ছোট ছোট সুখেই প্রশান্তি

জোহা আলহার্থি

  সাব্বিন হাসান ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোট ছোট সুখেই প্রশান্তি
জোহা আলহার্থি

বিশ্বের সাহিত্য দুনিয়ায় আলহার্থি নামেই রাতারাতি তারকা বনে গেছেন। পুরো নাম জোহা আলহার্থি। তিনি ১৯৭৮ সালে ওমানে জন্মগ্রহণ করেন।

ইতিমধ্যে আরবি ভাষায় লেখা তার উপন্যাস ম্যান বুকার পুরস্কার পাওয়ায় নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে। এর আগে আরবি ভাষার কোনো উপন্যাস এ বিরল সম্মাননা অর্জন করতে পারেনি।

আলহার্থি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদী আরবি কাব্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে ওমানের মাসকাটে সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। এ পর্যন্ত দুটি ছোটগল্প সংকলন, একটি ছোটদের বই ও তিনটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি।

আলহার্থির পরিবারে মা-বাবা আছেন। একমাত্র বোন জিনা তাকে লেখায় সবসময় উৎসাহ দিয়ে থাকেন। স্বামী বিল আলহার্থি। দুই সন্তানের মা তিনি। ইব্রাহিম ও জেসমিন।

মা-বাবা, বোন, স্বামী-সন্তান দারুণ এক আবহে নিজের লেখনী শক্তির চর্চা করে চলেছেন আলহার্থি। আলহার্থি-ই প্রথম আরব লেখক হিসেবে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার ‘ম্যান বুকার’ আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হলেন। তার উপন্যাস ‘সেলেস্টিয়াল বডিজ (স্বর্গীয় দেহ)’ তাকে এ পুরস্কার এনে দিয়েছে।

নিজ জন্মভূমি ওমানের উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিবর্তনই এই উপন্যাসের প্রধান আলোচ্য। আলহার্থির ‘সেলেস্টিয়াল বডিস’ উপন্যাসটি ইংরেজি অনুবাদ করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষার শিক্ষক মেরিলিন বুথ। আলহার্থি ও মেরিলিন যৌথভাবে ম্যান বুকার পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড সমভাবে পাবেন।

বুকার খ্যাত বই ‘সেলেস্টিয়াল বডিজ’ প্রসঙ্গে আলহার্থি বলেন, আমাকে ওমান অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় বিশ্বব্যাপী সাহিত্য রসিকেরা বইটির মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সহমর্মিতা অনুভব করবেন। যার মূল উপজীব্য স্বাধীনতা ও ভালোবাসা। গত ২১ মে মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে অবস্থিত রাউন্ড হাউসে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পরে ৪০ বছর বয়সী আলহার্থি জানালেন, সত্যিই আমি রোমাঞ্ছিত। দীর্ঘদিন পরে হলেও আরব সংস্কৃতির দিকে বিশ্ব সাহিত্যেও একটি জানালা অবমুক্ত হল। উপন্যাসটি পুরস্কার বিজয় প্রসঙ্গে বিচারকরা বলেন, সিলেস্টিয়াল বডিস উপন্যাসে সমাজের পরিবর্তনে একটি কল্পিত, আকর্ষণীয় ও কাব্যিক দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। আগে যা অস্পষ্ট ছিল।

সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে আলহার্থিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তালিকায় ছিলেন আরও পাঁচজন লেখক। তারা হলেন- ফ্রান্সের আনি ইয়ানো, জার্মানির মারিয়ন পোশমান, পোল্যান্ডের অলগা তোকারসুক, কলম্বিয়ার হুয়ান গাব্রিয়েল ভাসকেস এবং চিলির আলিয়া ত্রাবুকো সিরান।

ওমানের একটি অবহেলিত আল-আওয়াফি গ্রামকে ঘিরে সেলেস্টিয়াল বডিজ উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট চিন্তা করেন লেখিকা। আরব দেশ ওমান একটি সনাতনী সমাজব্যবস্থা থেকে উপনিবেশ-উত্তর যুগে সাংস্কৃতির বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

কতগুলো জীবনের সহজ-সরল এগিয়ে চলতে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছিল সবকিছু। মূল উপন্যাস তিন বোনের জীবনের গল্প দিয়ে সাজানো। পরিবর্তন হয়ে যাওয়া ওমানের সাংস্কৃতির সঙ্গে মধ্যবিত্ত পরিবারের খাপ খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। দাসপ্রথার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

উপন্যাস বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, সহজ-সরল জীবনের গল্পই এখানে মূল চরিত্র। একেবারে গ্রাম্য জীবনে শহুরে পরিবর্তনের যে ছাপ পড়ে তা প্রতিটি ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি একটি অনবদ্য জীবনঘনিষ্ঠ সুপাঠ্য।

কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি, কল্পনাশক্তি, জীবন ঐশ্বর্য, চিত্রাকর্ষক ভাবনাই আলহার্থির উপন্যাসটিকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বের চারদিকে পরিবর্তনের হাওয়া চলছে। তা এত দ্রুত হচ্ছে এক শ্রেণী পেশার মানুষ কোনোভাবেই তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। অনেকটা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাচ্ছে বিশ্বের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী।

সবাই উচ্চাভিলাসী জীবনের পথে এগোবে তা কিন্তু নয়। কিন্তু তারাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদেরও বেঁচে থাকার মানবিক অধিকার আছে। কিন্তু রাষ্ট্র, সরকার, সভ্য সমাজের সেদিকে লক্ষ্য করার কোনো মানসিকতাই যেন নেই। ফলে শ্রেণী বিন্যাস হয়ে পড়ছে সবকিছু। মুখ খুবড়ে পড়ছে মানবতা। নীরব হয়ে পড়ছে মানবিক মূল্যবোধ। এভাবেই আলহার্থির উপন্যাসের সমাজ দর্শনকে ব্যাখ্যা করেছেন সাহিত্যবিদরা।

ম্যানবুক পুরস্কার ঘোষণার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আলহার্থি প্রথমেই ম্যানবুক কর্তৃপক্ষ এবং বিচারকদের বিশেষ ধন্যবাদ জানান। ইংরেজি ভাষায় ‘সেলেস্টিয়াল বডিজ’ অনুবাদের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা স্যান্ডস্টোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। উৎসাহ আর সহযোগিতার জন্য পরিবারের সবার প্রতিই তিনি কৃতজ্ঞ।

সেলেস্টিয়াল বডিজ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদক মেরিলিন বুথ বলেন, আলহার্থি চমৎকার একজন লেখক। আমাকে ও ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। আরবি ভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় দারুণ সব কাজ হচ্ছে।

সে কাজগুলোকে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরতে পারলে তা লাখো পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। আরবি সাহিত্য নিয়ে দারুণ কাজ করেছে আলহার্থি। এ কাজে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি নিজেও আনন্দিত, সম্মানিত। আলহার্থির সঙ্গে মেরিলিনও যৌথভাবে ম্যানবুক অর্জন করেছেন।

জীবনকে খুব সহজ করে দেখতে হবে। হাসতে হবে। জীবনের ছোট ছোট সুখগুলোর মধ্যেই জীবনী শক্তি লুকিয়ে থাকে। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে নিজেকে।

পরিবারকে নিজের ইচ্ছা বোঝাতে হবে। নিয়ম মানতে হবে। জীবনে অনিয়মকে প্রশ্রয় দিলে তা একসময় কঠিন ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে। কল্পনার সঙ্গে স্বপ্নের রং মিশিয়ে নিজেকে সাজাতে হবে। আর তা হলেই জীবনের স্বার্থকতা আসে। নিজের জীবনবোধকে জোহা আলহার্থি এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×