প্রবাসে ঈদ আনন্দ

অনেকে পড়তে প্রবাসে অবস্থান করছেন। অনেকে স্বামীর কারণে অথবা চাকরির সুবাদে বিদেশে অবস্থান করছেন। প্রবাসীরা এবারের ঈদ কীভাবে উদযাপন করবেন তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন-

  সাব্বিন হাসান ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের কত কথা মনে

পড়ে : সামরিন আহমেদ কুসুম

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ থেকে ২০১২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। এরপর ২০১৬ সালে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পাড়ি জমান। সেখানে পিএইচডি শিক্ষার্থী হিসেবে ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল, কনস্ট্রাকশন, অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা। বিদেশে যাওয়ার আগে দেশে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলাতে যুক্তরাষ্ট্রের জীবনের অনেক কিছুই যেন জানা হয়ে গিয়েছিল। জেনেছেন কীভাবে প্রতিদিনের পড়ালেখার মাঝে এটা-ওটা দিয়ে কোনোরকমে উদরপূর্তি করার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। ছুটতে হয় আপন লক্ষ্যের দিকে। সময়ের কাজ সময়ে। আবার প্রবাসী বন্ধুদের অফুরন্ত আড্ডা আর ঘোরাঘুরি দেখে হিংসাও কম হয়নি! সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে মনে হয়েছিল এই জীবনটার অনেকটাই বুঝি তার জানা। কিন্তু আমেরিকায় আসার ঠিক এক মাসের মাথায় ঈদ চলে আসে। বাস্তবতা অনুধাবন করতে আর সময় বেশি লাগেনি, যখন ঈদের দিনও ক্লাস করতে হয়েছিল। নিজে দেশ ছাড়া, পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদে তিনি বারবার হারিয়ে গিয়েছিলেন দেশের ঈদ আনন্দে, মায়ের হাতের খিচুড়ি আর ভুনা মাংসে, বাবার থেকে পাওয়া চকচকে নোটের ঈদের সেলামিতে, আর ভাইবোন-বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই করে পার করা ঈদের স্মৃতিকাতর দিনগুলোর দৃশ্যপটে। যেন অস্তিত্বের এক ভাবনা। জানালেন প্রবাসী শিক্ষার্থী সামরিন আহমেদ কুসুম।

প্রতিটি পরিবার এক একটা আইটেম রান্না করে : রাবেয়া বসরী সুমী

জীবনের কঠিন তাগিদে প্রিয়জনদের ছেড়ে এখন দূর পরবাসে এসে থাকতে হচ্ছে। মানিয়ে নিতে হচ্ছে সবকিছু। জীবন তো এমনই। অনিশ্চিত আর দিন বদলের গল্পে ভরা। আমার বর জার্মানির স্টুর্টগার্ট শহরের ‘ইউনিভার্সিটি অব স্টুর্টগার্ট’ থেকে মাস্টার্স শেষে চাকরি পেয়ে যায়। ফলে জার্মানিতেই থেকে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আমিও আমার প্রিয় দেশ ছেড়ে সন্তান নিয়ে জার্মানিতে স্বামীর কাছে চলে এসেছি। বিয়ের বয়স চার বছর পার হলেও, সবে সংসার করছি গেল সাত মাস ধরে। তাই নতুন দেশে সংসার গোছাতে এখনও বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। এবারই প্রথম মা-বাবা আর ভাইবোনকে ছাড়া রোজা আর ঈদ পালন করতে হচ্ছে। উল্টো হিসাবে আবার এবারই প্রথমবারের মতো রোজা করছি একসঙ্গে। ঈদও করব। তাই সব মিলিয়ে খুব মিশ্র একটা অনুভূতির মধ্যে আছি জানালেন রাবেয়া বসরী সুমী।

রাবেয়া বসরী সুমীর মতে, আমি যত রান্নাই করি না কেন মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্নার স্বাদ এবার ঈদে পাব না। এবার আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকবে বাবা-মা-ভাইবোনদের জন্য। এখানে ঈদের দিনের জন্য আলাদা কোনো ছুটি থাকে না। এবারের ঈদ সপ্তাহের মাঝামাঝি পড়বে তাই ঈদের আনন্দ অল্প সময়েই শেষ হয়ে যাবে। জীবন এখানে অনেক সাজানো-গোছানো। পরিপাটি বলতে যা বোঝায়। কিন্তু দিন শেষে রোগে শোকে ভুগতে থাকা আমার প্রিয় মাতৃভূমি আর সেখানে ফেলে আসা আমার আপনজনদের কথা ভেবে খারাপ লাগাটা পেছন ছাড়ে না। দূরে এলেই কাছের মানুষের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। বিশেষ করে ঈদের দিন তা সপ্রতিয়মান হয়ে ওঠে। সবাই সুস্থ থাকুক। আর ঈদ কাটুক পরম আনন্দে।

ভীষণ খারাপ লাগবে ঈদের দিন : জোহরা তারা বেগম

বাংলাদেশ সরকারের দেয়া শিক্ষাবৃত্তি (৩০তম বিসিএস, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এবারডিনে ভর্তি হয়েছেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিদেশের মাটিতে প্রথম পা রাখেন। মা, ভাইবোন আর আত্মীয়স্বজনদের ছেড়ে এবারই জোহরা তারা বেগমের প্রথম ঈদ। ভীষণ খারাপ লাগবে ঈদের দিন।

জোহরা তারা বেগমের মতে, অন্যদিকে একেবারেই নতুন পরিবেশে বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের অনুভূতি মনকে অন্যভাবে চাঙ্গা রাখছে। ঈদের দিন সবচেয়ে বেশি মিস করব মায়ের হাতের সুস্বাদু বাহারি রান্না। তবে মায়ের কাছ থেকে রেসিপি নিয়ে ঈদের দিন এই প্রথম সেমাই আর ফিরনি রান্না করব। এখানকার বাঙালি আর উচ্চশিক্ষা নিতে আসা সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হবে ঈদের দিন। আর কিছুটা ঘোরাঘুরি হবে সবাই মিলে। খুব ভোরে উঠেই দেশে থাকা মা আর ভাইবোনদের সঙ্গে ফোনে শুভেচ্ছা বিনিময় করব। এরপর মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। কর্মজীবনে প্রবেশের পর থেকে সালামি খুব একটা পাওয়া হয় না। তবে মায়ের দেয়া সালামি না পাওয়ার শূন্যতা থাকবে। বিশ্বের বহু দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেব। এটা হবে আমার জীবনের অনন্য এক অভিজ্ঞতা। বাবাকে হারিয়েছি দীর্ঘ পঁচিশ বছর। এরপর মা আর ভাইবোন ছাড়া কখনই ঈদ করা হয়নি। তাই সবার শূন্যতা অনুভব করব। হাজারও মাইলের দূরত্বে থাকলেও আপনজনরা থাকবে একান্ত উপলব্ধিতে, ভালোবাসায়।

না পাওয়ার বেদনা মনটাকে দুমড়ে মুচড়ে দেয় : বিবি খাদিজা দিনা

ছয় বছর আগে বিবি খাদিজা দিনা ইতালির পিসা শহরে এসেছেন রোজার মাসেই। এ সময়ের মধ্যে পেয়েছেন অনেক। হারিয়েছেনও অনেক। এখানে রোজার সময় ১৯ ঘণ্টা। তাই কষ্ট একটু বেশিই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হয় যখন ইফতারিতে আব্বুর হাতের মুড়ি মাখা খেতে পান না।

বিবি খাদিজা দিনা জানান, এখন সবকিছু মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু কোথায় যেন না পাওয়ার বেদনা মনটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। দু-সন্তানের মা আমি। আরাফ আর মাহিরা ওদের নিয়েই দিনভর ব্যস্ততা। অফিসের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন ওদের বাবা। তাই ঘরে খুব একটা সময় দিতে পারেন না। এখানেও ঈদে আনন্দ হয়। তবে দেশের মতো সেই আবেদন নেই। ঈদের দিন সবার পছন্দের খাবার রান্না করব। ঈদের পরের দিন কোনো সুন্দর জায়গা দেখে সবাই ঘুরতে যাব। এখানকার বন্ধুরা খুবই আন্তরিক। তবে দেশের ঈদ আনন্দের সঙ্গে কোনো তুলনাই চলে না। ওটা সত্যিই স্পেশাল। ভীষণ মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার। এবারের ঈদে দেশের সবার সঙ্গে ফোনে শুভেচ্ছা বিনিময় করব। মিস করি দেশের সবকিছু। তবুও জীবনের টানে দূরদেশে থাকা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×