বানের পানিতে ভেসে গেল তাদের ঈদ আনন্দ

ঈদুল আজহা চলে এলো। দেশের বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যায় বেশি সমস্যা হয় নারী-শিশুদের। এর মধ্যে কীভাবে তারা ঈদ উদযাপন করবেন! লিখেছেন-

  জাফর আহমেদ ০৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়ক ভেঙে অনেক বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। ৭০ বছরের বিধবা জয়গন বেওয়ার বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনি নিয়ে পনেরো দিন আগে রেললাইনের পাশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। ভূঞাপুর-তারাকান্দির টেপিবাড়ির রেললাইনের স্লিপারের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার বিছানাপত্র, পাটি, বাসনপত্র। রেললাইনের পাশে মাটির উনুনে ভাত রান্না করছেন। বাড়ির পোষা মুরগিটিকেও নিয়ে এসেছেন। রেললাইনের ধারে সপরিবারে এক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

ঈদুল আজহা চলে এলো, এবারের ঈদে কী করবেন জিজ্ঞেস করতেই টেপিবাড়ি গ্রামের জয়গন বেওয়া বলেন, পনেরো দিন ধরে রেললাইনের পাশে এভাবেই বসবাস করলেও কোনো ত্রাণ পাইনি। কেউ খোঁজ নেয়নি। যেদিন মন্ত্রীরা আসছিল সেদিন গেছিলাম কিন্তু কিছুই পাইনি। ঘরে পানি উঠায় অনেক কিছুই আনতে পারি নাই। ছেলের কাজ নাই। একবেলা নাতি-নাতনির মুখে খাবার তুলতে পারলে আরেক বেলা না খেয়েই থাকতে হয়। ছেলেমেয়ে নিয়ে খাবারই জোটে না। আমাগো মতো গরিবের ঈদের আনন্দ বলতে কিছু নাই। ঈদের চাইতে আমরা একটু থাকার বা খাবার ব্যবস্থা করে সরকার তাতেই আমরা খুশি।

জয়গনের মতো আরেক গৃহবধূ বানের পানিতে ঘর তলিয়ে যাওয়ায় স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। একটি খুপড়ি ঘর তুলেছেন। তার স্বামী পেশায় ভ্যান চালক। শাহদত (৯) নামে এক ছেলে প্রতিবন্ধী। ভূঞাপুরে প্রতিমন্ত্রীর দেয়া শুকনা খাবার পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সে খাবার দু’দিনে শেষ হয়ে গেছে। স্বামীর রোজগার নেই। একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন।

ভুঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের চরগাবসারা দাখিল মাদ্রাসায় ১০ দিন ধরে আশ্রয় নিয়েছে এক পরিবার। তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি।

ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন অর্ধশত পরিবারের বানভাসি মানুষ। গাবসারা ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্প কেন্দ্র ও চর গাবসারা দাখিল মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কষ্টাপাড়া, ভালকুটিয়া, কুকাদাইর ও খানুরবাড়ি লোকজন উঁচু সড়কে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

স্বামী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার ভালোই চলছিল ফিরোজা বেগমের। স্বামী রওশন আলী ভ্যান চালাতেন। কয়েক মাস আগে রওশন আলী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর মৃত্যুর পর অভাব-অনটন নেমে আসে ফিরোজা বেগমের সংসারে। তবু সংগ্রাম চলছিল তার। শেষ সম্বল হিসেবে বাড়ির ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে একটি কুঁড়েঘর ছিল।

কিন্তু যমুনার করাল গ্রাস কেড়ে নিয়েছে ফিরোজার সেই কুঁড়েঘরটিও। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশাহারা টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর উপজেলার কষ্টাপাড়া গ্রামের বিধবা ফিরোজা। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সামনে ঈদুল আজহা।

এ প্রসঙ্গে ফিরোজা জানান, আমাগো মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। দুমুঠো খাবারের জোগাড় নাই। ঈদের আনন্দ বন্যা ও যমুনার ভাঙনের সাথে চলে গেছে। কোথায় আশ্রয় নিব, কার কাছে যাব, কিছুই কূলকিনারা পাচ্ছি না।

বঙ্গবন্ধু সেতু সড়কের পাশে গোহালিয়াবাড়ি এলাকায় উঁচু স্থানে পলিথিনের বেড়া দিয়ে ঘর তৈরি করেছেন টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কুশাবাড়ি গ্রামের রানু বেগম। পলিথিনের ঘরের এক কোনায় মাটির উনুনে ভাত বসিয়েছেন। ভাত রান্না হলে মেয়েকে খেতে দেবে। মেয়েকে বাম হাতে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন আর ডান হাতে উনুনে খড়ি দিচ্ছেন।

উনুনের পাড়েই কথা হয় রানু বেগমের সঙ্গে। রানু বেগম জানান, বানের পানির স্রোতে ছোট দুটি ঘর তলিয়ে গেছে। বানের পানি সরলে ওই ঘর না সারালে থাকা যাবে না। ঘর সারানোর টাকা কোথায় পাব। স্বামীর কাজ নাই। পানি নেমে গেলে ভ্যান চালিয়ে যা পাবে তা দিয়ে খাবারই কিনব নাকি ঘর সারাব। এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ পাই নাই। গরিবের আবার ঈদ।

গোপালপুর উপজেলার শোনামুই গ্রামের মনোয়ারা বেগম, নূরজাহান বেগমসহ কয়েকজন নারী এক মেয়েশিশুকে নিয়ে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদের বাড়িঘরও বানের পানিতে ডুবে গেছে।

কেবল জয়গন ফিরোজা, রানু বেগম, মনোয়ারা বেগম, নূরজাহান বেগম, আমিনা বেগমই নন, যমুনার সর্বনাশা ভাঙনে এভাবে পথে বসেছে ভুঞাপুর, কালিহাতী উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কষ্টাপাড়া, ভালকুটিয়া ও খানুরবাড়ি এলাকার তিন শতাধিক পরিবার। গাবসারা ও অজুর্না ইউনিয়নের বলরামপুর, তারাই, চর তারাই এলাকায় ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে যমুনার তীব্র স্রোতে।

বানভাসি লোকেরা জানান, ভাঙনরোধে টাঙ্গাইলের পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সময়মতো উদ্যোগ নিলে তারা এতগুলো পরিবার স্বামী, সন্তান নিয়ে বিপদে পড়তেন না। তারাও আজ কোরবানি দেয়ার কথা ভাবতেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×