স্বপ্ন পূরণের যুদ্ধে হার মানেনি শ্রাবণী

  প্রবীর চক্রবর্তী ২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রাবণী
শ্রাবণী

শ্রাবণী এখন মুক্ত বিহঙ্গ। আকাশে উড়তে পারার প্রথম দিনটি যেমন পাখির কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন।

তেমনি ১১ বছর পূর্বে এক পা হারিয়ে ফেলা এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে শ্রাবণী পা সংযোজনের মাধ্যমে যেন নতুন জীবন ফিরে পেল।

রেল দুর্ঘটনায় মেয়েটি এক পা হারিয়েছিল। কিন্তু লেখাপড়ার অদম্য আগ্রহ তাকে থামাতে পারেনি। ক্র্যাচে ভর দিয়ে ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে তেজগাঁও বিজি প্রেস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যেত। পরে গ্রামে চলে আসে।

এখানে গোবিন্দপুর আবদুল লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

শ্রাবণীর জীবনে একটাই স্বপ্ন ছিল, দুর্ঘটনায় একটি পা গিয়েছে তো কি হয়েছে, লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হবে। এই মনোবল নিয়ে শ্রাবণী গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

লেখাপড়ায় ভালো হওয়ায় এক পা হারান শ্রাবণীর প্রতি শিক্ষকদেরও আলাদা যত্ন ছিল। প্রতিবন্ধী উন্নয়নের সংগঠন চাঁদপুর ডিপিওডির সহায়তায় চট্টগ্রামের একে খান সিআরপি থেকে শ্রাবণীর পা লাগান হয়। এখন শ্রাবণী এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছে।

শ্রাবণী দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করলেও নিজের স্বপ্ন পূরণের যুদ্ধে হার মানেনি। পা হারিয়ে অভাবের কারণে ভিক্ষে বৃত্তি করেনি। তার বাবা-মা অভাবের সংসারেও অন্য সন্তানদের সঙ্গে তাকেও স্কুলে পাঠিয়েছেন।

বাবা-মায়ের ইচ্ছা পূরণ করে ভালো ফলাফল করেছে। তাই শ্রাবণীর গল্পটা অন্য যে কোনো গল্পের থেকে একটু আলাদা।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১০নং গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের গোবিন্দপুরের রফিক মোল্লার মেজ মেয়ে শ্রাবণী। সপরিবারে তারা ঢাকার কাওরান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। কারওয়ান বাজারে রেললাইনের একপাশে ছিল তার বাবার ছোট্ট একটি কাঠের দোকান।

এর বিপরীত পাশে একটু দূরে ছিল তাদের বাসা। সেখানেই থাকার সময় ২০০৮ সালের দিকে হঠাৎ করেই তিন বছরের শ্রাবণী তথা শাবু হারিয়ে যায়।

হারিয়ে যাওয়ার তিন মাস পর কাকতালীয়ভাবেই শ্রাবণী খুঁজে পায় তার বাবা-মাকে। এর কয়েকদিন পর কথা ছোট্ট শ্রাবণী বিকালে মা-খালাদের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়েছিল। খেলতে খেলতে রেললাইনের ওপর চলে আসে।

হঠাৎ করেই ট্রেন চলে আসে। ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে বাম পা হারায় শ্রাবণী। প্রায় দুই বছর চিকিৎসার পর সে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও ক্র্যাচই তার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে।

কিন্তু সে থমকে যায়নি। চালিয়ে গেছে লেখাপড়া এবং জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যায়। বাবার আর্থিক অনটনের কারণে ঢাকা থেকে গ্রাম ফরিদগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামে চলে আসে।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় শ্রাবণী সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপ্লব কান্তি সরকারের দৃষ্টি কাড়ে। এক পা না থাকায় মেয়েটি অ্যাসেম্বলিতে অংশ নিতে পারে না।

শ্রাবণীর পা হারানোর কথা শুনে তাকে পা ফিরে পাওয়ার আশ্বাস দেন। জেএসসিতে ভালো ফলাফল করার জন্য মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার কথা বলেন। জেএসসিতে সে এ মাইনাস পেয়ে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়।

সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপ্লব কান্তি সরকার যোগাযোগ করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন সংগঠন চাঁদপুর-ডিপিওডির পরিচালক মমতাজ উদ্দিন মিলনের সঙ্গে।

তিনি সরজমিনে শ্রাবণীর বিষয়টি দেখেন। চট্টগ্রামের একে খান সিআরপিতে যোগাযোগ করলে তারা সাড়া দেয়। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি শ্রাবণী মা নাছিমা বেগমের সঙ্গে চট্টগ্রাম যান। সেখানে তার বাম পা সংযোজন করা হয়। ক্র্যাচ ছাড়াই এখন পায়ে হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করে।

বাবা রফিক মোল্লা, মা নাছিমা বেগম জানান, তারা ১১ বছরের পূর্বের শ্রাবণীকে ফিরে পেয়েছেন। এখন একটাই স্বপ্ন অদম্য মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×