের সহায়তায় ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসা বাড়ানোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন তিনি।

আর রেড হ্যাট কেনার মাধ্যমে ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’ ব্যবসায় গুগল, অ্যামাজন এবং মাইক্রোফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে আইবিএম। এ ক্ষেত্রে রোমেট্টির সাহসিকতার পরিচয় দেখায়। আইবিএমের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণের ঘটনা ছিল।

স্থায়ী সার্ভার ও সফটওয়্যারের চাহিদা কমে আসায় নিবন্ধনকৃত সফটওয়্যার সেবার দিকে নজর রেখে রোমেট্টি বলেছেন, রেড হ্যাট অধিগ্রহণ এই খাতে আমূল পরিবর্তন আনবে। এটি ক্লাউড বাজারের সব কিছুই বদলে দেবে। বিশ্বের শীর্ষ ‘হাইব্রিড ক্লাউড’ সেবাদাতা হবে আইবিএম। ফলে আধুনিক দিনের ব্যবসাকার্যে ক্লাউডের পুরো ক্ষমতা কাজে লাগবে। তাতে পণ্য নির্মাণে ব্যয় কমবে সঙ্গে সঠিক মানও নিশ্চিত হবে।

লড়াকু মনোভাবের কারণেই রোমেট্টি আজ ঈর্ষণীয় এ অবস্থানে আসতে পেরেছেন। অল্প বয়সেই বাবাহীন কঠিন বাস্তবতা তাকে শক্ত হতে শিখিয়েছে। পড়াশোনা আর উদ্ভাবনার প্রতি অদম্য আগ্রহ তাকে সব ধরনের প্রতিকূলতা থেকে সাফল্যেও দিকে নিয়ে এসেছে।

সমালোচনায় দুর্বল না হয়ে নিজের লক্ষ্যেও স্থির থাকাই শ্রেয়। কারণ সমালোচনার জবাব দিতে গেলে পিছিয়ে পড়তে হয়। তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। খারাপ সময়ে কাছের মানুষগুলোও দূরে চলে যায়। তাই খারাপ সময় থেকে জীবনের কঠিন পাঠ শিখতে হবে। ভবিষ্যৎ জীবন সাজাতে তা ওষুধের মতো কাজে আসে।

জীবনের অধ্যায়গুলো যা কিছু শেখায় তাই আমলে নিতে হয়। পরিশ্রম একটি অনিবার্য শক্তি। আর ধৈর্য তার পাথেয়। এ দুয়ের মিলিত শক্তিতে সব কিছুই অর্জন করা সম্ভব। শুধু সঠিক সময় কখন এসে ধরা দেবে তার প্রহর গুনতে হয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে এভাবেই সবার জন্য তুলে ধরেছেন অদম্য ভার্জিনিয়া রোমেট্টি। বিশ্বের সফল নারীর ইতিহাসে তিনি একজন উজ্জ্বল তারা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×