দাবার সঙ্গেই মিতালি খুশবুর

ওয়ারসিয়া খুশবু। বয়স সাত বছর। রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ইংলিশ মিডিয়ামে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। এ বয়সেই দাবার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জয়ের খুশবু ছড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি উজবেকিস্তানের তাসখন্দে এশিয়ান স্কুল দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব-৭ বছর বিভাগে র‌্যাপিড ও স্ট্যান্ডার্ড দু’বিভাগেই জিতেছে সোনা আর ব্লিৎজ বিভাগে জিতে নিয়েছে রৌপ্য পদক। এই ক্ষুদে দাবাড়ুকে নিয়ে লিখেছেন-

  ওমর ফারুক রুবেল ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বয়সটা পুতুল খেলার। নানা রঙের, নানা ঢঙে পুতুল খেলে সময় কাটানোর। খেলার সাথীদের পুতুলের সঙ্গে পুতুলের বিয়ে দেয়ার। এই বয়সী ছেলেমেয়েরা মুঠোফোনে রীতিমতো গেমস নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু পুতুল কিংবা গেমস- কোনোটাই টানেনি তাকে। টানবে কেন? দাবার সঙ্গেই যে তার মিতালি। সারাক্ষণ দাবার ঘুঁটি নিয়েই বসে থাকে ছোট্ট খুশবু। দাবাই যেন তার ধ্যানজ্ঞান।

খুশবুর জন্ম ২০১২ সালের ২১ আগস্ট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই দাবার সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। ২০১৭ সালে প্রতিযোগিতামূলক আসরে খেলতে নেমেই ফিদে আন্তর্জাতিক রেটিং লাভ করে। এভাবেই এ ক্ষুদে বিস্ময়ের দাবায় পদচারণা শুরু। জাতীয় পর্যায়ে খুশবু তার অনূর্ধ্ব-৬ ও অনূর্ধ্ব-৮ ক্যাটাগরিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। ঘরোয়া দাবার জাতীয় সাব-জুনিয়র, জুনিয়র ও জাতীয় ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপে নিজ ইভেন্টে বরাবরই চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে। ইতিমধ্যেই জাতীয় নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বড়দের সঙ্গে লড়েও ২২তম হয়েছে।

দাবার খেলার দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে স্কুলের ক্লাবওয়ার্ক আর হোমওয়ার্ক কোনোটিই যেন মাথায় ধরে না খুশবুর। একদিন স্কুল থেকে ফিরে ভীষণ কান্নাকাটি করে ওয়ারসিয়া খুশবু। পরদিন কিছুতেই স্কুলে যেতে চায় না সে। তবে মেয়ের স্কুলে যাওয়ার অনাগ্রহটা জানতে বেশি সময় লাগেনি বাবা মেহেদি কায়সার ও মা শাহিদা আক্তারের। স্কুলের ম্যাডাম তাদের ডেকে বলেছিলেন, ‘শুধু দাবা খেললেই হবে, পড়াশোনা করতে হবে না? দাবা খেলাটা বরং ছেড়েই দাও।’ আর যায় কোথায়? ম্যাডামের এই কথাতেই ভীষণ কষ্ট পায় খুশবু। তার খুব অভিমান হয়। কষ্টে কাঁদতে থাকে।

বছরখানেক আগে রাগ, ক্ষোভ, অভিমানে স্কুলই ছেড়ে দিতে চেয়েছিল খুশবু। আগস্টে সাতে পা দেয়া খুশবু সাদা-কালো দাবা বোর্ডের চৌষট্টি ঘরের রাজা-মন্ত্রী, হাতি-ঘোড়া, সৈন্য-সামন্ত নিয়েই বেশি ব্যস্ত সময় পার করে। আড়াই বছর আগে বাবার সঙ্গে দাবা খেলায় হাতেখড়ি খুশবুর। শখের বসে বাবার সঙ্গে বসে বসে দাবা খেলত বাড়িতে। কিন্তু খুশবুর মনের মধ্যে দাবা খেলার বীজটা প্রথম বুনে দিয়েছিলেন স্কুলের একজন ক্রীড়া শিক্ষিকা। একদিন স্কুলে এসে সবাইকে তিনি ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে দাবা খেলা শিখতে চাও, হাত তোল।’ অন্যরা যখন হাত না তুলে চুপচাপ বসে রইল, খুশবু কিছু না বুঝেই হাত তুলেছিল। এরপর ধীরে ধীরে স্কুল থেকেই দাবা খেলাটা শিখে ফেডারেশনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় খুশবু।

এরই মধ্যে খুশবু বিভিন্ন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক আসরে নিজের জায়গা করে নিতে শুরু করেন। গত বছর কলকাতায় টেলিগ্রাফ স্কুল দাবায় অনূর্ধ্ব-৬ বছর ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে হইচই ফেলে দেয়। উজবেকিস্তানে পশ্চিম এশিয়া যুব চ্যাম্পিয়নশিপের ব্লিৎজ দাবায় স্বর্ণ পদক জেতে। এরপর থাইল্যান্ডে এশিয়ান যুব চ্যাম্পিয়নশিপে একটি স্বর্ণ ও দুটি রৌপ্য পদক জিতে নেয়। জুনিয়র ও সাব-জুনিয়র দাবায় মেয়েদের অনূর্ধ্ব-৮ বছর বয়সের ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়নও হয়। এতসবের মধ্যেও খুশবুর সেরা অর্জন এশিয়ান স্কুল দাবায় স্বর্ণ জেতা। এ বছরের ২৭ জুন উজবেকিস্তানের তাসখন্দে এশিয়ান স্কুল দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের অনূর্ধ্ব-৭ বছর ক্যাটাগরিতে র‌্যাপিড ও স্ট্যান্ডার্ড বিভাগে জিতেছে স্বর্ণ। ব্লিৎজে রৌপ্য।

অথচ অর্থাভাবে এই টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়া নিয়েই সংশয়ে ছিল ক্যান্ডিডেট মাস্টার খেতাবধারী ১৩৩০ রেটিং থাকা খুশবু। বাবা মেহেদি কায়সার একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন। মা গৃহিণী। বাবার চাকরির আয়ে খুশবু ঘরোয়া টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও দেশের বাইরে খেলতে যাওয়াটা বলতে গেলে অসম্ভবই হয়ে পড়ে। খুশবুর অংশ নেয়ার সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসায় চোখে-মুখে রীতিমতো সরষে ফুল দেখছিল বাবা-মেয়ে দু’জনই। উজবেকিস্তান যাওয়ার আগে বিমান টিকিটের জন্য আর্তি জানিয়েছিল খুশবু। এরপরই তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে সফটওয়্যার কোম্পানি বিট মাসকট প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ফিন্যান্স ম্যানেজার অসীম কুমার ঘোষ খুশবুর বাবার হাতে বিমানের টিকিট তুলে দেন। খুশবুর এমন সাফল্যে বেশ উচ্ছ্বসিত এই কর্মকর্তা।

খুশবুর এই সাফল্যে তিনি বলেন, গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব আমাদের কাছে এই মেয়ে সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়েছিলেন। ও ভালো খেলবে জানতাম। কিন্তু এত ভালো ফল করবে, বুঝিনি। ওর এশিয়ান দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সামান্য অবদান আছে ভেবেই আনন্দ হচ্ছে। ভবিষ্যতেও ওর পাশে থাকব আমরা।

মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত খুশবুর বাবা মেহেদি কায়সার বলেন, দাবায় মেয়ে ভালো করছে বলেই শতকষ্টের ভেতরেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে খেলাটি চালিয়ে নিচ্ছি আমরা। কিন্তু উজবেকিস্তানে যাওয়ার আগে স্পন্সরের অভাবে অনেক ভুগেছি। এক লাখ দশ হাজার টাকার প্রয়োজন ছিল। পরে অবশ্য মেয়ের আবদার রক্ষা করতে পেরেছে বিট মাসকট প্রাইভেট লিমিটেড। খুশবুও আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে।

মা শাহিদা আক্তারের মতে, ‘আসলে আমার মেয়েকে এখন সবাই এত আদর করে দেখে খুব ভালো লাগে। প্রতিবেশীরা তাদের ছেলেমেয়েদের ডেকে বলেন, দেখ এইটুকু মেয়ে কীভাবে দাবা খেলে স্বর্ণ জিতেছে।

খুশবুর এমন সাফল্যে গর্বিত তার স্কুলের শিক্ষকরাও। বিমানবন্দরে খুশবুকে ফুলেল সংবর্ধনা জানাতে গিয়েছিলেন স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান। শুরুতে স্কুলে ওর অর্ধেক বেতন দেয়ার কথা থাকলেও এখন বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে স্কুলটি। খুশবু স্বপ্ন দেখে, তাই ওর স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বলে, ভবিষ্যতে আমি অনেক বড় দাবাড়ু হতে চাই। নিয়মিত খেলতে পারলে অনেক বড় হব, সবাই বলে।

মাত্র ৭ বছর বয়সী খুশবু বর্তমানে বাংলাদেশে যুব দাবা প্রতিযোগিতার অনূর্ধ্ব-৮ (বালিকা) বিভাগের শীর্ষ দাবাড়ু। দেশি-বিদেশি সব ধরনের টুর্নামেন্ট মিলিয়ে এগারটিতে চ্যাম্পিয়ন, ছয়টিতে রানার্স আপ এবং একটিতে ব্রোঞ্জপদক জিতেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি আন্তর্জাতিক শিরোপা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×