অভিষেকেই সোনার হাসি হাসলেন দিয়া সিদ্দিকী

  ওমর ফারুক রুবেল ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিষেকেই সোনার হাসি হাসলেন দিয়া সিদ্দিকী
তীরন্দাজ দিয়া সিদ্দিকী

এবারের ইসলামিক সলিডারিটি আরচারির আন্তর্জাতিক আসরে দিয়া সিদ্দিকী প্রথম স্বর্ণ জয় করেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও উজ্জ্বল একটি নাম দিয়া সিদ্দিকী।

জাতীয় আরচারি দলের অন্যতম সদস্য তিনি। প্রথম আন্তর্জাতিক অভিষেকেই স্বর্ণপদক জয় করে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দেন দিয়া। এ পথচলাটা কেমন ছিল।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সোনার মেয়ে দিয়া সিদ্দিকী। তার বাবা স্বপ্ন দেখতেন মেয়ে চিকিৎসক হবে। সাধারণ মানুষের রোগ নিরাময়ে কাজ করবে; কিন্তু মা চাইতেন মেয়ে সংসারী হবে।

খেলাধুলা ছেলেদের কাজ, মেয়েদের নয়। তাই শৈশব থেকেই মেয়েকে সাংসারিক কাজকর্ম শেখার তাগিদ দিতেন মা শাহনাজ বেগম। যাতে মেয়ে ঘর-গৃহস্থালি শিখে পাক্কা গৃহিণী হয়ে ওঠেন।

কিন্তু দিয়া সিদ্দিকীর মন সেদিকে সায় দেয়নি। ঘর-গৃহস্থালি আর মানুষের সেবার চেয়ে তার কাছে বড় দেশপ্রেম। দেশের জন্য কিছু করতে পারলেই যে দেশের মানুষের জন্য করা হবে। তাই খেলার মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু করতে উদ্যোগী হলেন দিয়া। আর ইসলামিক সলিডারিটি আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় আসরে প্রথম অংশ নিয়েই জিতে নিলেন স্বর্ণপদক।

নীলফামারীর পাইকের পাড়া মধ্য হারওয়া গ্রামের বাসিন্দা নূর আলম সিদ্দিকীর দু’ছেলে আর এক মেয়ের মধ্যে বড় দিয়া সিদ্দিকী। দিয়া সকাল হলেই বই নিয়ে ছুটতেন নীলফামারীর আনন্দ নিকেতন মডেল স্কুলে। টিফিন পিরিয়ডে মাঠে খেলাধুলা করতেন।

দুপুরে এসে মায়ের সঙ্গে হাত লাগাতেন সংসারের কাজে। সাংসারিক কাজে মাকে সহযোগিতা করলেও তার মন পড়ে থাকত খেলার মাঠে। তবে সেভাবে বড় কোনো জায়গায় তার খেলা হয়ে ওঠেনি। সেই সুযোগটি এসে যায় ২০১৬ সালে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ওই বছরের নভেম্বরে সারা দেশের মতো নীলফামারীতেও আয়োজন করে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির।

দিয়ার উচ্চতা (৫ ফুট ৪ ইঞ্চি) দেখে নীলফামারী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক খাইরুল ইসলাম তীর ধনুকের (আরচারি) খেলাতেই তাকে মনোনিবেশ করতে বলেন। দিয়া শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত অনুশীলন করেন। তার পরিশ্রম সুফল বয়ে আনে।

নীলফামারীতে আরচারির প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে যান দিয়া। পরবর্তী সময়ে সুযোগ পান বিকেএসপিতে ভর্তির। এক মাসের অনুশীলন ক্যাম্প শেষে বছর দুয়েক আগে ভর্তি হন বিকেএসপিতে।

বিকেএসপিতে এসে শুরু হল তার কঠোর অনুশীলন। একজন পেশাদার তীরন্দাজ হওয়ার জন্য দিয়া সিদ্দিকী মনোযোগী হলেন। দশম শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া সিদ্দিকী গেল দু’বছরে কোনো ঘরোয়া আসরে স্বর্ণ জেতেননি।

গত বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে রূপা জিতেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ইসলামিক সলিডারিটি আরচারিতে অংশ নিয়ে দিয়া ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক আসরে স্বর্ণ জয় করেন।

রিকার্ভ নারী এককের ফাইনালে ইরানের শোজামেহের শিভাকে ৩-২ সেটে হারিয়ে সোনার হাসি হাসেন দিয়া। প্রথমবার আন্তর্জাতিক আসরে স্বর্ণপদক জিতে বেশ উচ্ছ্বসিত দিয়া। সেই সঙ্গে তার হাত ধরেই ওই টুর্নামেন্টে প্রথম স্বর্ণপদকের দেখা পায় বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে দিয়া সিদ্দিকী বলেন, ফাইনালের আগে খুব ভয় লাগছিল। এটা আমার প্রথম আন্তর্জাতিক আসরে আরচারিতে অংশ নেয়া। তাই ভয়ে গা কাঁপছিল। অনুশীলনে আমি খুবই ভালো করেছি। তাই আত্মবিশ্বাস ছিল স্বর্ণ জেতার ব্যাপারে। তৃতীয় সেটে এসে প্রথম পয়েন্ট পেতেই মনে হল আমি পারব।

আমি নিজেও বুঝতে পারিনি এভাবে আরচারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব। কঠোর অনুশীলন, ভালো পারফরমেন্স, মা-বাবা-শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের দোয়া আর ভাগ্য সব মিলিয়েই এ অর্জন। নীলফামারী গার্লস হাইস্কুলে পড়ার সময় শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম স্যার আমার উচ্চতা দেখে আরচারিতে আসতে বললেন। ওখানে ট্রায়াল দিলাম।

এরপর ১০ দিনের অনুশীলন করি। বিকেএসপিতে এসে ট্রায়ালে টিকে গেলাম। বিকেএসপিতে ভর্তি হলাম অষ্টম শ্রেণীতে। আন্তর্জাতিক আসরে আরচারিতে দেশের জন্য স্বর্ণ জিততে পেরে অনেক ভালো লাগছে।

মেয়ে দিয়া সিদ্দিকীর এ অর্জনে বাবা নূর আলম সিদ্দিকীও ভীষণ খুশি। তিনি বলেন, দিয়ার এ অর্জনে আমরা গর্বিত। আর নীলফামারীর মেয়ের এ স্বর্ণপদক অর্জন দেশবাসীর জন্যও গর্বের বিষয়।

আরচারিতে নিজের ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান দিয়া সিদ্দিকী। আগস্টে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হবে ইয়ুথ ওয়ার্ল্ড আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে খেলবেন তিনি। তার আগে অংশ নেবেন ২৫ জুন থেকে শুরু হওয়া আরচারির বিশেষায়িত ক্যাম্পে। লক্ষ্য ওই টুর্নামেন্টের ব্যক্তিগত ইভেন্টে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনা।

এ সম্পর্কে দিয়া সিদ্দিকী জানান, তিনি পরিবারের বড় মেয়ে। তাই তার মা কখনোই চাননি, মেয়ে ঘর-সংসারের কাজে মনোযোগ না দিয়ে খেলাধুলা নিয়ে বাড়ির বাইরে সময় কাটাক। তার খেলাধুলার বিপক্ষে ছিলেন মা; কিন্তু বাবা তাকে খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি দিয়া। কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করছেন। ভবিষ্যতে অলিম্পিকে অংশ নিতে চান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×